খেলায় রাজনীতি: অতীত থেকে বর্তমান
মঙ্গলবার, ১০ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ১২:৪০ অপরাহ্ন
শেয়ার করুন:
“খেলার সাথে রাজনীতি মেশাবেন না”-এই কথাটি বিনোদন প্রিয় মানুষের অত্যন্ত পছন্দের নীতিবাক্য।
খেলাধুলাকে নিছক বিনোদন হিসেবে দেখতে চাওয়া মানুষ মনে করেন, রাজনীতি একটি কলুষিত বাস্তবতা, যার স্পর্শ থেকে খেলাকে মুক্ত রাখাই শ্রেয়। কিন্তু ইতিহাস ও বাস্তবতা বলছে খেলাধুলা কখনোই রাজনীতির বাইরের বিষয় না। অতীতেও ছিল না, বর্তমানেও না। খেলাধুলা সমাজেরই অংশ। আর সমাজ যেহেতু রাজনৈতিক, তাই খেলাও অনিবার্যভাবে রাজনৈতিক বাস্তবতার ভেতরেই অবস্থান করে। এই বাস্তবতা অস্বীকার করার প্রবণতা আসলে ইতিহাস অস্বীকারেরই নামান্তর। খেলার সাথে রাজনীতি না জড়ানোর আকুতি নতুন নয়। প্রায় দুই হাজার বছর আগে, খ্রিষ্টপূর্ব প্রথম শতকে প্রাচীন অলিম্পিয়ায় দেয়ালে লেখা হয়েছিল-“খেলাধুলার থেকে রাজনীতিকে দূরে রাখুন।” তখন রোমান সম্রাটদের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল ঘোড়ার রথের প্রতিযোগিতার ফলাফল আগেই ঠিক করে রাখার। অর্থাৎ ক্ষমতা ও রাজনীতির প্রভাব তখনও খেলাধুলায় প্রবলভাবে উপস্থিত ছিল।
আধুনিক যুগে এর অন্যতম স্মরণীয় দৃষ্টান্ত দেখা যায় ১৯৬৮ সালে মেক্সিকো সিটিতে অনুষ্ঠিত ১৯তম গ্রীষ্মকালীন অলিম্পিকে। আমেরিকান অ্যাথলেট টমি স্মিথ এবং জন কার্লোস পদক বিতরণ অনুষ্ঠানে কালো গ্লাভস পরা মুষ্টিবদ্ধ হাত উঁচিয়ে ধরেছিলেন। এই ঘটনার জন্য তাদের অলিম্পিক থেকে বহিষ্কার করা হলেও ইতিহাসে এটি বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনের এক শক্তিশালী প্রতীক হয়ে আছে। আবার জাতিগত বৈষম্যবিরোধী সংগ্রামেও খেলাধুলার রাজনৈতিক ভূমিকা অনস্বীকার্য। দক্ষিণ আফ্রিকায় ১৯৪৮ থেকে ১৯৯১ সাল পর্যন্ত চলা বর্ণবাদী শাসনের কারণে দেশটির ক্রীড়া দলগুলো আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা থেকে নিষিদ্ধ ছিল। এই ক্রীড়া অবরোধ বিশ্ববাসীর সামনে বর্ণবাদের ভয়াবহতা স্পষ্ট করে তোলে। এর প্রতীকী পরিণতি দেখা যায় ১৯৯৫ সালে, যখন দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট প্রেসিডেন্ট নেলসন ম্যান্ডেলা রাগবি বিশ্বকাপের ট্রফি তুলে দেন অধিনায়ক ফ্রাঙ্কোয়েস পিয়েনারের হাতে। সেই মুহূর্তটি হয়ে ওঠে বিভক্ত জাতিকে একত্র করার প্রতীক।
খেলাধুলা কখনো কখনো রাষ্ট্রীয় কূটনীতির কার্যকর মাধ্যম হয়ে উঠেছে। ১৯৭১ সালে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে দীর্ঘ প্রায় দুই দশকের কূটনৈতিক বৈরিতা ভাঙতে টেবিল টেনিস (পিংপং) গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। পিপলস রিপাবলিক অব চায়নার প্রতিষ্ঠাতা মাও সে-তুং ১৯৭১ সালে যুক্তরাষ্ট্র পিংপং দলকে আমন্ত্রণ জানান চীন সফরের। সেই আমন্ত্রণে সাড়াও দেয় যুক্তরাষ্ট্র। পরের বছরই আবার ফিরতি আমন্ত্রণে যুক্তরাষ্ট্র সফর করে চীনা পিংপং দল। মার্কিন পিংপং দলের চীন সফর এবং পরবর্তী পাল্টা সফরের মধ্য দিয়েই দুই দেশের সম্পর্ক পুনঃপ্রতিষ্ঠার পথ তৈরি হয়। যা ইতিহাসে ‘পিংপং ডিপ্লোম্যাসি’ নামে পরিচিত।
ফুটবলে রাজনীতি ও জাতীয়তাবাদের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রকাশ দেখা যায় স্পেনে, রিয়াল মাদ্রিদ ও বার্সেলোনার-এর দ্বন্দ্বে। বিশেষ করে ১৯৩৯-১৯৭৫ সালের জেনারেল ফ্রান্সিসকো ফ্রাঙ্কোর স্বৈরশাসনামলে রিয়াল মাদ্রিদকে কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রক্ষমতার প্রতীক হিসেবে দেখা হতো। অন্যদিকে বার্সেলোনা কাতালান জাতিসত্তা, ভাষা ও স্বায়ত্তশাসনের দাবীর প্রতীক হয়ে ওঠে। কাতালান ভাষায় "Més que un club" (একটি ক্লাবের চেয়ে বেশি) হলো বার্সেলোনার স্লোগান। এই স্লোগানটি ক্লাবের এবং তার ভক্তদের জন্য একটি গভীর অর্থ বহন করে। এটি শুধু একটি ফুটবল ক্লাবের পরিচয় নয়, বরং এটি কাতালোনিয়ার জাতিগত, সাংস্কৃতিক, এবং রাজনৈতিক অবস্থান এবং আত্মবিশ্বাসের প্রতীক হিসেবেও পরিচিত। সে কারণেই এল ক্লাসিকো কেবল ফুটবল ম্যাচ নয়, বরং কেন্দ্র বনাম প্রান্তের রাজনৈতিক সংঘাত। একইভাবে লাতিন আমেরিকায় ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার ফুটবল দ্বৈরথও জাতীয় অহংকার ও ঐতিহাসিক বৈরিতার প্রতিফলন। উনিশ শতকের ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে শুরু করে ১৯২৫, ১৯৩৭ ও পরবর্তী কোপা আমেরিকা কিংবা বিশ্বকাপ ম্যাচগুলোতে এই উত্তেজনার প্রকাশ ঘটেছে। যা ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার সাধারণ ফুটবল ম্যাচ ছাড়িয়ে রাজনীতি, জাতীয় সত্ত্বার পরিচায়ক হয়ে ওঠেছে।
খেলাধুলার বহু ক্ষেত্রেই জাতীয় দ্বন্দ্ব ও জাতীয়তাবাদের প্রতিফলন লক্ষণীয়। ক্রিকেটে ভারত ও পাকিস্তান-এর দ্বৈরথ তার সবচেয়ে স্পষ্ট উদাহরণ। ১৯৪৭ সালের দেশভাগ, পরবর্তী যুদ্ধগুলো (১৯৪৮, ১৯৬৫, ১৯৭১, ১৯৯৯) এবং কাশ্মীর সংকট এই দুই দেশের ক্রিকেট ম্যাচকে খেলার বাইরে নিয়ে গেছে। ভারত-পাকিস্তান ম্যাচ মানেই রাষ্ট্রীয় মর্যাদা, ঐতিহাসিক ক্ষত ও জাতীয় আবেগের বহিঃপ্রকাশ। ক্রিকেট মাঠের বাইরের রাজনীতি ক্রিকেটে এক উন্মাদনার সৃষ্টি করে। যেখানে খেলার বিনোদন থেকে জাতীয়বাদ, জাতীয় গৌরব বড় হয়ে ওঠে।
ক্রিকেট ইতিহাসের আরেক বিখ্যাত দ্বৈরথ ইংল্যান্ড-অস্ট্রেলিয়ার অ্যাশেজ, যার সূচনা ১৮৮২ সালে। এটি ছিল উপনিবেশ ও সাম্রাজ্যবাদী শক্তির প্রতীকী লড়াই। অস্ট্রেলিয়ার কাছে ইংল্যান্ডকে হারানো দীর্ঘদিন ধরে ছিল ঔপনিবেশিক মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসার প্রতীক, আর ইংল্যান্ডের কাছে অ্যাশেজ মানে ক্রিকেটীয় কর্তৃত্ব ধরে রাখার সংগ্রাম।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে খেলাধুলা ও রাজনীতির সংযোগ এদেশের জন্মকাল থেকেই। ১৯৭১ সালের ১ মার্চ, পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান জাতীয় পরিষদের ৩ মার্চের অধিবেশন স্থগিত ঘোষণা করলে ঢাকার স্টেডিয়ামে চলমান ক্রিকেট ম্যাচ বন্ধ হয়ে যায়। দর্শকরা খেলা বয়কট করে প্রতিবাদে ফেটে পড়েন। ক্রিকেট মাঠ সেই মুহূর্তে রাজনৈতিক আন্দোলনের অংশে পরিণত হয়। বর্তমানেও বাংলাদেশের ক্রিকেট নিছক বিনোদনের উৎস নয়। পাকিস্তানের সাথে ম্যাচ অনেকের কাছে মুক্তিযুদ্ধের অমীমাংসিত ইতিহাসের প্রতীকী পুনরাবৃত্তি। তাই মার্চ কিংবা ডিসেম্বরে বাংলাদেশ পাকিস্তানকে ক্রিকেট দলকে পরাজিত করলে সমর্থকদের মধ্যে বাড়তি উদযাপন লক্ষ্য করা যায়। আবার ভারতের সাথে ক্রিকেট ভিন্ন মনস্তত্ত্ব বহন করে। মিত্রতা ও আধিপত্যের দ্বৈত বাস্তবতায় ম্যাচগুলো জাতীয় আত্মসম্মান প্রমাণের উপলক্ষ হয়ে ওঠে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশ-পাকিস্তান ম্যাচ থেকে বাংলাদেশ-ভারত ম্যাচগুলো মনস্তাত্তিকভাবে অনেক বেশি প্রতিদ্বন্দ্বীতাপূর্ণ হয়ে ওঠেছে। যার প্রতিফলন দেখা যায় যেকোন সিরিজের আগে দুই দেশের সমর্থকদের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যবহার করা ভাষা থেকে। বাংলাদেশের ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের ফলে এশীয় ক্রিকেটীয় রাজনীতিতে একটা বড় পরিবর্তন ঘটে গেছে। যার সাথে অবধারিতভাবে ভূরাজনৈতিক খেলা জড়িত। মোস্তাফিজুর রহমানের ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লীগ (আইপিএল) থেকে বাদ পড়া, বাংলাদেশ ভারতে টি টুয়েন্টি বিশ্বকাপে পুরুষ ক্রিকেট দলকে না পাঠানোর সিদ্ধান্ত, বাংলাদেশ ইস্যুতে আইসিসির মিটিংয়ে বাংলাদেশের পক্ষে একমাত্র পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ডের ভোট প্রদান, বাংলাদেশকে পুরো টুর্নামেন্ট থেকে বাদ দিয়ে স্কটল্যান্ডকে অন্তর্ভূক্ত করা, বাংলাদেশের অবস্থানকে সমর্থন করে পাকিস্তানের ভারত ম্যাচ বর্জনের সিদ্ধান্ত খালি চোখে ক্রিকেট মাঠের বিষয় মনে হলেও এর সাথে জড়িয়ে আছে জটিল রাজনৈতিক সমীকরণ।
সব মিলিয়ে একটি বিষয় স্পষ্ট তা হলো খেলাধুলা অতীতেও যেমন রাজনীতির বাইরে ছিল না, বর্তমানেও না। খেলা অতীতে বিভিন্ন সময়ে খেলার মাঠের বিনোদন ছাড়িয়ে জাতীয়তাবাদ, দেশপ্রেম, রাজনীতিকে প্রভাবিত করেছে। আবার রাজনীতিও খেলাধুলাকে নিয়ন্ত্রণ করেছে। যা ইতিহাসের নানা পর্ব পেরিয়ে বর্তমানেও চলমান। তাই “খেলার সাথে রাজনীতি মেশাবেন না”- এই নীতিবাক্য শ্রুতিমধুর হলেও ইতিহাসের বাস্তবতায় তা অলীক।
লেখক : সহকারী অধ্যাপক, ইতিহাস।
২৪৩ বার পড়া হয়েছে