ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র মোকাবিলায় দক্ষিণ কোরিয়া থেকে থাড সরাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র
শনিবার, ১৪ মার্চ, ২০২৬ ৫:১৪ পূর্বাহ্ন
শেয়ার করুন:
ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার আশঙ্কা বাড়তে থাকায় দক্ষিণ কোরিয়ায় মোতায়েন করা একটি থাড (টার্মিনাল হাই-অ্যালটিটিউড এরিয়া ডিফেন্স) ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার কিছু অংশ মধ্যপ্রাচ্যে সরিয়ে নিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ওয়াশিংটন পোস্ট ও দক্ষিণ কোরিয়ার কয়েকটি সংবাদমাধ্যম এ তথ্য জানিয়েছে।
জর্ডানে অবস্থানরত যুক্তরাষ্ট্রের একটি থাড প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ রাডার ইরানের হামলায় ধ্বংস হয়েছে—এমন খবর প্রকাশের পরই নতুন করে প্রতিরক্ষা জোরদারের পদক্ষেপ হিসেবে এই স্থানান্তরের বিষয়টি সামনে আসে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার জবাবে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি লক্ষ্য করে ইরান ধারাবাহিকভাবে ড্রোন ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালাচ্ছে।
উত্তর কোরিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র হুমকি মোকাবিলায় ২০১৭ সালে প্রথমবারের মতো দক্ষিণ কোরিয়ায় থাড মোতায়েন করেছিল যুক্তরাষ্ট্র। তবে সে সময় এ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে দেশটিতে ব্যাপক প্রতিবাদ দেখা দেয়। অনেকের আশঙ্কা ছিল, থাড মোতায়েনের ফলে দক্ষিণ কোরিয়া বড় ধরনের সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হতে পারে এবং এতে আঞ্চলিক উত্তেজনাও বাড়তে পারে।
চলতি সপ্তাহের শুরুতে ওয়াশিংটন পোস্ট দুই মার্কিন কর্মকর্তার বরাত দিয়ে জানায়, থাড ব্যবস্থার কিছু অংশ ইতোমধ্যে মধ্যপ্রাচ্যে সরিয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়ার সংবাদমাধ্যমগুলোর খবরে বলা হয়েছে, রাজধানী সিউলের দক্ষিণে অবস্থিত সেওংজু বিমানঘাঁটি থেকে থাডের লঞ্চার সরানোর কাজ চলছে।
এদিকে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট লি জে-মিউং স্বীকার করেছেন যে মার্কিন বাহিনী দেশটিতে থাকা কিছু অস্ত্র ও আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার বিষয়টি নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। তিনি মন্ত্রিসভার বৈঠকে বলেন, দক্ষিণ কোরিয়া এ বিষয়ে আপত্তি জানিয়েছে, তবে বাস্তবতার কারণে যুক্তরাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত পুরোপুরি ঠেকানো সম্ভব নয়।
বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ইতোমধ্যে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়েছে। ফলে সেখানে নতুন করে প্রতিরক্ষা শক্তিশালী করতে থাডের মতো উন্নত ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন হয়ে পড়েছে।
থাড মূলত স্বল্প ও মাঝারি পাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র আকাশের অনেক উঁচুতে ধ্বংস করার জন্য তৈরি করা একটি অত্যাধুনিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। মার্কিন কোম্পানি লকহিড মার্টিনের তৈরি এই ব্যবস্থায় ছয়টি লঞ্চার থাকে এবং প্রতিটি লঞ্চারে আটটি করে ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্র থাকে। এতে একটি শক্তিশালী রাডারও যুক্ত থাকে, যা শত্রুপক্ষের ক্ষেপণাস্ত্র শনাক্ত করতে সক্ষম।
এই প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ‘হিট-টু-কিল’ প্রযুক্তি ব্যবহার করে লক্ষ্যবস্তু ধ্বংস করে এবং পারমাণবিক ওয়ারহেড বহনকারী ক্ষেপণাস্ত্রও প্রতিহত করতে পারে। একটি থাড ব্যাটারির মূল্য প্রায় ১০০ কোটি ডলার এবং এটি পরিচালনায় প্রায় ১০০ জন কর্মীর প্রয়োজন হয়।
বর্তমানে বিশ্বজুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে এমন মাত্র আটটি থাড ব্যবস্থা রয়েছে। এর মধ্যে দুটি মধ্যপ্রাচ্যে—জর্ডান ও ইসরায়েলে—মোতায়েন আছে। এছাড়া সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরবের কাছে যৌথভাবে আরও তিনটি রয়েছে।
এদিকে থাড সরানোর সম্ভাব্য সিদ্ধান্ত নিয়ে চীন আবারও তাদের পুরোনো অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেছে। বেইজিং দীর্ঘদিন ধরেই দক্ষিণ কোরিয়ায় থাড মোতায়েনের বিরোধিতা করে আসছে। তাদের অভিযোগ, এই ব্যবস্থার শক্তিশালী রাডারের মাধ্যমে চীনের অভ্যন্তরের অনেক দূর পর্যন্ত নজরদারি করা সম্ভব।
২০১৭ সালে থাড মোতায়েনের পর চীন অনানুষ্ঠানিকভাবে দক্ষিণ কোরিয়ার পণ্য বর্জন এবং পর্যটনসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিল। বিশ্লেষকদের মতে, থাড সরানোর খবরে বেইজিং কিছুটা সন্তুষ্ট হতে পারে, তবে এটি স্থায়ীভাবে প্রত্যাহার না করা পর্যন্ত তারা এটিকে বড় কোনো কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে দেখবে না।
অন্যদিকে পর্যবেক্ষকদের মতে, ইরানের সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত চলতে থাকলে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ভাণ্ডারে চাপ তৈরি হতে পারে। এতে ভবিষ্যতে অন্য কোনো অঞ্চলে জরুরি সামরিক পরিস্থিতি মোকাবিলা করা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কঠিন হয়ে পড়ার ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে।
১০৬ বার পড়া হয়েছে