"কোকো": একটি নামের বহুমাত্রিক তাৎপর্য
বুধবার, ২১ জানুয়ারি, ২০২৬ ৪:৪৮ পূর্বাহ্ন
শেয়ার করুন:
"কোকো" - এই ছোট্ট শব্দটি বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে কত কী অর্থই না বহন করে।
প্রকৃতির অপরূপ এক পাখি সারস জাপানে "কোকো" নামে পরিচিত। শুধু তাই নয়, জাপান, আমেরিকা এবং আফ্রিকার কিছু সংস্কৃতিতে "কোকো" শব্দটি সৌভাগ্যবান, সৌভাগ্যের রাত, এমনকি একাকিত্বের নীরব সঙ্গীরূপেও ব্যবহৃত হয়। ইতিহাসের পাতায় জাপানের এক সম্রাট এবং আফ্রিকার নেমবি রাজ্যের এক রাজার নামও ছিলো "কোকো"।
কিন্তু বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে, এই "কোকো" নামটি আমাদের হৃদয়ে গভীর একটি শোক ও মর্যাদার পরিচয় বহন করে। এ নামে যিনি পরিচিত ছিলেন, তিনি হলেন শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের কনিষ্ঠ পুত্র আরাফাত রহমান কোকো। বাবা-মা আদর করে যাকে "কোকো" বলেই ডাকতেন। নামের অর্থের মতোই তিনি ছিলেন নিরহঙ্কার, নিজস্ব জগতে মগ্ন ও গণমাধ্যমের আলো থেকে দূরে থাকতে পছন্দ করা একজন মানুষ। তার মা দেশের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন, তবুও কখনোই মায়ের প্রভাব কিংবা পদবীর ছায়া ব্যবহার করে রাষ্ট্রীয় কোনো সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করেননি—এটা বলতে গেলে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি বিরল দৃষ্টান্ত।
একবার রাজশাহীতে এসে তিনি বিশ্ববিদ্যালয় ও মহানগর নেতাদের দেয়া বিশাল সংবর্ধনার প্রস্তাব নম্রতায় ফিরিয়ে দিয়েছিলেন, যা তখনকার অনেক ছাত্র হিসেবে আমাদের কাছে এক অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হয়ে রয়েছে।
কিন্তু এই নিভৃতচারী, অরাজনৈতিক মানুষটিকেই একসময় করতে হয়েছিলো রাজনৈতিক প্রতিহিংসার নির্মম শিকার। দীর্ঘ রিমান্ড ও নির্যাতনে তার স্বাস্থ্য ভেঙে পড়ে। শেষ পর্যন্ত ২০১৫ সালে, চিকিৎসাধীন অবস্থায়, আমাদের সকলকে কাঁদিয়েই তিনি চলে গেলেন না ফেরার দেশে।
এত কিছুর পরও আজ আমরা দেখছি এক মর্মান্তিক দৃশ্য। একজন স্বঘোষিত ‘মুফতি’ উপাধিধারী ব্যক্তি, যিনি অতীতে ভারতীয় এক অভিনেত্রীর রূপে বিমোহিত হয়ে তার দিকে তাকাতে অনুসারীদের উস্কে দিয়েছিলেন, যিনি খালেদা জিয়ার কারাজীবন নিয়েও ব্যঙ্গ করেছিলেন— সেই একই ব্যক্তি আজ মৃত, নিরীহ আরাফাত রহমান কোকোকে নিয়ে নিন্দনীয় ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ করছেন। তার মাহফিলগুলোর একটি বড় অর্থায়নই আসে কিছু বিভ্রান্ত মানুষের চাঁদা থেকে, যারা হয়তো জানেই না তাদের টাকা দিয়ে কী শেখানো হচ্ছে।
একজন মৃত মানুষ, বিশেষ করে যিনি কখনোই রাজনীতি কিংবা বিতর্কের মাঝে যাননি, তার প্রতি এমন ধৃষ্টতাপূর্ণ আচরণ শুধু নীতিহীনতাই নয়, এটি মানবিকতা ও ধর্মীয় মূল্যবোধের চরম অবমাননা। গীবত, পরচর্চা আর উপহাসকে যিনি ‘শিক্ষা’ বলে চালাতে চান, তিনি প্রকৃতপক্ষে আমাদের সমাজের নৈতিক ভিত্তিকেই দুর্বল করছেন।
আরাফাত রহমান কোকো ছিলেন একজন সৌভাগ্যবান পুত্র, কিন্তু তার জীবনদশা ছিলো ট্রাজেডিতে ভরা। তার মৃত্যু ছিলো আমাদের সকলের জন্য একটি বেদনাদায়ক অধ্যায়। সেই মৃত মানুষটির প্রতি সামান্য শ্রদ্ধা না দেখিয়ে, তার নাম নিয়ে বিদ্রূপ করা — এটি কোনো সভ্য, ধার্মিক বা নীতিবান সমাজে গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
মৃত ব্যক্তির স্মৃতিকে সসম্মানে স্মরণ করা আমাদের সংস্কৃতি ও ধর্মের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। আসুন, আমরা সকলেই এই গর্হিত কাজের প্রতিবাদ জানাই এবং মানবিক মূল্যবোধ ও শ্রদ্ধাবোধকে সমুন্নত রাখি।
লেখক : গবেষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।
১২০ বার পড়া হয়েছে