‘বনলতা সেন’ কাব্যে সময়চেতনার অখণ্ড প্রবাহ:
প্রেম, স্বপ্ন ও নারীর নিসর্গময় রূপান্তর
সোমবার, ৩০ মার্চ, ২০২৬ ২:০৬ অপরাহ্ন
শেয়ার করুন:
'বনলতা সেন' জীবনানন্দ দাশের শ্রেষ্ঠ প্রেমের কাব্য। এটি বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রেমের কাব্যগ্রন্থ। এ কাব্যে নারী, প্রেম, স্বপ্ন ভিন্নতর এক মাত্রায় উপনীত হয়েছে। আলোচ্য কাব্যে বহুবিধ নারীর উপস্থিতি কবির জাগ্রত স্বপ্নবলয়ে প্রাধান্য বিস্তার করতে দেখি আমরা।
বলাবাহুল্য এই স্বপ্নবলয় সময়চেতনার একটি দিব্য-কেন্দ্রবিন্দু বেষ্টন করে থাকে। 'বনলতা সেন' কাব্যে প্রেম, নারী, নিসর্গ একটি সময়চেতনার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত; যা অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎকে একই সমান্তরালে এনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।
'বনলতা সেন' কবিতায় সময়চেতনার মধ্য দিয়ে স্বপ্ন ও প্রত্যয়ের প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। 'বনলতা সেন' কাব্যে এবং এর নাম কবিতায় নারী ও প্রেম সময়-চৈতন্য শাসিত। 'বনলতা সেন' কাব্যে কবি যে প্রেম ও জীবনের অবিনশ্বরতার তাৎপর্য অন্বেষণ করেছেন, তাও তিনি করেছেন অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎকে একই পাত্রে সমুপস্থিত করে। এ খাতে সুদূর অতীতের অভিযোগ যেমন উজ্জ্বল হয়েছে, তেমনি দীপিত হয়েছে বর্তমান ও ভবিষ্যৎ। 'বনলতা সেন' কাব্যে স্থান ও পাত্রের সীমিত রূপ লক্ষ করা যায় 'বনলতা সেন' কবিতার 'আমাকে দু'দন্ড শান্তি দিয়েছিল নাটোরের বনলতা সেন' পঙ্ক্তিতে।
'বনলতা সেন' কাব্যের নাম কবিতার পাশাপাশি 'সুদর্শনা' কবিতায়ও আমরা সময়চেতনার স্বাক্ষর পাই। 'সুদর্শনা' কবিতায় কবি লেখেন—
"এই পৃথিবীর ভালো পরিচিত রোদের মতন
তোমার শরীর; তুমি দান করোনি তো;
সময় তোমাকে সব দান করে মৃতদার বলে
সুদর্শনা, তুমি আজ মৃত।” ['সুদর্শনা' 'বনলতা সেন']
স্থান ও পাত্রের সীমিত রূপ অসীমের আবহনও বটে। 'বনলতা সেন' কাব্যের বিভিন্ন কবিতায় অতীতের পাত্রেই ঘটেছে সদাবর্তমানতার উপলব্ধি, যা সময়চেতনারই প্রত্যক্ষ ফল।
'শ্যামলী' কবিতায়ও আমরা সময়চেতনা প্রত্যক্ষ করি,
"অনেক অপরিমেয় যুগ কেটে গেল;
মানুষকে স্থির-স্থিরতর হতে দেবে না সময়;
সে কিছু চেয়েছে বলে এত রক্তনদী।
অন্ধকার প্রেরণার মতো মনে হয়
দূর সাগরের শব্দ—শতাব্দীর তীরে এসে ঝরে:
কাল কিছু হয়েছিল; তবে কি শাশ্বতকাল পরে।" [শ্যামলী', 'বনলতা সেন']
জীবনানন্দ দাশের 'বনলতা সেন' কাব্যের বিভিন্ন কবিতায় 'Space' এর সঙ্গে 'Time' উপস্থাপিত হয়ে একটি অনড় সম্প্রসারণশীল অখ সত্যরূপে বিধৃত হয়েছে। এ প্রসঙ্গে আমরা জীবনানন্দ দাশের নিজের মন্তব্য মনে করতে পারি : “আমার কাব্য প্রেরণার উৎস নিরবধিকাল এবং ধূসর প্রকৃতি-চেতনার ভিতরে রয়েছে বলেইতো মনে করি।” জীবনানন্দ দাশের সময়চেতনা স্থানচেতনার সঙ্গে সম্পৃক্ত; যেটিকে জীবনানন্দ দাশ মনে করতেন ‘মহাবিশ্বলোকের ইশারা'। সময়চেতনার এই দার্শনিক পটভূমি নিঃসন্দেহে গুর“ত্বপূর্ণ, যা ‘স্থান' বা 'Space' কিংবা 'Matter' বা বস্তুর মতো একই সঙ্গে আয়তনসর্বস্ব এবং ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য। পাশাপাশি 'Space' দৈর্ঘ্য-প্রস্থ-উচ্চতাবিশিষ্ট বস্তুর সঙ্গে তুলনীয়। এ বিবেচনায় Space-ও বস্তুর মতো অসীম। 'Space' এর সঙ্গে 'Time' একাকার হয়ে যায়। একটি অনড় সম্প্রসারণশীল অখ সত্যরূপে উপস্থাপিত হয়। কবি এ অখ” সত্যরূপকে উপস্থাপন করেছেন ব্যক্তির ক্ষণস্থায়ী চৈতন্যে।
এ প্রসঙ্গে জেমস জিনসের কথা বলা যেতে পারে। 'Space'-সংলগ্ন সময়ের বৈশিষ্ট্যগুলোকে জেমস জিনস যেভাবে উপস্থাপন করেছেন, তা এভাবে ব্যক্ত করা যায়, ১. সময় সঞ্চরণশীল, এর অতি চিরকালীন।
২. সময় খন্ডিত নয়; অখন্ড, নিয়ত প্রবহমান ।
৩. অতীত এবং অড়িত্বের সম্পর্ক এক। অতীত এবং ভবিষ্যতের মধ্যে পার্থক্যরেখা টানা অসম্ভব।
৪. স্থান ও সময় এমনিভাবে একা যে, এর ব্যক্তি নিরপেক্ষ স্বয়ম্ভূ অস্তিত্ব কোনোভাবেই সম্ভব নয়।
৫. ব্যক্তির আপেক্ষিক গুরত্ব আছে। তবে তা মুহূর্তের ব্যাপার মাত্র ।
৬. নিঃসন্দেহে বস্তু অবিনাশী, পরিবর্তনশীল, বিবর্তনশীল এবং সময়-সম্পৃক্ত। সময়চেতনা সম্পর্কে জীবনানন্দ দাশের নিজস্ব বক্তব্য হচ্ছে : “মহাবিশ্বলোকের ইশারা থেকে উৎসারিত সময়চেতনা আমার কাব্যে একটি সংগতিসাধন অপরিহার্য সত্যের মতো, কবিতা লিখবার পথে কিছু দূর অগ্রসর হয়েই এ আমি বুঝেছি, গ্রহণ করেছি। ” [জীবনানন্দ দাশ : ‘কবিতার কথা’] অড়রের স্বপ্ন-জগত যে মুহূর্তে ভুল মনে হয়, তা-ও সময়চেতনার কারণেই। জীবনানন্দ দাশের ‘বনলতা সেন' কবিতায় 'Timeless time' বিশেষভাবে প্রকাশিত হয়েছে। এ কবিতায় 'Timeless' এবং 'Temporal'-এর অদ্ভুত আইনস্টাইনীয় দেশ-কাল-সড়তি (Space-time-contimence) তত্ত্বের বিশেষত্ব জীবনানন্দ দাশের ‘বনলতা সেন’ কাব্যে বিশেষভাবে প্রভাব বিস্তার করেছে। তিনি তার কবিতায় উপলব্ধির প্রাথমিক থেকেই এই তত্ত্বের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সাযুজ্য অনুভব করেছেন। বলা যায়, এটিই তার ‘মহাবিশ্বলোকের ইশারা’ হয়ে উৎসারিত ‘সময়চেতনা’; যা তার কাব্যে আপাতবিচ্ছিন্ন; অভিজ্ঞতাসমূহের সংগতি সাধন করে । সময়চেতনার অনুপ্রেরণায় জীবনানন্দ দাশ যেমন সার্থক কবিতা রচনা করেছেন; তেমনি তার বেশ ক'জন পূর্বসুরিও সময়চেতনার সার্থক কবিতা রচনা করেছেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন— ইয়েটস, মার্লামে, এলিয়ট, রিলকে প্রমুখ। সময়ের অসীমতা, প্রবহমানতা জীবনানন্দ দাশের কবিতায় বিশেষভাবে বিস্তৃর লাভ করেছে; যা তার অখ” সময়চেতনার স্বাক্ষর বহন করে। কবি তাই লেখেন,
“হাজার বছর ধরে আমি পথ হাঁটিতেছি পৃথিবীর পথে, সিংহল সমুদ্র থেকে নিশীথের অন্ধকারে মালয় সাগরে অনেক ঘুরেছি আমি; বিম্বিসার অশোকের ধূসর জগতে সেখানে ছিলাম আমি; আরো দূর অন্ধকারে বিদর্ভ নগরে; আমি ক্লান্ডপ্রাণ এক, চারিদিকে জীবনের সমুদ্র সফেন, আমারে দু'দ” শাড়ি দিয়েছিল নাটোরের বনলতা সেন।”
[‘বনলতা সেন', ‘বনলতা সেন’]
সময়চেতনার বিবেচনায় ‘বনলতা সেন” কাব্য উর্বর ভূমি, ফলবান বৃক্ষ। এ কাব্যের স্বপ্নমেদুরতা, জাগ্রত-স্বপ্নের (Vision) অপূর্ব লীলাক্ষেত্রে বিস্ময়কর পক্তি-সৃজন জীবনানন্দ দাশের সময়চেতনার সাক্ষ্য বহন করে। এ কাব্যের মহতী সৌন্দর্যবোধ, উদ্দীপ্ত কল্পনার ও সময়চেতনার পরিণত নিরীক্ষণ লক্ষ করা যায়।
প্রেমাবেগ নিয়ে রচিত জীবনানন্দ দাশের ‘বনলতা সেন' কাব্যে অনেক নারীর উপস্থিতি লক্ষ করা যায়। আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে যে, নারীকে তিনি এখানে শরীরী করে তুলেছেন, কামনাবাসনার স্রোতে প্রবাহিত করেছেন। মনে হতে পারে কবি উন্মাতাল প্রেমাবেগের ঝড়-ঝঞ্ঝায় বিধ্বড় হয়েছেন; কিন্তু এর কোনোটাই সত্য নয়। নারীর রূপ-সৌন্দর্যের উলেখ থাকলেও জীবনানন্দ দাশের কবিতায় উলিণ্ঢখিত নারীগণ কবিকে শরীরী প্রেমে উদ্বুদ্ধ করেননি। সেখানে হৃদয়ের তাপ থাকলেও শরীরের ফেনিল উচ্ছ্বাস নেই। কবিতায় উলিণ্ঢখিত এই সব নারীগণ কবির স্বপ্নের নায়িকা। তারা কেউই গার্হস্থ্য রমণী নন। শরীরী প্রেমের চতুরালিতে তারা অভ্যড় নন। প্রেমের শাশ্বত ক্ষুধা এসব নারীর নেই। আবেগ সংরাগের যে সংহত প্রকাশ জীবনানন্দ দাশের ‘বনলতা সেন' কাব্যে ঘটেছে; সেখানে জীবনবেদন থাকলেও জৈবিক আবেদন নেই। সুস্থির নান্দনিক প্রেমের যে টীকাভাষ্য জীবনানন্দ দাশের ‘বনলতা সেন' কাব্যে পাওয়া যায়—তা বাংলা কবিতার ক্ষেত্রেও উজ্জ্বল ও ব্যতিক্রম।
জীবনানন্দ দাশের প্রেমাবেগ উৎসারণের পিছনে কাজ করেছেন অনেক দয়িতা। ‘বনলতা সেন' কাব্যে এসব দয়িতা শরীরী প্রেমে অভ্যড় নন বলেই উচ্চমার্গের স্বপ্নের ও নান্দনিক ভুবনের বাসিন্দা তারা। তাদের মধ্যে রয়েছেন— বনলতা সেন, সুদর্শনা, শ্যামলী, সুরঞ্জনা, সবিতা, শেফালিকা বোস প্রমুখ। কবির হৃদয়াবেদনা প্রকাশে এসব স্বপ্নের নায়িকা মুখরিত হয়েছেন কবিতায়। তারা মনোরম, মনোহর, হার্দ্য, অনুত্তেজিত। ফলে জীবনানন্দ দাশের কবিতায় যৌন প্রবর্তনার জন্ম হয় না। সেখানে শরীরকাতরতা কিংবা দয়িতার শরীর পর্যটনের প্রসঙ্গ নেই; যদিও প্রিয়দর্শিনীর রূপ-সৌন্দর্যের স্বপ্নমুগ্ধতা আছে সেখানে। কবি লেখেন,
“চুল তার করেকার অন্ধকার বিদিশার নিশা,
মুখ তার শ্রাবস্তীর কার কার্য; অতিদূর সমুদ্রের ‘পর
হাল ভেঙে যে নাবিক হারায়েছে দিশা
সবুজ ঘাসের দেশ যখন সে চোখে দেখে দারচিনি- দ্বীপের ভিতর,
তেমনি দেখেছি তারে অন্ধকারে; বলেছে সে, ‘এতদিন কোথায় ছিলেন?’
পাখির নীড়ের মতো চোখ তুলে নাটোরের বনলতা সেন।”
['বনলতা সেন', 'বনলতা সেন']
জীবনানন্দ দাশের কবিতায় তার স্বপ্নের নায়িকাগণ আছেন, সেখানে প্রেম ও স্বপ্নমুগ্ধতা
আছে; কিন্তু আশেণ্টষবাসনাপূর্ণ কোনো পঙ্ক্তি নেই। কবিতায় জীবনানন্দ দাশ নামক
যে প্রেমিকের সাক্ষাৎ পান পাঠক- সেই প্রেমিকের প্রেমিকা সুদূরে অবস্থান করেন।
প্রেমিকাকে কাছে পাওয়ার জন্য প্রেমিকের চিত্ত আন্দোলিত হয় না। “আমারে দু’দ-
শাড়ি দিয়েছিল নাটোরের বনলতা সেন।”—এতেই প্রেমিক কৃতার্থ।
জীবনানন্দ দাশ সেই প্রেমিক, যে প্রেমিক অধরা প্রেমে স্মৃতিভারাতুর। প্রেমিকের মত্ততা
নেই তার মধ্যে। প্রেমিকা পটানোর জন্য কোনো প্রকার শরীরী চতুরালি নেই। বরং
প্রেমিকার সঙ্গে সাক্ষাৎ হওয়ার সম্ভাবনা আছে। প্রেমিক দয়িতার দেহলিঙ্গু নন; কামনালুব্ধ
দৃষ্টি নেই দয়িতার দেহের প্রতি। সম্ভোগ আকাঙ্ক্ষামুক্ত প্রেমিকার সঙ্গ ও সান্নিধ্য
পাওয়ার আকাঙ্ক্ষাই জীবনানন্দ দাশের কবিতায় মহীয়ান হয়ে উঠেছে। কবি লেখেন,
“আবার বছর কুড়ি পরে তার সাথে দেখা হয় যদি!
আবার বছর কুড়ি পরে-
হয়তো ধানের ছড়ার পাশে
কার্তিকের মাসে-
তখন সন্ধ্যার কাক ঘরে ফেরে- তখন হলুদ নদী
নরম নরম হয় শর কাশ হোগলায়-মাঠের ভিতরে!”
['কুড়ি বছর পরে', 'বনলতা সেন']
জীবনানন্দ দাশের ‘বনলতা সেন’ কাব্যে প্রেমিকের সত্তার রূপান্তরও অভাবনীয়। অন্তর্হিত
দয়িতার সঙ্গে হঠাৎ সাক্ষাৎ লাভই প্রেমিকের জন্যে মহার্ঘ। আলিঙ্গনহীন দয়িত-দয়িতার
সাক্ষাৎ জীবনানন্দ দাশের ‘বনলতা সেন’ কাব্যের বিভিন্ন কবিতায় নতুন মাত্রা ও
আয়তন যোগ করেছে। দেহলিপ্সাহীন প্রেম যে মনোবিশ্বের উজ্জ্বলতম হীরক খ হতে
পারে, জীবনানন্দ দাশের কবিতা সে সাক্ষ্যই বহন করে-
১. “সবিতা, মানুষজন্ম আমরা পেয়েছি
মনে হয় কোনো এক বসন্তের রাতে।
ভূমধ্যসাগর ঘিরে যেইসব জাতি,
তাহাদের সাথে
সিন্ধুর আঁধার পথে করেছি গুঞ্জন;
মনে পড়ে নিবিড় মের—ন আলো, মুক্তার শিকারী,
রেশম, মদের সার্থবাহ,
দুধের মতন শাদা নারী।’[‘সবিতা’, ‘বনলতা সেন' ]
২. “তোমার মুখের দিকে তাকালে এখনো
আমি সেই পৃথিবীর সমুদ্রের নীল,
দুপুরের শূন্য সব বন্দরের ব্যথা, বিকেলের উপকণ্ঠে সাগরের চিল,
নক্ষত্র, রাত্রির জল, যুবাদের ক্রন্দন সব—
শ্যামলী, করেছি অনুভব ।
অনেক অপরিমেয় যুগ কেটে গেল;
মানুষকে স্থির-স্থিরতর হতে দেবে না সময়;” [‘শ্যামলী’, ‘বনলতা সেন'] জীবনানন্দ দাশের দয়িতাগণ নিসর্গময়ী নারী। বনলতা সেন কেবল নিসর্গময়ী নারী নন, বাৎসল্যময়ী এবং কবির মানস আশ্রয়দাত্রীও বটে। নিসর্গশক্তির আশ্রয়ময়তা এবং নারীশক্তির প্রেরণা একাকার হয়ে গেছে ‘রূপসী বাংলা' কাব্যের বিভিন্ন কবিতায়। তার দয়িতাগণ অনাদি অতীত থেকে যাত্রা শুর“ করে সুদূর ভবিষ্যতে সম্প্রসারিত। দয়িতদের মানবিক শিরোনাম দিয়ে তাদের বঙ্গললনা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন কবি তার কবিতায়। আইনস্টাইনের অখ সময়চেতনার স্বরূপ উপস্থাপিত হয়েছে দয়িতাদের মাধ্যমে। এ প্রসঙ্গে আমরা আইনস্টাইনের বক্তব্য মনে করতে পারি : "It may be that time from its beginning to the end of eternity is spread before us in the picture but we are in contract with only one moment." [আইনস্টাইন : থিওরি অব রিলিটিভিটি]
স্বপ্নলোকে কবিতা সন্ধান করেন জীবনানন্দ দাশ। স্বপ্নরঞ্জিত নিসর্গলুব্ধ কবিতা প্রেম ও স্বপ্নময়, নিসর্গময়। হৃদয়ভোজী সময়কে কোনোভাবেই প্রত্যাখ্যান করতে চান না কবি। সময়কে স্বীকার করে নিয়েই সময় অতিক্রমী সাধনা করেছিলেন জীবনানন্দ দাশ । তার কবিতা সময়শাসিত, একই সঙ্গে স্বপ্নময়। স্বপ্নই সৌন্দর্য, সৌন্দর্যই প্রেম। জীবনানন্দ দাশের প্রেমসাধনা সৌন্দর্যকে মহৎ করার সাধনা। অন্যদিকে প্রেমে জীবনানন্দ দাশ নীলকণ্ঠ প্রেমবিষপানে অভ্যড়। প্রেম-অমৃতেই জীবনানন্দ দাশের অবিচল আস্থা। প্রেমিকার দেহসূর্য সময়ের অন্ধকার দূর করতে পারে বলে তিনি মনে করেন। যদিও দয়িতার শরীর পর্যটন তার কাম্য নয়। কবি লেখেন,
আর তুমি নারী—
এইসব ছিল সেই জগতে একদিন।
অনেক কমলা রঙের রোদ ছিল,
অনেক কাকাতুয়া পায়রা ছিল,
মেহগনির ছায়াঘন পলস্তব ছিল অনেক;
অনেক কমলা রঙের রোদ ছিল,
অনেক কমলা রঙের রোদ;
আর তুমি ছিলে;
তোমার মুখের রূপ কত শত শতাব্দী আমি দেখি না,
খুঁজি না।” ['নগ্ন নির্জন হাত', 'বনলতা সেন']
জীবনানন্দ দাশের কবিতায় বোধ কখনো কখনো বোধ থেকে আর্তিতে রূপান্তরিত
হয়। 'বনলতা সেন' কাব্যের 'বনলতা সেন' কবিতায় আমরা যে জীবনানন্দ দাশের
তীক্ষ্ণবোধের উপলব্ধি পাই, সেখানেও রয়েছে মগ্নচৈতন্যের গভীরতা ও ইন্দ্রিয় ঘনত্বের
পরিচয়; যা যুক্তিগ্রাহ্যও নয়, বিশ্বাসযোগ্যও নয়। কিন্তু পাঠকের মনে দুর্নিবার
আকর্ষণবোধ তৈরি করে। এটি সুররিয়ালিজমের ফল।
“সমস্ত দিনের শেষে শিশিরের শব্দের মতন
সন্ধ্যা আসে; ডানার রৌদ্রের গন্ধ মুছে ফেলে চিল;
পৃথিবীর সব রঙ নিভে গেলে পাণ্ডুলিপি করে আয়োজন
তখন গল্পের তরে জোনাকির রঙে ঝিলমিল;
সব পাখি ঘরে আসে—সব নদী— ফুরায় এ—জীবনের সব লেনদেন;
থাকে শুধু অন্ধকার, মুখোমুখি বসিবার বনলতা সেন।' ['বনলতা সেন', 'বনলতা সেন']
'হরিণেরা' কবিতায় সময়চেতনার দ্বিতীয় পর্যায় (অতীত ও ভবিষ্যতের রাখীবন্ধন) অনুভব
করেন পাঠক। কবির স্বপ্নলোক এ কবিতায় নিবিড়ভাবে গ্রথিত রয়েছে। এ কবিতা পাঠ করে
পাঠক জানতে পারেন যে, জ্যোঙালোকের পটভূমিতে স্বপ্নবিদ্ধ হরিণেরা অতীতকে
নিবিড়ভাবে বেঁধে রাখতে চায়। পাঠক এ-ও অনুধাবন করেন যে, অগ্রসর মানুষ এবং
অনগ্রসর হরিণের মধ্যে দৃশ্য ও দ্রষ্টার সংযোগ স্থাপিত হয়। কবি লেখেন,
“স্বপ্নের ভিতরে বুঝি—ফাল্গুনের জ্যোঙার ভিতরে
দেখিলাম পলাশের বনে খেলা করে
হরিণেরা; রূপালি চাঁদের হাত শিশিরের পাতায়;
বাতাস ঝাড়িছে ডানা—মুক্তা ঝরে যায়
“আমার বিলুপ্ত হৃদয়, আমার মৃত চোখ, আমার বিলীন স্বপ্ন আকাঙ্ক্ষা, পলণ্ডবের ফাঁকে ফাঁকে বনে বনে হরিণের চোখে; হরিণেরা খেলা করে হাওয়া আর মুক্তার আলোকে ৷ হীরের প্রদীপ জ্বেলে শেফালিকা বোস যেন হাসে
হিজল ডালের পিছে অগণন বনের আকাশে, বিলুপ্ত ধূসর কোন পৃথিবীর শেফালিকা, আহা,
ফাল্গুনের জ্যোঙ্গায় হরিণেরা জানে শুধু তাহা।” [‘হরিণেরা’, ‘বনলতা সেন'] ‘হাওয়ার রাত’ কবিতায় সময়ের প্রবহমানতা, 'Space' এবং 'time'-এর অভিন্নতা, অতীত-বর্তমান ও ভবিষ্যতের ঐকতান খুঁজে পাওয়া যায়। এ কবিতায় আইনস্টাইনের 'the beginning of universe and end of eternity' কে একত্রে পর্যবেক্ষণ করা যায়। যদিও কবি ভালো করেই জানতেন যে, তার চেতনা মুহূর্ত সম্পৃক্ত ব্যাপার ছাড়া আর কিছুই নয়। ‘হাওয়ার রাত' কবিতায় নক্ষত্রলোকের প্রতীকে অজর, অমর, বস্তু বোধের উপস্থিতি লক্ষ করা যায়। এটি নিঃসন্দেহে আইনস্টাইনীয় বস্তুর ধারণীয় সমার্থক। অখ” সময়চেতনা প্রতিফলিত ‘হাওয়ার রাত' কবিতায় কালের সীমারেখা নেই। এ কবিতায় সময় যেমন নির্গুণ, তেমনি place (স্থান) এবং 'space' নির্গুণ। সময়চেতনার সার্বিক সংরক্ষণ ‘বনলতা সেন' কাব্যের বিভিন্ন কবিতায় সম্ভব হয়েছে। কবি তাই লেখেন,
‘গভীর হাওয়ার রাত ছিল কাল অসংখ্য নক্ষত্রের রাত;
সারা রাত বিউীর্ণ হাওয়া আমার মশারিতে খেলেছে; উঠেছে কখনো মৌসুমী সমুদ্রের পেটের মতো,
মশারিটা ফুলে
কখনো বিছানা ছিঁড়ে
নক্ষত্রের দিকে উড়ে যেতে চেয়েছে;
এক-একবার মনে হচ্ছিল আমার আধো ঘুমের ভিতর হয়তো—
মাথার উপরে মশারি নেই আমার,
স্বাতী তারার কোল ঘেঁষে নীল হাওয়ার সমুদ্রে শাদা বকের মতো
কাল এমন চমৎকার রাত ছিল।
উড়ছে সে!
সমড় মৃত নক্ষত্রেরা কাল জেগে উঠেছিল—আকাশে এক তিল ফাঁক ছিল না;
পৃথিবীর সমস্ত ধূসরপ্রিয় মৃতদের মুখও সেই নক্ষত্রের
ভিতর দেখেছি আমি;
অন্ধকার রাতে অশ্বত্থের চূড়ায় প্রেমিক চিলপুর—ষের শিশির-ভেজা চোখের
মতো ঝলমল করছিল সমড় নক্ষত্রেরা;
ভূমধ্যসাগর ঘিরে যেইসব জাতি,
তাহাদের সাথে
সিন্ধুর আঁধার পথে করেছি গুঞ্জন;
মনে পড়ে নিবিড় মের—ন আলো, মুক্তার শিকারী,
রেশম, মদের সার্থবাহ,
দুধের মতন শাদা নারী।’[‘সবিতা’, ‘বনলতা সেন' ]
২. “তোমার মুখের দিকে তাকালে এখনো
আমি সেই পৃথিবীর সমুদ্রের নীল,
দুপুরের শূন্য সব বন্দরের ব্যথা, বিকেলের উপকণ্ঠে সাগরের চিল,
নক্ষত্র, রাত্রির জল, যুবাদের ক্রন্দন সব—
শ্যামলী, করেছি অনুভব ।
অনেক অপরিমেয় যুগ কেটে গেল;
মানুষকে স্থির-স্থিরতর হতে দেবে না সময়;” [‘শ্যামলী’, ‘বনলতা সেন'] জীবনানন্দ দাশের দয়িতাগণ নিসর্গময়ী নারী। বনলতা সেন কেবল নিসর্গময়ী নারী নন, বাৎসল্যময়ী এবং কবির মানস আশ্রয়দাত্রীও বটে। নিসর্গশক্তির আশ্রয়ময়তা এবং নারীশক্তির প্রেরণা একাকার হয়ে গেছে ‘রূপসী বাংলা' কাব্যের বিভিন্ন কবিতায়। তার দয়িতাগণ অনাদি অতীত থেকে যাত্রা শুর“ করে সুদূর ভবিষ্যতে সম্প্রসারিত। দয়িতদের মানবিক শিরোনাম দিয়ে তাদের বঙ্গললনা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন কবি তার কবিতায়। আইনস্টাইনের অখ সময়চেতনার স্বরূপ উপস্থাপিত হয়েছে দয়িতাদের মাধ্যমে। এ প্রসঙ্গে আমরা আইনস্টাইনের বক্তব্য মনে করতে পারি : "It may be that time from its beginning to the end of eternity is spread before us in the picture but we are in contract with only one moment." [আইনস্টাইন : থিওরি অব রিলিটিভিটি]
স্বপ্নলোকে কবিতা সন্ধান করেন জীবনানন্দ দাশ। স্বপ্নরঞ্জিত নিসর্গলুব্ধ কবিতা প্রেম ও স্বপ্নময়, নিসর্গময়। হৃদয়ভোজী সময়কে কোনোভাবেই প্রত্যাখ্যান করতে চান না কবি। সময়কে স্বীকার করে নিয়েই সময় অতিক্রমী সাধনা করেছিলেন জীবনানন্দ দাশ । তার কবিতা সময়শাসিত, একই সঙ্গে স্বপ্নময়। স্বপ্নই সৌন্দর্য, সৌন্দর্যই প্রেম। জীবনানন্দ দাশের প্রেমসাধনা সৌন্দর্যকে মহৎ করার সাধনা। অন্যদিকে প্রেমে জীবনানন্দ দাশ নীলকণ্ঠ প্রেমবিষপানে অভ্যড়। প্রেম-অমৃতেই জীবনানন্দ দাশের অবিচল আস্থা। প্রেমিকার দেহসূর্য সময়ের অন্ধকার দূর করতে পারে বলে তিনি মনে করেন। যদিও দয়িতার শরীর পর্যটন তার কাম্য নয়। কবি লেখেন,
আর তুমি নারী—
এইসব ছিল সেই জগতে একদিন।
অনেক কমলা রঙের রোদ ছিল,
অনেক কাকাতুয়া পায়রা ছিল,
মেহগনির ছায়াঘন পলস্তব ছিল অনেক;
অনেক কমলা রঙের রোদ ছিল,
অনেক কমলা রঙের রোদ;
আর তুমি ছিলে;
তোমার মুখের রূপ কত শত শতাব্দী আমি দেখি না,
খুঁজি না।” ['নগ্ন নির্জন হাত', 'বনলতা সেন']
জীবনানন্দ দাশের কবিতায় বোধ কখনো কখনো বোধ থেকে আর্তিতে রূপান্তরিত
হয়। 'বনলতা সেন' কাব্যের 'বনলতা সেন' কবিতায় আমরা যে জীবনানন্দ দাশের
তীক্ষ্ণবোধের উপলব্ধি পাই, সেখানেও রয়েছে মগ্নচৈতন্যের গভীরতা ও ইন্দ্রিয় ঘনত্বের
পরিচয়; যা যুক্তিগ্রাহ্যও নয়, বিশ্বাসযোগ্যও নয়। কিন্তু পাঠকের মনে দুর্নিবার
আকর্ষণবোধ তৈরি করে। এটি সুররিয়ালিজমের ফল।
“সমস্ত দিনের শেষে শিশিরের শব্দের মতন
সন্ধ্যা আসে; ডানার রৌদ্রের গন্ধ মুছে ফেলে চিল;
পৃথিবীর সব রঙ নিভে গেলে পাণ্ডুলিপি করে আয়োজন
তখন গল্পের তরে জোনাকির রঙে ঝিলমিল;
সব পাখি ঘরে আসে—সব নদী— ফুরায় এ—জীবনের সব লেনদেন;
থাকে শুধু অন্ধকার, মুখোমুখি বসিবার বনলতা সেন।' ['বনলতা সেন', 'বনলতা সেন']
'হরিণেরা' কবিতায় সময়চেতনার দ্বিতীয় পর্যায় (অতীত ও ভবিষ্যতের রাখীবন্ধন) অনুভব
করেন পাঠক। কবির স্বপ্নলোক এ কবিতায় নিবিড়ভাবে গ্রথিত রয়েছে। এ কবিতা পাঠ করে
পাঠক জানতে পারেন যে, জ্যোঙালোকের পটভূমিতে স্বপ্নবিদ্ধ হরিণেরা অতীতকে
নিবিড়ভাবে বেঁধে রাখতে চায়। পাঠক এ-ও অনুধাবন করেন যে, অগ্রসর মানুষ এবং
অনগ্রসর হরিণের মধ্যে দৃশ্য ও দ্রষ্টার সংযোগ স্থাপিত হয়। কবি লেখেন,
“স্বপ্নের ভিতরে বুঝি—ফাল্গুনের জ্যোঙার ভিতরে
দেখিলাম পলাশের বনে খেলা করে
হরিণেরা; রূপালি চাঁদের হাত শিশিরের পাতায়;
বাতাস ঝাড়িছে ডানা—মুক্তা ঝরে যায়
“আমার বিলুপ্ত হৃদয়, আমার মৃত চোখ, আমার বিলীন স্বপ্ন আকাঙ্ক্ষা, পলণ্ডবের ফাঁকে ফাঁকে বনে বনে হরিণের চোখে; হরিণেরা খেলা করে হাওয়া আর মুক্তার আলোকে ৷ হীরের প্রদীপ জ্বেলে শেফালিকা বোস যেন হাসে
হিজল ডালের পিছে অগণন বনের আকাশে, বিলুপ্ত ধূসর কোন পৃথিবীর শেফালিকা, আহা,
ফাল্গুনের জ্যোঙ্গায় হরিণেরা জানে শুধু তাহা।” [‘হরিণেরা’, ‘বনলতা সেন']
‘হাওয়ার রাত’ কবিতায় সময়ের প্রবহমানতা, 'Space' এবং 'time'-এর অভিন্নতা, অতীত-বর্তমান ও ভবিষ্যতের ঐকতান খুঁজে পাওয়া যায়। এ কবিতায় আইনস্টাইনের 'the beginning of universe and end of eternity' কে একত্রে পর্যবেক্ষণ করা যায়। যদিও কবি ভালো করেই জানতেন যে, তার চেতনা মুহূর্ত সম্পৃক্ত ব্যাপার ছাড়া আর কিছুই নয়। ‘হাওয়ার রাত' কবিতায় নক্ষত্রলোকের প্রতীকে অজর, অমর, বস্তু বোধের উপস্থিতি লক্ষ করা যায়। এটি নিঃসন্দেহে আইনস্টাইনীয় বস্তুর ধারণীয় সমার্থক। অখ” সময়চেতনা প্রতিফলিত ‘হাওয়ার রাত' কবিতায় কালের সীমারেখা নেই। এ কবিতায় সময় যেমন নির্গুণ, তেমনি place (স্থান) এবং 'space' নির্গুণ। সময়চেতনার সার্বিক সংরক্ষণ ‘বনলতা সেন' কাব্যের বিভিন্ন কবিতায় সম্ভব হয়েছে। কবি তাই লেখেন,
‘গভীর হাওয়ার রাত ছিল কাল অসংখ্য নক্ষত্রের রাত;
সারা রাত বিউীর্ণ হাওয়া আমার মশারিতে খেলেছে; উঠেছে কখনো মৌসুমী সমুদ্রের পেটের মতো,
মশারিটা ফুলে
কখনো বিছানা ছিঁড়ে
নক্ষত্রের দিকে উড়ে যেতে চেয়েছে;
এক-একবার মনে হচ্ছিল আমার আধো ঘুমের ভিতর হয়তো—
মাথার উপরে মশারি নেই আমার,
স্বাতী তারার কোল ঘেঁষে নীল হাওয়ার সমুদ্রে শাদা বকের মতো
কাল এমন চমৎকার রাত ছিল।
উড়ছে সে!
সমড় মৃত নক্ষত্রেরা কাল জেগে উঠেছিল—আকাশে এক তিল ফাঁক ছিল না;
পৃথিবীর সমস্ত ধূসরপ্রিয় মৃতদের মুখও সেই নক্ষত্রের
ভিতর দেখেছি আমি;
অন্ধকার রাতে অশ্বত্থের চূড়ায় প্রেমিক চিলপুর—ষের শিশির-ভেজা চোখের
মতো ঝলমল করছিল সমড় নক্ষত্রেরা;
লেখক: কবি ও প্রাবন্ধিক।
১৩৭ বার পড়া হয়েছে