হারানো দুর্গ পুনরুদ্ধারে মরিয়া বিএনপি, চ্যালেঞ্জে জোটসঙ্গী ও বিদ্রোহী
রবিবার, ৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ৯:১৩ পূর্বাহ্ন
শেয়ার করুন:
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সরগরম হয়ে উঠেছে কুষ্টিয়া-১ (দৌলতপুর) আসন। ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী এবং পদ্মা নদীর চরাঞ্চলবেষ্টিত এই গুরুত্বপূর্ণ জনপদে এবার নির্বাচনী লড়াইয়ে নেমেছেন আটজন প্রার্থী।
তবে ভোটের মাঠে মূল আলোচনা এখন বিএনপি, তাদের দীর্ঘদিনের জোটসঙ্গী জামায়াতে ইসলামী এবং বিএনপির এক বিদ্রোহী প্রার্থীকে ঘিরে।
ঐতিহাসিকভাবে বিএনপির 'শক্ত ঘাঁটি' হিসেবে পরিচিত এই আসনটি গত কয়েক মেয়াদে আওয়ামী লীগের দখলে থাকলেও, এবার তা পুনরুদ্ধারে আটঘাট বেঁধে নেমেছে ধানের শীষের নেতাকর্মীরা।
ভোটের মাঠের ত্রিমুখী সমীকরণ বিএনপির স্থানীয় নেতাকর্মীরা মনে করছেন, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ভোট কারচুপির কারণে আসনটি তাদের হাতছাড়া হয়েছিল। এবার সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশে জয়ের ব্যাপারে তারা শতভাগ আশাবাদী। তবে তাদের প্রধান প্রতিপক্ষ হিসেবে মাঠে সক্রিয় রয়েছে জামায়াতে ইসলামী। পাশাপাশি বিএনপির বিদ্রোহী (স্বতন্ত্র) প্রার্থীর উপস্থিতি দলটির জন্য কিছুটা বাড়তি চাপের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিএনপি প্রার্থী রেজা আহমেদ বাচ্চু মোল্লা বলেন, 'বিদ্রোহী প্রার্থী নিয়ে আমরা চিন্তিত নই। বিপুল জনসমর্থন আমাদের সঙ্গে আছে। আমরা সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজিমুক্ত দৌলতপুর গড়তে চাই।'
অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মাওলানা বেলাল উদ্দিন বলেন, 'বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী মাঠে সক্রিয় থাকায় তাদের ভোট ভাগের সম্ভাবনা রয়েছে, যা আমাদের জয়ের পথ সুগম করবে। আমরা নতুন নেতৃত্বের মাধ্যমে নতুন বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যাশা করছি।'
স্বতন্ত্র প্রার্থী নুরুজ্জামান হাবলু মোল্লা তার অবস্থানে অটল থেকে জানান, তিনি কোনো দলের বিরুদ্ধে নন, বরং ব্যক্তির বিরুদ্ধেই তার এই নির্বাচন।
প্রার্থী ও প্রতীক পরিচিতি এই আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন মোট আটজন প্রার্থী: ১. রেজা আহমেদ বাচ্চু মোল্লা (বিএনপি) - ধানের শীষ ২. মাওলানা বেলাল উদ্দিন (জামায়াতে ইসলামী) - দাঁড়িপাল্লা ৩. নুরুজ্জামান হাবলু মোল্লা (স্বতন্ত্র) - মোটরসাইকেল ৪. শাহরিয়ার জামিল (জাতীয় পার্টি) - লাঙ্গল ৫. আমিনুল ইসলাম (ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ) - হাতপাখা ৬. শাহাবুল ইসলাম (গণঅধিকার পরিষদ) - ট্রাক ৭. বদিরুজ্জামান (বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্ট) - মোমবাতি ৮. গিয়াস উদ্দিন (জেএসডি) - তারা
ভোটার পরিসংখ্যান ও তরুণদের ভাবনা ১৪টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত এই বৃহৎ উপজেলায় মোট ভোটার ৪ লাখ ৪ হাজার ৪৭৩ জন।
পুরুষ ভোটার: ২ লাখ ৩ হাজার ৪৭০ জন।
নারী ভোটার: ২ লাখ ১ হাজার ৩ জন।
তরুণ ভোটার (১৮-২৫ বছর): ৬২ হাজার ৯১৯ জন।
তরুণ ভোটাররা জানিয়েছেন, দলীয় পরিচয়ের চেয়ে প্রার্থীর যোগ্যতা ও সততাকে প্রাধান্য দিয়ে তারা ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন।
অতীত নির্বাচনের ফলাফল কুষ্টিয়া-১ আসনে ১৯৯১, ১৯৯৬ ও ২০০১ সালে টানা জয়ী হন বিএনপির আহসানুল হক মোল্লা। ২০০৪ সালের উপনির্বাচনে তার ছেলে রেজা আহমেদ বাচ্চু মোল্লা জয়ী হন। এরপর ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ, ২০১৪ ও ২০২৪ সালে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী এবং ২০১৮ সালে মহাজোট প্রার্থী জয়লাভ করেন।
নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও ঝুঁকি ভৌগোলিকভাবে সীমান্তবর্তী ও চরাঞ্চল হওয়ায় আসনটিকে অত্যন্ত সংবেদনশীল মনে করছে প্রশাসন। মোট ১৩৫টি ভোটকেন্দ্রের মধ্যে ৪৭টি কেন্দ্রকে ‘অধিক গুরুত্বপূর্ণ’ বা ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় নজিরবিহীন ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। কুষ্টিয়া-৪৭ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল রাশেদ কামাল রনি জানান, সীমান্ত এলাকায় অবৈধ অস্ত্র ও চোরাচালান রোধে নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। জানুয়ারি থেকে ১ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত অভিযানে ৯টি আগ্নেয়াস্ত্র, ১৬টি গুলি, ১১টি ম্যাগাজিন ও একটি এয়ারগান উদ্ধারসহ তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
দৌলতপুর উপজেলা রিটার্নিং কর্মকর্তা ও ইউএনও অনিন্দ্য গুহ জানান, সুষ্ঠু নির্বাচনের স্বার্থে জুডিশিয়াল ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সমন্বিতভাবে কাজ করছে।
প্রার্থীরা তাদের প্রচারণায় সীমান্ত অপরাধ দমন, চরাঞ্চলের উন্নয়ন এবং শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতকে শক্তিশালী করার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। এখন দেখার বিষয়, আগামী নির্বাচনে দৌলতপুরের ভোটাররা কার ওপর আস্থা রাখেন।
১৩৫ বার পড়া হয়েছে