ইসলামপুরে ১৪টি খাল খনন হলে বদলে যাবে জনজীবন, বাড়বে কৃষি ও মৎস্য উৎপাদন
মঙ্গলবার, ১০ মার্চ, ২০২৬ ১১:৪৩ পূর্বাহ্ন
শেয়ার করুন:
জামালপুরের ইসলামপুর উপজেলায় দীর্ঘদিন ধরে ভরাট ও দখল হয়ে থাকা ১৪টি খাল পুনঃখনন ও সংস্কার করা হলে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বাড়বে এবং এ অঞ্চলের মানুষের জীবনযাত্রার মান উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত হবে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
ইসলামপুর উপজেলার পাশ দিয়ে বয়ে গেছে যমুনা ও ব্রহ্মপুত্র নদ। নদী তীরবর্তী এসব এলাকার মানুষের প্রধান পেশা কৃষি। প্রাকৃতিকভাবে উর্বর মাটির কারণে এখানে ধান, পাট, আখ, সরিষা, তামাক, চীনাবাদাম, মসুর, ভুট্টা ও বিভিন্ন ধরনের শাকসবজির চাষ হয়ে থাকে। কৃষির পাশাপাশি মৎস্য শিকার, ক্ষুদ্র শিল্প যেমন তাঁত, কামার, কুমার এবং নকশি কাঁথা তৈরির মতো কুটির শিল্পও স্থানীয়দের জীবিকার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
তবে দীর্ঘদিন ধরে উপজেলার অধিকাংশ খাল ভরাট ও দখল হয়ে যাওয়ায় সেচ সংকট ও জলাবদ্ধতার কারণে কৃষকসহ সাধারণ মানুষকে নানা ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, উপজেলার গাইবান্ধা ইউনিয়নের ফুলকার চর ছাইতনতলা থেকে উত্তর চর গোয়ালিনী ইউনিয়নের কান্দারচর দশানী নদী পর্যন্ত প্রায় সাত কিলোমিটার দীর্ঘ জিয়া খাল, পাথর্শী ইউনিয়নের দেলীরপাড় থেকে বৈশা বিল ও হলহলি ব্রিজ হয়ে যমুনা নদীপাড় পর্যন্ত প্রায় ছয় কিলোমিটার জিয়া খাল, লাওদত্ত ব্রিজ থেকে ধর্মকুড়া ও কাছারীপাড়া হয়ে পাথরঘাটা পর্যন্ত প্রায় তিন কিলোমিটার পুটি খাল, পাথরঘাটা থেকে ব্রহ্মপুত্র নদ পর্যন্ত প্রায় দেড় কিলোমিটার পুরাতন ব্রহ্মপুত্র খাল, চিনাডুলী ইউনিয়নের শিংভাঙ্গা থেকে বামনা পর্যন্ত প্রায় তিন কিলোমিটার বলিয়াদহ খাল, ঢেংগারগড় খাল, পচাবহলা খাল, পলবান্ধা ইউনিয়নের বাটিকামারী খাল, কাঠমা কৃষ্ণনগর খাল, মাইজবাড়ী খাল, চর টগা খাল, চর নন্দনেরপাড় খাল, চর পুটিমারী খাল এবং গোয়ালেরচর ইউনিয়নের সভুকুড়া থেকে মহিষকুড়া হয়ে প্রবাহিত ব্রহ্মপুত্র খালসহ মোট ১৪টি খাল দীর্ঘদিন ধরে খননের অভাবে প্রায় মৃতপ্রায় হয়ে পড়েছে।
স্থানীয়রা জানান, উপজেলার ১২টি ইউনিয়ন ও পৌরসভার এসব খাল খনন ও পুনঃখনন প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে জলাবদ্ধতা দূর হবে, কৃষিতে সেচ সুবিধা বাড়বে এবং দেশীয় মাছের উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে। খালে সারা বছর পানি থাকলে মাছের প্রজনন বাড়বে এবং স্থানীয় মানুষের আমিষের চাহিদা পূরণের পাশাপাশি নতুন আয়ের উৎস তৈরি হবে।
এ ছাড়া খালগুলো ব্রহ্মপুত্র ও যমুনা নদীর শাখা নদীর সঙ্গে সংযুক্ত হলে বর্ষা মৌসুমে পানি দ্রুত নিষ্কাশনের সুযোগ তৈরি হবে এবং অতিরিক্ত বৃষ্টির পানি ধারণ করে হঠাৎ বন্যা থেকে জনপদ রক্ষায় সহায়তা করবে। একই সঙ্গে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ঠিক রাখতে এবং নৌ-চলাচলের সুযোগ সৃষ্টিতেও ভূমিকা রাখবে।
পতিত ব্রহ্মপুত্র খালের কৃষক আলম শেখ (৬০) বলেন, “একসময় আমাদের আবাদি জমিতে ব্রহ্মপুত্র খাল থেকে সহজেই পানি নিয়ে চাষাবাদ করতাম। এখন খাল শুকিয়ে যাওয়ায় সেচ পাম্পের মাধ্যমে জমি চাষ করতে হয়, এতে খরচ অনেক বেড়ে গেছে। খালটি খনন করা হলে বছরে দুটি ফসল ফলানো সম্ভব হবে।”
গাইবান্ধা ইউনিয়নের কৃষক কবির হোসেন (৫৫) বলেন, “এই চরাঞ্চলের প্রায় ২০টি গ্রামের মানুষ কৃষি ও মৎস্য উৎপাদনে জিয়া খালের পানির ওপর নির্ভরশীল ছিল। কিন্তু দীর্ঘদিন খনন না হওয়ায় খালটি ভরাট হয়ে গেছে, ফলে কৃষিকাজে ব্যাপক সমস্যা হচ্ছে।”
চর পুটিমারী ইউনিয়নের সাবেক ইউপি সদস্য জবেদ আলী বলেন, “জিয়া খালটি খনন করা হলে আমাদের ইউনিয়নের অন্তত ২০টি গ্রামের মানুষ কৃষিকাজসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বড় ধরনের সুবিধা পাবে।”
ইসলামপুর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) রেজুয়ানল ইফতেকার বলেন, “উপজেলার এসব খাল খনন করা হলে জীববৈচিত্র্যে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে। বিষয়টি নিয়ে ইতিমধ্যে একটি প্রতিবেদন ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে।”
ইসলামপুর আসনের সংসদ সদস্য সুলতান এ. ই. মাহমুদ বাবু বলেন, “প্রধানমন্ত্রী সারাদেশে প্রায় ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খননের একটি বৃহৎ পরিকল্পনা ঘোষণা করেছেন। সেই পরিকল্পনার আওতায় ইসলামপুর আসনের খালগুলো পুনঃখননের কার্যক্রমও প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। আশা করছি, দ্রুতই কাজ শুরু হবে।”
১২৯ বার পড়া হয়েছে