সর্বশেষ

জাতীয়ইসিতে চলছে মনোনয়নপত্র বাতিলের বিরুদ্ধে শেষ দিনের আপিল
পাবনা-১ ও ২ আসনে ভোট কার্যক্রম স্থগিত
ট্রলারের ধাক্কায় পাইপলাইন ক্ষতিগ্রস্ত, ঢাকায় তীব্র গ্যাস সংকট
সারাদেশনাটোরের সিংড়ায় বিএনপি নেতা কুপিয়ে আহত: ধানের শীষের প্রার্থী আনুসহ ২০ জনের বিরুদ্ধে মামলা
যশোরে শীতের তীব্র প্রভাব: এক দিনে ১০ জনের মৃত্যু
রংপুর ও রাজশাহীতে শৈত্যপ্রবাহের প্রভাবে কুয়াশা ও শুষ্ক আবহাওয়া থাকবে
কুতুবদিয়ায় ট্রলারডুবি: দুই জেলের মরদেহ উদ্ধার
মীরসরাইয়ে সড়ক দুর্ঘটনা, নৌবাহিনীর সদস্যসহ নিহত ৩
পটুয়াখালীর প্রবীণ সাংবাদিক জাহিদুল ইসলাম রিপন আর নেই
আন্তর্জাতিকপাকিস্তানে ৫.৮ মাত্রার ভূমিকম্প, আতঙ্ক ছড়াল দেশজুড়ে
ইরানে বিক্ষোভের মাঝে ট্রাম্পের কঠোর হুঁশিয়ারি
ফিলিপিন্সে বর্জ্যস্তূপ ধসে নিহত ১, নিখোঁজ ৩৮
খেলাসুপার কাপের ফাইনালে বার্সেলোনা, বিলবাওকে ৫–০ গোলে বিধ্বস্ত করল ফ্লিকের শিষ্যরা
মতামত

এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের পথচলার গল্প

প্রফেসর ড. আবুল হাসান মুহাম্মদ সাদেক
প্রফেসর ড. আবুল হাসান মুহাম্মদ সাদেক

বৃহস্পতিবার , ৮ জানুয়ারি, ২০২৬ ১০:৩২ পূর্বাহ্ন

শেয়ার করুন:
একটি স্বপ্ন, দীর্ঘ সংগ্রাম ও নৈতিক মূল্যবোধকে কেন্দ্র করেই এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের পথচলা। এই প্রতিষ্ঠান কেবল শিক্ষাদানেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং মানুষ গড়ার দৃঢ় অঙ্গীকার নিয়ে নিরবচ্ছিন্নভাবে এগিয়ে চলেছে। গৌরবময় ৩০ বছর পূর্তি উপলক্ষে দীর্ঘ বক্তৃতা প্রদান করেন এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা ও প্রতিষ্ঠাতা উপাচার্য প্রফেসর ড. আবুল হাসান মুহাম্মদ সাদেক। সেই বক্তব্যের মূল অংশ অপরিবর্তিত রেখে এখানে উপস্থাপন করা হলো। পুরো বক্তব্যটি সম্পাদনা করেছেন সাংবাদিক রনজক রিজভী।

আমরা আজ সেই স্বপ্নের বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে দাঁড়িয়ে আছি। এই অর্জন যদি সামান্যও সফলতা হয়ে থাকে, তবে আমি এখানে সেই শিক্ষাটিই উচ্চারণ করতে চাই- যা সফলতার মুহূর্তে আল্লাহ আমাদের শিখিয়েছেন। পবিত্র কুরআনের সূরা নাসরে আল্লাহ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে উদ্দেশ করে বলেছেন- যখন তোমার কাছে সাহায্য আসে, বিজয় আসে এবং তুমি সফল হও, তখন তিনটি কাজ করো।

প্রথমত- বিনয়। সফলতার আনন্দে উচ্ছ্বসিত হয়ে লাফালাফি নয়; বরং বিনয়ে মাথা নত করো।

দ্বিতীয়ত- শুকরিয়া আদায়। এই সফলতা শুধু তোমার নিজের জন্য বা শুধু তোমার চেষ্টার ফল নয়; এটি আল্লাহর সাহায্যে অর্জিত। তাই তাঁর প্রশংসা করো, কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করো।

তৃতীয়ত- ক্ষমা প্রার্থনা। কারণ চলার পথে ভুল-ত্রুটি হয়ে যেতে পারে। মানুষ মাত্রই ভুলের ঊর্ধ্বে নয়।

আমি সেই বিনয়, সেই প্রশংসা এবং সেই ক্ষমা প্রার্থনার ডালি নিয়ে আজ আপনাদের সামনে উপস্থিত হয়েছি। আল্লাহর কাছে বিনম্র শ্রদ্ধা নিবেদন করছি, তাঁর পবিত্রতার ঘোষণা করছি এবং বলছি- আলহামদুলিল্লাহ। আমার সঙ্গে আপনারাও বলুন- আলহামদুলিল্লাহ। আলহামদুলিল্লাহ, এ সবই আল্লাহর দান।

আমি গভীর কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করছি সেই টিমকে, সহকর্মীবৃন্দকে- যাঁরা নিবেদিত প্রাণ হয়ে দিনরাত পরিশ্রম করেছেন। দিনরাতের নিরলস পরিশ্রম ছাড়া কোনো মহান কাজ বা বড় অর্জন সম্ভব নয়। যাঁরা পরিশ্রম করেছেন, তাঁদের সবাইকে আমি আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই।

আমি ধন্যবাদ জানাই এই সমাজের আপামর জনতাকে, দেশবাসীকে, সরকারকে এবং উপস্থিত সকল সুধীবৃন্দকে- যাঁদের সহযোগিতা ও সদিচ্ছা আমরা বিভিন্নভাবে পেয়েছি।

এরপর তৃতীয় বিষয়- ক্ষমা প্রার্থনা। আমি আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইছি; কারণ নিশ্চয়ই আমাদের কাজের পথে অনেক ভুল-ত্রুটি হয়েছে। ভুল মানুষেরই হয়। পাশাপাশি আপনাদের সকলের কাছেও বিনীতভাবে ক্ষমা প্রার্থনা করছি।

আজ আমাদের এই পথচলার প্রায় ত্রিশ বছর পূর্ণ হয়েছে। বলা হয়েছে- এই দীর্ঘ যাত্রার ইতিহাস বলতে। কিন্তু এত দীর্ঘ ইতিহাস অল্প কথায় বলা সম্ভব নয়। তাই আমি শুধু দু-একটি কথা সংক্ষেপে বলার চেষ্টা করছি।

প্রথম কথা হলো- I had a dream। আমার একটি স্বপ্ন ছিল। শুধু একটি স্বপ্ন নয়- স্বপ্নের ভেতরেই ছিল আরেক স্বপ্ন। এই স্বপ্নের একটি প্রেক্ষাপট আছে, একটি সৃষ্টি আছে; আছে তার জন্য নিরন্তর প্রচেষ্টা, ব্যর্থতা, চ্যালেঞ্জ এবং অবশেষে সাফল্য। সেই স্বপ্ন সম্পর্কে খুব সংক্ষেপে দু-একটি কথা বলতে চাই।

প্রথমেই বলি প্রেক্ষাপটের কথা। আমি নরসিংদী জেলার একটি অজপাড়া গাঁ থেকে উঠে এসেছি। সেই গ্রামে তখন কোনো স্কুলই ছিল না। আমার পিতাই ছিলেন সেই গ্রামের প্রথম মানুষ, যিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছেন। স্কুলে যেতে হতো আমাদের গ্রাম ছেড়ে পাশের গ্রামে।

বর্ষাকালে পথে পড়ত একটি বিশাল ধানের মাঠ। সেই মাঠ পার করে দিতেন আমার দাদা। এরপর ছিল আরেকটি খাল- সেটি পার হতে হতো বুকসমান পানি ভেঙে। আমি তখন ছোট; প্রায়ই পানি উঠে যেত বুক পর্যন্ত। গ্রামের মানুষজন জানেন- লুঙ্গি পরে পানিতে নামতে হতো। যত বাড়ত পানি, তত উপরে তুলতাম লুঙ্গি। শেষ পর্যন্ত বুক পর্যন্ত উঠে যেত। নিচে লুঙ্গি থাকত কি না- তা কেউ দেখত না। মানুষ দেখত না, মাছ দেখত। আর মাছের তো সেই দৃষ্টি নেই।

এইভাবেই আমি স্কুলে যেতাম। এটাই ছিল আমার জীবনের প্রেক্ষাপট। তখনো স্বপ্ন আসেনি- শুধু চলা ছিল।

এরপর যখন হাইস্কুল পর্যায়ে উঠলাম, তখন নরসিংদী শহরের আরেকটি স্কুলে ভর্তি হলাম। সেখানে লজিং থাকতাম- লজিং বোঝেন তো? সেখান থেকে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার পথ হেঁটে স্কুলে যেতে হতো। সেইভাবেই পড়াশোনা করেছি। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতিতে পড়েছি। তখন অর্থনীতি ছিল একেবারেই ‘হট ক্রেজ’।

পরে আমি সেই বিশ্ববিদ্যালয়েই শিক্ষকতা করেছি। এরপর পিএইচডি করেছি। আর পিএইচডি করতে গিয়েই আমার স্বপ্নের শুরু। সেটাই ছিল স্বপ্নলগ্নের সূচনা।

পিএইচডি করার সময় আমি দেখতাম- এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা আমাদের পিএইচডি শিক্ষার্থীদের অনেক দূরে নিয়ে যেতেন, আমাদের কিছু শেখানোর জন্য। তখন আমার মনে একটি ভাবনা জন্ম নিল। আমি মনে মনে চিন্তা করলাম- সেইখানেই আমার স্বপ্নের অঙ্কুরোদ্গম হলো।

আমি গভীরভাবে উপলব্ধি করেছি- এই দেশের শিক্ষিত সমাজ যদি সত্যিই শিক্ষার আউটরিচ নিশ্চিত করতে চায়, তবে আমাদেরকে বাস্তবতাকে সামনে রেখে ভাবতে হবে। বাংলাদেশের যে বিপুল আপামর জনতা আজও গ্রামে পড়ে আছে, তাদেরকে শহরের এই চার দেয়ালের ভেতরে এনে গণ্ডিবদ্ধভাবে শিক্ষিত করা সম্ভব নয়। তাদের কাছে পৌঁছে দিতে হবে শিক্ষা- এই প্রয়োজন থেকেই জন্ম নেয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ধারণা।

আমি দীর্ঘ সময় বিশ্ববিদ্যালয়ে ছিলাম। সেখানে বহু কাজ করেছি। এর মধ্যে একটি উল্লেখযোগ্য কাজ হলো- আমি পৃথিবীর নানা দেশ ঘুরেছি। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সেমিনার ও কনফারেন্সে অংশ নিয়েছি, পেপার প্রেজেন্টেশন করেছি, কখনো উপস্থাপনা দিয়েছি, কখনো আলোচনায় অংশ নিয়েছি। যেখানে-ই গিয়েছি, মাথার ভেতর একটি স্বপ্ন আমাকে বারবার নাড়া দিয়েছে- এই বাংলাদেশে শিক্ষার জন্য আমরা কী করছি, আর কী করা উচিত?

এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার জন্য আমি আমার চোখ ও কান খোলা রাখার চেষ্টা করেছি- দেখেছি, পর্যবেক্ষণ করেছি, শিখেছি। এরপর যখন আমার মনে শিক্ষাকে ঘিরে একটি সুস্পষ্ট স্বপ্ন দানা বাঁধতে শুরু করল- যে বাংলাদেশে শিক্ষার জন্য অবশ্যই কিছু করা দরকার- তখন আমি পরিকল্পিতভাবে কয়েকটি দেশে গিয়েছি, শুধুমাত্র তাদের শিক্ষাব্যবস্থা দেখার জন্য।

আমি থাইল্যান্ডে গিয়েছি সুখোথাই থাম্মাথিরাত ওপেন ইউনিভার্সিটি পরিদর্শনে। লন্ডনে গিয়েছি ইউনিভার্সিটি অব লন্ডনের শিক্ষাপদ্ধতি দেখার জন্য। দিল্লিতে ইন্দিরা গান্ধী ন্যাশনাল ওপেন ইউনিভার্সিটি পরিদর্শন করেছি। অস্ট্রেলিয়ায় ইউএসকেতে গিয়েছি- যেখানে শিক্ষাদান পদ্ধতি অত্যন্ত কার্যকর ও শিক্ষণীয়ভাবে বাস্তবায়িত হয়েছে।

এই সব অভিজ্ঞতা ও পর্যবেক্ষণের আলোকে আমি একটি প্রজেক্ট প্রোফাইল তৈরি করি- যার নাম দিই Dual Mode of Education। অর্থাৎ দ্বৈত পদ্ধতির শিক্ষা- যেখানে একদিকে থাকবে ক্যাম্পাসভিত্তিক প্রথাগত শিক্ষা, আর অন্যদিকে থাকবে দূরশিক্ষা বা ওপেন এডুকেশন। এই সমন্বিত ধারণার ওপর ভিত্তি করেই আমি সেই প্রজেক্ট প্রোফাইল প্রস্তুত করি।

এই প্রজেক্ট প্রোফাইল তৈরি করার পর আমি তখন মালয়েশিয়ায় ছিলাম। সেখান থেকে ঢাকায় ফিরে আসি এবং সরাসরি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যাই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপাচার্যের সঙ্গে দেখা করে বলি- আমি আপনাদের অধীনে একটি এফিলিয়েশনভিত্তিক উদ্যোগ নিতে চাই। কারণ তখনো প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের কোনো সুযোগ ছিল না; সে সময় কোনো আইনি কাঠামোও গড়ে ওঠেনি।

উপাচার্য মহোদয় বললেন- প্রজেক্টটি অত্যন্ত ভালো। তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এফিলিয়েশন দেওয়ার দায়িত্ব ও কর্তৃত্ব তখন সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় তখনো পূর্ণাঙ্গভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি, তবে সেটি একটি প্রজেক্ট হিসেবে চলমান ছিল এবং প্রফেসর বাড়ি সাহেব ছিলেন এর প্রজেক্ট ডিরেক্টর। তিনি আমাকে সেখানে যোগাযোগ করতে পরামর্শ দিলেন।

আমি তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করি। তিনি দুই–তিন দিন সময় নিয়ে প্রজেক্ট প্রোফাইলটি পর্যালোচনা করেন। এরপর আমাকে জড়িয়ে ধরে বললেন- This is what to make in Bangladesh. কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে তিনি জানালেন, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের কারিকুলাম ইতোমধ্যে সংসদে পাস হয়ে গেছে। সেই কাঠামোর সঙ্গে আমার প্রস্তাবিত মডেলটি পুরোপুরি খাপ খায় না- কারণ এই প্রস্তাবটি অনেক বেশি অগ্রসর ও উচ্চতর।

এই কথোপকথনের সময় আমার সঙ্গে ছিলেন শাহ আব্দুল হান্নান সাহেব- যাঁর নাম অনেকেই জানেন। তিনি আমাকে কানে কানে বললেন- এই বিশ্ববিদ্যালয়টি তিনি সত্যিই করতে চান এবং এই উদ্যোগে আমরা একে অপরের পাশে থাকব। তবে বাস্তবতা হলো- জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে এফিলিয়েশন সম্ভব হলো না। ফলে আমি আবার দেশের বাইরে চলে যাই।

দেশের বাইরে আমি টপ ম্যানেজমেন্ট পর্যায়ে কাজ করছিলাম। কয়েক বছর এতটাই ব্যস্ত ছিলাম যে দেশের খোঁজখবর তেমন রাখতে পারিনি। এরই মধ্যে দেশে কয়েকজন অগ্রগামী ব্যক্তি স্বাধীনভাবে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিলেন- সৈয়দ আলী আশরাফ, মুস্তেদীন সাহেব এবং নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যোগ তার উদাহরণ।

১৯৯৫ সালে দেশে ফিরে দেখি- ইতোমধ্যে এক-দুটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে। তখন আর দেরি না করে আমি দ্রুত শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে যাই। সে সময় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব ছিলেন এরশাদুল হক সাহেব-একজন অত্যন্ত সজ্জন ও দায়িত্বশীল মানুষ।

আমি তাঁকে বলি- আমি আগে চেষ্টা করেছিলাম, কিন্তু তখন আইনি কাঠামো না থাকায় সম্ভব হয়নি। এখন যেহেতু আইন হয়েছে, আমার এই প্রজেক্টটি কি বিবেচনায় নেওয়া যেতে পারে? তিনি বললেন- প্রজেক্ট প্রোফাইলটি জমা দিতে। আমি জমা দিলাম। তিনি বললেন- তিন–চার দিন পর ফোন করতে।

ফোন করলে তিনি জানান- প্রজেক্ট প্রোফাইলটি তিনি দেখেছেন এবং আমাকে সরাসরি সাক্ষাৎ করতে বললেন। আমি সময় চাইলে তিনি রাত আটটার সময় দেন। হাসতে হাসতে আমি বলেছিলাম- আপনি কি রাত আটটায় অফিস করেন? তিনি বললেন-No, you are not coming to my office. You are coming to my residence.

আমি কিছুটা বিস্মিত হই। তখন শাহ আব্দুল হান্নান সাহেব আমার সঙ্গে ছিলেন। আমি তাঁকে বিষয়টি জানালে তিনি বললেন- চলো, আমিও যাব। আমরা দুজন একসঙ্গে তাঁর বাসায় যাই। সেখানে পৌঁছানোর পর তিনি আমাকে জড়িয়ে ধরে বললেন- This is what we need in this country.

এরপর তিনি বললেন- আপনি জানেন কি, কেন আমি আপনাকে বাসায় ডেকেছি? আমি বললাম- না। তিনি হাসিমুখে বললেন- এই প্রজেক্টের জন্য, এই প্রজেক্ট প্রোফাইলের জন্য আমি আপনাকে ট্রিট দিতে চাই। খাবারের আয়োজন করা হয়েছে। আমরা একসঙ্গে খাওয়া–দাওয়া করলাম।

খাওয়া শেষে তিনি বললেন- আর দেরি করবেন না। দ্রুত বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি নাম নির্ধারণ করে প্রজেক্টটি আবার সাবমিট করুন। তখনো পর্যন্ত আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো নাম দিইনি- কারণ প্রোফাইল তৈরি করার সময় তো বিশ্ববিদ্যালয় ছিলই না।

এরপর আমরা সেখান থেকে বেরিয়ে এলাম। পথে হান্নান ভাই বললেন- একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম ঠিক করা জরুরি। আমি তাঁকে বললাম- ভাই, নামটা আমি আগেই মনে মনে ঠিক করে ফেলেছি। নাম হবে এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ।

তিনি জিজ্ঞেস করলেন- এই নাম কেন? আমি বললাম- এই বিশ্ববিদ্যালয় শুধু বাংলাদেশেই আলো ছড়াবে না; সমগ্র এশিয়াকে আলোকিত করবে। যেহেতু এটি বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠিত হবে এবং আমি বাংলাদেশকে ভালোবাসি, তাই নামের সঙ্গে ‘বাংলাদেশ’ যুক্ত করেছি।

তিনি বললেন- ভালো নাম। তবে Asian University in Dhaka নামটাও হতে পারে। আমি জানতে চাইলে তিনি বললেন- আমেরিকান ইউনিভার্সিটি অব বৈরুত-এর মতো উদাহরণ আছে। সেই আদলে করলে কেমন হয়? আমি বললাম- সেটাও ভালো প্রস্তাব, তবে বাংলায় উচ্চারণ ও অনুভূতির দিক থেকে এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ নামটাই আমার কাছে বেশি যথাযথ মনে হয়।

এরপর আমি আবার মালয়েশিয়ায় ফিরে যাই। আমার কম্পিউটারে প্রজেক্ট প্রোফাইল সংরক্ষিত ছিল। সেখান থেকেই এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ নামে প্রজেক্ট প্রোফাইলটি সাবমিট করি। তারিখটি ছিল- ৩০ নভেম্বর ১৯৯৫।

সাবমিট করার পর আমি সেক্রেটারি সাহেবকে হাসতে হাসতে জিজ্ঞেস করেছিলাম- এই প্রজেক্টের জন্য আমাকে কি বারবার ঢাকায় আসতে হবে? কতবার আসতে হবে? তিনি বললেন- আপনার আসার কোনো দরকার নেই। আমি বললাম- বাংলাদেশে না এলে কি করে হবে? তিনি বললেন- Don’t worry about it. I will go all the way to get it approved.

তিনি আমার কোনো আত্মীয় ছিলেন না, আগে কখনো পরিচয়ও ছিল না। এমনকি এর আগে তাঁর সঙ্গে আমার সরাসরি দেখাও হয়নি। তবুও তিনি বলেছিলেন- I will do everything. I will go all the way to get it approved. এই আশ্বাস নিয়ে আমি আবার বিদেশে ফিরে যাই।

৩০ নভেম্বর প্রজেক্ট জমা দেওয়ার পর ৪ জানুয়ারি- মাত্র এক মাসের মধ্যেই সই হয়ে অনুমোদন এসে যায়। ভাবুন তো- শুধু বাংলাদেশে নয়, পৃথিবীর কোথাও কি এমন ঘটনা ঘটেছে যে একটি বিশ্ববিদ্যালয় মাত্র এক মাসে অনুমোদন পেয়েছে? এটি ছিল অকল্পনীয়। আমি এ জন্য মোটেও প্রস্তুত ছিলাম না।

আমার কোনো পূর্বপ্রস্তুতি ছিল না। কারও সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা করিনি। বিদেশে থাকতেই আমি এই বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বপ্ন দেখেছি। বিদেশি দুই-একজনের সঙ্গে পরামর্শ করেছি। তাঁরা বাইরে থেকেই কারিকুলাম তৈরিতে সহায়তা করেছেন। সেই কারিকুলামে আন্তর্জাতিক মানের এশিয়ান ইউনিভার্সিটির ভাবনা ও ইনপুট স্পষ্টভাবে ছিল- কারণ এটি আমাদের নিজের হাতে গড়া একটি ধারণা।

এই দ্রুত অনুমোদনে আমি বিস্মিত, অভিভূত- সবকিছু একসঙ্গে অনুভব করছিলাম। তখন I was impressed, shocked-everything at once. কী করব, ঠিক বুঝে উঠতে পারছিলাম না। কোনো প্রস্তুতিও ছিল না, কারও সঙ্গে আগাম বিস্তারিত আলোচনা করিনি। আমি বিদেশে থেকেই এই বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বপ্ন দেখেছি, বিদেশি দু–একজনের সঙ্গে পরামর্শ করেছি। তাঁরা বাইরে থেকেই কারিকুলাম তৈরিতে সহায়তা করেছেন। সেই কারিকুলামে আন্তর্জাতিক মানের এশিয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাবনা ও ইনপুট ছিল- কারণ এটি ছিল আমাদের নিজের হাতে গড়া একটি স্বপ্নের নকশা।

এই অবস্থায় আমি একটি সিদ্ধান্ত নিলাম। জেদ্দার একটি টিকিট কাটলাম এবং সরাসরি মক্কায় চলে গেলাম। মক্কায় পৌঁছে প্রথমেই নামাজ পড়লাম। নামাজ শেষে আল্লাহর কাছে দোয়া করলাম-

“হে আল্লাহ, তুমি তো আমার মনের অবস্থা জানো। তুমি জানো আমি কোন পরিস্থিতি থেকে এখানে এসেছি।”

আমি তখন মালয়েশিয়ার রাজার হল এলাকায় থাকতাম- আমার স্ত্রী ও দুই ছোট সন্তানকে নিয়ে। সেখানে আমার ছিল একটি তিনতলা বাড়ি। সেই বাড়িতে আমরা ছাড়া আর কেউ থাকত না। আন্তর্জাতিক মানের একটি পাহাড়ি এলাকায় সে বাড়ি ছিল- যেখানে তিনতলায় উঠলে যেন মেঘ ছুঁয়ে যাওয়া যায়। সেখান থেকে এসে আমি আল্লাহকে বললাম- আল্লাহ তুমি জানো, রাজার হাল থেকে এসেছি এটার জন্য। আমার কাছে সাহায্য চেয়েছি- তুমি সাহায্যকরেছ। এখন এটা তোমার হাতে। তুমি আমার মনটাকে দেখো- তুমি সাহায্য কর।

আমি চলে এসেছি। এসে এখানে কোনো টাকা ছিল না। একজন ভদ্রলোকের নাম বললে আপনারা তাকে চিনবেন। আরেকজন ভদ্রলোককে পাঠিয়েছেন, যে আমার কাছে কোনো টাকা নেই। আমরা টাকা দিচ্ছি, যা লাগে আমরা দিচ্ছি। কোনো ইউনিভার্সিটি তো ৮–১০ কোটি টাকা ছাড়া শুরু করা যায় না। আমার কাছে কয়েক লাখ টাকা ছিল। আমি টাকা দিচ্ছি।

আমি তার কাছে ক্ষমা চেয়েছি। আমি বলেছি, দেখুন, আমার একটি মিশন আছে, আমার একটি ভিশন আছে, আমার একটি স্বপ্ন আছে। আমি চাই এই বিশ্ববিদ্যালয়টি দেশের আপামর জনতার, বিশেষ করে গরিবের জন্য কাজে লাগুক। যখনই এটি কোনো ধনীর হাতে চলে যাবে, তখনই এর কমার্শিয়াল উদ্দেশ্য চলে আসবে। তখন এটি থাকবে না। আমাকে এভাবেই চলতে দিন।

আমি এভাবেই চললাম। অনেক চেষ্টা করে উত্তরায় একটি আন্ডার কনস্ট্রাকশন দোতলা বিল্ডিং নিলাম। সেখানে লোক নেওয়ার কোনো টাকা ছিল না। শুধু একজন অফিসার এবং একজন সিকিউরিটি গার্ড নিয়েছিলাম। পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিয়ে ঘোষণা দিলাম যে এখানে ভর্তি নেওয়া হবে। শিক্ষকরা সবই পার্টটাইম- ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা; কোনো ফুলটাইম শিক্ষক ছিল না। শুধু আমি এবং একজন অ্যাসিস্ট্যান্ট, আমাদের অফিসার ছাড়া কেউ ছিল না।

এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ম্যানেজমেন্ট কিভাবে হবে, তা সব আমার একার। রাতে ফ্লোরে শুয়ে বিছানা উপরে রাখতাম, আবার রাত হলে সেখানে শুতে যেতাম। চলাফেরা করতাম রিক্সায়। এভাবেই বিশ্ববিদ্যালয়টি শুরু হয়।

কিন্তু আল্লাহ তো আছেন। আল্লাহ যদি মানুষকে ডাকতে পারে এবং মানুষের মনকে দেখেন, তবে তিনি সাহায্য করেন। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদনে তিনি সাহায্য করেছেন।

প্রথমে একজনও ফুলটাইম শিক্ষক ছিল না। ছাত্ররা আসতে লাগল, এবং তাদের ভর্তি করা হল। কোয়ালিটি এজুকেশনে এক বিন্দুমাত্র কম্প্রোমাইজ করা হয়নি। আমরা কোনো ধরনের চাকচিক্য দেখাইনি, কোনো পোসপাস করি নাই, কিন্তু কোয়ালিটিতে কোনো ত্যাগ করা হয়নি।

ছাত্ররা এত আকৃষ্ট হলো যে, শেষ পর্যন্ত উত্তরায় হাবিবুল্লাহ বাহার কলেজে গিয়ে ভর্তি পরীক্ষা নেওয়া হতো। এত ছাত্র আবেদন করেছিল যে, আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের দোতলা বিল্ডিংয়ের স্থান যথেষ্ট ছিল না। আমরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্টস ফ্যাকালিটিতে, যা তখন চারতলা পরীক্ষার হল ছিল, সেখানে ভর্তি পরীক্ষা নিতাম।

এভাবে বিশ্ববিদ্যালয়টি দেশের সবচেয়ে বড় প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিণত হলো। ছাত্রসংখ্যা বাড়ার মানে হলো-মানুষ তো বোকা নয়, শুধু তাই নয়, একটি বিশ্ববিদ্যালয় বড় হওয়া তার পারফরম্যান্সের একটি সূচক।

আমি লেট আঠারো শতকে এই চেষ্টা করেছি। হ্যান্ডবুক অফ ইউনিভার্সিটিস ২০০৯-এ, যা ইউনিভার্সিটি গ্রান্ট কমিশন অব বাংলাদেশ দ্বারা প্রকাশিত হয়েছে, সেখানে লেখা আছে যে এরকম প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য কেউ আমার আগে চেষ্টা করেনি। যদি এটি প্রথম নথি হয়, তাহলে বলা যায় যে একজন ব্যক্তি এই প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় কনসেপ্ট নিয়েছেন, এবং তা সফল হয়েছে। প্রচেষ্টা অবশ্যই অনেকের ছিল। তবে এভাবেই এটি সম্ভব হয়েছে।

এই ত্রিশ বছরের প্রথম দেড় দশকে আমি সংগ্রামের কথা বলি নি, চ্যালেঞ্জের কথা বলি নি। বন্ধুর পথ চলেছি। পথটা সহজ বা সুন্দর ছিল না। নদীতে ঢেউ ছিল, সমুদ্রে উথাল-পাথাল ঢেউ ছিল। অনেক কিছু পার করেছি- এগুলো এখন বলার সময় নয়।

এই দেড় দশকে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় দেশের সবচেয়ে বড় প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিণত হলো। আমরা এটা করেছি। প্রফেসর শমসের আলি সাহেব এক বৈঠকে বললেন- আমি স্টেজে বসা, উনিও বসা- ‘আমি সারা জীবন ওপেন ইউনিভার্সিটির জন্য চেষ্টা করেছি, আপনিই তো প্রথম হয়ে গেলেন।’ আমি অবাক হয়ে বললাম, ‘কি!’ তিনি বললেন, ‘এই দেশে যে গ্লোবাল ইউনিভার্সিটি দরকার, যা সারা পৃথিবীতে আছে- আপনিই তো প্রথম হয়ে গেলেন।’

শেষ দেড় দশকের পরে, এই দেড় দশকে, ত্রিশ বছরের শেষ দেড় দশকে আমরা সিরিয়াস- এবং অনেক বার সিরিয়াস চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছি।

এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ কেবল একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়; এটি হাজারো শিক্ষার্থীর স্বপ্ন, সংগ্রাম ও সাফল্যের প্রতীক। এই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করে বহু শিক্ষার্থী আজ দেশ ও দেশের বাইরে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে পৌঁছেছেন। কেউ সেনাবাহিনীতে কর্নেল হয়েছেন, কেউ বড় উদ্যোক্তা হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছেন, আবার কেউ শিক্ষা, প্রশাসন ও গবেষণার বিভিন্ন ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখছেন।

দীর্ঘ এই পথচলায় বিশ্ববিদ্যালয়কে নানা চ্যালেঞ্জ ও প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে হয়েছে। কোনো সুস্পষ্ট কারণ ছাড়াই হঠাৎ করে প্রতিষ্ঠান বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, একের পর এক একাডেমিক প্রোগ্রাম বন্ধ করতে বলা হয়েছে। এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভবন ও অবকাঠামো নিয়েও অযৌক্তিক প্রশ্ন তোলা হয়েছে। কোনো লিখিত ব্যাখ্যা বা নির্দিষ্ট অভিযোগ ছাড়াই এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যা একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জন্য অত্যন্ত হতাশাজনক ও বেদনাদায়ক।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস প্রিন্সিপালসহ গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পদে প্যানেল দেওয়া হলেও দীর্ঘদিন তা কার্যকর করা হয়নি। কাউকে অযোগ্য বলা হয়নি, আবার যোগ্য বলেও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানানো হয়নি। একইসঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটে ‘রেড স্পট’ উল্লেখ করে শিক্ষার্থীদের ভর্তি হতে সতর্ক করা হয়েছে, অথচ এর পেছনে কোনো যুক্তিসংগত কারণ জানানো হয়নি। এতে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়েছে এবং বিশ্ববিদ্যালয় অকারণে ক্ষতির মুখে পড়েছে।

এ ধরনের প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত বা রাজনৈতিক বাস্তবতা যাই হোক না কেন, এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ সবসময় শিক্ষা ও মানবিক মূল্যবোধকে সামনে রেখেই এগিয়ে গেছে। প্রতিকূলতার কাছে মাথা নত না করে এই প্রতিষ্ঠান বারবার ঘুরে দাঁড়িয়েছে।

সাম্প্রতিক সময়ে দেশের পরিবর্তিত বাস্তবতায় নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মুক্ত হয়েছে। জুলাই ও আগস্টের পর বাংলাদেশ একটি নতুন পথে যাত্রা শুরু করেছে, আর সেই অগ্রযাত্রায় এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশও সক্রিয়ভাবে অংশ নেবে। শিক্ষা, গবেষণা ও মানবসম্পদ উন্নয়নে এই বিশ্ববিদ্যালয় আগের চেয়ে আরও শক্তিশালী ভূমিকা রাখবে।

গত দেড় দশকের কথা বলছি। হঠাৎ করে একটি চিঠি দেওয়া হলো- বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ করার জন্য। কোনো কারণ নেই। আমি বললাম, ‘একটা কারণ তো থাকা উচিত।’ বলা হলো- না, বন্ধ করুন, এটি আমার সিদ্ধান্ত। বন্ধ করা হলো। আমাদের বিল্ডিংগুলো, যা অনেকগুলো, সেই বিল্ডিংগুলো বন্ধ করতে বলা হলো, অথচ এর জন্য কোনো পারমিশন নেওয়া হয়নি, কোথায় শিক্ষা সম্প্রসারণ হবে, সেটাও বলা হয়নি।

এরপর বলা হলো, আউটার প্রোগ্রাম বন্ধ করুন। আমি আর কিছু বলিনি। আমাদের ভাইস প্রিন্সিপাল প্যানেল দেওয়া হলো, কিন্তু কোনো নিয়োগ করা হলো না। বলা হয়নি কোনো শিক্ষক বা কর্মকর্তা এখানে অনুপযুক্ত- এটাও বলা হয়নি। আমার ওয়েবসাইটে বলা হলো, ‘রেড স্পট।’ যেখানে রেড স্পট আছে, সেখানে ছাত্রদের ভর্তি হতে সতর্ক থাকতে হবে। ছাত্ররা ভর্তি হবে কেন? কোনো কারণ নেই।

এই ধরণের রাজনীতি হোক বা যাই হোক, আমরা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছি।

এখন আমি আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কথা বলতে চাই। এই যে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়- এরশাদুল হক সাহেব, প্রফেসর বারী সাহেব, এই বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হওয়ার কিছুদিন পরেই আমি তাঁর নিজের হাতে লেখা একটি চিঠি পাই। সেখানে তিনি লিখেছিলেন- ‘আপনার প্রজেক্টটা আমার খুব ভালো লেগেছে। চলুন, আমরা ওই রকম একটা ইউনিভার্সিটি করি।’ তখন অবশ্য এই বিশ্ববিদ্যালয়টি ইতোমধ্যেই প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে।

যাই হোক, প্রশ্ন হলো- এই বিশ্ববিদ্যালয়ের নেচারটা কী? কেন এরশাদুল হক সাহেব বা তিনি এটাকে পছন্দ করেছিলেন?

নাম্বার ওয়ান- আমি মনে করেছি, শিক্ষা মানেই শুধু পেশাগত শিক্ষা নয়। পেশাগত শিক্ষা দিয়ে যদি সেখানে ভ্যালুস না থাকে, এথিক্স আর মোরালিটি না থাকে, তাহলে শিক্ষিত মানুষ তৈরি না হয়ে জাতীয় চোর তৈরি হতে পারে। হাজার হাজার কোটি টাকা লুট করা যেতে পারে। দোষ করলে দোষ নেই, কিন্তু দোষটা ধরিয়ে দিলে দোষ হয়ে যায়।

আমাদের সামনে একজন মানুষ বসে আছেন- দোষটা ধরিয়ে দেওয়ার জন্য যাকে আহত করা হয়েছে। দোষ করার জন্য কেউ দোষী নয়, কিন্তু দোষ ধরিয়ে দেওয়াটাই অপরাধ! যদি নৈতিকতা না থাকে, যদি মূল্যবোধ না থাকে, তাহলে এমনটাই হয়।

আমি এখানে দুনিয়ার উদাহরণ দিচ্ছি। যদি দুটো দেশের কথা বলি- একটা কঙ্গো, আরেকটা জাপান। কঙ্গো এমন একটি দেশ, যেখানে সোনার খনি আছে, ডায়মন্ডের খনি আছে। আর জাপান এমন একটি দেশ, যেখানে প্রায় কিছুই নেই- শুধু কয়লার খনি আছে।

২০২৩ সালে কঙ্গোর পার ক্যাপিটা ইনকাম ছিল ৬৬০ মার্কিন ডলার। আর একই বছরে জাপানের পার ক্যাপিটা ইনকাম ছিল ৩৩,৯৫০ মার্কিন ডলার। ৬৬০ ডলার আর ৩৩,৯৫০ ডলার- পার্থক্যটা কোথায়?

আমি এ বিষয়টি গভীরভাবে স্টাডি করে দেখেছি। কঙ্গোতে কোনো স্তরেই এথিক্স ও মোরালিটির সমন্বয় নেই। আর জাপানে শিশু যখন খেলাধুলা শুরু করে, তখন থেকেই তাকে শেখানো হয়- এটা করবে, এটা করবে না, এভাবে কথা বলতে হয়। এই ভ্যালুস শেখানো শুরু হয় একদম শৈশব থেকে- মাস্টার্স পর্যন্ত, পিএইচডি পর্যন্ত। প্রতিটি ক্লাসে তাদের এথিক্স ও মোরালিটি শেখানো হয়।

এই ভ্যালুস না থাকলে মানুষ তৈরি হয় না- জাতীয় চোর তৈরি হয়। আর এটাই ছিল আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের ড্রিম। আমার স্বপ্ন ছিল- একটি এথিক্যালি মোটিভেটেড ইউনিভার্সিটি তৈরি করা। আমি সেটাই করার চেষ্টা করেছি।”

"কিভাবে আমরা চেষ্টা করেছি, তা একটু বলি। আমি ইসলামী ইউনিভার্সিটিতে তখন ফ্যাকাল্টি ডিন হিসাবে কাজ করছিলাম। সেই সময় আমি বিভিন্ন পদে আছি- সিনেটের মেম্বারও ১০ বছর ছিলেন। সেখানে আমি প্রস্তাব দিয়েছিলাম, যদি এটি সত্যিকারের ইসলামী ইউনিভার্সিটি হতে চায়, যদি মানুষ তৈরি করতে হয়, তাহলে আমাদের মানব জীবনের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ দিকের জন্য একটি করে এথিক্স ও মোরালিটি বিষয়ক পেইজ কোর্স থাকা উচিত। এটি ইউনিভার্সিটির জন্য বাধ্যতামূলক কোর্স হতো।

সেই সময় ড. আব্দুল হামিদ, আবু সোলাইমান (ডিরেক্টর) এবং প্রফেসর কামাল হাসান (ডেপুটি ডিরেক্টর) আমাকে ডেকে বলেছিলেন- ‘ভেরি গুড, দ্যাট ইজ আওয়ার ফাইনাল অবজেকটিভ, বাট ইউ গো স্লো।’ তখন ড. মাহাথির (প্রাইম মিনিস্টার) ছিলেন। উনি এতটা কঠোর ইসলামীক ছিলেন না। তিনি বললেন, ‘মনে করো, এটি রিজেক্ট।’

আমরা এই ধারণাটি এখানে, এশিয়ান ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশে, বাস্তবায়ন করেছি। এখানে কিছু কোর্স দিন ওয়ান থেকেই কমপোলসারি- যেমন: আমাদের সামাজিক জীবন, সামাজিক ব্যবস্থা, রাজনৈতিক জীবন, আইনি জীবন, অর্থনৈতিক জীবন, এবং ব্যক্তিগত জীবনের এথিক্স ও সাধারণ মূল্যবোধ। প্রতিটি বিভাগ, প্রতিটি ফ্যাকাল্টি এবং ধর্ম নির্বিশেষে- হিন্দু হোক বা মুসলিম- সব শিক্ষার্থীর জন্য এই ভ্যালুস শেখানো হয়। এটি সবার জন্য বাধ্যতামূলক।

আমরা এটি সবার নাগালে রাখার জন্য যতটা সম্ভব খরচ কমিয়ে দিয়েছি। শিক্ষার্থীদের ফিস সর্বনিম্ন রাখা হয়েছে, প্রচুর স্কলারশিপ দেওয়া হয়েছে, ওয়েভার দেওয়া হয়েছে এবং পার্টটাইম চাকরির সুযোগও দেওয়া হয়েছে। এখানে অনেক শিক্ষার্থী আছে যাদের পিতৃকৃষক, কিন্তু তারা কঠোর পরিশ্রম করে পড়াশোনা করছে।

আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের ৭০% শিক্ষার্থী গ্রাম থেকে আসে। আমাদের এখানে নেতৃবৃন্দ আছেন। ময়মনসিংহ ও টাঙ্গাইলেও আমাদের সেন্টার ছিল। আমরা উইকেন্ডে শিক্ষার্থীদের জন্য গাড়ি ব্যবস্থা করতাম এবং প্রফেসর পাঠিয়ে দিতাম। আমরা শিক্ষার্থীদের এমন মডিউল প্রদান করতাম, যাতে তারা বসে-বসে বা শুয়ে-শুয়ে সহজে পড়তে পারে। এটা শুরু করতে চাই।

তখন ইন্টারনেটের সুবিধা এতটা ছিল না, তবে আমরা চেষ্টা করেছি শিক্ষার্থীদের জন্য সুবিধাজনক ব্যবস্থা তৈরি করতে। আমার লক্ষ্য ছিল- সকল শিক্ষার্থী যেন মানসম্মত শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে, যেখানে নৈতিকতা, মূল্যবোধ এবং এথিক্সের গুরুত্ব সর্বপ্রথম থাকে।"

আমরা কোয়ালিটি রক্ষা করি- এটাই আমাদের সবচেয়ে বড় অঙ্গীকার। আমাদের প্রতিটি ক্লাসরুমে সিসিটিভি রয়েছে। শিক্ষক কখন ক্লাসে ঢুকলেন, শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ইন্টারঅ্যাকশন হলো কি না, কখন ক্লাস শেষ করলেন-সবকিছু পর্যবেক্ষণ করা হয়। একজন ফুলটাইম কর্মকর্তা এই বিষয়গুলো নিয়মিতভাবে স্টাডি করেন এবং কোথাও দুর্বলতা থাকলে কর্তৃপক্ষকে জানিয়ে দেন। বাংলাদেশের কয়টি বিশ্ববিদ্যালয়ে এই ব্যবস্থা আছে? এটি আমার নিজের আইডিয়া।

প্রতিটি কোর্সে, প্রতিটি ডিপার্টমেন্টে, প্রতিটি সেমিস্টারে টিচার ইভ্যালুয়েশন রিপোর্ট (TER) করা হয়। প্রতি সেমিস্টারে শিক্ষার্থীদের একটি ফর্ম দেওয়া হয়- তোমার শিক্ষক কি তোমাকে ঠিকমতো প্রস্তুত করেছেন? বিষয়টি কি তিনি পরিষ্কারভাবে বোঝাতে পেরেছেন? এই রিপোর্টগুলো বিশ্লেষণ করা হয় এবং তার ভিত্তিতেই শিক্ষকদের পরবর্তী কোর্স দেওয়া হয়।

আমাদের কারিকুলাম কম্পার্টমেন্টালাইজড নয়- মানে শুধু সিইসি করবে, আর সিইসি-ই থাকবে- এমন নয়। প্রত্যেক শিক্ষার্থীরই রাজনৈতিক ব্যবস্থা, সামাজিক ব্যবস্থা সম্পর্কে ন্যূনতম জ্ঞান থাকা দরকার। আমাদের শিক্ষার্থীদের কিছু বাধ্যতামূলক কার্যক্রম আছে, যেগুলো বাস্তব জীবনের দায়িত্ববোধ তৈরি করে। তার মধ্যে অন্যতম সামাজিক কার্যক্রম। কোথাও যদি আগুন লাগে, দেখবেন- এশিয়ান ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থীরা সেখানে উপস্থিত।

আমরা তাদের বুঝিয়েছি- তোমরা শুধু নিজের বা পরিবারের জন্য নও, তোমরা জাতির জন্য। যে জাতি এক সাগর রক্তের বিনিময়ে স্বাধীনতা অর্জন করেছে, সেই জাতির জন্য কিছু করা তোমাদের দায়িত্ব। শুধু নিজের জন্য কাজ করলে, শুধু স্বার্থপর হলে মানুষ হওয়া যায় না। এজন্য আমরা এ ধরনের প্র্যাকটিক্যাল চ্যালেঞ্জ শিক্ষার্থীদের সামনে তুলে ধরার চেষ্টা করি।

এগুলোই ছিল আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস। আরেকটি কথা বলতে চাই- আমাদের সহকর্মীবৃন্দ ও শিক্ষার্থীরা যে ধাক্কাগুলো আমরা খেয়েছি, সেগুলো আমাদের থামাতে পারেনি; বরং সেই ধাক্কা দিয়েই আমরা আরও দ্রুত এগিয়ে যেতে চাই।

যারা শিক্ষার্থী, তোমরাই আমাদের হৃদয়ের স্পন্দন। একটি বিশ্ববিদ্যালয় মানেই শিক্ষার্থী। তোমরাই জাতিকে দেখাবে- তোমরা শিখছো, তোমরা মানুষ হচ্ছো, তোমরা জাতীয় নেতা হচ্ছো, এবং দেশ গড়ার জন্য কাজ করছো।

আর যারা আমাদের সহকর্মী, তাদের মনে রাখতে হবে- আমরা যদি কোনো প্রতিষ্ঠানে কাজ করি, তবে সেটিই আমাদের পরিবার। I have to own this. আমি আবার বলছি—I have to own this. নিজের বাড়ির মতো যত্ন না নিলে, প্রতিষ্ঠানের অজুহাত দিলে হবে না। আমাদের থাকতে হবে ফুল কমিটমেন্টে- আগের মতোই।

আর শেষ কথা- সবকিছু আগের মতোই থাকবে।

আমরা যখন শুরু করেছি, তখন প্রত্যেকেরই একটি লক্ষ্য ছিল- একটি স্বপ্ন, একটি ব্যক্তিগত লক্ষ্য। ডিপার্টমেন্টেরও একটি লক্ষ্য। যদি আপনার লক্ষ্য না থাকে, তাহলে স্বপ্নও থাকবে না, অর্জনও হবে না। আপনাকে স্বপ্ন দেখতেই হবে। আমরা সেমিস্টার ভিত্তিকভাবে লক্ষ্য নির্ধারণ করার চেষ্টা করেছি।

যদি একটি লক্ষ্য থাকে এবং আমরা প্রতিযোগিতা করি, আল্লাহ তায়ালা বলেছেন- ভাল কাজে প্রতিযোগিতা করুন। সেই প্রতিযোগিতা আমরা করতে চাই। বিশেষ করে, যারা ডিপার্টমেন্টের প্রধান, আমরা চাই সবাই যেন এগিয়ে যায়; আমার আগে এগিয়ে যেতে হবে, অন্যরা আমার চেয়ে কম করবে না।

আমরা যখন কাজ করেছি, তখন কাউকে নির্দেশ দিইনি যে রাত ৮ বা ৯টা পর্যন্ত অফিসে থাকতে হবে। তাদের স্বপ্ন, তাদের লক্ষ্য ছিল সেই লক্ষ্য অর্জন করা। তাই কেউ রাত ৮–৯টার আগে ঘরে যায়নি। মনে রাখবেন, যেকোনো অফিসে যদি ৯–৫টা কাজ করি, তাহলে আমি একজন শ্রমিক হতে পারি, লিডার নয়। লিডারের সময় নেই; লিডারের স্বপ্ন এবং লক্ষ্য থাকে। যদি লক্ষ্য ১ ঘণ্টা আগে থাকে, তবে আপনি যেতে পারেন; কিন্তু যদি লক্ষ্য ২ ঘণ্টা বেশি সময় লাগে, তবে থাকতে হবে।

আমরা পুনরুজ্জীবিত হতে চাই। শেষ করছি দুটি শব্দ দিয়ে- নিবেদন ও সমর্পণ। আমার বয়স হয়েছে, কখন ডাক আসবে তা বলা যায় না। আমার জীবনে যতটুকু চেষ্টা করতে পেরেছি করেছি। যদি কিছু থেকে থাকে, তা ক্ষমা করবেন। আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাই।

এখন এই দায়িত্ব আপনার হাতে। সমাজ ও জাতির জন্য। আমি এটি আপনার হাতে সমর্পণ করলাম। আপনারা এটি সংরক্ষণ করুন, বিলিয়ে দিন- নিজের স্বার্থের জন্য নয়, জাতির স্বার্থের জন্য। আল্লাহ আমাদের সকলের কল্যাণ করুন, আমাদের সুন্দর স্বপ্ন দেখার তৌফিক দিন, এবং সেই স্বপ্ন বাস্তবায়ন করার শক্তি দিন, মানবতার কল্যাণের জন্য।

শুধু এশিয়ান ইউনিভার্সিটির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, আমরা দেশের বাইরে গিয়েছি। আফ্রিকা থেকে একটি শাখা খোলার প্রস্তাব এসেছে, লিখিতভাবে। দেশের বাইরে অস্ট্রেলিয়ার এবং কোরিয়ার শিক্ষার্থী আছে। আমরা চাই, আমরা শুধু বাংলাদেশেই সীমাবদ্ধ থাকবো না। ইনশাআল্লাহ, আমরা আবারও আকাশে উড়ব।

১৬৪ বার পড়া হয়েছে

শেয়ার করুন:

মন্তব্য

(0)

বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০
বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন
এলাকার খবর

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন














সর্বশেষ সব খবর
মতামত নিয়ে আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০
বিজ্ঞাপন