উচ্চশিক্ষা ও মানবিক চিন্তার পথিকৃৎ: অধ্যাপক ড. আবুল হাসান মুহাম্মদ সাদেক
বুধবার, ২৫ মার্চ, ২০২৬ ৭:১০ পূর্বাহ্ন
শেয়ার করুন:
বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার বিকাশে কিছু ব্যক্তিত্ব তাঁদের চিন্তা, কর্ম ও প্রতিষ্ঠান নির্মাণের মধ্য দিয়ে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব রেখে গেছেন। অধ্যাপক ড. আবুল হাসান মুহাম্মদ সাদেক তাঁদের মধ্যে অন্যতম, যাঁর কর্মজীবন শিক্ষা, অর্থনীতি, গবেষণা ও সাহিত্যচর্চার বহুমাত্রিক সমন্বয়ে গঠিত।
একজন অর্থনীতিবিদ হিসেবে আন্তর্জাতিক একাডেমিক পরিমণ্ডলে তাঁর অবদান যেমন উল্লেখযোগ্য, তেমনি একজন শিক্ষা সংগঠক ও সাহিত্যমানস হিসেবেও তিনি স্বতন্ত্র পরিচয় নির্মাণ করেছেন।
১৯৫৩ সালের ১ মে নরসিংদী জেলার রায়পুরা উপজেলার পীরপুর গ্রামে তাঁর জন্ম। পিতা আব্দুল খালেক ছিলেন বহুগ্রন্থ প্রণেতা এবং মাতা আয়েশা খাতুন ছিলেন বিদ্যানুরাগী মানুষ। পারিবারিকভাবে জ্ঞানচর্চা ও সাহিত্য অনুরাগের যে পরিবেশ তিনি লাভ করেন, তা তাঁর মানসিক বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। শৈশবেই লেখালেখির প্রতি আগ্রহের সূচনা ঘটে, যা পরবর্তী সময়ে তাঁর সাহিত্যচর্চাকে সমৃদ্ধ ধারায় প্রবাহিত করে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে স্নাতক (সম্মান) ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের মাধ্যমে তাঁর একাডেমিক যাত্রার ভিত্তি রচিত হয়। পরবর্তীতে কানাডার ম্যানিটোবা বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করে অর্থনীতিতে দ্বিতীয় স্নাতকোত্তর এবং পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। উন্নয়ন অর্থনীতি, ইসলামী অর্থনীতি এবং অর্থনৈতিক নৈতিকতা বিষয়ে তাঁর গবেষণা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আলোচিত হয়েছে।
পেশাজীবনের শুরু বাংলাদেশ ব্যাংকে কর্মকর্তা হিসেবে হলেও অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি শিক্ষকতা পেশায় আত্মনিয়োগ করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফাইন্যান্স বিভাগে শিক্ষকতার মাধ্যমে তাঁর একাডেমিক কর্মজীবনের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় শুরু হয়। পরে মালয়েশিয়ার আন্তর্জাতিক ইসলামিক বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করে তিনি আন্তর্জাতিক শিক্ষা ও গবেষণা অঙ্গনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। এই সময় তাঁর গবেষণা ও প্রকাশনা ইসলামী অর্থনৈতিক চিন্তার আলোচনায় নতুন মাত্রা যোগ করে।
বাংলাদেশে বেসরকারি উচ্চশিক্ষার বিকাশের প্রেক্ষাপটে ১৯৯৬ সালে প্রতিষ্ঠিত এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ তাঁর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। প্রতিষ্ঠাতা উপাচার্য হিসেবে দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালন করে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়টিকে মূল্যবোধনির্ভর ও মানবিক শিক্ষা চর্চার একটি প্ল্যাটফর্ম হিসেবে গড়ে তোলার প্রয়াস চালান। বর্তমানে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়টির বোর্ড অব ট্রাস্টিজের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তাঁর নেতৃত্বে শিক্ষা ও নৈতিকতার সমন্বিত ধারণা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করে—যা বাংলাদেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার ধারায় একটি তাৎপর্যপূর্ণ সংযোজন হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
অধ্যাপক সাদেক ইসলামী অর্থনীতির একজন আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত গবেষক। উন্নয়ন অর্থায়ন, যাকাত ব্যবস্থা, সম্পদ বণ্টন, মানবসম্পদ উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক নৈতিকতা বিষয়ে তাঁর গবেষণা আন্তর্জাতিক জার্নাল ও গ্রন্থে প্রকাশিত হয়েছে। অর্থনৈতিক উন্নয়নকে নৈতিক ও সামাজিক দায়বদ্ধতার সঙ্গে যুক্ত করার প্রয়াস তাঁর লেখায় বিশেষভাবে লক্ষণীয়। উন্নয়ন অর্থায়ন, ইসলামী অর্থনৈতিক চিন্তা এবং অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানের নৈতিক ভিত্তি বিষয়ে তাঁর সম্পাদিত ও রচিত গ্রন্থসমূহ গবেষক সমাজে গুরুত্বপূর্ণ রেফারেন্স হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।
অর্থনীতির গবেষক হয়েও সাহিত্যচর্চা তাঁর সৃজনশীল সত্তার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। ছোটগল্প, কবিতা, ছড়া, ভ্রমণকাহিনী ও প্রবন্ধ—সাহিত্যের বিভিন্ন ধারায় তিনি সক্রিয় উপস্থিতি রেখেছেন। তাঁর সাহিত্যকর্মে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, সমাজবাস্তবতা, ইতিহাসচেতনা এবং মানবিক অনুভবের সমন্বয় লক্ষ করা যায়। নান্দনিক বাক্যবিন্যাস ও প্রাঞ্জল ভাষার ব্যবহার তাঁর লেখাকে সহজপাঠ্য ও ভাবনাসমৃদ্ধ করে তুলেছে।
তাঁর উল্লেখযোগ্য সাহিত্যকর্মের মধ্যে রয়েছে বাজুকুরুং, ফিরে চাই অরণ্য, ক্লোনিং, ডালি, চেতনায় বায়ান্ন, ফেরাউনের দেশে এবং মৃতসাগরের দেশে। পাশাপাশি শিশুতোষ সাহিত্যেও তাঁর অবদান উল্লেখযোগ্য। শিশুদের কল্পনাশক্তি, নৈতিক শিক্ষা ও দেশপ্রেমবোধ জাগ্রত করার লক্ষ্য তাঁর শিশুতোষ রচনাগুলোতে প্রতিফলিত হয়েছে।
শিক্ষা ও গবেষণায় অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি দেশ-বিদেশে বিভিন্ন সম্মাননা লাভ করেছেন, যার মধ্যে আন্তর্জাতিক বর্ষসেরা ব্যক্তিত্ব স্বীকৃতি, মাদার তেরেসা স্বর্ণপদক এবং শিক্ষা ক্ষেত্রে বিশেষ অবদানের জন্য বিভিন্ন পুরস্কার উল্লেখযোগ্য। এসব সম্মাননা তাঁর দীর্ঘ একাডেমিক ও বৌদ্ধিক সাধনার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি বহন করে।
অধ্যাপক ড. আবুল হাসান মুহাম্মদ সাদেকের কর্মজীবন শিক্ষা, গবেষণা ও সাহিত্য—এই তিন ধারার এক সমন্বিত উদাহরণ। প্রতিষ্ঠান নির্মাণের পাশাপাশি জ্ঞানচর্চাকে সামাজিক দায়বদ্ধতা ও মানবিক মূল্যবোধের সঙ্গে যুক্ত করার যে প্রয়াস তিনি দেখিয়েছেন, তা বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা ও বৌদ্ধিক পরিসরে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। তাঁর দীর্ঘ কর্মযাত্রা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য শিক্ষা ও চিন্তার এক ধারাবাহিক অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে।
১৮৩ বার পড়া হয়েছে