আব্বা ছাড়া ঈদ! কখনোই পুরো হয় না...
শনিবার, ২১ মার্চ, ২০২৬ ৫:২৬ অপরাহ্ন
শেয়ার করুন:
ঈদের নামাজ শেষে বাড়ি ফিরতেই শুরু হলো চেনা সেই হৈচৈ। হাসি, কোলাহল, আর ছোটদের দৌড়ঝাঁপ… সবকিছুই যেন ঠিক আছে, তবুও কোথাও একটা শূন্যতা রয়ে গেছে—নীরব, গভীর ও অদৃশ্য।
একসময় ঈদের দিন মানেই ছিল আব্বার চুপচাপ হয়ে যাওয়া। বিছানায় শুয়ে থাকতেন, কণ্ঠ ভারী, চোখ লাল দেখাত। দূর দেশে পড়ে থাকা বাবা-মা, ভাই-বোনদের জন্য বুকের ভেতর জমে থাকা কষ্টটা আমরা বুঝতাম, কিন্তু কিছুই করতে পারতাম না। ফোনে কথা বলার সুযোগও তখন এত সহজ ছিল না।
তখন আমরা শুধু দেখতাম—নামাজে যাওয়ার আগে কিংবা নামাজ শেষে—আব্বা ফোনে কথা বলছেন ওপারে থাকা তাঁর মা আর ভাইদের সঙ্গে। আর আমরা তিন ভাইবোন চুপচাপ তাকিয়ে থাকতাম… আব্বার মন খারাপ মানেই আমাদের ঈদও নিস্তব্ধ হয়ে যাওয়া।
তখন আমরা আব্বাকে খুব ভয় পেতাম। তিনি বাড়িতে থাকলে আমরা শান্ত, নিঃশব্দ হয়ে যেতাম। আর তিনি বাইরে গেলেই যেন মুক্ত পাখি—গাছে গাছে চড়ে বেড়ানো, হুড়োহুড়ি, দৌড়, মাঠে ফুটবল, নিজেরা বানানো কোর্টে হাডুডুর খেলা… দুষ্টুমি আর আনন্দে ভরা ছোট্ট একটা জগৎ ছিল আমাদের।
একবার খেলতে গিয়ে আমার মেরে দেওয়া বল ছোট ভাইয়ের মুখে লেগে ঠোঁট কেটে গিয়েছিল—রক্তে ভেসে গিয়েছিল ওর মুখ। সেই ঘটনার পরই হয়তো প্রথমবারের মতো আব্বা আমাদের খেলার অনুমতি দিয়েছিলেন, কিনে দিয়েছিলেন বলও। আর একবার—ইন্ডিয়া থেকে ফিরে আসার সময় আব্বা একটা ফুটবল এনেছিলেন—সেই আনন্দ আজও খুব খুব মনে পড়ে।
সময় বদলেছে। এখন স্মার্টফোন এসেছে, সেলফি এসেছে। ঈদের নামাজ শেষে বাড়ি ফেরার পথে আব্বাকে মাঝখানে রেখে দাঁড়িয়ে আমরা দুই ভাই সেলফি তুলতাম। তখন আমার স্মার্টফোন ছিল না। ছোট ভাইয়ের ফোনে ধারণ হতো সেই মুহূর্তগুলো। আমি তখন নিঃশ্বাস আটকে দাঁড়িয়ে থাকতাম—যদি আব্বার গায়ে লাগে, যদি কিছু বলেন! ভয়ের মাঝেও ছিল অদ্ভুত এক ভালোবাসা।
আগে বছরে দুই ঈদে অন্তত দুটো ছবি হতো আব্বার সঙ্গে। আরেকবার—হজে যাওয়ার আগে, এয়ারপোর্টে… সেই কয়েকটা ছবিই এখন আমাদের সব।
কারণ—আব্বা আর নেই।
তার চলে যাওয়ার পর ঈদের নামাজে যাওয়া-আসা যেন অন্যরকম হয়ে গেল। দুই ভাই পাশাপাশি হাঁটি, কিন্তু মনে হয় কেউ নেই পাশে। ফিরে এসে অনেক সময় বিছানায় শুয়ে কাঁদি—আর ভাবি, ঈদের দিন আব্বা কেন এত চুপচাপ থাকতেন… আজ বুঝি।
মাঝে মাঝে ভাগ্নেরা এসে সেই শূন্যতা ভরাট করার চেষ্টা করে, কিন্তু কিছু অভাব কখনো পূরণ হয় না।
এখন আমাদের সন্তানেরা বড় হচ্ছে—ঈদগাহে যাওয়ার সময় তারা সঙ্গে থাকে, ফেরার পথে দৌড়ে এসে জড়িয়ে ধরে—ভালো লাগে, হৃদয় ভরে যায়… তবুও কোথাও একটা অপূর্ণতা থেকে যায়।
আজও তেমনই এক সকাল ছিল—দুই ভাই আর পরিবারের বড় ছেলেটা একই রঙের পাঞ্জাবি পরে ঈদগাহে গেলাম। ফিরে এসে কলিংবেল চাপতেই দৌড়ে গেট খুলে দিল বড় মেয়েটা, পিছনে আরও দু’জন ছেলে-মেয়ে ছুটে এলো… এই ছোট ছোট মুহূর্তগুলোই এখন বেঁচে থাকার ভরসা।
গেট পেরিয়ে ভেতরে ঢুকতেই ছোট মেয়েটা আর ভাস্তে এসে জড়িয়ে ধরল। ওদের নিয়ে রাস্তায় দাঁড়িয়ে কয়েক দফা সেলফি তোলা হলো—ছোট্ট ছেলেটার হাতে ধরা পড়ল আমাদের বড়দের স্মৃতি। ছোট-বড়, ছেলে-মেয়েদের নিয়ে বাড়ির ভেতরে গিয়ে সবাই মিলে আরেক দফা সেলফি তোলা হলো—সকলের মুখেই ছিল হাসি। আর এই হাসির ভেতরে কোথাও যেন লুকিয়ে ছিল এক অদৃশ্য কান্না।
সবমিলিয়ে এবারের ঈদ—বৃষ্টিভেজা, স্মৃতিভেজা, আর সেলফিতে বন্দী এক ঈদ।
আব্বা নেই, তবুও ঈদ আছে। কিন্তু আব্বা ছাড়া ঈদ—কখনোই পুরো হয় না…
১৩৮ বার পড়া হয়েছে