জাতীয়করণকৃত মাধ্যমিক শিক্ষকদের পেনশন জটিলতা নিয়ে উদ্বেগ, 'দুই নীতি'র অভিযোগ
সোমবার, ১৩ এপ্রিল, ২০২৬ ৮:৩৯ পূর্বাহ্ন
শেয়ার করুন:
একটি দেশের সকল জাতির ঊর্ধ্বে শিক্ষাগুরুর মর্যাদা—এ কথা আজ যেন কেবল উপন্যাসের পাতা আর গুরুজনদের মুখেই শোভা পায়; বাস্তবতা ভিন্ন চিত্র তুলে ধরে।
সাম্প্রতিক সময়ে জেন-জি প্রজন্ম শিক্ষকদের প্রতি যে আচরণ দেখিয়েছে, তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ হিসেবে বিশ্ব ইতিহাসে বাংলাদেশকে উল্লেখ করা হচ্ছে। জাতি গড়ার কারিগর এই শিক্ষক সমাজ যুগে যুগে অবহেলিত, বঞ্চিত ও শোষিত—এমনটাই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বর্তমানে মাধ্যমিক শিক্ষকদের গ্রেড ও চাকরি জাতীয়করণ নিয়ে একই সেক্টরে দ্বৈত নীতির প্রমাণ পেয়েছেন গোয়াইনঘাটের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক ও সাহিত্যপ্রেমী দেবব্রত ভট্টাচার্য। তিনি শিক্ষকদের চাকরি স্থায়ীকরণ ও গ্রেডভিত্তিক সরকারি নতুন নীতিমালা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। নিজের উপজেলা গোয়াইনঘাটে শিক্ষকদের সঙ্গে ঘটে যাওয়া ঘটনাকে কেন্দ্র করে তিনি আজ সকালে তার ভেরিফায়েড ফেসবুক আইডিতে এক খোলা চিঠি প্রকাশ করেন।
চিঠিতে তিনি উল্লেখ করেন, সদ্য সরকারিকরণ বা জাতীয়করণকৃত মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের যেসব শিক্ষক-কর্মচারী এডহক নিয়োগ পাওয়ার পর অল্প সময়ের মধ্যে ৫৯ বছর পূর্ণ করে পিআরএল সুবিধা নিয়ে অবসরে গেছেন এবং পেনশন ও আনুতোষিকের জন্য আবেদন করেছেন, তাদের ক্ষেত্রে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) “দুই নীতি” অনুসরণ করছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
তিনি বলেন, একই অধিদপ্তরের অধীনে একই পর্যায়ের শিক্ষক-কর্মচারীদের জন্য ভিন্ন ভিন্ন নীতি গ্রহণ অত্যন্ত দুঃখজনক। কারও ক্ষেত্রে পেনশন সুবিধা পেতে নিয়মিতকরণ বা স্থায়ীকরণের আদেশপত্র জমা দিতে বলা হচ্ছে, আবার কারও ক্ষেত্রে এ নিয়ম শিথিল করে বরাদ্দ প্রদান করা হচ্ছে।
চিঠিতে আরও বলা হয়, নিয়মিতকরণ বা স্থায়ীকরণ একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়া। এ নিয়ম মেনে পেনশন পেতে গেলে অনেকের ক্ষেত্রে তা মরণোত্তর পেনশনে পরিণত হবে, যা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির জন্য কার্যত অর্থহীন। ২০১৭-২০১৮ সালে প্রতিষ্ঠান সরকারি হলেও প্রায় ৮ বছর পরও শিক্ষক-কর্মচারীদের চাকরি নিয়মিতকরণ বা স্থায়ীকরণ হয়নি। পদ সংরক্ষণ ও পুলিশ ভেরিফিকেশনও সম্পন্ন হয়নি।
প্রক্রিয়াগুলো সম্পন্ন করতে আবেদন করা হলেও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর ধীরগতি বা ‘ঢিমেতেতালা’ মনোভাব লক্ষ্য করা যাচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে বারবার ঢাকায় যাতায়াত করা বয়স্ক, অসুস্থ ও আয়হীন অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকদের জন্য অত্যন্ত কষ্টকর। এত কিছুর পরও দীর্ঘসূত্রিতার কারণে ভোগান্তি আরও বেড়েছে।
চিঠিতে বলা হয়, সারা জীবন শিক্ষকতা করে অবসরে এসে পেনশনের টাকার জন্য দৌড়ঝাঁপ করতে হওয়া অত্যন্ত কষ্টদায়ক। পিআরএল সুবিধা ও লাম্পগ্রান্ট পাওয়ার পরও নিয়মিতকরণকে পেনশনের শর্ত হিসেবে যুক্ত করা অমানবিক। কারণ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর নিয়মিতকরণই এখনো সম্পন্ন হয়নি এবং নিকট ভবিষ্যতেও হওয়ার সম্ভাবনা অনিশ্চিত।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, যে আদেশ এখনো বাস্তবায়িত হয়নি, সেই আদেশের কপি জমা দিতে বলা আবেদনকারীদের হয়রানির শামিল। যারা এ ধরনের সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন, তারা যদি নিজেরা একই পরিস্থিতিতে পড়তেন, তবে বিষয়টি বুঝতে পারতেন বলে মন্তব্য করেন তিনি। এ প্রসঙ্গে তিনি কবির ভাষায় উল্লেখ করেন—
“কী যাতনা বিষে বুঝিবে সে কিসে,
কভু আশীবিষে দংশেনি যারে।”
চিঠিতে গ্রেড সংক্রান্ত সমস্যার কথাও তুলে ধরা হয়। বেসরকারি স্কুলে সহকারী শিক্ষকরা ৯ম গ্রেডে বেতন পেলেও সরকারিকরণের পর তাদের ১০ম গ্রেডে এডহক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে বেসরকারি আমলের চাকরির অর্ধেক সময় গণনা করে কার্যকর চাকরিকাল নির্ধারণ করা হয়েছে। ফলে শিক্ষকরা একদিকে গ্রেড হারিয়েছেন, অন্যদিকে দীর্ঘ কর্মজীবনের একটি বড় অংশ মূল্যায়নের বাইরে চলে গেছে।
এতে শিক্ষকরা নিজেদের সর্বস্বহারা বলে মনে করছেন। জাতীয়করণের মাধ্যমে আত্মীকরণ হয়ে পিআরএল শেষে পেনশনের আবেদন করা এসব শিক্ষক জীবনের পুরো সময়ই বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কাটিয়েছেন। ফলে তারা নামমাত্র পেনশন পাবেন।
চিঠিতে আরও উল্লেখ করা হয়, অনেক শিক্ষক-কর্মচারী কন্যাদায়গ্রস্ত পিতা-মাতা, কেউবা গুরুতর অসুস্থ। পেনশনের সামান্য অর্থ পাওয়ার আশায় তারা জীবনের শেষ প্রান্তে অপেক্ষা করছেন। কিন্তু আইনি জটিলতায় পড়ে অনেকেই অর্থাভাবে মানবেতর জীবনযাপন করছেন।
তারা আশা করেছিলেন, পেনশনের অর্থ দিয়ে চিকিৎসা বা পারিবারিক দায়িত্ব পালন করতে পারবেন। কিন্তু বাস্তবে সেই স্বপ্ন ভেঙে যাচ্ছে। সারা জীবন গ্রামে শিক্ষকতা করার পর বৃদ্ধ বয়সে আইনের মারপ্যাঁচে পড়ে তাদের দুর্দশা চরমে পৌঁছেছে।
চিঠির শেষে বলা হয়, আইন মানুষের কল্যাণের জন্য হওয়া উচিত। যারা সারা জীবন দেশ গঠনে অবদান রেখেছেন, তাদের জীবনের শেষ সময়ে ন্যূনতম সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। শিক্ষকদের সমস্যার সমাধানে মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণের আহ্বান জানানো হয়।
এ বিষয়ে সদ্য সরকারিকৃত মাধ্যমিক বিদ্যালয় অ্যাসোসিয়েশনের নেতৃবৃন্দকে সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তর ও মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনা করে কার্যকর ভূমিকা রাখার আহ্বান জানানো হয়েছে।
সবশেষে তিনি মাউশি ও শিক্ষামন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানান, নিয়মিতকরণ বা স্থায়ীকরণের শর্ত বাদ দিয়ে সহজ পদ্ধতিতে পেনশন, আনুতোষিক ও অন্যান্য ন্যায্য পাওনা দ্রুত প্রদানের জন্য মানবিক পদক্ষেপ গ্রহণ করা হোক, যাতে শিক্ষকরা মরণোত্তর পেনশনের ঝুঁকি থেকে রক্ষা পান।
১৫০ বার পড়া হয়েছে