কাঁটাচামচ
সোমবার, ১৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ১২:০১ অপরাহ্ন
শেয়ার করুন:
প্রতিদিনের মতো সেদিনও ছিল কুয়াশার চাদরে ঢাকা সকাল। মধ্য পৌষে কুয়াশা না থাকাটায়তো অস্বাভাবিক ব্যাপার! এই শীতে সেই ভোর-সকালে কারইবা পড়তে যেতে ভালো লাগে, সৈকতেরও লাগে না।
তবুও বাবার ডান হস্তের কারুকাজের ভয়ে সৈকত চোখ কচলাতে কচলাতে অঙ্ক বই আর খাতা কোমরের সাথে চেপে পড়তে রওনা হয়। সৈকত ক্লাস এইটে পড়ে। প্রায় মাইলখানেক পথ পেরুলেই রোকনের বাড়ি।
রোকন দশম শ্রেণির ছাত্র। ওই বাড়িতে গণেশ স্যার পড়াতে আসেন। অত্র এলাকাতে অঙ্ক স্যার হিসেবে স্যারের খুবই নাম ডাক। রোকনের বাবা আর সৈকতের বাবা একই কারখানাতে কর্মরত। কাজের সুবাদেই গণেশ স্যারের সন্ধান সৈকতের বাবা রোকনের বাবার থেকেই পেয়েছে।
দু'দিন পড়ার পর সৈকতকে তার বাবা জিজ্ঞেস করেছিল,
'স্যার কেমন পড়ায়রে?' "ভালোয় কিন্তু......"
'কিন্তু কী?' সৈকতের বাবা জিজ্ঞেস করেছিল।
সৈকত তার উত্তরে যা বলেছিল তা শুনে সৈকতের বাবা ও মা হেসেতো কুটিকুটি।
সৈকতের মা আবার শোনার জন্য সাগ্রহে বলেছিল, 'ধুর্ কী বলিস?'
সৈকত- "সত্যি মা, স্যারের নাক ভর্তি পাঁকাশিন, স্যার বাথরুমে বা বাহিরে না ঝেড়ে পকেট থেকে রুমাল বের করে প্রু প্রু শব্দে রুমাল ভর্তি করে সর্দি ঝেড়ে সেই শিনসহ রুমাল ময়দার মতো দলা পাকিয়ে পকেটে পুরে রাখে আবার কিছুক্ষণ পরপর রুমাল বের করে শিন ঝেড়ে দলা পাকিয়ে পকেটে রাখে।"
সৈকতের মা- আচ্ছা হয়েছে এবার চুপ কর। শুনেইতো গা গুলিয়ে আসছে।
সৈকত- শোনোই না, আবার কি করে জানো?
সৈকতের মা- কী?
সৈকত- স্যার কিছুক্ষণ পরপর এমন হাঁচি দেয়! এতই দুর্গন্ধ হাঁচিতে সারাঘর গন্ধে ম-ম করে। এক মিনিট নিঃশ্বাস বন্ধ করে রাখতে হয়।
সৈকতের মা- ছি! থাম এবার! আর শুনবো না। যা পড়তে যা।
সেদিন স্যারের গল্পে খুব হাসাহাসি করেছিল সৈকতের বাবা ও মা। কিন্তু এত্তসব হাসির খোঁড়াক জোগালেও গণেশ স্যারের কাছে সৈকতের পড়তে ভালো লাগে না। এর কারণ স্যার ভালো পড়ায় না সেটা নয়; মূলত শীতের সকালে ঘুম ফেলে এক মাইল দূরপথে পড়তে যাওয়াটাই কষ্টের! সেদিন রোকনের বাসায় গিয়ে সৈকত যা শুনলো তাতে সৈকত মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়লো। শীতের ঝামেলার সঙ্গে বাঁধলো আর এক নতুন ঝামেলা।
রোকনের কাজিনের বিয়ে উপলক্ষ্যে রোকনরা পনের দিনের জন্য গ্রামের বাড়ি যাবে। তাহলে সৈকত এই ক'দিন গনেশ স্যারের কাছে কীভাবে পড়বে? কোথায় পড়বে?
শেষমেশ গণেশ স্যারই সমাধান দিলেন। পাশেই সুগার মিলস্ এর অফিসার্স কলোনি, ওখানে গণেশ স্যার এক অফিসারের মেয়েকে পড়ান। আপাততঃ ওই বাসাতেই সৈকত যেয়ে পড়ে আসবে। গণেশ স্যারই সেই বাসার এ্যাড্রেস ভালো করে বুঝিয়ে দিলেন।
পরদিন সকালে যথাযথ বাসাতে হাজির হয়ে সৈকত কলিংবেলে চাপ দিতেই কলাপাতা রঙের থ্রিপিস পরহিত রূপবতী এক মেয়ে দরজা খুলে দিলো। সৈকত বেশ বোকাসোকা ঘোচের হওয়াতে পরীর মতো মেয়েকে দেখে বাক্ প্রতিবন্ধীর মতো খাবি খাওয়া শুরু করে দিলো।
"তুমি সৈকত? আমি সুমি। ক্লাস টেন-এ পড়ি। স্যার বলেছিলো তুমি আসবে। আসো ভেতরে আসো।"
সৈকত- আপনি সু-সুমি আপা? আসসালামু আলাইকুম আপু।
সুমি- আসো ভেতরে আসো। বসো।
সৈকত- স্যার কখন আসবেন?
সুমি- তুমি বসো, স্যার এখনই চলে আসবে।
সৈকত ড্রয়িং রুমে বসে এটা সেটা দেখতে থাকে। কখনো শো পিচ কখনোবা দেয়ালে ঝুলানো প্রকৃতির নানানরকম পেইন্টিংস। সুমি ভেতর থেকে প্রিচ ভরে চমচম ও কালোজাম নিয়ে আসে। আর মিষ্টি তোলার জন্য কাঁটাচামচ। কিন্তু এ কী? সারাজীবন সৈকত বাড়িতে বড়জোর চা-চামচে মিষ্টি খেয়েছে। চা-চামচ বললেও ভুল হবে হাতে তুলেই খেয়েছে বেশি। কিন্তু আজ এ কী হলো? এই চিরুনির মতো দাঁত যুক্ত চামচে এত বড় বড় মিষ্টি কী করে খাবে সৈকত? সৈকতের বাড়িতেতো এমন চামচ কোনোদিনও সে দেখেনি। আর একজন মিল-লেবারের বাড়িতে এমন চামচ থাকাতো নব্বইয়ের দশকে বিলাসিতায় বটে। সৈকতের সামনে কাঁটাচামচ যেন যুদ্ধের ময়দানে শত্রুর গোলার সামনে দাঁড়ানোর মতো।
সৈকতের আজ যেন মিষ্টি খাওয়াটাই গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই কাঁটাচামচে সে কী করে মিষ্টি তুলবে? সৈকত ভাবতে থাকে আর এদিকে সুমির মা'ও এসে জুটেছে।
সুমির মা- বাবা, খাও। খাচ্ছো না কেন? খাও।
সুমি- লজ্জা কীসের ভাই? খাও।
সৈকত- জী খাচ্ছি আন্টি। না, লজ্জা কীসের
আপা? (বিড়বিড় করতে থাকে) কী করে যে কাঁটাচামচে মিষ্টি খায়!
সৈকতের এদিকে ঘাম ঝরতে থাকে। সৈকত ভাবতে থাকে, কোনোরকম সুমি আপু আর আন্টি চোখ অন্যদিকে ঘোরালেই হাত দিয়ে তুলেই মুখে টপাটপ মিষ্টি ঢোকাবো। কিন্তু কেউই সড়েও না, নড়েও না। চোখও অন্যদিকে ফেরে না। চার চক্ষু যেন সৈকতের মিষ্টি গেলা দেখতে চায়। এদিকে বারবার মিষ্টি খেতে তাগাদা চলতে থাকে। ওদিকে জি খাচ্ছি, জি খাচ্ছি, জি এইতো খায় চলতে থাকে।
হঠাৎ সুমির মা রান্নাঘরের উদ্দেশ্যে রওনা হয়। সৈকত যেন বুকে কিছুটা প্রাণ ফিরে পায়। এবার সুমি আপা গেলেই কর্মসাধন করতে পারে সৈকত!
সুমি- তুমি খাও ভাই, আমি আসছি।
সুমি পা বাড়াতেই সৈকত হাত দিয়ে টপাটপ মিষ্টি গিলতে শুরু করে। গলাতে মিষ্টি বেঁধে যাবার উপক্রমও হয়। গ্লাসে রাখা পানি মিষ্টি গিলতে অনেক সাহায্য করেছে আজ। সৈকত হাফ ছেড়ে বাঁচে যেন।
অবশেষে মিষ্টি যুদ্ধ শেষ হলেই মানে মিষ্টি গেলা শেষ হলেই সুমি আপা ড্রয়িং রুমে ফিরে আসে।
সুমি- স্যার বোধ হয় আজ আর আসবে না। এত দেরীতো করে না। তুমি আজ দুপুরে খেয়ে যেও ভাই।
সৈকত- আজ আর খাবো না আপু। আরেকদিন খাবো। আজ তাহলে আসি আপু।
সুমি- প্রথম এলে, না খেয়ে যেতেই দিবো না।
সৈকত- আরেকদিন খাবো আপু। কথা দিচ্ছি। আজ আসি।
বলেই তড়িঘড়ি করে সৈকত রওনা হয়। আর বিপদে পড়তে রাজী না সে।
সুমি- আগামীকাল তাহলে পড়তে চলে এসো।
সৈকত- আচ্ছা আপু।
সৈকত সুমির বাসা থেকে বের হয়ে যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচে। ওরে বাবা কাঁটাচামচে মিষ্টি খেতে যেয়েই যে হাল! আবার দুপুরে না জানি কেমন কাঁটাচামচ দেবে! আর তা দিয়ে ভাত তুলে খাওয়ার কথা ভাবতেই লজ্জা ও আশঙ্কায় সৈকতের বুক কেঁপে ওঠে। যাক্ এ যাত্রায় রক্ষাতো হলো! আল্লাহ!
সৈকত নিজে নিজে বলতে থাকে, " এখনও চৌদ্দ দিন বাদে রোকন ভাইরা বাড়ি ফিরবে! উফ্ আর চৌদ্দটা দিন আল্লাহ্ আর চৌদ্দটা দিন কাঁটাচামচ থেকে রক্ষা করো!"
১১৯ বার পড়া হয়েছে