গণভোটের প্রচারে ‘ভোটের রিকশা’: শব্দদূষণ নিয়ে প্রশ্ন
মঙ্গলবার, ২০ জানুয়ারি, ২০২৬ ৫:২১ অপরাহ্ন
শেয়ার করুন:
তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান আজ মঙ্গলবার (২০ জানুয়ারি ২০২৬) সকালে ঢাকার সাভারের রেডিও কলোনি এলাকায় গণভোটের প্রচারের জন্য ‘ভোটের রিকশা’ কার্যক্রমের উদ্বোধন করেছেন।
সরকারি এই কর্মসূচির অংশ হিসেবে বিশেষভাবে সাজানো রিকশাগুলোর মাধ্যমে এলাকায় ঘুরে গণভোটের পক্ষে প্রচার চালানো হবে।
আয়োজক সূত্রে জানা গেছে, ‘ভোটের রিকশা’ কর্মসূচিতে ব্যবহৃত রিকশাগুলোতে চোঙ্গা মাইক ও বিশেষ ধরনের লাউডস্পিকার লাগানো হয়েছে। এসব রিকশা রেডিও কলোনি ও আশপাশের বিভিন্ন সড়ক ও গলিতে ঘুরে গণভোট সম্পর্কিত প্রচারণামূলক বার্তা, স্লোগান ও তথ্য প্রচার করবে। প্রচারণার এই ধরনকে আয়োজকরা বলছেন, ভোটারদের বাড়ি–বাড়ি গিয়ে সরাসরি সচেতন করার একটি “নবীন উদ্যোগ”।
কিন্তু এখানেই শুরু হয়েছে নতুন বিতর্ক। পরিবেশবাদী ও নাগরিক সমাজের একটি অংশ প্রশ্ন তুলছেন—এই ধরনের শব্দনির্ভর প্রচারণা কি নগরবাসীর জন্য আরেক দফা শব্দদূষণের উৎস নয়? তাদের বক্তব্য, জনবহুল এলাকায় সারাদিন ধরে চোঙ্গা মাইক ও শক্তিশালী লাউডস্পিকারে বার্তা প্রচার করলে আশপাশের বাসিন্দা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, অসুস্থ মানুষ ও শিশুদের জন্য তা নিদারুণ ভোগান্তি তৈরি করতে পারে।
সমালোচকদের অনেকে আরও মনে করছেন, যিনি সরকারের উপদেষ্টা হিসেবে তথ্য ও সম্প্রচার খাতের নীতিনির্ধারণে যুক্ত, তাঁর উপস্থিতিতে এমন শব্দদূষণ সৃষ্টিকারী প্রচারণা উদ্বোধন হওয়াটা নীতিগতভাবে বিতর্কিত। পরিবেশ রক্ষা, শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণ, জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি কমানোর কথা যখন সরকারি নীতিতে বারবার উচ্চারিত হচ্ছে, তখন সেই সরকারেরই একজন উপদেষ্টার পৃষ্ঠপোষকতায় উচ্চ শব্দের প্রচারণা অনেকের কাছে দ্বিমুখী বার্তা হিসেবে প্রতিভাত হচ্ছে।
স্থানীয়দের একাংশ মনে করিয়ে দিচ্ছেন, ঢাকার আশপাশের এলাকায় বহুদিন ধরেই নির্বাচনী মাইকিং, ধর্মীয় অনুষ্ঠান, বিয়ে–শাদি ও বিভিন্ন সামাজিক আয়োজনে লাউডস্পিকারের অতিরিক্ত ব্যবহার মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে বিঘ্নিত করছে। দিন-রাতের যে কোনো সময় উচ্চ শব্দে মাইক বাজানোর এই প্রবণতা শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থ মানুষের জন্য বাড়তি ঝুঁকি তৈরি করছে। গণভোট উপলক্ষে ‘ভোটের রিকশা’ কর্মসূচি যদি নিয়ন্ত্রিত ডেসিবেল, নির্দিষ্ট সময়সীমা ও আইনি বিধিনিষেধ মান্য না করে চলে, তবে তা নতুন করে ক্ষোভ ও অসন্তোষের জন্ম দিতে পারে।
গত দেড় বছরে বায়ুদূষণ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, নদী দখল বা সবুজ এলাকা রক্ষায় দৃশ্যমান কোনো সাফল্য পরিবেশ উপদেষ্টার পক্ষ থেকে সামনে আসেনি। অথচ গণভোটের প্রচারণায় শব্দদূষণ বাড়ানোর ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও রিকশার ওপর মাইক বসিয়ে প্রচারণার উদ্বোধন করায় তাদের কাছে বিষয়টি ‘পরিবেশনীতি ও বাস্তবতার স্পষ্ট বৈপরীত্য’ হিসেবে দেখা দিচ্ছে। তারা মনে করেন, এমন পদক্ষেপ পরিবেশবান্ধব গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার বদলে উল্টো পরিবেশের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করবে।
আধুনিক ও উন্নত অনেক দেশে জনসমক্ষে প্রচারণা চালানো হলেও সেখানে শব্দনিয়ন্ত্রণের কড়া বিধি মানতে হয়। নির্দিষ্ট সময়ের বাইরে এবং নির্দিষ্ট ডেসিবেলের বেশি শব্দে মাইক, লাউডস্পিকার বা সাউন্ড সিস্টেম ব্যবহারকে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হয়। ফলে রাস্তাঘাট, আবাসিক এলাকা বা হাসপাতাল–স্কুলের আশপাশে প্রচারণার নামে উচ্চ শব্দে মাইক বাজানোকে সেখানে সাধারণভাবে গ্রহণযোগ্য আচরণ হিসেবে দেখা হয় না।
গণভোটের মতো গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া নিয়ে প্রচারণা চালানো অবশ্যই জরুরি, কিন্তু সেই প্রচারণা কতটা পরিবেশবান্ধব ও নাগরিক-বান্ধব হবে, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। তাদের প্রশ্ন, ভোটের তথ্য পৌঁছাতে গিয়ে যদি সাধারণ মানুষের নীরবতা ও স্বস্তি কেড়ে নেওয়া হয়, তবে এই ধরনের প্রচার কার্যক্রম শেষ পর্যন্ত গণতান্ত্রিক চর্চাকে শক্তিশালী করবে, নাকি জনঅসন্তোষ বাড়াবে—এখনই সেই প্রশ্নের জবাব খোঁজার সময়।
লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্ট।
১১৯ বার পড়া হয়েছে