আশুলিয়ার জেলে পরিবারের ৮৫ শতাংশই সন্তানদের মাছ ধরার পেশায় দেখতে চান না
বৃহস্পতিবার, ৮ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:২৬ পূর্বাহ্ন
শেয়ার করুন:
ঢাকার আশুলিয়ার তুরাগ নদীতীরবর্তী জেলে সম্প্রদায়ের আর্থ-সামাজিক জীবনে নানা সংকটের চিত্র উঠে এসেছে এক গবেষণায়। এতে দেখা গেছে, জরিপে অংশ নেওয়া ৬০ শতাংশ জেলে পরিবারের দৈনিক আয় ৬০০ টাকা বা তার কম। আর ৮৫ শতাংশ অভিভাবক জানিয়েছেন, তারা সন্তানদের ভবিষ্যতে মাছ ধরার পেশায় দেখতে চান না।
ঢাকার আশুলিয়ার তুরাগ নদীতীরবর্তী জেলে সম্প্রদায়ের আর্থ-সামাজিক অবস্থায় নানা সংকটের চিত্র উঠে এসেছে একটি গবেষণায়। গবেষণায় দেখা গেছে, জরিপে অংশ নেওয়া জেলে পরিবারের ৬০ শতাংশের দৈনিক আয় ৬০০ টাকা বা তার কম। একই সঙ্গে ৮৫ শতাংশ অভিভাবক জানিয়েছেন, তারা চান না তাদের সন্তান ভবিষ্যতে মাছ ধরার পেশায় যুক্ত হোক।
এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের সমাজবিজ্ঞান ও নৃবিজ্ঞান বিভাগের গবেষকদের পরিচালিত এ গবেষণায় আশুলিয়া ইউনিয়নের রুস্তমপুর, পাড়াগ্রাম ও নয়াপাড়া গ্রামের ১৫০ জন জেলের আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করা হয়েছে। ২০২৪ সালের জুন থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত পরিচালিত গবেষণাটিতে জেলেদের জীবিকা, আর্থিক অবস্থা, পেশাগত পরিবর্তন এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের পেশা সম্পর্কে তাদের দৃষ্টিভঙ্গি বিশ্লেষণ করা হয়। গবেষণাটি সাউথ এশিয়ান জার্নাল অব সোশ্যাল স্টাডিজ অ্যান্ড ইকোনমিকস-এর ২০২৬ সালের ২৩তম ভলিউমের দ্বিতীয় সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছে।
গবেষণায় উঠে এসেছে, তুরাগ নদীর শিল্পদূষণ, মাছের পরিমাণ কমে যাওয়া, নদীর পানিপ্রবাহ হ্রাস, নদী দখল ও পলি জমাসহ বিভিন্ন কারণে জেলেদের ঐতিহ্যবাহী জীবিকা সংকটে পড়েছে। গবেষণায় অংশ নেওয়া ৯৫ শতাংশ উত্তরদাতা পানিদূষণকে মাছ ধরার অন্যতম প্রধান বাধা হিসেবে উল্লেখ করেছেন। এছাড়া ৮৫ শতাংশ কম পানিপ্রবাহ ও পলি জমা, ৯০ শতাংশ মধ্যস্বত্বভোগীদের ওপর নির্ভরতা এবং ৮৫ শতাংশ প্রাতিষ্ঠানিক ঋণের সুযোগের অভাবের কথা জানিয়েছেন।
গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ৪৩ দশমিক ৩ শতাংশ উত্তরদাতা মাছ ধরাকে প্রধান পেশা হিসেবে অনুসরণ করছেন। অন্যরা দৈনিক শ্রম, ক্ষুদ্র ব্যবসা ও অন্যান্য পেশায় যুক্ত হয়েছেন। দৈনিক ৬০০ টাকা বা তার কম আয় করেন ৬০ শতাংশ, ৬০১ থেকে ৭০০ টাকা আয় করেন ২৩ দশমিক ৩ শতাংশ এবং ৭০০ টাকার বেশি আয় করেন ১৬ দশমিক ৭ শতাংশ উত্তরদাতা।
শিক্ষার ক্ষেত্রেও পিছিয়ে রয়েছে এই জনগোষ্ঠী। গবেষণায় অংশ নেওয়া ৪০ শতাংশ উত্তরদাতা নিরক্ষর এবং ৪৮ দশমিক ৭ শতাংশের শিক্ষাগত যোগ্যতা প্রাথমিক পর্যায় পর্যন্ত। মাত্র ১১ দশমিক ৩ শতাংশ মাধ্যমিক শিক্ষা সম্পন্ন করেছেন এবং কোনো উত্তরদাতার উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন করার তথ্য পাওয়া যায়নি।
গবেষণাটিতে জেলে সম্প্রদায়ের জীবিকা সংকটকে ব্যাখ্যা করতে সাসটেইনেবল লাইভলিহুডস ফ্রেমওয়ার্ক (এসএলএফ) ব্যবহার করা হয়েছে। এই ফ্রেমওয়ার্ক অনুযায়ী, একটি পরিবারের জীবিকা শুধু তার পেশা বা আয়ের ওপর নির্ভর করে না; মানবসম্পদ, প্রাকৃতিক সম্পদ, ভৌত সম্পদ, আর্থিক সম্পদ ও সামাজিক সম্পদের সমন্বয় এবং প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো ও বাহ্যিক সংকটের প্রভাব জীবিকার স্থায়িত্ব নির্ধারণ করে।
এই ফ্রেমওয়ার্কের আলোকে গবেষকরা দেখিয়েছেন, আশুলিয়ার জেলেদের জীবিকার সংকটকে শুধু মাছের প্রাপ্যতা কমে যাওয়ার বিষয় হিসেবে দেখলে পুরো বাস্তবতা বোঝা যায় না। নদীর পরিবেশগত অবক্ষয়ের পাশাপাশি শিক্ষার সীমাবদ্ধতা, দক্ষতার ঘাটতি, আনুষ্ঠানিক ঋণব্যবস্থায় দুর্বল প্রবেশাধিকার এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের ওপর নির্ভরতা জেলেদের লাইভলিহুড ভালনারেবিলিটি বা জীবিকা-ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে। ফলে বিকল্প পেশায় প্রবেশ করলেও সেটি সবসময় অর্থনৈতিক অগ্রগতি তৈরি করছে না; অনেক ক্ষেত্রে এটি কম মজুরি ও অনিরাপদ কাজের দিকে জীবিকা পরিবর্তনের রূপ নিচ্ছে।
গবেষণায় প্রজন্মগত পরিবর্তনের বিষয়টিও বিশেষভাবে উঠে এসেছে। ৮৫ শতাংশ অভিভাবক তাদের সন্তানদের মাছ ধরার পেশায় দেখতে চান না। তাদের মধ্যে ৭০ শতাংশ সন্তানদের উচ্চশিক্ষা গ্রহণের আকাঙ্ক্ষার কথা জানিয়েছেন। বিপরীতে ১৫ শতাংশ অভিভাবক সন্তানদের মাছ ধরার পেশায় দেখতে চান। অর্থাৎ, একসময় পারিবারিকভাবে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে চলে আসা জেলে পেশার ধারাবাহিকতা এখন অনেক পরিবারের কাছেই অনাকাঙ্ক্ষিত হয়ে উঠছে।
গবেষকদের বিশ্লেষণে, এই পেশাগত পরিবর্তনকে শুধু অর্থনৈতিক অগ্রগতি হিসেবে দেখা যায় না। লাইভলিহুড ডাইভারসিফিকেশন বা জীবিকার বহুমুখীকরণ সাধারণত সংকট মোকাবিলার একটি কৌশল হলেও আশুলিয়ার ক্ষেত্রে প্রাকৃতিক সম্পদের অবক্ষয় ও জীবিকার অনিশ্চয়তার কারণে অনেক পরিবার কম মজুরি ও অনিরাপদ বিকল্প পেশায় যেতে বাধ্য হচ্ছে। গবেষণায় এটিকে লাইভলিহুড সাবস্টিটিউশন বা জীবিকার বিকল্পায়ন হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
গবেষকরা মনে করেন, জেলে সম্প্রদায়ের জীবিকা সংকটের সঙ্গে পরিবেশগত অবক্ষয়, আর্থ-সামাজিক দুর্বলতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তার ঘাটতি পরস্পর সম্পর্কিত। গবেষণায় তুরাগ নদীর পরিবেশ পুনরুদ্ধার, শিল্পবর্জ্য ব্যবস্থাপনা, জেলেদের জন্য প্রশিক্ষণ ও বিকল্প কর্মসংস্থান, সহজ শর্তে ঋণ, সরাসরি বাজারজাতকরণ এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের ওপর নির্ভরতা কমানোর উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়েছে।
গবেষণাটির শিরোনাম “অ্যান এমপিরিক্যাল স্টাডি অন দ্য সোশিও-ইকোনমিক কন্ডিশন অব ফিশারমেন কমিউনিটিজ অব আশুলিয়া, ঢাকা, বাংলাদেশ”। এতে গবেষক হিসেবে রয়েছেন ফাহমিদা হোসাইন, সায়েদা আকতার, মো. আসিফ হাসান রাজু, মীর ফারজানা শারমিন ও মুহাম্মাদ বায়েজিদ হুসাইন।
১৪১ বার পড়া হয়েছে