উত্তেজনার মধ্যেও চট্টগ্রামে রেকর্ড সংখ্যক জ্বালানিবাহী জাহাজের ভিড়
সোমবার, ১৬ মার্চ, ২০২৬ ৫:৫৫ পূর্বাহ্ন
শেয়ার করুন:
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যেও চট্টগ্রাম বন্দরে এলএনজি, এলপিজি ও অপরিশোধিত জ্বালানি তেলবাহী জাহাজের ভিড় বেড়েছে।
মধ্যপ্রাচ্য, সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়া থেকে রেকর্ড সংখ্যক জাহাজ বন্দরে এসেছে। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির পর এখন পর্যন্ত মোট ২১টি জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছেছে এবং আরও কয়েকটি জাহাজ আসার অপেক্ষায় রয়েছে। এসব জাহাজ থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার মেট্রিক টন জ্বালানি তেল খালাস করা হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, এর ফলে দেশে জ্বালানি সংকট কমবে এবং শিল্প উৎপাদনে গতি ফিরে আসবে।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি) কর্মকর্তারা জানান, ইরানে ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের হামলার পর দেশের জ্বালানি তেলের বাজারে অস্থিরতা দেখা দেয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সরকার জ্বালানি তেল বিপণনে রেশনিং ব্যবস্থা চালুসহ বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করে। তবে এর মধ্যেই মধ্যপ্রাচ্য, সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়া থেকে একের পর এক জ্বালানিবাহী জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দরে নোঙ্গর করতে শুরু করে। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ ও বিপিসি দ্রুততার সঙ্গে এসব জাহাজ থেকে জ্বালানি তেল খালাসের ব্যবস্থা নেয়। এতে পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আসে এবং পরে রেশনিং ব্যবস্থা তুলে নেওয়া হয়।
এদিকে অপরিশোধিত জ্বালানি তেল, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) ও তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) ছাড়াও বেশ কিছু জাহাজ পরিশোধিত জ্বালানি পণ্য ও শিল্পকারখানায় ব্যবহৃত জ্বালানি নিয়ে চট্টগ্রাম বন্দরে নোঙ্গর করেছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে আসা ট্যাঙ্কার ‘বে ইয়াসু’ মনোইথিলিন গ্লাইকেন (এমইজি) নিয়ে এসেছে।
অন্যদিকে সিঙ্গাপুর থেকে আসা ‘এল্যান্ড্রা স্প্রুস’ ও ‘হাফনিয়া ববক্যাট’ নামের জাহাজ দুটি বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্প বয়লারে ব্যবহৃত উচ্চমাত্রার সালফারযুক্ত ফার্নেস অয়েল নিয়ে এসেছে। এছাড়া সিঙ্গাপুর থেকে আসা গ্যাস অয়েলবাহী ট্যাঙ্কার ‘শিউ চি’ ও ‘লিয়ান হুয়ান হু’ এবং মালয়েশিয়া থেকে আসা ‘এসপিটি থেমিস’ ডিজেলজাতীয় জ্বালানি নিয়ে বন্দরে পৌঁছেছে। এসব জাহাজ থেকে বর্তমানে জ্বালানি খালাস কার্যক্রম চলছে বলে জানিয়েছেন চট্টগ্রাম বন্দরের সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামিম।
বন্দর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, গত ৩ থেকে ১০ মার্চের মধ্যে কাতার থেকে আসা তিনটি এলএনজিবাহী জাহাজ—‘আল জুর’, ‘আল জাসাসিয়া’ ও ‘লুসাইল’ তাদের মালামাল খালাস সম্পন্ন করেছে। প্রতিটি জাহাজে প্রায় ৬২ হাজার টন এলএনজি ছিল। এছাড়া ১২ মার্চ ‘আল গালায়েল’ নামের আরেকটি জাহাজ ২৬ হাজার ১৬৫ টন এলএনজি নিয়ে বন্দরে পৌঁছায়। বর্তমানে ওই জাহাজ থেকে ভাসমান স্টোরেজ ও রিগ্যাসিফিকেশন ইউনিটে (এফএসআরইউ) জ্বালানি খালাস করা হচ্ছে।
অন্যদিকে মালয়েশিয়া থেকে আসা ‘মর্নিং জেন’ এবং ওমান থেকে আসা ‘জিওয়াই এমএম’ ইতোমধ্যে মোট ১৯ হাজার ৩১৬ টন এলপিজি খালাস সম্পন্ন করেছে। আরও কয়েকটি এলপিজিবাহী জাহাজ থেকে বর্তমানে কার্গো খালাস করা হচ্ছে। এর আগে ৮ মার্চ ওমান থেকে আসা ‘এলপিজি সেভান’ নামের একটি জাহাজ ৭ হাজার ৫০০ টন এলপিজি খালাস শুরু করে, যা আগামী ৩০ মার্চের মধ্যে সম্পন্ন হওয়ার কথা রয়েছে।
বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালি দিয়ে বৈশ্বিক পেট্রোলিয়াম বাণিজ্যের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ সম্পন্ন হয়। মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনার কারণে ওই অঞ্চলে জাহাজ চলাচল ও বিমা খরচে চাপ সৃষ্টি হলেও এখন পর্যন্ত চট্টগ্রাম বন্দরে জ্বালানিবাহী জাহাজের আগমন স্বাভাবিক রয়েছে বলে জানিয়েছেন চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের বোর্ড সদস্য কমডোর আহমেদ আমিন আবদুল্লাহ। তিনি আরও বলেন, দ্রুততার সঙ্গে জাহাজ থেকে জ্বালানি তেল খালাস নিশ্চিত করতে বিপিসির সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করা হচ্ছে। জ্বালানি তেল খালাসে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে কাজ করছে বন্দর কর্তৃপক্ষ।
বন্দর সংশ্লিষ্টরা জানান, ভারত থেকে ‘অ্যাঞ্জেল ১১’ নামের একটি জাহাজ প্রায় ৪ হাজার টন লুব্রিকেন্ট উৎপাদনের অন্যতম কাঁচামাল বেজ অয়েল নিয়ে চট্টগ্রাম বন্দরে ভিড়ছে। পাশাপাশি সরকার পাইপলাইনের মাধ্যমেও জ্বালানি তেল আনার উদ্যোগ নিয়েছে। আসামের নুমালিগড় রিফাইনারি থেকে ‘বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রী পাইপলাইন’-এর মাধ্যমে ডিজেল দিনাজপুরের পার্বতীপুর ডিপোতে পৌঁছাচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ভারতের শিলিগুড়ি মার্কেটিং টার্মিনাল থেকে দিনাজপুরের পার্বতীপুর ডিপো পর্যন্ত বিস্তৃত এই মৈত্রী পাইপলাইনটির দৈর্ঘ্য প্রায় ১৩১ কিলোমিটার। এই পাইপলাইনের মাধ্যমে সরাসরি ডিজেল পরিবহন করা হচ্ছে।
২০২৩ সালের মার্চ মাসে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে এই আন্তঃদেশীয় পাইপলাইনটির উদ্বোধন করা হয়। বছরে প্রায় ২ লাখ মেট্রিক টন ডিজেল পরিবহনের সক্ষমতা রয়েছে এই পাইপলাইনটির।
এতে দেশে আবাসিক ও বাণিজ্যিক খাতে জ্বালানি তেলের সংকট থাকবে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
১২৬ বার পড়া হয়েছে