সর্বশেষ

মতামত

এমন মৃত্যু মেনে নেওয়া কঠিন

শিপন হালদার
শিপন হালদার

বৃহস্পতিবার , ২৬ মার্চ, ২০২৬ ৬:১০ অপরাহ্ন

শেয়ার করুন:
মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী। মানে আপনাকে-আমাকে মরতে হবেই। পৃথিবীর মায়া ছিন্ন করে চলে যেতে হবে সবাইকে। এটাই নিয়তি!

কিন্তু প্রিয়জনের সঙ্গে ঈদ শেষে ঢাকা ফেরার পথে দৌলতদিয়ায় ফেরি থেকে পদ্মা নদীতে ডুবে যেভাবে বাসভর্তি মানুষের মৃত্যু হলো! তা মেনে নেওয়া কঠিন। এটা কেমন নিয়তি! এভাবে মৃত্যু সত্যি মেনে নেওয়া যায় না। ভাগ্যের কী নিষ্ঠুর পরিণতি। সীমাহীন অবহেলা, অসচেতনতা, দায়িত্বহীনতা, বিশৃঙ্খলা, অদক্ষতা, উদ্ধারে ধীরগতি, রাষ্ট্রের দুর্বল কাঠামো-মর্মান্তিক এই বাস দুর্ঘটনা একসাথে সবকিছু চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিলো। যদিও আমাদের তাতে কিছু যায় আসে না। দু-একদিন সমালোচনা করেই থেমে যাবো। আবারও আমরা একইভাবে চলবো। কারণ, নিয়ম না মানলেতো কোনও শাস্তি হয় না। আর হলেও তা গায়ে লাগে না।

বাস-ট্রেন-নৌপথ-সবখানে শুধু মৃত্যুর মিছিল। মৃত্যু এতোটাই সহজ হয়ে গিয়েছে-যা ধারণারও বাইরে। মানুষের প্রাণের দাম এখনো হাজার টাকায় নেমে এসেছে। আর তালিকার বাইরে থাকলেতো মূল্যহীন! দরজায় দরজায় ঘুরেও মিলবে না মৃত্যুর দাম। যে দামে কারও স্ত্রী, সন্তানের পড়াশোনা, থাকা-খাওয়া চলতে পারে। মেটাতে পারে কারও বৃদ্ধ বাবা-মায়ের চিকিৎসা ব্যয়। মৃত্যুর দাম দিতে পারে একটি পরিবারের আর্থিক সুরক্ষা। এই আইনি দুর্বলতা ৫৫ বছরেও কাটেনি-আর কাটবে বলেও বিশ্বাস হয় না। হতাশ হতে হতে আমরা এখন অবিশ্বাসের চোরাবালিতে আটকে গেছি। যেখান থেকে পরিত্রাণের আর কোন উপায় আছে বলে মনে হয় না।

ঈদের ৮ দিনে, রাজবাড়ীর গোয়ালন্দে পদ্মা নদীতে যাত্রীবাহী বাস ডুবে প্রাণ হারিয়েছেন ২৬ জন। বগুড়ার সান্তাহারে ট্রেনে কাটা পড়ে ১২ জনের করুণ মৃত্যু হয়েছে। কুমিল্লায় স্টার লাইন বাসের ধাক্কায় একই পরিবারের চারজনসহ নিহত হয়েছেন ৫ জন। সদরঘাটে লঞ্চের চাপায় প্রাণ গেছে ২ জনের। আর সড়ক দুর্ঘটনায় ২৬-০৩-২৬ তারিখ পর্যন্ত মোট নিহতের সংখ্যা প্রায় আড়াইশো। এক একটি মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের ক্ষতি নয়; একটি স্বপ্নের অবেলায় ঝরে যাওয়া। যেন আকাশে জ্বলজ্বল করা এক একটি তারার করুণ পরিসমাপ্তি। মহাকালে হারিয়ে যাওয়া। যেখান থেকে আর কোনদিন ফেরা হবে না কারও! বাবা বা মাকে পাওয়ার জন্য যতই কাদুক সন্তান, অথবা প্রিয় সন্তানকে পাওয়ার জন্য বাবা-মা। স্বামীকে পাওয়ার জন্য স্ত্রী অথবা স্ত্রীকে পাওয়ার জন্য স্বামী। ভাইকে পাওয়ার জন্য বোন অথবা বোনকে পাওয়ার জন্য ভাই। কান্নার আকুতি পৌঁছাবে না ভিন গ্রহে। যেখানে হারিয়ে যাওয়া তারাদের মেলা বসে!

সবশেষ দৌলতদিয়ায় বাস ডুবির ঘটনায় ৬ সদস্যের উচ্চপর্যায়ের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়। ৩ দিনের মধ্যে প্রতিবেদন কমা দেবে কমিটি। কিছু সুপারিশও পাওয়া যাবে। কিন্তু বাস্তবায়ন সেতো পদ্মা নদীর ৩০ ফিট গভীরে থেকে যাবে! পদ্মাপাড়ে প্রিয়জনের মরদেহের অপেক্ষায় থাকা স্বজনদের কান্না শেষ হবে না। তাদের আহাজারি আর শুনবে না সরকার। মিলবে না প্রাণের দামও। এটা আমি হলফ করেই বলতে পারি। আমার এই কথা যেন মিথ্যে প্রমাণিত হয়। খুব খুশি হবো সেদিন, যেদিন শুনবো অপেক্ষায় থাকা স্বজনরা তাদের প্রিয়জনের মরদেহ নিয়ে বাড়ি ফিরতে পেরেছে। ক্ষতিপূরণ পেয়েছে সবাই। পদ্মাপাড়ে বসে নেই কোন স্বজন। নেই কোন আহাজারি;অরণ্যেরোদন!

আশা করাটাই যেন দুরাশা। তারপরও আশায় বুক বাঁধি। সড়ক, রেল ও নৌপথে দুর্ঘটনা যেন আর দেখতে না হয়। মৃত্যুর সংখ্যা শূণ্যে নেমে আসুক। মৃত্যুকে যেন আর দাম দিয়ে কিনতে না হয়! এজন্য সরকার ও জনগণ সজাগ হোক। কার্যকর, দীর্ঘমেয়াদি ও নিরাপদ সড়ক ব্যবস্থাপনা বা কাঠামো গড়ে তুলুক সরকার। চালকদের জন্য প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হোক। বাধ্যতামূলক করা হোক রেস্ট পয়েন্ট ও ড্রাগ টেস্ট। মহাসড়কে যুক্ত করা হোক স্পিডোমিটার। মহাসড়কে জোরদার করা হোক পুলিশি মনিটরিং। একইভাবে নৌপথে নিশ্চিত করতে হবে লঞ্চের ধারণ ক্ষমতা অনুসারে টিকিট বিক্রি, অতিরিক্ত যাত্রী উঠালে জরিমানা ও লাইসেন্স বাতিলের মতো পদক্ষেপ। রেলপথে শিডিউল ঠিক রাখা, অতিরিক্ত ট্রেন চালু, রেলক্রসিংগুলো শতভাগ নিরাপদ রাখা, মানসম্মত খাবার, বদলি চালক এবং অনলাইন টিকেটিং ব্যবস্থা আরও সহজ করতে হবে। দূর করতে হবে সার্ভার জটিলতা। তিনপথেই বাড়াতে হবে সিসিটিভি নজরদারি।

যাত্রীদের সেবার মানে কোন আপোষ নয়। অবহেলা বা বিশৃঙ্খলাকারীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। দুর্ঘটনায় মৃত্যুজনিত ক্ষতিপূরণ কোটি টাকার নিচে করা যাবে না। কারণ রাষ্ট্রকেই এই দায় নিতে হবে। প্রতিটি নাগরিকের নিরাপদ যাত্রা বা নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। আর নাগরিক হিসেবে আপনাকে-আমাকে আরও সচেতন হতে হবে। কারণ, অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা, অবহেলা বা বিশৃঙ্খলা দেখলেই প্রতিবাদ করার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে তা জানাতে হবে। এজন্য নাগরিক সেবায় শর্টকোড চালু করা এখন সময়ের দাবি।

লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক।

৪০৩ বার পড়া হয়েছে

শেয়ার করুন:

মন্তব্য

(0)

বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০
বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন
এলাকার খবর

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন














সর্বশেষ সব খবর
মতামত নিয়ে আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০
বিজ্ঞাপন