মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন রণতরি মোতায়েন: ইরানে সম্ভাব্য হামলা ঘিরে উত্তেজনা
বুধবার, ২৮ জানুয়ারি, ২০২৬ ১:৫৯ পূর্বাহ্ন
শেয়ার করুন:
মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাপক সামরিক উপস্থিতি নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে। বিমানবাহী রণতরি ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনসহ একাধিক যুদ্ধজাহাজ ও ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংসকারী রণতরি মোতায়েন করেছে ওয়াশিংটন। পর্যবেক্ষকদের মতে, এই প্রস্তুতি ইসরায়েলের সঙ্গে যৌথভাবে ইরানের ওপর বড় ধরনের সামরিক অভিযানের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
বিশ্লেষকদের ধারণা, সম্ভাব্য হামলার লক্ষ্য কেবল ইরানের সামরিক বা পারমাণবিক অবকাঠামো নয়; বরং দেশটির রাজনৈতিক নেতৃত্বকে দুর্বল করে সরকার পরিবর্তনের পথ তৈরি করাই হতে পারে মূল উদ্দেশ্য। সাম্প্রতিক সময়ে ইরানে চলমান সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দমন করতে গিয়ে ব্যাপক সহিংসতার অভিযোগ উঠেছে, যেখানে হাজারো নাগরিক নিহত হয়েছেন বলে দাবি করা হচ্ছে।
মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংসকারী রণতরিগুলো এখনো পূর্ণাঙ্গ আক্রমণ অবস্থানে পৌঁছায়নি, তবে ইরানের ওপর হামলা চালানোর সক্ষমতার মধ্যেই রয়েছে। যদিও বিদেশি সামরিক হস্তক্ষেপে ইরানে নতুন করে গণবিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়বে কি না, তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাঁদের মতে, সরকারবিরোধী মনোভাব থাকা সত্ত্বেও অনেক ইরানি বিদেশি শক্তির মাধ্যমে শাসন পরিবর্তনের বিরোধী।
কূটনৈতিক অচলাবস্থার মধ্যেই গত সোমবার ইরানের পুঁজিবাজারে রেকর্ড পতন দেখা গেছে। এ পরিস্থিতিতে সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ কয়েকটি আঞ্চলিক দেশ স্পষ্ট জানিয়েছে, তারা ইরানের বিরুদ্ধে কোনো হামলায় নিজেদের আকাশসীমা বা জলসীমা ব্যবহারের অনুমতি দেবে না। তবে ভূমধ্যসাগরে মার্কিন রণতরির অবস্থানের কারণে তৃতীয় কোনো দেশের অনুমতির প্রয়োজন নাও হতে পারে।
এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র এ অঞ্চলে একটি সামরিক মহড়ার ঘোষণা দিয়েছে। মার্কিন সামরিক বাহিনীর ভাষ্য অনুযায়ী, এই মহড়ার লক্ষ্য হলো যুদ্ধজাহাজ থেকে দ্রুত যুদ্ধবিমান ওঠানামার সক্ষমতা যাচাই করা।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি আগেই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে; তাই এবার হামলার লক্ষ্যবস্তু হতে পারে দেশটির রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা কাঠামো। ইরানের সরকারি তথ্যে বলা হয়েছে, গত মাসে দেশটিতে মূল্যস্ফীতি ৬০ শতাংশে পৌঁছেছে, যা জনঅসন্তোষ আরও বাড়িয়ে তুলছে।
ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সচিব আলী লারিজানি অভিযোগ করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র হামলার আগেই ইরানের সামাজিক ঐক্য ভাঙার চেষ্টা করছে। তাঁর ভাষায়, ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানকে ‘জরুরি অবস্থার’ দিকে ঠেলে দিচ্ছেন, যা কার্যত যুদ্ধেরই শামিল।
মার্কিন বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফের সঙ্গে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির সম্ভাব্য আলোচনার খবরকে ‘ভিত্তিহীন’ বলে প্রত্যাখ্যান করেছে তেহরান। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই জানান, যুক্তরাষ্ট্র যে শর্তগুলো সামনে আনছে—জাতিসংঘের অস্ত্র পরিদর্শক দল ফিরিয়ে আনা, উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম অপসারণ এবং ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি সীমিত করা—তা গ্রহণযোগ্য নয়।
তিনি বলেন, ইরানের সশস্ত্র বাহিনী প্রতিটি সামরিক গতিবিধি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে কোনো আগ্রাসন চালানো হলে তার জবাব হবে ‘সর্বাত্মক ও কঠোর’।
দুই সপ্তাহ আগে ইরানে সরাসরি হামলা থেকে সরে আসেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। বিশ্লেষকদের মতে, সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে সরানোর স্পষ্ট পরিকল্পনা এবং ইরানের পাল্টা হামলা মোকাবিলায় ইসরায়েলকে রক্ষার পূর্ণ প্রস্তুতি না থাকায় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তবে বিক্ষোভকারীদের সহায়তার প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন না হওয়ায় অনেক ইরানির মধ্যেই হতাশা তৈরি হয়েছে।
৯ কোটির বেশি জনসংখ্যার ইরানে শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের বাস্তবতা নিয়েও মার্কিন প্রশাসনের ভেতরে মতভেদ স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
ইরান পরিস্থিতির প্রভাব ইউরোপীয় রাজনীতিতেও পড়েছে। ইতালির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্তোনিও তাজানি জানিয়েছেন, তিনি ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্র বিষয়ক কাউন্সিলে ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি)কে নিষিদ্ধ সংগঠন হিসেবে তালিকাভুক্ত করার প্রস্তাব তুলবেন।
১৪৯ বার পড়া হয়েছে