বাংলার আসল ঘোড়া
দেড়শ' বছরের ঐতিহ্যবাহী ঘোড়দৌড় ও গ্রামীণ মেলা
সোমবার, ১২ জানুয়ারি, ২০২৬ ৬:৪০ পূর্বাহ্ন
শেয়ার করুন:
মাগুরার মহম্মদপুর উপজেলার বালিদিয়া ইউনিয়নের বড়রিয়া গ্রাম আবারও রঙিন উৎসবে মেতে উঠেছে। শীতের কুয়াশা ভেদ করে রোদের উষ্ণতা মাটিতে পড়তেই শুরু হয়েছে তিন দিনব্যাপী ঐতিহ্যবাহী বড়রিয়া ঘোড়দৌড় ও গ্রামীণ মেলা।
বাংলা ২৯ পৌষ উপলক্ষে আজ সোমবার থেকে শুরু হওয়া এই আয়োজন প্রায় দেড়শ বছরের পুরোনো, যা কেবল বিনোদনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়- এটি ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মানুষের মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে।
প্রতিবছরের মতো এবারও দুপুর ২টা থেকে বড়রিয়া মাঠে শুরু হয় বহু প্রতীক্ষিত ঘোড়দৌড়। মাঠের চারপাশে ভিড় করেন হাজারো দর্শক। শিশুদের কৌতূহলী চোখ, প্রবীণদের স্মৃতিচারণ আর দর্শকদের উচ্ছ্বাসে পুরো এলাকা উৎসবমুখর হয়ে ওঠে। ছুটে চলা ঘোড়ার টগবগ শব্দের সঙ্গে মিশে যায় করতালি ও উল্লাসধ্বনি। স্থানীয়দের কাছে এই ঘোড়দৌড় শুধুমাত্র একটি প্রতিযোগিতা নয়, এটি বড়রিয়া গ্রামের মানুষের আবেগ ও আত্মার প্রতিফলন।
মেলার পরিসরও চোখে পড়ার মতো। প্রায় দুই কিলোমিটার এলাকা জুড়ে বসেছে সারি সারি দোকান। কোথাও রঙিন খেলনা, কোথাও মিষ্টান্নের সম্ভার, আবার কোথাও মাছ ও নানা ধরনের খাবার। শিশুদের জন্য রয়েছে দোলনা, নাগরদোলা ও বিভিন্ন রাইড। পুরো মেলাজুড়ে বিরাজ করছে আনন্দ-উচ্ছ্বাস, যা প্রমাণ করে এটি শুধু কেনাবেচার স্থান নয়, বরং মানুষের হৃদয়ের মিলনমেলা।
মেলার দ্বিতীয় দিনে অনুষ্ঠিত হয় বিশেষ আরেকটি আয়োজন, যা স্থানীয়ভাবে পরিচিত ‘জামাই মেলা’ নামে। এদিন এলাকার কন্যাদের জামাইরা শ্বশুরবাড়িতে আসেন। মেলাজুড়ে বড় বড় মাছ ও বালিশ মিষ্টি কেনাকে কেন্দ্র করে তৈরি হয় বাড়তি উৎসাহ। কে কত বড় মাছ কিনলো, তা নিয়ে চলে নীরব প্রতিযোগিতা। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই জামাই মেলা স্থানীয় সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়েছে।
মেলার ইতিহাস সম্পর্কে আয়োজক কমিটির সভাপতি শাহজাহান সরদার জানান, প্রায় দেড়শ বছর আগে তাদের পূর্বপুরুষ শানু সরদার, ধনাউল্লাহ সরদার ও সোনাউল্লা সরদার এই ঐতিহ্যের সূচনা করেন। সে সময় গ্রাম্য কাঁচা রাস্তায় ঘোড়দৌড় অনুষ্ঠিত হতো। পরবর্তীতে রাস্তায় ইটের সোলিং ও পাকা সড়ক নির্মিত হলে দৌড় স্থানান্তরিত হয় গ্রামের মাঠে। তবে সময়ের পরিবর্তনে মানুষের আগ্রহ কমেনি; বরং প্রতিবছর তা বেড়েছে। আশপাশের গ্রামগুলোর মানুষও এই মেলাকে নিজেদের উৎসব হিসেবে গ্রহণ করেছে।
মেলায় দোকানিদের উপস্থিতিও উল্লেখযোগ্য। মাগুরা জেলার বিভিন্ন উপজেলা ছাড়াও নড়াইল, ফরিদপুর, গোপালগঞ্জ, রাজবাড়ী, কুষ্টিয়া, ঝিনাইদহ ও বাগেরহাটসহ বিভিন্ন জেলা থেকে ব্যবসায়ীরা এসেছেন। কেউ এনেছেন কাঠের আসবাবপত্র, কেউ ঘর সাজানোর সামগ্রী, কেউবা বাহারি পোশাক ও খেলনা। আয়োজক কমিটির আশা, চলতি বছর মেলায় প্রায় ১০ কোটি টাকার বেচাকেনা হবে, যা এই মেলার অর্থনৈতিক গুরুত্বকেও স্পষ্ট করে।
ঘোড়দৌড়ই এই মেলার মূল আকর্ষণ। গত বছর আশপাশের ছয়টি জেলা থেকে ১৯টি ঘোড়া অংশ নেয়। এবার সেই সংখ্যা ২০ ছাড়িয়ে যাবে বলে আশা করা হচ্ছে। প্রতিটি ঘোড়ার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে মালিকের স্বপ্ন, জকিরের দক্ষতা এবং দর্শকদের উত্তেজনা। দৌড় শুরুর মুহূর্তে পুরো মাঠ যেন নিস্তব্ধ হয়ে যায়, আর মুহূর্ত পরেই ঘোড়ার দুরন্ত গতিতে সেই নীরবতা ভেঙে পড়ে।
তিন দিনব্যাপী এই গ্রামীণ মেলা বড়রিয়া গ্রামকে দেয় এক ভিন্ন রূপ। দিনভর কেনাবেচা, সন্ধ্যায় আলোর ঝলকানি, আর রাতের হাওয়ায় ঝিঝিপোকার শব্দের সঙ্গে মানুষের কোলাহল মিলেমিশে তৈরি করে এক নস্টালজিক আবহ। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে মানুষ এখানে এসে স্মৃতি সঞ্চয় করে ফিরে যায়।
বড়রিয়া গ্রামের এই মেলা তাই শুধুই একটি আয়োজন নয়; এটি সময়কে ছুঁয়ে থাকা এক জীবন্ত ঐতিহ্য। উৎসব শেষে মাঠ নীরব হয়ে গেলেও মানুষের হৃদয়ে বড়রিয়া মেলার রেশ থেকে যাবে বহুদিন।
১২২ বার পড়া হয়েছে