ফেরিঘাটে মর্মান্তিক দুর্ঘটনা
পদ্মার বুকে আর্তনাদ—আর কত ?
বৃহস্পতিবার , ২৬ মার্চ, ২০২৬ ৬:৪২ পূর্বাহ্ন
শেয়ার করুন:
কুষ্টিয়ার কুমারখালী থেকে ঢাকার পথে যাত্রা করা একটি সাধারণ যাত্রীবাহী বাস—যেখানে ছিলেন নানা বয়সের, নানা স্বপ্নের মানুষ। কেউ ঈদের ছুটি শেষে পড়াশোনা, চাকরি কিংবা ব্যবসার টানে ফিরছিলেন রাজধানীতে। কিন্তু দৌলতদিয়ার ফেরিঘাটের সেই বিকেল হঠাৎ করেই থামিয়ে দিল তাদের সময়, থামিয়ে দিল বহু জীবনের গতি।
একটি দাঁড়িয়ে থাকা বাস হঠাৎ নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সবার চোখের সামনে পদ্মার বুকে তলিয়ে যায়। কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই ঘটে যায় এক অবর্ণনীয় ট্র্যাজেডি। বাসটিতে থাকা অন্তত ৫০ জন যাত্রী শুধু একটি দুর্ঘটনার শিকার হননি; সেই সঙ্গে ডুবে গেছে তাদের অসংখ্য স্বপ্ন, ভেঙে চুরমার হয়েছে বহু পরিবারের আশ্রয় ও ভবিষ্যৎ।
এই দুর্ঘটনার প্রতিটি গল্পই একেকটি হৃদয়বিদারক কাহিনি। গিয়াস উদ্দিন রিপনের পরিবারের কথা যেন সেই শোকের প্রতিচ্ছবি—ঈদের আনন্দ শেষে পরিবার নিয়ে কর্মস্থলে ফেরার পথে এমন নির্মম পরিণতি! প্রিয়জনের সামনে দাঁড়িয়ে ‘কে বেঁচে আছে, কে আর নেই’—এই হিসাব করার অসহায়তা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়।
প্রশ্ন জাগে—আমরা কি সত্যিই নিরাপদ?
প্রতিদিন আমরা যেসব ঘাট ব্যবহার করি, যেসব যানবাহনে ভরসা করি, যেসব ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করে জীবন চালাই—সেগুলো কতটা নিরাপদ?
এই প্রশ্ন নতুন নয়। বরং প্রতিটি দুর্ঘটনার পরই এই প্রশ্ন ফিরে আসে। কিছুদিন শোক, কিছুদিন আলোচনা—তারপর আবার সব আগের মতো। কিন্তু বাস্তবতা হলো, সেই অবহেলা আর অদক্ষতার মূল্য দিতে হয় নিরীহ মানুষকে, নিরপরাধ পরিবারকে।
নদীপথে পরিবহন ব্যবস্থাপনা, ফেরিঘাটের নিরাপত্তা, যানবাহনের নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা—সবকিছুতেই রয়েছে ঘাটতি।
প্রশ্ন হলো, এসব দুর্বলতা কি আমাদের অজানা? না, আমরা জানি। কিন্তু কার্যকর পদক্ষেপের অভাবই এসব দুর্ঘটনাকে পুনরাবৃত্তি হতে দিচ্ছে।
আজ যারা হারিয়ে গেছেন, তাদের জন্য আমাদের গভীর শোক। যারা এখনো নিখোঁজ, তাদের পরিবারের প্রতিটি মুহূর্ত কাটছে অনিশ্চয়তা আর অসীম যন্ত্রণায়। আর যারা বেঁচে ফিরেছেন, তাদের হৃদয়ে এই ঘটনার ক্ষত আজীবন রয়ে যাবে।
এখন সময়ের দাবি—
শুধু শোক প্রকাশ নয়, শুধু সমবেদনা নয়; প্রয়োজন কার্যকর ও দৃশ্যমান ব্যবস্থা।
নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে প্রতিটি ফেরিঘাটে, প্রতিটি যানবাহনে। দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করতে হবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের। অবহেলা বা ত্রুটির জন্য জবাবদিহিতা থাকতে হবে স্পষ্টভাবে।
কারণ, একটি দুর্ঘটনা শুধু কিছু প্রাণ কেড়ে নেয় না—এটি ধ্বংস করে দেয় বহু পরিবারের স্বপ্ন, ভেঙে দেয় একটি সমাজের বিশ্বাস।
আমরা চাই না আর কোনো বিকেলে কোনো মা-বাবা নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে তার সন্তানের জন্য আহাজারি করুক। আমরা চাই না আর কোনো বাস মানুষের স্বপ্ন বয়ে নিয়ে এভাবে অন্ধকারে তলিয়ে যাক।
ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।
এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় নিহতদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানাই এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারগুলোর প্রতি জানাই আন্তরিক সমবেদনা।
লেখক: সাংবাদিক
১৬৯ বার পড়া হয়েছে