সর্বশেষ

জাতীয়শেষ হয়েছে নির্বাচনী প্রচারণা, ১২ ফেব্রুয়ারি ভোটগ্রহণ
নির্বাচন উপলক্ষে মোটরসাইকেলে ৭২ ঘণ্টার নিষেধাজ্ঞা
সারাদেশলক্ষ্মীপুরে আলাদা গণমিছিলে ২ কর্মীর মৃত্যু, বিএনপি–জামায়াত নেতাকর্মীদের মাঝে শোক
হাওরাঞ্চলের দুর্গম ও অতিঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রে নেয়া হয়েছে বাড়তি নিরাপত্তা
ভোটের ছুটিতে সাভার শিল্পাঞ্চল ফাঁকা, বাড়তি যাত্রীর চাপ মহাসড়কে
পাবনায় দুই বাসের সংঘর্ষে নিহত ২, আহত অন্তত ১০
পাথরঘাটায় যৌথ অভিযানে শীর্ষ সন্ত্রাসী বাতেন গ্রেফতার
আন্তর্জাতিকম্যান্ডেলসন–কাণ্ডে পদত্যাগের চাপে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার
খেলা১৫ ফেব্রুয়ারি কলম্বোতে ভারতের বিপক্ষে ম্যাচটি খেলবে পাকিস্তান দল
মতামত

ক্ষমতার অক্টোপাস: রাষ্ট্র দখল ও আমজনতার নাভিশ্বাস

ড. মাহরুফ চৌধুরী
ড. মাহরুফ চৌধুরী

মঙ্গলবার, ১০ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ৩:৪২ পূর্বাহ্ন

শেয়ার করুন:
বাংলাদেশ নামক ভূখণ্ডটি কেবল একটি ভৌগোলিক রাষ্ট্র নয়; এটি ইতিহাসের দীর্ঘ পথচলা, অগণিত রক্তদান, ত্যাগ ও এক ন্যায়ভিত্তিক ভবিষ্যতের স্বপ্নে বিভোর জনগোষ্ঠীর সমষ্টিগত আত্মপরিচয়ের রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষার বহির্প্রকাশ।

ভাষা আন্দোলন থেকে মুক্তিযুদ্ধ- ইতিহাসের প্রতিটি পর্বে এই ভূখণ্ডে রাষ্ট্র গঠনের চেয়ে বড় ছিল জনগণের আকাঙ্ক্ষা ও মানবিক মর্যাদার দাবি। কিন্তু ইতিহাসের নির্মম পরিহাস হলো, যে রাষ্ট্র গড়ে উঠেছিল জনগণের স্বার্থ রক্ষার অঙ্গীকার নিয়ে, সেই রাষ্ট্র আজ আর প্রকৃত অর্থে জনগণের হাতে নেই।

 

এটি ক্রমশ পরিণত হয়েছে এমন এক বন্দী কাঠামোতে, যার নিয়ন্ত্রণ চলে গেছে এক ক্ষমতালোভী অক্টোপাসের হাতে। এই ক্ষমতার অক্টোপাসের এক প্রান্তে রয়েছে রাষ্ট্রযন্ত্রের চারটি তথাকথিত সাংবিধানিক ও প্রাতিষ্ঠানিক হাত- প্রশাসন, বিচার বিভাগ, পুলিশ ও সেনাবাহিনী। তত্ত্বগতভাবে রাষ্ট্রীয় পরিধিতে যাদের দায়িত্ব ছিল নাগরিকের অধিকার রক্ষা, ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা ও রাষ্ট্রকে জনগণের সেবায় নিয়োজিত রাখা, বাস্তবে তারা ক্রমে ক্ষমতার অনুগত যন্ত্রে রূপান্তরিত হয়েছে। অন্য প্রান্তে বিস্তার লাভ করেছে সুবিধাভোগী গোষ্ঠীর চারটি দীর্ঘ, দৃশ্যত রাষ্ট্রযন্ত্র বর্হিভূত অথচ কার্যত রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রক হাত। সেগুলো হলো- রাজনৈতিক গোষ্ঠী, ব্যবসায়ী গোষ্ঠী, মিডিয়া গোষ্ঠী ও তথাকথিত বুদ্ধিজীবী গোষ্ঠী। এই গোষ্ঠীগুলো পারস্পরিক স্বার্থের বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে রাষ্ট্রক্ষমতার চারপাশে এক অদৃশ্য বলয় সৃষ্টি করেছে।

 

ক্ষমতার অক্টোপাসের এই আটটি হাত সম্মিলিতভাবে রাষ্ট্র নামক পরিকাঠামোকে কুক্ষিগত করে এমন এক দখলদারিত্ব প্রতিষ্ঠা করেছে, যেখানে রাষ্ট্র আর নাগরিকের কল্যাণের বাহন নয়, বরং গোষ্ঠীগত স্বার্থসিদ্ধির হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। রাষ্ট্রবিজ্ঞান যাকে ‘রাষ্ট্র দখল’ (স্টেট ক্যাপচার) বলে চিহ্নিত করে, বাংলাদেশে তারই এক নগ্ন বাস্তবতা দেখা যায় যেখানে নীতি, আইন ও প্রতিষ্ঠান জনগণের প্রয়োজন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে কেবল ক্ষমতাশালী গোষ্ঠীর কিছু মানুষের চাহিদা পূরণে ব্যস্ত থাকে। এর ফলে রাষ্ট্রযন্ত্র ধীরে ধীরে নিজের বাইরে আর কিছু ভাবতে অক্ষম হয়ে পড়ে। ফলে জনগণ রাষ্ট্রের কেন্দ্র থেকে সিটকে গিয়ে প্রান্তিক, নিরুপায় ও নির্বাক দর্শকে পরিণত হয়। অথচ বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের রাষ্ট্রযন্ত্রের মৌলিক দর্শন হওয়া উচিত ছিল জনগণের সেবা, ন্যায়বিচার ও মানবিক মর্যাদা রক্ষার প্রাতিষ্ঠানিক নিশ্চয়তা। আধুনিক রাষ্ট্রচিন্তায়, বিশেষ করে ইংরেজ দার্শনিক জন লক (১৬৩২–১৭০৪), সুইস দার্শনিক জঁ-জাক রুশো (১৭১২–১৭৭৮) কিংবা সমকালীন রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের কল্যাণরাষ্ট্রের ধারণা মতে, রাষ্ট্রের বৈধতা নির্ভর করে নাগরিকের সম্মতি ও কল্যাণ নিশ্চিত করার সক্ষমতার ওপর।

 

কিন্তু বাস্তবে বাংলাদেশের রাষ্ট্রযন্ত্র সেই নৈতিক ভিত্তি থেকে ক্রমশ বিচ্যুত হয়ে এক জটিল ক্ষমতার ইন্দ্রজালে পরিণত হয়েছে। এখানে আইন আর রাষ্ট্রীয় পরিমন্ডলে ন্যায় প্রতিষ্ঠার মাধ্যম নয়; বরং শাসকের শোষণ ও নিষ্পেষণকে বৈধতা দেওয়ার অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়। রাষ্ট্রযন্ত্রে ক্ষমতার বিন্যাসে প্রশাসন পরিণত হয়েছে দক্ষতা বা জনসেবার প্রতীক নয়, বরং আনুগত্য ও পদলেহনের মানদণ্ডে উত্তীর্ণ হওয়ার সিঁড়ি। পুলিশ বাহিনী নাগরিকের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা না দিয়ে নিপীড়ন ও ভয় উৎপাদনের কাঠামোতে রূপ নিয়েছে, যেখানে আতঙ্কই সৃষ্টি হয়েছে শাসনের ভাষা। আধুনিক রাষ্ট্রে সেনাবাহিনীর সাংবিধানিক ভূমিকা হলো সীমান্ত ও রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা। কিন্তু সেটি ব্যবহৃত হয় জনগণের বিরুদ্ধে এক ধরনের নীরব হুমকি হিসেবে, যেন সেনাসদস্যদের দৃশ্যমান উপস্থিতিই জনগণকে স্মরণ করিয়ে দেয় রাষ্ট্রের ক্ষমতার সীমাহীনতা। মিশেল ফুকোর (১৯২৬–১৯৮৪) ভাষায়, এটি শারীরিক দমন নয় শুধু, বরং মনস্তাত্ত্বিক শৃঙ্খল আরোপের এক আধুনিক কৌশল। রাষ্ট্রযন্ত্রের এই চার হাতের সঙ্গে যুক্ত হয়ে রাজনৈতিক গোষ্ঠী, যারা ক্ষমতাকে আদর্শ বা জনসেবার বিষয় না রেখে উত্তরাধিকার, লেনদেন ও ব্যক্তিগত সম্পদে পরিণত করেছে। ব্যবসায়ী গোষ্ঠী রাষ্ট্রকে দেখছে একটি উন্মুক্ত বাজার হিসেবে, যেখানে নীতি, আইন ও সিদ্ধান্ত মুনাফার দরে কেনাবেচা হয়।

 

মিডিয়া গোষ্ঠীর একটি বড় অংশ সত্য ও জনস্বার্থের পাহারাদার না হয়ে অর্থ ও ক্ষমতার প্রভাবের কাছে সত্যকে বিক্রি করে দিয়েছে। আর তথাকথিত বুদ্ধিজীবী গোষ্ঠীর উল্লেখযোগ্য অংশ নৈতিক দায় পরিত্যাগ করে ক্ষমতার ছায়ায় আশ্রয় নিয়ে সত্য তুলে ধরার বদলে যুক্তি দিয়ে ক্ষমতাসীনদের অপকর্মের সাফাই গাইছে, ত্রুটি-বিচ্যুতির সমালোচনার বদলে স্তাবকতা আর বিবেকের অনুবর্তী হওয়ার বদলে সুবিধাবাদ বেছে নিয়েছে। ক্ষমতার এই আটটি হাত সম্মিলিতভাবে রাষ্ট্র ও সমাজের প্রতিটি কোষকে অক্টোপাসের মতো চেপে ধরেছে। এর ফলে আমজনতার শ্বাস নেওয়ার জায়গা সংকুচিত হয়ে এসেছে, মুক্তভাবে তাদের ভাবার অবকাশ নেই, প্রশ্ন তোলার সাহস নেই, প্রতিবাদ করার সুযোগ নেই। মানুষ কেবল টিকে থাকার এক নিরন্তর লড়াইয়ে আবদ্ধ; নাগরিক হয়ে ওঠার অধিকার ও সক্ষমতা তার কাছ থেকে ধীরে ধীরে ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে। নাগরিকত্ব এখানে আর রাজনৈতিক অধিকার নয়, বরং নীরব সহনশীলতার এক নিষ্ঠুর প্রশিক্ষণে পরিণত হয়েছে।

 

সুদীর্ঘ সতেরো বছর ধরে নির্যাতন, বঞ্চনা ও অসহায়ত্বের ভার বহন করতে করতে যখন ক্লান্ত জনতা চব্বিশের জুলাই আন্দোলনের মধ্য দিয়ে নতুন করে রাষ্ট্রকে গড়ার স্বপ্ন দেখেছিল, তখন অনেকের মনেই জন্ম নিয়েছিল এই বিশ্বাস, হয়তো এবার জাতির ইতিহাস মোড় নেবে মুক্তির নব দিগন্তে। আন্দোলনের বিস্তার, মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ও পরিবর্তনের উচ্চকণ্ঠ দাবি ইঙ্গিত দিচ্ছিল রাষ্ট্র ও ক্ষমতার সম্পর্ক নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত হবে। কিন্তু খুব অল্প সময়ের মধ্যেই সেই আশাবাদ নির্মম বাস্তবতার মুখোমুখি হয়। দ্রুতই স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, রাষ্ট্র ও সমাজকে চেপে ধরা ক্ষমতার অক্টোপাসের হাতগুলো বাহ্যত ভিন্ন ভিন্ন গোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব করলেও অস্তিত্ব ও স্বার্থের প্রশ্নে তারা আলাদা নয়; বরং প্রয়োজনের মুহূর্তে তারা অবলীলায় গলাগলি করে এক হয়ে যায়। বাংলার প্রবাদে যাকে বলা হয়, ‘সব শিয়ালের একই রা’ তথা ক্ষমতা, সুবিধা ও দায়মুক্তির প্রশ্নে সেই অভিন্ন সুরই তাদের ঐক্যের ভিত্তি।

 

এই বাস্তবতায় পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিসরে জনগণের প্রত্যাশা খুব দ্রুতই ‘আশায় গুড়ে বালি’ হয়ে যায়। রাষ্ট্রীয় পরিমণ্ডলে দৃশ্যমান কিছু রদবদল ঘটলেও কাঠামোগত দখলদারিত্ব অটুট থাকে। যে তিমিরে আমজনতা ছিল, সেই তিমিরেই তারা রয়ে যায়। দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমাদের দেশে শাসকের নাম, মুখ, পোষাক, কিংবা দল বদলায়, কিন্তু শাসনের চরিত্র বদলায় না। রাষ্ট্রের রন্ধ্রে রন্ধ্রে জগদ্দল পাথরের মতো চেপে বসে থাকা স্বৈরাচার বিগত দেড় বছরে আরও দৃঢ় হয়ে ওঠে, যেন এই দখলদারিত্বই রাষ্ট্রের স্বাভাবিক অবস্থা। কোথাও নিস্কৃতির সুস্পষ্ট লক্ষণ বা সম্ভাবনা চোখে পড়ে না। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায়, এটি কেবল ক্ষমতার পালাবদল, রাষ্ট্রের রূপান্তর নয়।

 

কারণ ক্ষমতার কেন্দ্রে থাকা গোষ্ঠীগুলো নিজেদের স্বার্থরক্ষায় এমন এক অদৃশ্য সামাজিক চুক্তিতে আবদ্ধ, যেখানে জবাবদিহিতা, সংস্কার ও ন্যায়বিচার কেবল শ্লোগান হয়ে থাকে। স্বার্থের প্রশ্নে প্রায় সবাই ক্ষমতার ছত্রছায়ায় দাঁড়িয়ে অঘোষিতভাবে বিশ্বাস করে ‘বিচার মানি, কিন্তু তালগাছ আমার’। ন্যায় তখনই গ্রহণযোগ্য, যতক্ষণ তা নিজের সুবিধা ও দায়মুক্তিকে স্পর্শ না করে। এই পরিস্থিতিতে রাষ্ট্র ও সমাজে আমজনতার হায়-হুতাশ বাড়ে, ক্ষোভ জমে, কিন্তু গঠনমূলক বিশেষ কোন পরিবর্তন আসে না।

 

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সতর্ক উচ্চারণ তাই আজ আরও নির্মমভাবে সত্য হয়ে ওঠে, ‘…আমাদের সমাজে, আমাদের স্বভাবে, আমাদের অভ্যাসে, আমাদের বুদ্ধিবিকারে গভীরভাবে নিহিত হয়ে আছে আমাদের সর্বনাশ’। এই সর্বনাশ কেবল শাসকের একক দায় নয়; আমাদের আচরণে, আমাদের আপসকামিতায়, আমাদের সুবিধাবাদে, আমাদের পদলেহনে এবং সর্বোপরি আমাদের নীরব সম্মতিতেই রাষ্ট্রীয় কাঠামোয় এই অক্টোপাসের জন্ম, বিকাশ ও স্থায়ীত্বের কারণ। রাষ্ট্র তাই একদিনে বন্দী হয়নি; বহুদিনের সামাজিক মানসিকতা ও সমষ্টিগত ব্যর্থতার মধ্য দিয়েই সে আজ এই দানবীয় রূপ ধারণ করেছে। এখন প্রশ্ন উঠছে, এই দমবন্ধ করা ক্ষমতার অক্টোপাসের আঁকড়ে ধরা থেকে কি দেশের নাগরিকদের মুক্তি আদৌ সম্ভব? ইতিহাস ও রাষ্ট্রচিন্তার অভিজ্ঞতা বলে, মুক্তি অসম্ভব নয়; তবে তা আপনা-আপনি আসে না, কিংবা কেবল ক্ষমতার পালাবদলের মধ্য দিয়েও আসে না।

 

মুক্তির পূর্বশর্ত হলো আমজনতার রূপান্তর তথা ভুক্তভোগী জনতা থেকে সচেতন, দায়িত্বশীল, সক্রিয় এবং ন্যায়ের পক্ষে ও অন্যায়ের বিপক্ষে লড়াকু নাগরিক হয়ে ওঠা। গণতন্ত্রের প্রাণশক্তি কোনো নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় সীমাবদ্ধ নয়; এটি টিকে থাকে নাগরিকের প্রশ্ন করার অধিকার, প্রতিবাদ করার সাহস এবং অন্যায়ের সঙ্গে আপস না করার মানসিকতায়। এই রূপান্তরের সঙ্গে সঙ্গে বুদ্ধিজীবিতাকেও ফিরে পেতে হবে তার নৈতিক দৃঢ়তা, ন্যায়পরায়ণতা ও সাহস। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, সমাজে পরিবর্তনের বীজ অঙ্কুরিত হয় তখনই, যখন বুদ্ধিবৃত্তিক শ্রেণি ক্ষমতার সান্নিধ্য নয়, সত্যের পক্ষে দাঁড়ায়। একইভাবে, গণমাধ্যমকে আবারও সত্যের ধারক, বাহক ও জনস্বার্থের পাহারাদার হিসেবে ভূমিকা নিতে হবে। কারণ স্বাধীন ও জনস্বার্থে দায়বদ্ধ মিডিয়া ছাড়া কোনো সমাজেই ক্ষমতার জবাবদিহিতা স্থায়ী হয় না। রাজনীতিকেও শিখতে হবে এমন নতুন ভাষা যা ক্ষমতা দখল ও সংরক্ষণের ভাষা নয়, বরং জনসেবা, নীতি ও দায়িত্ববোধের ভাষা।

 

এর পাশাপাশি রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রতিটি স্তরে জবাবদিহির সংস্কৃতি ফিরিয়ে আনা অপরিহার্য। প্রশাসন, বিচার বিভাগ, পুলিশ ও নিরাপত্তা কাঠামোকে আবার জনগণের অধীন প্রতিষ্ঠান হিসেবে পুনর্গঠন না করা গেলে রাষ্ট্রের চরিত্র বদলাবে না। আইনের শাসন তখনই অর্থবহ হয়, যখন আইন শাসকের হাতিয়ার না হয়ে নাগরিকের সুরক্ষার ও আশ্রয়স্থল হয়ে ওঠে। অন্যথায়, রাষ্ট্র কেবল শক্তিশালীই নয়, আরও নিষ্ঠুর ও বেপরোয়া হয়ে ওঠে। এই শর্তগুলো পূরণ না হলে ক্ষমতার এই অক্টোপাস আরও শক্ত, বলবান ও দানবীয় হয়ে উঠবে, তার হাত আরও দীর্ঘ হয়ে সমাজ ও রাষ্ট্রের আরো গভীর থেকে গভীরে প্রবেশ করবে। তখন আমজনতার হায়-হুতাশ কেবল ব্যক্তিগত দীর্ঘশ্বাসে সীমাবদ্ধ থাকবে আর নিরবে, নিবৃতে হাওয়ায় মিলিয়ে যাবে।

 

রাষ্ট্রের কাঠামো অপরিবর্তিত থাকবে, শোষণের চক্র আরও সুসংহত হবে। তাই প্রশ্নটি শেষ পর্যন্ত নৈতিক ও রাজনৈতিক হয়ে উঠলেও তার উত্তর খোঁজা জরুরি হয়ে পড়ে। আমরা কি কেবল নিপীড়নের ইতিহাস লিখে যাব, নাকি নাগরিক হয়ে ওঠার কঠিন দায়িত্ব গ্রহণ করে সেই ইতিহাস বদলানোর ঝুঁকি নেব? সব মিলিয়ে বলা যায়, এক দিকে বাংলাদেশের সংকট কোনো একক সরকার, দল কিংবা ব্যক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি একটি গভীর কাঠামোগত ব্যাধি যা সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছে। রাষ্ট্রযন্ত্র ও সুবিধাভোগী গোষ্ঠীর যোগসাজশে ক্ষমতা একটি আটহাতা অক্টোপাসে রূপ নিয়েছে।

 

ক্ষমতার এই অক্টোপাস যতদিন প্রশ্নহীন আনুগত্য, নীরব সম্মতি ও সুবিধাবাদের পুষ্টি পাবে, ততদিন ক্ষমতার পালাবদল ঘটবে, কিন্তু গণমানুষের ভাগ্য বদলাবে না। ইতিহাস আমাদের শেখায়, রাষ্ট্রযন্ত্রের চরিত্র বদলায় তখনই, যখন নাগরিকেরা ভয়কে অতিক্রম করে দায় গ্রহণ করে এবং অন্যায়ের সঙ্গে আপস না করার সিদ্ধান্ত নেয়। যতীন্দ্রমোহন বাগচীর (১৮৭৮–১৯৪৮) ভাষায় বলতে হয়, ‘ও ভাই, ভয়কে মোরা জয় করিব হেসে,/গোলাগুলির গৌলেতে নয়, গভীর ভালোবেসে’। আজকের বাংলাদেশে তাই আমরা একটি সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে হায়-হুতাশের দীর্ঘশ্বাসে নিজেদেরকে নিঃশেষ করব, নাকি সচেতন নাগরিকত্বের শক্তিতে ‘দায় ও দরদের ভিত্তিতে’ ‘স্বৈরাচারমুক্ত’ ও ‘বৈষম্যহীন’ রাষ্ট্রনির্মাণে ক্ষমতার এই দখলদারিত্ব ভেঙে নতুন রাষ্ট্রচিন্তার পথ রচনা করব। এই প্রশ্নের উত্তর রাষ্ট্রযন্ত্র বা ক্ষমতাকেন্দ্রে নয়, নিহিত আছে আমাদের সামষ্টিক বিবেক, নৈতিক সাহস ও সক্রিয় নাগরিক হয়ে ওঠার সিদ্ধান্তের মধ্যেই।

 

প্রকৃত অর্থে, নিজেদের পরিবর্তনের প্রয়াসের মধ্যে দিয়েই আমাদের রাষ্ট্রযন্ত্রে রূপান্তরের প্রক্রিয়ার সূচনা করতে হবে।

 

লেখক : ভিজিটিং ফ্যাকাল্টি, ইউনিভার্সিটি অব রোহ্যাম্পটন, যুক্তরাজ্য।

১২৪ বার পড়া হয়েছে

শেয়ার করুন:

মন্তব্য

(0)

বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০
বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন
এলাকার খবর

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন














সর্বশেষ সব খবর
মতামত নিয়ে আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০
বিজ্ঞাপন