জ্বালানি সাশ্রয়ের অজুহাতে অনলাইন ক্লাস
বাস্তবে কি বাড়বে না বিদ্যুৎ খরচই?
শুক্রবার, ৩ এপ্রিল, ২০২৬ ৫:৪৯ অপরাহ্ন
শেয়ার করুন:
বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের অজুহাতে দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সপ্তাহে তিন দিন অনলাইন ও তিন দিন সশরীরে ক্লাস চালুর সিদ্ধান্ত নিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। কিন্তু একটি ক্লাসরুমের ছয়টি ফ্যান–টিউবলাইট বন্ধ রেখে ৮০ শিক্ষার্থীকে বাড়িতে পাঠিয়ে দিলে বাস্তবে কি সত্যিই বিদ্যুৎ সাশ্রয় হবে, নাকি উল্টো ৮০টি ফ্যান, ৮০টি বাতি ও অসংখ্য ডিভাইস চালিয়ে আরও বড় জ্বালানি চাপ তৈরি হবে—এ নিয়ে উঠেছে বড় প্রশ্ন।
ধরা যাক, একটি শ্রেণিকক্ষে ৮০ জন শিক্ষার্থী। এই ৮০ জনকে ক্লাস করাতে প্রয়োজন হয় ধরা–বাঁধা ছয়টি সিলিং ফ্যান আর মেঘলা দিনে আরও ছয়টি টিউবলাইট। সব মিলিয়ে ১২টি বৈদ্যুতিক যন্ত্রের মাধ্যমে একটি ক্লাসের পরিবেশ তৈরি হয়। এখন জ্বালানি সাশ্রয়ের নামে যদি সেই ৮০ জনকে বাড়ি পাঠিয়ে অনলাইনে ক্লাস করতে বলা হয়, তাহলে একই ৮০ জন শিক্ষার্থীর মাথার ওপর আলাদাভাবে ৮০টি ফ্যান, ৮০টি আলো আর অনেকের বাড়িতে এয়ারকন্ডিশনার পর্যন্ত চালু থাকবে—এ হিসাব কি কেউ কষেছেন? সরকারের যুক্তি, অনলাইন ক্লাস চালু হলে গণপরিবহনের ব্যবহার কমবে, জ্বালানি খরচও কমে আসবে। কিন্তু বাস্তবে শিক্ষার্থীরা তো বাতাসহীন ঘরে বসে ক্লাস করবে না; ফ্যান, লাইট, অনেক ক্ষেত্রে এসি চালিয়েই তারা অনলাইন ক্লাসে বসবে—ফলে কেন্দ্রীয়ভাবে কয়েকটি ফ্যান–বাতি বন্ধ রেখে শত শত বাড়িতে দ্বিগুণ–তিগুণ লোড তৈরি হওয়ার ঝুঁকি থেকে যাচ্ছে।
প্রশ্ন আরও আছে প্রযুক্তিগত সক্ষমতা নিয়ে। দেশের কত শিক্ষার্থীর ঘরে ল্যাপটপ–ডেস্কটপ আছে, কতজন শুধু স্মার্টফোনে ভরসা করে, আর কতজনের ঘরে কোনো কার্যকর ডিভাইসই নেই—এ নিয়ে শক্ত কোনো ডেটা ছাড়াই নীতিনির্ধারকরা যেন অনলাইন ক্লাসকে সহজ সমাধান ধরে নিচ্ছেন। সরকার কি শিক্ষার্থীদের ট্যাব, কম্পিউটার বা ইন্টারনেট ডিভাইস সরবরাহ করবে, নাকি অভিভাবকদেরই নতুন করে এসব কিনে দিতে হবে—এই জবাবও নেই। অথচ করোনাকালে অনলাইন ক্লাসের অভিজ্ঞতা বলছে, ডিভাইস–সংকট ও ডাটা–খরচের চাপে বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থী কার্যত ক্লাসের বাইরে থেকে গেছে।
তার ওপর প্রতিটি ডিভাইস চালু রাখতে আলাদা বিদ্যুৎ লাগে, রাউটার–মোবাইল চার্জার, ল্যাপটপ–ডেস্কটপ—সব মিলিয়ে একটি ঘরে একসঙ্গে দুই–তিনটি ডিভাইসও চালু থাকতে পারে। ফলে একেকটি পরিবারে যে অতিরিক্ত লোড তৈরি হবে, তা কি জ্বালানি সাশ্রয়ের মূল লক্ষ্যকে প্রশ্নবিদ্ধ করবে না? যারা এসিসহ আরামে বসে ক্লাস করবে, তাদের বিদ্যুৎ খরচ তো আরও বেশি হবে। ফলে জ্বালানি সংকট কমানোর বদলে এ ধরনের পদক্ষেপে খরচ আরও বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
সবশেষে আসে নীতিগত প্রশ্ন। এই সিদ্ধান্তে লাভবান হবেন কারা? শিক্ষার্থী, শিক্ষক না সরকার—কেউই তা নিশ্চিতভাবে বলতে পারছে না। তবে ডিভাইস–বাজেট, নতুন গ্যাজেট কেনা, ইন্টারনেট প্যাকেজ—সব মিলিয়ে বড় ধরনের বাজার তৈরি হবে, এতে লাভবান হতে পারে কেবল ডিভাইস–বিক্রেতা ও সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী গোষ্ঠীই। সমাজে এমন ধারণা গড়ে উঠলে সরকারের জনপ্রিয়তা ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উপর আস্থাও প্রশ্নের মুখে পড়বে। জ্বালানি সাশ্রয়ের যুক্তি দেখিয়ে শিক্ষা ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনার আগে তাই সার্বিক বিদ্যুৎ–হিসাব, সামাজিক বৈষম্য ও প্রযুক্তিগত বাস্তবতা যাচাই করে, নিয়ে নিতে হবে শিক্ষক–অভিভাবক–শিক্ষার্থীদের মতামতও। নইলে এই সিদ্ধান্ত হয়তো শিক্ষাব্যবস্থার জন্য আরেকটি ভুল পরীক্ষামূলক উদ্যোগ হিসেবেই ইতিহাসে জায়গা করে নেবে।
লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট, লেখক।
১৩৭ বার পড়া হয়েছে