জ্বালানি তেলের পর ভোজ্য তেলের বাজারে অস্থিরতা: প্রতিমণে বেড়েছে ২৫০টাকা
শনিবার, ১৪ মার্চ, ২০২৬ ৭:৩৬ পূর্বাহ্ন
শেয়ার করুন:
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংকট ও যুদ্ধ পরিস্থিতিকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে দেশে ভোজ্য তেলের বাজারে নতুন করে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে।
এরই মধ্যে চট্টগ্রামের প্রধান পাইকারি বাজার খাতুনগঞ্জে ভোজ্য তেলের দাম প্রতিমণে বেড়েছে প্রায় ২৫০ টাকা। যদিও বাজারে চাহিদার তুলনায় আমদানি ও মজুদ বেশি রয়েছে, তবুও সরবরাহ কমিয়ে দিয়ে কৃত্রিম সংকট তৈরি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ তুলেছেন সাধারণ ব্যবসায়ীরা। তাদের দাবি, অতিরিক্ত মুনাফার আশায় মিল মালিক ও ডিও (ডেলিভারি অর্ডার) ব্যবসায়ীরা বাজারে তেলের সরবরাহ কমিয়ে দিয়েছেন।
ট্যারিফ কমিশনের হিসাব অনুযায়ী, রমজান মাসে দেশে ভোজ্য তেলের চাহিদা থাকে প্রায় ৩ লাখ টন। চট্টগ্রাম বন্দর ও কাস্টমস কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, রোজার আগে চলতি বছর সয়াবিন তেল আমদানির জন্য এলসি খোলা হয়েছে ৪ লাখ ৯৪ হাজার ৮৬৫ টনের। পাশাপাশি রোজার আগে ক্রুড ও রিফাইন সয়াবিন এবং পাম অয়েল মিলিয়ে দেশে ভোজ্য তেল আমদানি হয়েছে প্রায় ৫ লাখ ৭৪ হাজার মেট্রিক টন। এর সঙ্গে অতিরিক্ত আরও ১ লাখ ২১ হাজার টন সয়াবিন আমদানি হয়েছে।
বিপুল পরিমাণ তেলের মজুদ থাকা সত্ত্বেও হঠাৎ করে বাজারে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জে ভোজ্য তেলের দাম প্রতিমণে ২৫০ টাকা বেড়েছে। খুচরা ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করছেন, রমজানের আগে বিভিন্ন সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা বাজার থেকে আগাম টাকা সংগ্রহ করলেও এখন তারা তেল সরবরাহ করছে না। ডিলাররা বিভিন্ন অজুহাত দেখিয়ে সরবরাহ বিলম্বিত করছেন।
‘মেসার্স হাজী আব্বাস আলী সওদাগর’-এর মালিক মুহাম্মদ আফজাল আলী জানান, ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে তিনি ভোজ্য তেল সরবরাহকারী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের আগাম টাকা দিয়েছেন। কিন্তু এখন মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির অজুহাত দেখিয়ে তেল উৎপাদন ও বিপণনকারী প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা সরবরাহ বন্ধ করে দিয়েছেন। এতে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি হচ্ছে এবং ব্যবসায়ীরাও ক্ষতির মুখে পড়ছেন।
চাক্তাই-খাতুনগঞ্জ আড়তদার সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক এহসান উল্লাহ জাহেদী বলেন, দেশের তেল উৎপাদনকারী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান সমন্বিতভাবে বাজারে সরবরাহ সীমিত করে দিয়েছে। এতে সরবরাহ চেইনে চাপ তৈরি হয়ে কৃত্রিম সংকট দেখা দিয়েছে এবং বাজার অস্থিতিশীল হয়ে উঠছে। পর্যাপ্ত মজুদ থাকা সত্ত্বেও কেন বাজারে সংকট তৈরি হচ্ছে—তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তিনি।
চাক্তাই-খাতুনগঞ্জ আড়তদার সমিতির সাবেক সভাপতি সোলায়মান বাদশাও একই অভিযোগ করেছেন। তার মতে, ভোক্তাদের জিম্মি করে অতিরিক্ত মুনাফা লাভের উদ্দেশ্যে বাজারে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করার চেষ্টা চলছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের মিল মালিকদের সঙ্গে দ্রুত বৈঠক করে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার পাশাপাশি তাদের জবাবদিহিতার আওতায় আনার দাবি জানান তিনি। একই সঙ্গে ডিও ব্যবসার ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ এবং মিল থেকে দ্রুত তেল খালাসের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও বলেন।
মেসার্স সবুজ কমার্শিয়ালের মালিক মোহাম্মদ শাহদে উল আলম জানান, বাংলাদেশে পাম অয়েল মূলত মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়া থেকে আমদানি করা হয়। অন্যদিকে সয়াবিন আমদানি করা হয় আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিল থেকে।
তবে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধকে কেন্দ্র করে গুজব ছড়িয়ে বাজারে ভোজ্য তেলের কৃত্রিম সংকট তৈরির চেষ্টা করা হলেও চট্টগ্রাম বন্দর ও কাস্টমস সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, বাংলাদেশের ভোজ্য তেল আমদানির প্রধান উৎস আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিল। এসব দেশের জাহাজ আটলান্টিক ও ভারত মহাসাগর হয়ে সরাসরি চট্টগ্রাম বন্দরে আসে। অন্যদিকে পাম অয়েল আসে ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়া থেকে, যার রুট মালাক্কা প্রণালী। এই দুই রুটের কোনোটির সঙ্গেই হরমুজ প্রণালীর ভৌগোলিক কোনো সম্পর্ক নেই।
সূর্যমুখী তেল মূলত ইউক্রেন ও রাশিয়া থেকে আমদানি করা হয়। তবে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে এ ক্ষেত্রে সরবরাহ ব্যবস্থায় কিছুটা ঘাটতি দেখা দিয়েছে। এছাড়া সরিষার তেল দেশে উৎপাদিত হলেও চাহিদা পূরণে তা যথেষ্ট নয়। এজন্য ভারত, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়া থেকেও সরিষার তেল আমদানি করা হয়।
বাংলাদেশে ভোজ্য তেল আমদানির ক্ষেত্রে মূলত সিটি গ্রুপ, মেঘনা গ্রুপ, টি কে গ্রুপ এবং এস আলম গ্রুপ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এসব প্রতিষ্ঠান বিদেশ থেকে অপরিশোধিত তেল আমদানি করে নিজেদের রিফাইনারিতে প্রক্রিয়াজাত করে ডিলারদের মাধ্যমে বাজারে সরবরাহ করে থাকে।
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতিকে অজুহাত করে ভোজ্য তেলের কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি এবং বাজারে অস্থিরতা তৈরির বিরুদ্ধে সরকারের কঠোর অবস্থান গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন সাধারণ ব্যবসায়ীরা। পাশাপাশি বাজারে মনিটরিং ব্যবস্থা জোরদার করার আহ্বান জানিয়ে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ারও তাগিদ দিয়েছেন তারা।
১১৬ বার পড়া হয়েছে