নারীর প্রতি সহিংসতা ও অধরা স্বপ্ন
সোমবার, ৯ মার্চ, ২০২৬ ৭:০৮ পূর্বাহ্ন
শেয়ার করুন:
তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে ফাতেমা ছদ্মনাম (৩৬) নিয়মিত নির্যাতিত হচ্ছেন স্বামীর হাতে। বাসায় ঢুকেই কারণে-অকারণে গায়ে হাত তোলেন তাঁর স্বামী রাজিব। তাদের ৮ বছর বয়সী ছেলে সন্তান জয়। ঠিকমতো সংসারের দায়িত্বও পালন করেন না তিনি।
মাদক আর বিয়ে-বহির্ভূত সম্পর্কের কারণে আজ তার এই অবস্থা। রাতারাতি বদলে গেছে এক সময়ের এই প্রেমিক পুরুষ। ১০ বছরের প্রেমের পর বিয়ে-তাতে কি, পাশের মানুষটি এখন যেন পুরোপুরি অচেনা লাগে; ভয়ও লাগে-যদি মেরে ফেলেন, বলছিলেন ফাতেমা। এভাবেই অনেক স্বপ্নের অপমৃত্যু হচ্ছে। আবার অধরা থেকে যাচ্ছে নারীর প্রতি ভালোবাসা আর সম্মান।
পরিবার, সম্মান, সন্তানের ভবিষ্যত-এসব কারলে নীরবে সবকিছু সহ্য করে যাচ্ছেন ফাতেমার মতো লাখো নারী। যারা অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করছেন, মুখ খুলছেন, আইনের আশ্রয় নিচ্ছেন, তাদের বিপদ থেমে নেই। সামাজিকভাবে হেনস্তার শিকার হতে হচ্ছে তাদের। ন্যায়বিচার পাওয়া সেতো অসম্ভব প্রায়। সামাজিক প্রেক্ষাপট, বিচারহীনতাসহ নানা কারণে নারীরা বহুকাল ধরেই অবহেলিত, নিপীড়িত, নির্যাতিত। তবে সাম্প্রতিক সময়ে নারীর প্রতি সহিংসতার যে নতুন পরিসংখ্যান সামনে এসেছে; যা রীতিমতো উদ্বেগজনক, হতাশাজনক, লজ্জাজনক!
পুলিশের অপরাধ পরিসংখ্যানের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ২০২৪ সালের শেষ চার মাসে ৫ হাজার ৭৯৫টি নারী ও শিশু নির্যাতনের অপরাধ সংঘটিত হয়েছিল। সেখানে ২০২৫ সালের প্রথম চার মাসে এই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭ হাজার ১৩টিতে।
২০২৩ থেকে ২০২৫ সালের মার্চ পর্যন্ত পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সের তথ্য বলছে, ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলা হয়েছে ১,২৬৫টি, ফেব্রুয়ারিতে হয়েছে ১,২৯৫, মার্চে ১,৬৫২টি, এপ্রিলে ১,৪৪৮টি, মে মাসে ১,৮৬৭টি, জুন মাসে ১,৮৩৩টি, জুলাই মাসে ১,৭৯৪টি, আগস্ট মাসে ১,৮৫১টি, সেপ্টেম্বরে ১,৬৯৯টি, অক্টোবরে ১,৬২১টি, নভেম্বরে ১,৪২৬টি এবং ডিসেম্বরে ১,১৯৩টি।
২০২৪ সালে জানুয়ারিতে এই সংখ্যা ছিল ১,০৪৩টি, ফেব্রুয়ারিতে ১,৩৭১, মার্চ মাসে ১,৫০৯, এপ্রিল মাসে ১,৬২৩, জুন মাসে ১,৬৮৯টি, জুলাই মাসে ১,৭০২ আগস্ট মাসে ১,০৭২, সেপ্টেম্বর মাসে ১,৫৭৮, অক্টোবর মাসে ১,৫৬০, নভেম্বর মাসে ১,৪৫২ এবং ডিসেম্বর মাসে ১,২০৫টি।
২০২৫ সালের, অর্থাৎ চলতি বছর মার্চ মাস পর্যন্ত তথ্য অনুযায়ী জানুয়ারিতে এই সংখ্যা ১,৪৪০টি, ফেব্রুয়ারিতে ১,৪৩০টি এবং মার্চে তা বেড়ে হয়েছে ২,০৫৪টি। অর্থাৎ, মার্চ মাসে উল্লিখিত যেকোনো মাসের তুলনায় সবচেয়ে বেশি।
হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) তথ্য অনুসারে, ২০২০-২০২৪ সাল পর্যন্ত গত পাঁচ বছরে, বাংলাদেশে কমপক্ষে ১১ হাজার ৭৫৮ জন নারী ও মেয়ে শিশু নির্যাতন ও সহিংসতার শিকার হয়েছে, যার মধ্যে ৬ হাজার ৩০৫ জনকে ধর্ষণ করা হয়েছে।
আরও আশঙ্কার বিষয় হলো, যাদের ধর্ষণ করা হয়েছে তাদের মধ্যে ৩ হাজার ৪৭১ জনের বয়স ১৮ বছরের নিচে, যা মোট ঘটনার ৫৫ শতাংশেরও বেশি। এর মধ্যে ১ হাজার ৮৯ জন নারী ও কন্যাশিশুকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ করা হয়েছে এবং ২০৭ জনকে যৌন সহিংসতার পর হত্যা করা হয়েছে। তাদের মধ্যে ১১৮ জনই শিশু। এছাড়া, অন্তত ৫০ জন ভয়াবহ সহিংসতার ট্রমা সহ্য করতে না পেরে আত্মহত্যা করেছেন।
এইচআরএসএসের তথ্য অনুসারে, এই সময়ে যৌতুকের জন্য ৩৫৫ জনকে শারীরিক নির্যাতন করা হয়েছে, যাদের মধ্যে ২৬ জন আত্মহত্যা করেছেন। একই সময়ে পারিবারিক সহিংসতার ঘটনায় ১ হাজার ২৬২ নারী নিহত, ৩৮৬ জন আহত এবং ৪১৬ জন আত্মহত্যা করেছেন। অ্যাসিড হামলায় ৯৪ জন নারী ও কন্যাশিশু আহত হয়েছেন, যার মধ্যে ৯ জন এই ভয়াবহ হামলায় মারা গেছেন।
২০২৫ সালেও পরিস্থিতির কোন উন্নতি হয়নি; প্রথম দুই মাসের পরিসংখ্যানও উদ্বেগজনক। এই সময়ে অন্তত ২২৪ জন নারী ও কন্যাশিশু সহিংসতার শিকার হয়েছেন, যার মধ্যে ১০৭ জনকে ধর্ষণ করা হয়েছে, যাদের মধ্যে ৬৬ জন অপ্রাপ্তবয়স্ক। আরও ২৭ জন নারী ও শিশুকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ করা হয়েছে এবং ২৯ জন যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন, যার মধ্যে ১৬ জনই শিশু। যৌতুক-সম্পর্কিত সহিংসতার কারণে মারা গেছেন ছয় জন নারী, আহতের সংখ্যা দুই জন। পারিবারিক সহিংসতায় মৃত্যু হয়েছে ৫৮ জন নারীর। তাদের মধ্যে আত্মহত্যা করেছেন ২০ জন। অ্যাসিড হামলায় মৃত্যু হয়েছে একজনের।
বিশেষজ্ঞরা বাংলাদেশে নারীর বিরুদ্ধে ক্রমবর্ধমান সহিংসতা, বৈষম্য এবং নারীবিদ্বেষের পেছনে বেশ কয়েকটি কারণ তুলে ধরেছেন। শিক্ষাক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ নিয়ে কুসংস্কার এবং ধর্মীয় অপব্যাখ্যা গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবেও উল্লেখ করেছেন তারা। তাদের মতে, আইনের যথাযথ প্রয়োগের অভাব, পুলিশের উদাসীনতা এবং বিচারব্যবস্থায় দীর্ঘসূত্রিতায় অপরাধীরা পার পেয়ে যাচ্ছে। একারণে সমাজ বিশৃঙ্খলা তৈরি হচ্ছে।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী, বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড এ্যান্ড সার্ভিস ট্রাস্টের নির্বাহী পরিচালক ও মানবাধিকারকর্মী ব্যারিস্টার সারা হোসেন বলেন, হ্যারাসমেন্টের প্রতিবেদন থেকে দেখা যাচ্ছে যে প্রতি মাসে এক থেকে দেড় হাজারের বেশি নারী নির্যাতনের ঘটনা মিডিয়াতে আসে। কিন্তু এর পরিপ্রেক্ষিতে সাজা পাচ্ছেন কয়জন? আবার ভুক্তভোগীও যে সুরক্ষা পাচ্ছেন, সেই তথ্যও নেই।
অপরাধ বিশ্লেষক তৌহিদুল হক বলেন, নারীর প্রতি সহিংসতা নানা ধরনে, নানা আকারে ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। এগুলো যে আগেও ছিল না তা নয়। বছরের প্রথম তিন মাসে একরকম হলে শেষের তিন মাসে হয়তো কমত। তবে এখন সেটি বেড়েই চলেছে। আর যে উপায়ে সহিংসতাগুলো হচ্ছে, তাতে নারী ও শিশুর সুরক্ষার প্রশ্নে ভয়াবহ পরিস্থিতি বিরাজ করছে।
তবে অনেক হতাশার মাঝেও আমরা আশার আলো দেখতে পাচ্ছি। গণমাধ্যমের তথ্য বলছে, নির্যাতনের শিকার নারীরা এখন মুখ খুলতে শুরু করেছেন। জোরালো প্রতিবাদে রাজপথে নামছেন। নিজেদের অধিকার আদায়ে সোচ্চার হচ্ছেন। এর প্রমাণ হলো-দেশে নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতা ও যৌন হয়রানির ঘটনায় জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ নম্বরে অভিযোগ করার প্রবণতা উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ছে। পরিসংখ্যান বলছে, বিগত বছরগুলোর তুলনায় জরুরি সেবায় কল করার হার এখন অনেক বেশি।
পুলিশের দেওয়া তথ্যমতে, ২০২৩ সালে ৯৯৯-এর মাধ্যমে ২৬ হাজার ৭৯৮ জন নারীকে জরুরি সেবা দেওয়া হয়েছিল। ২০২৪ সালে এই সংখ্যা কিছুটা কমে ২৩ হাজার ৩৩ জন হলেও ২০২৫ সালে তা এক লাফে বেড়ে দাঁড়ায় ৩২ হাজার ৩৮৬ জনে। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে প্রায় ৯ হাজারেরও বেশি নারী অতিরিক্ত অভিযোগ করেছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতো আমরাও মনে করি, শুধু আইন প্রণয়ন যথেষ্ট নয়; কার্যকর তদন্ত, দ্রুত বিচার, সামাজিক সচেতনতা এবং রাষ্ট্রের দৃঢ় অবস্থানই পারে নারী ও শিশুদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে। আসুন আমরা নারীর প্রতি সহিংসতা বন্ধে জনসচেতনতা গড়ে তুলি। সমাজ ও রাষ্ট্রে নারীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার পাশাপাশি তাদের অধিকার আদায়ে পাশে থাকি।
লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক।
২২৪ বার পড়া হয়েছে