ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে বেড়েছে ট্রলিবয়দের দৌরাত্ম্য
শুক্রবার, ৩ এপ্রিল, ২০২৬ ৪:০৭ অপরাহ্ন
শেয়ার করুন:
ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে প্রবেশ করলেই রোগী বহনের জন্য খুঁজতে হয় ট্রলি। আর পাওয়া গেলেও যতক্ষণ না তাদের মনমতো টাকা দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়, ততক্ষণ মেলে না ট্রলি। ট্রলিবয়রা অজুহাত দেয়—এটা ওই ওয়ার্ডের ট্রলি না, অথবা এই ট্রলি অন্য রোগীর জন্য রাখা।
অনেক সময় দেখা যায়, মুমূর্ষু রোগীকে অ্যাম্বুলেন্স, রিকশা বা সিএনজি অটোরিকশায় রেখে স্বজনরা এদিক-সেদিক ছুটছেন একটি ট্রলি ম্যানেজ করার জন্য।
ট্রলিবয়কে খুশি করতে পারলেই মেলে ট্রলি, নয়তো স্বজনরা ধরেই রোগীকে নিয়ে যান ওয়ার্ডে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ট্রলিবয়দের নিয়ন্ত্রণে পদক্ষেপ নিলেও কিছুদিন পর আবার ফিরে যায় আগের অবস্থায়। অনেকটা জিম্মি হয়ে থাকেন রোগীর স্বজনরা ট্রলিবয়দের কাছে। অনেক সময় হাসপাতালের নিচে ট্রলির টাকা নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে হট্টগোল দেখা যায়। এতে চিকিৎসাসেবা নিতে আসা রোগীদের দুর্ভোগ কয়েকগুণ বেড়ে যায়।
টিকিট সংগ্রহ, চিকিৎসক দেখানো, ওষুধ সরবরাহ—সব ক্ষেত্রেই ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আগতদের ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে। নতুন করে আতঙ্কের আরেক নাম হয়ে উঠেছে ট্রলিবয়। রোগীর স্বজনদের জিম্মি করে টাকা নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে তাদের বিরুদ্ধে। দুই কোটি মানুষের স্বাস্থ্যসেবার অন্যতম ভরসার এই প্রতিষ্ঠানটির এমন দুরবস্থায় ক্ষুব্ধ রোগী ও তাদের স্বজনরা।
শেরপুর জেলার নালিতাবাড়ির বাসিন্দা মধ্যবয়সী রতন মিয়া। ভাঙা হাতের চিকিৎসা করাতে গত ১৪ মার্চ রাতে তিনি ময়মনসিংহ শহরে অবস্থান নেন। পরদিন সকালে টিকিট সংগ্রহ থেকে শুরু করে কয়েক ঘণ্টা বসেও ডাক্তারের দেখা না পেয়ে হাঁপিয়ে পড়েন তিনি।
রতন মিয়া বলেন, “মধ্যবিত্ত পরিবারের আমার জন্ম। আমি খেটে খাওয়া একজন মানুষ। প্রাইভেটে ডাক্তার দেখানোর মতো অবস্থা আমার নেই। তাই নালিতাবাড়ি থেকে আগের দিন রাতে ময়মনসিংহ চলে আসি। সকাল ৭টায় হাসপাতালে এসে লাইনে দাঁড়িয়ে টিকিট সংগ্রহ করতে সাড়ে ৮টা বেজে যায়। এরপর সাড়ে ৯টা পর্যন্ত অপেক্ষা করেও ডাক্তার আসেননি। সময়মতো সবকিছু হলে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি কিছুটা হলেও কমত।”
সময়মতো ডাক্তার না আসায় রতন মিয়ার মতো দূরদূরান্ত থেকে আসা রোগীরা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে ক্লান্ত হয়ে ফ্লোরে বসে ঘুমিয়ে পড়ছেন।
নান্দাইলের রোকেয়া বেগম, যিনি ফ্লোরে বসে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন, বলেন, “ভোরে নান্দাইল থেকে বাসে করে এসে প্রায় আটটার দিকে হাসপাতালে পৌঁছেছি। পরে ১০ টাকার বিনিময়ে লাইনে দাঁড়িয়ে একটি টিকিট সংগ্রহ করি। ডাক্তার দেখানোর অপেক্ষায় থাকতে থাকতে ঘুমিয়ে পড়েছি। শরীরটা খুব ক্লান্ত। দ্রুত ডাক্তার দেখাতে পারলে ওষুধ নিয়ে বাড়ি চলে যেতাম।”
৪০ মিনিট লাইনে দাঁড়িয়ে টিকিট সংগ্রহ করে দেড় ঘণ্টা অপেক্ষার পর ডাক্তার দেখিয়ে ওষুধ নিতে যান ফুলবাড়িয়া উপজেলার হিমেল। তিনি বলেন, “ডাক্তার স্লিপে চার ধরনের ওষুধ লিখলেও পেয়েছি দুই ধরনের। বাকিগুলো বাইরে থেকে কিনতে বলছে। এত কষ্টের পর সবগুলো ওষুধ পেলে আমাদের মতো গরিবদের উপকার হতো।”
চিকিৎসক দেরিতে আসার কারণ জানতে চাইলে সিনিয়র স্টাফ নার্স আক্তার হোসেন বলেন, “স্যাররা একটু দেরিতে আসেন, তবে রোগীরা নির্ধারিত সময়ের অনেক আগে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকায় তাদের কষ্টটা বেশি হয়।”
ভর্তি রোগী ও তাদের স্বজনদের অবস্থা জানতে পুরাতন ভবনের দ্বিতীয় তলার ১৫ নম্বর ওয়ার্ডে গেলে দেখা যায়, রোগীর অতিরিক্ত চাপে মেঝেতেও পা ফেলার জায়গা নেই। সাংবাদিক দেখে কয়েকজন স্বজন ছুটে এসে ট্রলিবয়দের দৌরাত্ম্যের কথা জানান।
রোগীর স্বজন শরীফ হাসান বলেন, “জরুরি বিভাগের সামনে থেকে আমার রোগীকে দ্বিতীয় তলায় আনতে ট্রলিবয়কে ১০০ টাকা দিতে হয়েছে। আবার রোগীকে ট্রলিতে করে ডাক্তার দেখাতে নিলেও বকশিশ দিতে হচ্ছে। না দিলে খারাপ আচরণ করে।”
ফুলপুরের মো. ইয়াসিন তার বাবাকে ভর্তি করিয়েছেন। ওয়ার্ডে জায়গা না পেয়ে বারান্দায় থাকতে হচ্ছে। তিনি বলেন, “এত খারাপ অবস্থা কোথাও হতে পারে না। ডাক্তার দেখানো থেকে শুরু করে ওষুধ সংগ্রহ—সবখানেই হয়রানি। বাবাকে ওয়ার্ডে আনতে ট্রলিবয়কে ৮০ টাকা দিতে হয়েছে। আবার নিয়ে যাওয়ার সময়ও দিতে হবে বলে জানিয়েছে। সরকারি হাসপাতালে এমন নৈরাজ্য মেনে নেওয়া যায় না।”
তবে অভিযোগের বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক ট্রলিবয় বলেন, “আমরা কারও কাছ থেকে জোর করে টাকা নেই না। কেউ ভালোবেসে দিলে নেই।”
রোগী ও তাদের স্বজনদের ভোগান্তির কথা স্বীকার করে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. জাকির হোসেন বলেন, “এক হাজার শয্যার এই হাসপাতালে প্রতিদিন গড়ে সাড়ে চার হাজার রোগী ভর্তি থাকে। বহির্বিভাগে সেবা নেন অন্তত ৫ থেকে ৭ হাজার রোগী।”
তিনি আরও বলেন, “সম্প্রতি হাসপাতালে যোগদান করে সব বিষয় সম্পর্কে অবগত হয়েছি। এখন দায়িত্ব নিয়ে বলছি, রোগীরা যেন পর্যাপ্ত সেবা পায় তা নিশ্চিত করা হবে। কোথায় কী ধরনের ঘাটতি আছে তা খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। ওষুধ যে পরিমাণ মজুদ থাকে, তা সরবরাহ করা হয়।”
ট্রলিবয়দের বিষয়ে তিনি বলেন, “টাকা নেওয়ার বিষয়ে অভিযোগ আসায় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এমনটি আর হওয়ার সুযোগ নেই।”
সদর আসনের সংসদ সদস্য আবু ওয়াহাব আকন্দ ওয়াহিদ বলেন, “ওষুধ সংকট নিরসনের পাশাপাশি ভোগান্তি কমাতে আমরা কাজ করছি। শপথ গ্রহণের পর হাসপাতাল পরিদর্শন করে খোঁজখবর নিয়েছি। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গেও কথা বলেছি। আশা করছি সেবায় আমূল পরিবর্তন আসবে।”
১৪৩ বার পড়া হয়েছে