সর্বশেষ

সাহিত্য

১৪৩৩-এর নবপ্রভাত ও বাঙালির আত্মানুসন্ধান

গাউসুর রহমান 
গাউসুর রহমান 

সোমবার, ১৩ এপ্রিল, ২০২৬ ৩:৫৪ অপরাহ্ন

শেয়ার করুন:
আজ ১৪ এপ্রিল, ২০২৬। ভোরের রক্তিম সূর্য পূর্ব দিগন্তে উদিত হওয়ার সাথে সাথে বঙ্গাব্দের পঞ্জিকায় যুক্ত হলো একটি নতুন সংখ্যা—১৪৩৩। গতকালের সেই চৈত্রসংক্রান্তির স্তব্ধতা আর জীর্ণতাকে পেছনে ফেলে প্রকৃতি আজ নতুনের আবাহনে মুখর।

বাঙালির কাছে পহেলা বৈশাখ মানে কেবল ক্যালেন্ডারের পাতা ওল্টানো যান্ত্রিক কোনো দিনবদল নয়; এ এক মজ্জাগত অনুভবের নাম, যা হাজার বছরের ইতিহাসকে এক সুতোয় বেঁধে রাখে। আজ আমরা কেবল একটি উৎসবে শামিল হইনি, বরং নিজেদের শেকড়কে ছুঁয়ে দেখার এক শাশ্বত অঙ্গীকারে মেতেছি। ১৪৩৩-এর এই নবপ্রভাত বাঙালির কাছে তাই এক অগ্নিস্নানের সুযোগ। জীর্ণ যা কিছু, পুরনো যা কিছু গ্লানি—তাকে পুড়িয়ে ছাই করে দেওয়ার মধ্যেই তো নতুন সৃষ্টির আনন্দ নিহিত। ইতিহাসের ধুলো ঝাড়লে দেখা যায়, এই নববর্ষের উদ্ভব হয়েছিল সম্রাট আকবরের রাজদরবারে, মূলত খাজনা আদায়ের একটি সুশৃঙ্খল প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনার অংশ হিসেবে। বাঙালির প্রাণশক্তি সেই কর আদায়ের প্রথাকে কখন যে নিজের সংস্কৃতির রঙে রাঙিয়ে এক সর্বজনীন উৎসবে রূপান্তর করে ফেলেছে, তা ভাবলে বিস্ময় জাগে। বাঙালির এই আত্মীকরণের ক্ষমতাটিই মূলত তার টিকে থাকার মূলমন্ত্র।

রাস্তায় বেরোলে এখন চারদিকে রঙের অবিরাম খেলা দেখা যায়। চারুকলার সেই বিশাল প্রাঙ্গণ থেকে যখন শোভাযাত্রা বের হয়, তখন মনে হয় যেন এক জাদুর জগৎ নেমে এসেছে রাজপথে। এই যে শোভাযাত্রা, এটি কি কেবলই এক বর্ণিল সাজগোজের আতিশয্য? সম্ভবত না। এর ভেতরে লুকানো থাকে এক গভীর সামাজিক বয়ান। ফরাসি বা রুশ সমাজতাত্ত্বিকরা হয়তো একে বলতেন ‘কার্নিভালেস্ক’ বা উৎসবের মাধ্যমে রাজপথ দখল করার এক নান্দনিক রাজনীতি। যেখানে সাময়িকভাবে হলেও উঁচু-নিচু, ধনী-দরিদ্রের দেয়াল ভেঙে সবাই একাকার হয়ে যায়।

তবে মুদ্রার উল্টো পিঠটিও আমাদের নির্মোহভাবে দেখতে হবে। বর্তমানের এই করপোরেট সংস্কৃতির প্রবল জোয়ারে উৎসব কি আর আগের মতো নিরঙ্কুশ ও নির্মল আছে? আজ বৈশাখ মানেই কি কেবল হাজার কোটি টাকার বিশাল এক বাণিজ্য? বড় বড় শপিং মলে যখন লাল-সাদা শাড়ির চোখধাঁধানো প্রদর্শনী চলে, কিংবা নামী-দামি পাঁচতারা হোটেলে পান্তা-ইলিশের আকাশছোঁয়া দাম হাঁকা হয়, তখন মনে মনে এক দীর্ঘশ্বাস গোপন করা কঠিন হয়ে পড়ে। যে উৎসব ছিল মাটির কাছাকাছি থাকা মানুষের, সাধারণ কৃষকের আনন্দের নির্যাস, তা আজ অনেক ক্ষেত্রে শীতাতপনিয়ন্ত্রিত ঘরের আভিজাত্যে ও বিলাসিতায় বন্দি হয়ে পড়েছে। ফ্রাঙ্কফুর্ট স্কুলের তাত্ত্বিকরা যেমন থিওডোর অ্যাডর্নো বা ম্যাক্স হরখাইমার ‘সংস্কৃতি শিল্প’ বা ‘কালচার ইন্ডাস্ট্রি’ নিয়ে যে আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন—সংস্কৃতি যখন নিছক পণ্যে পরিণত হয়, তখন তার অভ্যন্তরীণ প্রাণভোমরাটি ধীরে ধীরে হারিয়ে যায়। আমরা কি আজ সেই বিপদের মুখেই দাঁড়িয়ে নেই? আমাদের লোকজ সুর, আমাদের মাটির গান কি ব্র্যান্ডিংয়ের আড়ালে ঢাকা পড়ে যাচ্ছে না? বাঙালির আত্মানুসন্ধানের এই যাত্রায় এই প্রশ্নগুলো আজ অত্যন্ত জরুরি হয়ে দেখা দিয়েছে।

সংস্কৃতির নামে আমরা গত কয়েক দশকে কত যে মেকি আভিজাত্য ও কৃত্রিম ঐতিহ্য তৈরি করেছি, তার ইয়ত্তা নেই। ‘পান্তা-ইলিশ’ খাওয়ার কথাই যদি পুনরায় ধরা যাক, তবে এক বিচিত্র স্ববিরোধিতা পরিলক্ষিত হয়। আমাদের গ্রামবাংলার দরিদ্র কৃষক পান্তা ভাত খেতেন পেটের দায়ে, বেঁচে থাকার তাগিদে, কারণ আগের দিনের বাসি ভাত নষ্ট না করার অন্য কোনো উপায় ছিল না। আর আজ আমরা সেই দারিদ্র্যের প্রতীককে উচ্চবিত্তের ড্রয়িংরুমে এক বিলাসী ফ্যাশন হিসেবে উপস্থাপন করছি। আরও বড় ট্র্যাজেডি হলো, বৈশাখ মাস মোটেও ইলিশ মাছ ধরার সঠিক সময় নয়। প্রজনন মৌসুমের এই সময়ে ইলিশ রক্ষা করা যেখানে জাতীয় কর্তব্য, সেখানে বৈশাখী আবেগকে পুঁজি করে ইলিশ ধ্বংস করা কি এক ধরনের সাংস্কৃতিক অন্ধত্ব নয়? ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ আমাদের সেই শুভবোধের জগতে ফিরিয়ে নিয়ে যাক, যেখানে মানুষ আর প্রকৃতি একে অপরের পরিপূরক হিসেবে কাজ করবে। পান্তা ভাত যদি খেতেই হয়, তবে তা হোক শেকড়ের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধায়, মাটির কাছে ফেরার অকৃত্রিম টানে, কোনো শৌখিন বিলাসিতার ঢংয়ে নয়। প্রকৃত আত্মানুসন্ধান কেবল পোশাকে বা আহারে সীমাবদ্ধ থাকে না; এটি থাকে আমাদের মননশীলতায় এবং মানবিক আচরণের গভীরতায়।

আমরা আজ এক গ্লোবাল ভিলেজ বা বিশ্বগ্রামের অধিবাসী, যেখানে আঙুলের একটি ডগায় সারা পৃথিবী মুহূর্তেই ধরা দেয়। সোশ্যাল মিডিয়ায় বৈশাখী স্ট্যাটাস দেওয়া বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি পহেলা বৈশাখের ঝকঝকে ছবি পোস্ট করা হয়তো আধুনিকতারই অংশ, কিন্তু তার চেয়েও বড় হলো উৎসবের অন্তর্নিহিত কালজয়ী দর্শনকে অনুভব করা। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছিলেন, নিজের ঘরে শক্ত হয়ে বসতে পারলেই তবেই অন্যের ঘরে অতিথি হওয়ার অধিকার জন্মায়। পহেলা বৈশাখ হলো সেই নিজের ঘরকে চেনার দিন, নিজের সমৃদ্ধ ঘরানাটিকে বিশ্বদরবারে সগৌরবে মেলে ধরার দিন। ডিজিটাল প্রযুক্তি যেন আমাদের সেই আদিম লোকজ সুরকে কেড়ে না নেয়, বরং প্রযুক্তির অসীম শক্তিকে ব্যবহার করেই আমরা যেন আমাদের সমৃদ্ধ জাতিসত্তার জয়গান বিশ্বের প্রতিটি প্রান্তে আরও জোরালোভাবে পৌঁছে দিতে পারি। কিন্তু এই পৌঁছানোর প্রক্রিয়াটি যদি কেবল অনুকরণনির্ভর হয়, তবে তা দীর্ঘস্থায়ী হবে না।

১৪৩৩ বঙ্গাব্দের এই নবপ্রভাতে আমাদের আরেকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের দিকে নজর দেওয়া প্রয়োজন, আর তা হলো—আমাদের ভাষা ও সাহিত্যের প্রতি আমাদের দায়বদ্ধতা। দুঃখজনক হলেও সত্য যে, বিশ্বায়নের এই যুগে আমরা ক্রমশ আমাদের ভাষা থেকে দূরে সরে যাচ্ছি। উচ্চশিক্ষায় বা কর্মক্ষেত্রে বাংলার ব্যবহার সংকুচিত হচ্ছে। অথচ এই বৈশাখী চেতনার মূলে ছিল একটি ভাষাকেন্দ্রিক জাতি গঠনের স্বপ্ন। বাঙালির আত্মানুসন্ধান তাই অপূর্ণ থেকে যাবে যদি না আমরা আমাদের ভাষাকে তার প্রাপ্য মর্যাদা দিতে পারি। নববর্ষের সকালে মিষ্টিমুখের প্রথাটি আমাদের ব্যবসায়িক সততা ও পারস্পরিক হৃদ্যতার কথা মনে করিয়ে দেয়। আজ সেই নৈতিকতা ও পারস্পরিক আস্থার সংস্কৃতি অনেক ক্ষেত্রেই বিলীন হয়ে যাচ্ছে। দুর্নীতির করাল গ্রাস বা নৈতিক অবক্ষয় থেকে মুক্তি পেতে আমাদের সেই লোকজ সহজ-সরল জীবনবোধের কাছে ফিরে যাওয়া ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই। লোকজ মেলাগুলোতে যখন মাটির তৈরি পুতুল বা শীতল পাটি দেখি, তখন বুঝতে পারি বাঙালির শৈল্পিক কারুকার্য কত গভীর ছিল। আধুনিক শিল্পায়নের যুগে এই কুটিরশিল্পীদের টিকিয়ে রাখা আমাদের জাতীয় দায়িত্ব। এটি কেবল অর্থনীতি নয়, এটি আমাদের ঐতিহ্যের সংরক্ষণ।

আজকের নবপ্রভাত আমাদের সেই শপথ নেওয়ার সুযোগ করে দেয়, যেখানে আমরা জীর্ণতাকে বিসর্জন দেব। বাঙালি হিসেবে আমাদের যে বিশাল ঐতিহ্য রয়েছে, তার চর্চা হওয়া উচিত প্রতিদিনের জীবনে। বছরের একদিন পাঞ্জাবি পরে বা শাড়ি পরে নিজেকে খাঁটি বাঙালি ভাবার মধ্যে কোনো গৌরব নেই, যদি বছরের বাকি ৩৬৪ দিন আমরা আমাদের সংস্কৃতিকে অবজ্ঞা করি। ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ হোক সেই দিন, যা আমাদের দৈনন্দিন জীবনাচরণে বাঙালির চিরন্তন উদারতা ও সহমর্মিতাকে প্রোথিত করবে। আমাদের তরুণ প্রজন্মের কাছে পহেলা বৈশাখ যেন কেবল একটি ছুটির দিন বা নিছক বিনোদনের মাধ্যম না হয়।

১৪৩৩ বঙ্গাব্দ আমাদের এক নতুন দিগন্তের সন্ধান দিক, যেখানে আধুনিকতা আর ঐতিহ্য হাতে হাত ধরে চলবে। আমাদের গ্রামগুলো যেন শহরের ইট-পাথরের খাঁচায় হারিয়ে না যায়, আবার আমাদের শহরগুলোও যেন নিজস্ব পরিচয়হীন কোনো যান্ত্রিক গোলকধাঁধায় পরিণত না হয়—সেই কামনাই আজ মুখ্য। বাঙালির আত্মানুসন্ধানের এই প্রক্রিয়াটি কোনো গন্তব্য নয়, বরং এটি একটি নিরন্তর যাত্রা। যুগের প্রয়োজনে এই উৎসবের রূপ পাল্টাতে পারে, কিন্তু তার মূল সুরটি যেন অপরিবর্তিত থাকে।

১৪৩৩ বঙ্গাব্দের সূর্য উঠুক এক নতুন পৃথিবীর বার্তা নিয়ে—যেখানে ঘৃণা নয়, বরং ভালোবাসা আর সহমর্মিতাই হবে আমাদের প্রধান পরিচয়। একটি বৈষম্যহীন সমাজ গড়ার যে স্বপ্ন আমাদের পূর্বসূরিরা দেখেছিলেন, সেই স্বপ্নের সারথি হতে হবে আমাদেরই। আমাদের লোকজ গান, আমাদের বাউলিয়ানা, আমাদের পিঠা-পুলি আর গ্রামীণ মেলার সেই হারানো দিনগুলোকে আধুনিকতার মোড়কে পুনরুজ্জীবিত করতে হবে। বাঙালির আত্মানুসন্ধান সার্থক হবে তখনই, যখন আমরা আমাদের শেকড়কে বুকে ধারণ করে আকাশকে স্পর্শ করার সাহস অর্জন করব। জয় হোক নতুনের, জয় হোক বাঙালির শাশ্বত ঐতিহ্যের। শুভ নববর্ষ।

লেখক: কবি ও প্রাবন্ধিক।

১৫২ বার পড়া হয়েছে

শেয়ার করুন:

মন্তব্য

(0)

বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০
বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন
এলাকার খবর

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন














সর্বশেষ সব খবর
সাহিত্য নিয়ে আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০
বিজ্ঞাপন