মার্চে শুরু হচ্ছে পদ্মা ব্যারাজ: ফারাক্কা সংকটে বাংলাদেশের কৌশলগত জবাব
বুধবার, ২১ জানুয়ারি, ২০২৬ ২:৪৯ পূর্বাহ্ন
শেয়ার করুন:
ছয় দশকের বেশি সময় ধরে আলোচনা ও সম্ভাব্যতা সমীক্ষায় আটকে থাকা পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প অবশেষে বাস্তবায়নের পথে এগোচ্ছে। বহুল আলোচিত এ প্রকল্পটি দুই ধাপে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার, যেখানে প্রথম ধাপের আনুমানিক ব্যয় ধরা হয়েছে ৩৪ হাজার ৬০৮ কোটি টাকা—পুরোটাই নিজস্ব অর্থায়নে।
সম্প্রতি পরিকল্পনা কমিশনে অনুষ্ঠিত প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভায় পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণের প্রস্তাব নীতিগতভাবে পর্যালোচনা করা হয়। কৃষি, পানি সম্পদ ও পল্লী প্রতিষ্ঠান বিভাগ–সংক্রান্ত সদস্য মোস্তাফিজুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে শুরুতে প্রস্তাবিত ৫০ হাজার ৪৪৩ কোটি ৬৪ লাখ টাকার প্রকল্পকে দুই ধাপে ভাগ করে বাস্তবায়নের সুপারিশ করা হয়। প্রথম ধাপে ব্যারাজের মূল কাঠামো, নদী প্রশিক্ষণ, পানি সংরক্ষণ ও সংশ্লিষ্ট অবকাঠামোর কাজ রাখা হয়েছে, আর দ্বিতীয় ধাপে অতিরিক্ত সেচ–কমান্ড এলাকা ও সহায়ক উন্নয়ন কার্যক্রম নেওয়া হবে।
বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) প্রস্তাব অনুযায়ী, রাজবাড়ী অঞ্চলের পাংশা পয়েন্টের কাছে পদ্মা নদীর ওপর প্রায় ২ দশমিক ১ কিলোমিটার দীর্ঘ এই ব্যারাজ নির্মাণ করা হবে। এতে ৭৮টি স্পিলওয়ে গেট, ১৮টি আন্ডার–স্লুইস গেট, ১৪ মিটার প্রশস্ত নেভিগেশন লক এবং মাছের চলাচলের জন্য দুটি ফিশ পাস থাকবে। ব্যারাজের ওপর দিয়ে সড়ক ও রেল–সংযোগের সুবিধা রাখার প্রস্তাবও ডিপিপিতে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে, যা দক্ষিণ–পশ্চিমাঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থাকে নতুন মাত্রা দিতে পারে।
প্রকল্পের আওতায় শুষ্ক মৌসুমে প্রায় ২ হাজার ৯০০ মিলিয়ন ঘনমিটার পানি রিজার্ভে ধরে রাখা এবং ন্যূনতম ৫৭০ ঘনমিটার/সেকেন্ড পানি বিভিন্ন শাখা–নদীতে ছাড়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এর মাধ্যমে গড়াই–মধুমতী, হিসনা–মাথাভাঙ্গা, চন্দনা–বারাশিয়া, ইছামতি, বোরালসহ দক্ষিণ–পশ্চিমাঞ্চলের একাধিক নদী ব্যবস্থায় সারা বছর নৌ– ও সেচ–যোগাযোগ সচল রাখার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে প্রায় ১৯ লাখ হেক্টর জমিতে নতুন বা স্থায়ী সেচ সুবিধা সৃষ্টি হবে, যা গঙ্গা–নির্ভর ২৬ জেলার কৃষি–অর্থনীতিতে বড় ধরনের ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
ফারাক্কা ব্যারাজ–পরবর্তী সময়ে পদ্মা অববাহিকায় শুষ্ক মৌসুমে পানির প্রাপ্যতা কমে যাওয়ায় দক্ষিণ–পশ্চিমাঞ্চলে লবণাক্ততা বৃদ্ধি, নাব্যতা হ্রাস ও সুন্দরবনের ইকোসিস্টেমে চাপ তৈরি হয়েছে বলে বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে। পাউবোর ধারণা, পদ্মা ব্যারাজের মাধ্যমে বাড়তি স্বাদুপানি সরবরাহ করা গেলে সুন্দরবনে প্রয়োজনীয় মিঠাপানির প্রবাহ ফিরিয়ে আনা, খুলনা–সাতক্ষীরা অঞ্চলে লবণাক্ততা কমানো এবং উপকূলের পোল্ডার এলাকায় দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা নিরসনে সহায়ক ভূমিকা রাখবে এই প্রকল্প।
পিইসি সভায় প্রথম ধাপের ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট প্রপোজাল (ডিপিপি) কিছু সংশোধন–সংযোজনের সুপারিশ করে একনেক সভায় তোলার প্রস্তুতি নিতে বলা হয়েছে। একনেক অনুমোদন পেলেই নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণের কাজ শুরু করার মাধ্যমে দক্ষিণ–পশ্চিমাঞ্চলের দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটিয়েই দেশ নতুন আরেকটি মেগা–হাইড্রোলজিকাল প্রকল্পের পথে এগোবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট, লেখক
১২১ বার পড়া হয়েছে