সর্বশেষ

মতামত

শিশু হত্যাকারীদের বিচার চাই

শিপন হালদার
শিপন হালদার

বৃহস্পতিবার , ২ এপ্রিল, ২০২৬ ৬:৪৬ অপরাহ্ন

শেয়ার করুন:
শিশুদের সুন্দর ভবিষ্যত নিয়ে আমরা টকশোতে অনেক কথা বলি। পত্র-পত্রিকায় লেখালেখি করি। কিন্তু সন্তানের সুস্থতা নিয়ে, নিরাপত্তা নিয়ে তেমন ভাবি বলে মনে হয় না। কারণ, আমরা দায়িত্বপ্রাপ্ত যারা, তারা সবাই আখের গোছাতে ব্যস্ত, সন্তানদের নিয়ে ভাবার সময় পাই না।

ক্ষমতার চেয়ারে বসলে প্রটোকল নিয়ে জনগণের থেকে দূরে সরে যাই। নিরাপত্তার নামে বলয় তৈরি করি; যেন সাধারণ মানুষ ধারে-কাছে আসতে না পারে। আর ব্যস্ততার অজুহাতে সন্তানদের সময় দেওয়াতো-প্রশ্নই ওঠে না। এতো কথা এই কারণে লিখছি, যে অভিভাবক হিসেবে আমরা কতটা দায়িত্বজ্ঞানহীন, উদাসীন এবং স্বার্থপর। নীতিনির্ধারক হিসেবেও আমরা ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছি। এ কারণে আগামী প্রজন্ম কখনোই আমাদের ক্ষমা করবে না।

প্রায় শতভাগ প্রতিরোধযোগ্য সংক্রামক রোগ হামে আক্রান্ত হয়ে শিশু মারা যাচ্ছে। দেশে চলতি বছরে এ পর্যন্ত অর্ধশতাধিক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। শুধু ২০২৬ সালের প্রথম তিন মাসে আক্রান্তের সংখ্যা ৬৮ থেকে বেড়ে ৬৭৬-এ পৌঁছেছে। এটা ভাবা যায়? ভাবলেই স্বপ্ন দেখানো এক সরকারের অন্তসারশূণ্য কদর্য চেহারা ভেসে উঠছে। যারা কী না শিশুদের জীবন ঝুঁকিতে ফেলে দিয়েছে। জনমনে প্রশ্ন উঠছে, প্রায় ১৬ বছর ক্ষমতায় থাকা সরকার কী করলো তাহলে? আবার ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারও বা কী করলো? একজন অদক্ষ, অযোগ্য স্বাস্থ্য উপদেষ্টাকে কেন এতো সমালোচনার পরও চেয়ারে রাখা হয়েছিল? এটাও স্বৈরাচারী মানসিকতার বহি:প্রকাশ। সবগুলো বিষয় খতিয়ে দেখার সময় এসেছে।

অনেকেই বলছেন, ২০২৫-২৬ সালে হামের যে ভয়াবহ বিস্তার ঘটেছে, তা কোনও প্রাকৃতিক সংকট নয়—এটি সদ্য সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের নীতিগত ভুল, প্রশাসনিক অদক্ষতা এবং অদূরদর্শী সিদ্ধান্তের ধারাবাহিক পরিণতি। একটি দেশে যেখানে বছরের পর বছর ৯৫ শতাংশের ওপরে টিকাদান কাভারেজ ধরে রাখা হয়েছিল, সেখানে ২০২৫ সালে কাভারেজ নেমে দাঁড়ায় ৫৬-৫৭ শতাংশে। এটা নিছক পতন নয়, বরং একটি প্রতিষ্ঠিত স্বাস্থ্যব্যবস্থা ভেঙে পড়ার স্পষ্ট চিহ্ন।

সম্প্রতি প্রকাশিত একটি পত্রিকার তথ্যমতে, ২০২৫ সালে হাম-রুবেলা টিকার কাভারেজ নেমে আসে যথাক্রমে প্রথম ডোজে ৫৬.৫ শতাংশ এবং দ্বিতীয় ডোজে ৫৭.১ শতাংশে, যা দেশের টিকাদান ইতিহাসে নজিরবিহীন পতন।

ঢাকা মেডিকেল কলেজের মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. কাকলী হালদার জানিয়েছেন, হাম কেবল সাধারণ জ্বর বা ফুসকুড়ি নয়; এটি জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে। নিউমোনিয়া, মারাত্মক ডায়রিয়া, কানের সংক্রমণ (যা থেকে বধিরতা হতে পারে) এমনকি মস্তিষ্কের প্রদাহের (এনসেফালাইটিস) মতো জটিলতা তৈরি হতে পারে হাম থেকে। সঠিক সময়ে টিকা নিলে এসব প্রাণঘাতী ঝুঁকি থেকে প্রায় শতভাগ সুরক্ষা পাওয়া সম্ভব।

তিনি আরও জানান, হাম বাড়ার প্রধান কারণ হলো টিকাদান কর্মসূচিতে ঘাটতি। অনেক শিশু নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি বা ইপিআই থেকে বাদ পড়ে যাওয়ায় তাদের শরীরে রোগ প্রতিরোধক্ষমতা তৈরি হয়নি। এ ছাড়া ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা এবং অপুষ্টির কারণেও ভাইরাসের বিস্তার দ্রুত ঘটে। টিকা না নেওয়া বা অসম্পূর্ণ ডোজ নেওয়ার ফলে একটি বড় জনগোষ্ঠী ঝুঁকির মুখে থাকে, যা প্রাদুর্ভাবের মূল কারণ।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এমন মহামারি পরিস্থিতিতে এখন প্রয়োজন বর্তমান সরকারের সক্রিয়, সুসংগঠিত ও দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ, কারণ শিশুস্বাস্থ্য রক্ষায় তাদের ভূমিকা এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, একটি দ্রুত জাতীয় ‘ক্যাচ-আপ ইমিউনাইজেশন ক্যাম্পেইন’ চালু করতে হবে। এই ক্যাম্পেইন ছাড়া সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব নয়। এর মাধ্যমে ৯ মাস ও ১৫ মাস বয়সের শিশুদের পাশাপাশি যেসব বড় শিশুরা নিয়মিত ডোজ মিস করেছে, তাদের আবারও টিকাদানের আওতায় আনতে হবে।

বিশেষজ্ঞরা আরও বলছেন, দ্রুততম সময়ের মধ্যে টিকাদান সরবরাহ চেইনকে পুনর্গঠন করতে হবে। কেবল টিকা দেশে পৌঁছানো যথেষ্ট নয়, বরং ব্যবহার নিশ্চিত করাই মূল চ্যালেঞ্জ। তাদের মতে, মাঠপর্যায়ের ৩০-৩৫ শতাংশ শূন্যপদ পূরণ করা ছাড়া টিকাদান কার্যক্রম স্থায়ীভাবে পুনরুদ্ধার করা সম্ভব নয়।

আমরা চাইবো, বর্তমান সরকার মহামারি পরিস্থিতি দক্ষতার সাথে সামাল দেবে। একই সাথে একটি দীর্ঘমেয়াদি নীতি-কাঠামো নিশ্চিত করবে। যাতে আগামী দিনে এ ধরনের প্রাদুর্ভাব প্রতিরোধ করা সম্ভব হতে পারে। তবে হাম প্রতিরোধে জনসচেতনতা তৈরিই হবে সবচেয়ে কার্যকর পদক্ষেপ। আমাদের সন্তানকে আমাদেরকেই ভাবতে হবে। অন্য কেউ ভাববে না। তাই দেরি না করে আপনার শিশুকে সময়মতো টিকা দিন। সন্তানকে হাম থেকে সুরক্ষিত রাখুন।

সবশেষে, যাদের অবহেলায়, উদাসীনতায়, দায়িত্বজ্ঞানহীনতার কারণে আমাদের সন্তানরা ফুল হয়ে ফোটার আগেই অকালে ঝরে গেছে। মায়ের বুক খালি হয়েছে। হাহাকার আর আর্তনাদে ভারি হচ্ছে আকাশ। তাদের কোনো ক্ষমা নেই। শিশুদের জীবন বিপন্ন করার দায়ে দায়ীদের বিচারের আওতায় নিয়ে আসা দরকার। গণমাধ্যমের কাছে দাবি, যারা টিকা নিয়ে নয়-ছয় করেছে, অনিয়ম-দুর্নীতি করেছে, লুটপাট করেছে, তাদের মুখোশ জাতির সামনে উন্মোচন করা হোক। আমরা চাই, বর্তমান সরকারের কাছ থেকে এ ব্যাপারে কঠোর ও আপোষহীন পদক্ষেপ গ্রহণ করুক। আমরা বিচারের কাঠগড়ায় দেখতে চাই শিশু হত্যাকারীদের।

লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক।

১২২ বার পড়া হয়েছে

শেয়ার করুন:

মন্তব্য

(0)

বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০
বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন
এলাকার খবর

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন














সর্বশেষ সব খবর
মতামত নিয়ে আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০
বিজ্ঞাপন