মহাকালের রুদ্রতন্ত্রীতে বৈশাখী আলাপ: বাংলা কবিতার দর্পণে নতুনের সৃজন-বেদনা
সোমবার, ১৩ এপ্রিল, ২০২৬ ৭:১৮ পূর্বাহ্ন
শেয়ার করুন:
সময় কোনো স্থির চিত্রপট নয়, বরং এক নিরন্তর বহমান নদী। তার কোনো কূল নেই, কিনারা নেই; আছে শুধু আবর্ত আর বাঁকবদল। বৈশাখ কেবল একটি মাসের নাম নয়, কিংবা পঞ্জিকার পাতায় আটকে থাকা কোনো শুষ্ক তারিখও নয়। এটি বাঙালির আত্মানুসন্ধানের এক গভীর দর্পণ।
মহাকালের রুদ্রবীণায় যখন নতুন সুর বাজে, তখন সেই ঝংকারে পুরনো জীর্ণতা খসে পড়ে। বাংলা কবিতার বিশাল ক্যানভাসে বৈশাখী চৈতন্যের যে বহুমাত্রিক প্রকাশ আমরা দেখি, তা যেন বাঙালির সামষ্টিক অবচেতনের এক অবিচ্ছিন্ন প্রবাহ। ফরাসি দার্শনিক অঁরি বার্গসঁ সময়কে দেখেছিলেন মানুষের অন্তরের এক অবিচ্ছেদ্য ‘কালপ্রবাহ’ হিসেবে। আমাদের বাংলা কবিতাতেও বৈশাখ ঠিক তেমনি—কখনো তা রুক্ষ ধুলোবালি, কখনো বা নতুন জীবনের শঙ্খধ্বনি।
পেছনের দিকে তাকালে দেখা যায়, মধ্যযুগের বাংলা কাব্যে বৈশাখ বা নববর্ষের কোনো আধুনিক রোমান্টিক রূপ ছিল না। তখন বৈশাখ ছিল মূলত জীবনসংগ্রামের এক কঠিন ঋতু। কবিকঙ্কণ মুকুন্দরাম চক্রবর্তীর ‘চণ্ডীমঙ্গল’ কাব্যে যখন কালকেতু আর ফুল্লরার বারমাস্যা দেখি, তখন সেখানে বৈশাখ আসে প্রখর দাবদাহ আর দারিদ্র্যের কশাঘাত নিয়ে। সেই যুগের কৃষিজীবী মানুষের কাছে বৈশাখ ছিল রোদে পোড়া তামাটে মাঠ আর ঘাম ঝরানো ক্লান্তির নাম। কিন্তু উনবিংশ শতাব্দীর রেনেসাঁ বা নবজাগরণের ছোঁয়ায় বাঙালির চিন্তাজগতে যখন আধুনিকতার হাওয়া লাগলো, তখন থেকেই বৈশাখ তার এই প্রথাগত রূপ পাল্টে এক আধ্যাত্মিক ও শৈল্পিক মাত্রায় উন্নীত হলো। কবিরা অনুভব করলেন, বৈশাখ মানে কেবল প্রকৃতি নয়, বৈশাখ মানে অন্তরের শুদ্ধি।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাছে বৈশাখ মানে এক ‘রুদ্র সন্ন্যাসী’। তিনি বৈশাখকে দেখেছিলেন এক জীবন্ত সত্তা হিসেবে, যিনি জগতের সমস্ত জঞ্জাল সরিয়ে এক প্রসন্ন নির্মলতা নিয়ে আসেন। তাঁর কাছে নববর্ষ মানে প্রলয়ের ভেতর দিয়ে নবজন্মের আবাহন। রবীন্দ্রকবিতায় বৈশাখ কেবল গ্রীষ্মের উত্তাপ নয়, বরং তা এক তপশ্চর্যা। তিনি যখন লিখছেন—
"এসো, এসো, এসো হে বৈশাখ
তাপস নিঃশ্বাস বায়ে
মুমূর্তুরে দাও উড়ায়ে
বৎসরের আবর্জনা দূর হয়ে যাক॥
যাক পুরাতন স্মৃতি, যাক ভুলে-যাওয়া গীতি,
অশ্রুবাষ্প সুদূরে মিলাক॥
মুছে যাক গ্লানি, ঘুচে যাক জরা,
অগ্নিস্নানে শুচি হোক ধরা।
রসের আবেশরাশি শুষ্ক করি দাও আসি,
আনো আনো আনো তব প্রলয়ের শাঁখ।
মায়ার কুজ্ঝটিজাল যাক দূরে যাক॥"
এই যে ‘অগ্নিস্নান’, এই শব্দটির ভেতর লুকিয়ে আছে এক গভীর দর্শন। আগুনের দহন ছাড়া যেমন সোনা খাঁটি হয় না, তেমনি হৃদয়ের মালিন্য দূর করতেও এক ধরনের রুদ্র দহনের প্রয়োজন। রবীন্দ্রনাথের এই বৈশাখ বন্দনা কোনো সাধারণ উৎসবের গান নয়, এটি এক ধরনের ‘ক্যাথারসিস’ বা আত্মশুদ্ধির প্রক্রিয়া। তিনি পুরনোকে আঁকড়ে ধরে থাকাকে জরা ও মৃত্যুর নামান্তর মনে করতেন।
তবে রবীন্দ্রনাথের বৈশাখ সবসময় কেবল শান্ত ও সমাহিত নয়। দুর্যোগের ঘনঘটার মাঝেও তিনি বৈশাখকে দেখেছেন এক অমোঘ শক্তিরূপে। তাঁর অন্য একটি কবিতায় দেখা যায় এক ভিন্ন সুর—
"নববর্ষ এল আজি দুর্যোগের ঘন অন্ধকারে;
আনে নি আশার বাণী, দেবে না সে করুণ প্রশ্রয়;
প্রতিকূল ভাগ্য আসে হিংস্র বিভীষিকার আকারে—
তখনি সে অকল্যাণ যখনি তাহারে করি ভয়।"
এখানে তিনি বলছেন, বৈশাখ কোনো মিথ্যে সান্ত্বনা নিয়ে আসে না। বরং সে যখন আসে, ভয়াল রূপেই আসে। কিন্তু সেই ভয়কে জয় করাই হলো মানুষের প্রকৃত ধর্ম। রুদ্রের এই আগমনে যে মানুষ ভীত হয় না, সেই প্রকৃতপক্ষে নতুনকে বরণ করার যোগ্য।
রবীন্দ্রনাথ যেখানে বৈশাখকে এক আধ্যাত্মিক সন্ন্যাসীরূপে কল্পনা করেছেন, বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম সেখানে তাকে করে তুলেছেন অন্যায়ের বিরুদ্ধে এক প্রলয়ঙ্করী লড়াইয়ের সেনাপতি। নজরুলের কবিতায় কালবৈশাখী কেবল প্রকৃতির ঝড় নয়, বরং এটি ব্রিটিশ উপনিবেশবাদের বিরুদ্ধে এক প্রচণ্ড রাজনৈতিক প্রতিরোধের রূপক। তাঁর চোখে ধ্বংসই হলো নতুন সৃষ্টির প্রথম ধাপ। তিনি যখন চিৎকার করে বলেন—
"তোরা সব জয়ধ্বনি কর! তোরা সব জয়ধ্বনি কর!!
ঐ নূতনের কেতন ওড়ে কালবোশেখির ঝড়।
তোরা সব জয়ধ্বনি কর! তোরা সব জয়ধ্বনি কর!!
আস্ছে এবার অনাগত প্রলয়–নেশায় নৃত্য–পাগল,
সিন্ধু–পারের সিংহ–দ্বারে ধমক হেনে ভাঙল আগল!
মৃত্যু–গহন অন্ধকুপে, মহাকালের...
ধ্বংস দেখে ভয় কেন তোর? — প্রলয় নূতন সৃজন-বেদন!
আসছে নবীন-জীবন-হারা অ-সুন্দরে করতে ছেদন!"
নজরুলের এই ‘সৃজন-বেদন’ শব্দবন্ধটি কি অদ্ভুত ব্যঞ্জনা তৈরি করে! একটি শিশু যখন জন্ম নেয়, মা যেমন অসহ্য বেদনা সহ্য করেন, তেমনি এক নতুন ভোরের জন্মের জন্য কালবৈশাখীর এই প্রলয়ঙ্করী ধ্বংসের বেদনাও অপরিহার্য। নজরুলের কাছে বৈশাখ মানে পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙা, অ-সুন্দরের বিনাশ এবং জীবনের জয়গান। ব্রিটিশ শাসনামলের সেই অন্ধকার দিনে নজরুলের এই বৈশাখী কবিতাগুলো বাঙালির রক্তে যে নাচন জাগিয়েছিল, তা আজও অমর হয়ে আছে।
নজরুলের ঝড় থামলে আমরা যখন জীবনানন্দ দাশের কবিতার বনলতা সেনের মতো স্নিগ্ধ ছায়ায় গিয়ে দাঁড়াই, তখন বৈশাখের এক অন্য রূপ ধরা পড়ে। জীবনানন্দের কাছে বৈশাখ মানে রুদ্র সন্ন্যাসী কিংবা বিদ্রোহী ঝড় নয়, বরং তা প্রকৃতির এক রহস্যময় রূপান্তর। তাঁর কবিতায় বৈশাখী দুপুরের নির্জনতা আর বিকেলের ম্লান আলো এক বিষণ্ণ নস্টালজিয়া তৈরি করে। ইকো-ক্রিটিসিজম বা পরিবেশবাদী দর্শনের চোখে দেখলে দেখা যায়, জীবনানন্দ বৈশাখকে মানুষের চেয়ে প্রকৃতির নিজের প্রয়োজনে বেশি দেখেছেন। তাঁর কবিতায় বৈশাখ যখন আসে, তখন আকাশ হয়ে ওঠে এক অদ্ভুত ক্যানভাস—
"ওই যে পূর্ব তোরণ-আগে দীপ্ত নীলে, শুভ্র রাগে
প্রভাত রবি উঠলো জেগে দিব্য পরশ পেয়ে,
নাই গগণে মেঘের ছায়া যেন স্বচ্ছ স্বর্গকায়া
ভুবন ভরা মুক্ত মায়া..."
জীবনানন্দের বৈশাখ এক নীল রঙের নির্জনতা। তাঁর ‘বর্ষ-আবাহন’ কবিতায় প্রকৃতির এই যে শুভ্রতা আর মুক্তির আনন্দ, তা এক অলৌকিক অনুভূতি জাগায়। মানুষের যান্ত্রিক জীবনের কোলাহল থেকে দূরে গিয়ে একাকী প্রান্তরের ধুলোবালির মাঝে তিনি যে মুক্তি খুঁজে পান, তা-ই তাঁর বৈশাখী চেতনা।
আবার, বাংলা কবিতার ইতিহাসে ফররুখ আহমদ বৈশাখকে চিত্রিত করেছেন এক অদ্ভুত দুর্ধর্ষতা আর শাশ্বত শক্তির সংমিশ্রণে। তাঁর কাছে বৈশাখ কোনো সাধারণ ঋতু নয়, বরং এক মহাশক্তির দূত। তিনি বৈশাখকে দেখেছেন এক ‘নকীব’ বা অগ্রদূত হিসেবে, যে ধ্বংসের খবর নিয়ে আসে কিন্তু লক্ষ্য তার পুনর্গঠন। তাঁর কবিতায় বৈশাখের যে গতিশীলতা, তা যেন এক মহাজাগতিক অশ্বের ক্ষিপ্রতা।
"ধ্বংসের নকীব তুমি হে দুর্বার, দুর্ধর্ষ বৈশাখ
সময়ের বালুচরে তোমার কঠোর কণ্ঠে
শুনি আজ অকুণ্ঠিত প্রলয়ের ডাক॥
সংগ্রামী তোমার সত্তা অদম্য, অনমনীয়—
বজ্র দৃঢ় প্রত্যয় তোমার..."
ফররুখ আহমদের এই দর্শনে বৈশাখ মানেই সংগ্রাম। তিনি মানুষের জড়তা আর স্থবিরতাকে আঘাত করতে চেয়েছিলেন। তাঁর অন্য একটি বিখ্যাত কবিতায় বৈশাখকে এক কালো ঘোড়ার সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে—
"বৈশাখের কালো ঘোড়া উঠে এলো।
বন্দর, শহর পার হয়ে সেই ঘোড়া যাবে দূর কোকাফ মুলুকে,
অথবা চলার তালে ছুটে যাবে কেবলি সম্মুখে
প্রচণ্ড আঘাতে পায়ে পিষে যাবে অরণ্য, প্রান্তর।"
এই ‘কালো ঘোড়া’র প্রতীকটি অত্যন্ত শক্তিশালী। এটি কেবল একটি ঝড় নয়, এটি যেন ইতিহাসের সেই গতিবেগ, যা কোনো বাধাই মানতে চায় না। কোকাফ মুলুকের সেই কাল্পনিক রোমান্টিকতা থেকে শুরু করে রাজপথের ধুলোবালি—সবই এই ঘোড়ার পদতলে একাকার হয়ে যায়। ফররুখের বৈশাখ তাই এক অজেয় শক্তির নাম।
কবিতার এই গম্ভীর ও দার্শনিক আলোচনার ভিড়ে সুকুমার রায়ের বৈশাখ আমাদের একটু হাসাতে শেখায়, শেখায় সহজভাবে নতুনকে বরণ করতে। বড়দের বৈশাখ যখন আধ্যাত্মিকতা আর বিদ্রোহের চাপে নুইয়ে পড়ে, সুকুমারের বৈশাখ তখন এক দুষ্টু ছেলের মতো হাত বাড়িয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। তাঁর কাছে পুরনো বছর মানে এক বৃদ্ধ মানুষ, যে বিদায় নিচ্ছে, আর নতুন বছর মানে এক চঞ্চল প্রাণ।
"বর্ষ গেল বর্ষ এল,
বৃদ্ধ বছর উধাও হ’ল ভূতের মুলুক খুঁজি।
নূতন বছর এগিয়ে এসে হাত পাতে ঐ দ্বারে,
বল্ দেখি মন মনের মতন কি দিবি তুই তারে?"
সুকুমার রায়ের এই শিশুতোষ ছড়ার আড়ালে কিন্তু এক গভীর দর্শন লুকিয়ে আছে। আমরা প্রায়ই ভাবি নতুনকে কী দেব? আসলে নতুন বছর আমাদের কাছ থেকে কোনো বৈষয়িক বস্তু চায় না, সে চায় আমাদের মনের সারল্য। তাঁর ‘বর্ষ শেষ’ কবিতায় দেখা যায় সেই বিদায় মুহূর্তের এক মজাদার বর্ণনা, যা বড়দের জগতকেও মনে করিয়ে দেয় যে সময় চিরস্থায়ী নয়। পুরনো বছরকে ‘ভূতের মুলুকে’ পাঠিয়ে দেওয়ার মধ্যে যে এক ধরনের নিস্পৃহতা আছে, তা জীবনের এক পরম সত্য।
নাগরিক যান্ত্রিকতা আর গম্ভীর দর্শনের বাইরেও এক বৈশাখ আছে, যা মাটির প্রদীপ আর রাখালের বাঁশির সুরে গাঁথা। পল্লীকবি জসীমউদ্দীনের কবিতায় বৈশাখ মানে গ্রামের সেই ধুলো ওড়া পথ, মেলা আর কৃষকের ঘাম। সেখানে বৈশাখ কোনো রুদ্র সন্ন্যাসী নয়, বরং সে এক ঘরোয়া অতিথি। চৈত্র সংক্রান্তির গাজন থেকে শুরু করে বৈশাখের হালখাতা—সবই তাঁর কবিতায় এক নিবিড় মমতায় ধরা দিয়েছে।
"বোশেখ শেষে বালুচরের বোরো ধানের থান,
সোনায় সোনা মেলিয়ে দিয়ে নিয়েছে কেড়ে প্রাণ।"
জসীমউদ্দীনের এই চরণে বৈশাখ আসে ফসলের আশীর্বাদ নিয়ে। বোশেখ শেষের মাঠে যখন সোনালি ধান দোল খায়, তখন কৃষকের মনে যে আনন্দের সঞ্চার হয়, তার চেয়ে বড় নান্দনিকতা আর কী হতে পারে? জসীমউদ্দীনের বৈশাখ মানে কেবল ঝড় নয়, জসীমউদ্দীনের বৈশাখ মানে মাটির সঙ্গে মানুষের সেই আদি ও অকৃত্রিম বন্ধন।
বৈশাখের কবিতায় আমরা সাধারণত পুরুষালি তেজ আর প্রলয়ঙ্করী ধ্বংসের বর্ণনা বেশি পাই। কিন্তু সুফিয়া কামালের মতো নারী কবিদের হাত ধরে বৈশাখ পেয়েছে এক ভিন্ন মাত্রা। তাঁদের কবিতায় বৈশাখ কেবল ‘রুদ্র’ নয়, বরং তা এক ত্যাগের প্রতিচ্ছবি। ঝড়ের পর যখন প্রকৃতি শান্ত হয়, যখন রুক্ষ মাটিতে বৃষ্টির ছোঁয়া লাগে, তখন সেই স্নিগ্ধতাকেই তাঁরা বড় করে দেখেছেন। তাঁদের কবিতায় বৈশাখ আসে মাতৃত্বের মমতা নিয়ে, যে দহন সহ্য করেও আগামীর অঙ্কুরকে বাঁচিয়ে রাখে। ধ্বংসের চেয়ে সৃষ্টি আর পালনের প্রতি এই যে মমতা, তা বাংলা কবিতার বৈশাখী চেতনাকে এক পূর্ণতা দান করেছে।
উল্লেখযোগ্য ভাবে বিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে, বিশেষ করে ১৯৫০ ও ৬০-এর দশকে বাংলা কবিতায় বৈশাখ এক অভূতপূর্ব রাজনৈতিক রূপ লাভ করে। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী যখন বাঙালির সংস্কৃতি ও ভাষার ওপর আঘাত হানলো, তখন পহেলা বৈশাখ হয়ে উঠলো প্রতিরোধের এক দুর্গ। কবিরা অনুভব করলেন, বৈশাখ পালনের মাধ্যমেই বাঙালি তার অসাম্প্রদায়িক ও জাতিসত্তাগত পরিচয়কে বিশ্বের দরবারে তুলে ধরতে পারে।
তাঁরা বৈশাখকে কেবল একটি উৎসবে সীমাবদ্ধ না রেখে তাকে বানিয়ে তুললেন জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের ইশতেহার। শামসুর রাহমান, হাসান হাফিজুর রহমান কিংবা সৈয়দ শামসুল হকের কবিতায় বৈশাখী ঝড় মানেই হলো স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে আমজনতার গর্জন। সেই সময়ে বৈশাখ বন্দনা আর নিছক প্রকৃতি বন্দনা থাকেনি, তা হয়ে উঠেছিল রাজপথের শ্লোগান।
আজকের প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে বৈশাখ নিয়ে আমাদের ভাবনাগুলো কি বদলে গেছে? বিশ্বায়ন আর কর্পোরেট সংস্কৃতির এই যুগে বৈশাখ এখন অনেক ক্ষেত্রে এক রঙিন উৎসবে পরিণত হয়েছে। টেলিভিশনের পর্দায় কিংবা সোশ্যাল মিডিয়ার ওয়ালে আমরা যখন বৈশাখ পালন করি, তখন সেই মাটির সোঁদা গন্ধ কিংবা জসীমউদ্দীনের সেই মেঠো সুর কি কোথাও হারিয়ে যাচ্ছে?
ফরাসি দার্শনিক জঁ বোদ্রিয়ার যে ‘সিমুলাক্রা’র কথা বলেছিলেন—যেখানে আসল বাস্তবের চেয়ে প্রতিচ্ছবিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে—আজকের বৈশাখ যেন অনেকটা তেমনই। পান্তা-ইলিশের সেই পুরনো অভাবের প্রতীক আজ বিলাসবহুল রেস্টুরেন্টের দামি মেন্যু। আজকের কবিরা তাঁদের কবিতায় এই বিচ্যুতিকে অত্যন্ত বেদনার সঙ্গে তুলে ধরছেন। বর্তমানের কবিতায় বৈশাখ আর কেবল নতুনের জয়গান গায় না, বরং হারানো ঐতিহ্যের জন্য দীর্ঘশ্বাস ফেলে। এই যে যান্ত্রিকতা আর নস্টালজিয়ার দ্বন্দ্ব, এটাই সমকালীন বৈশাখী কবিতার মূল সুর।
বাংলা কবিতায় বৈশাখ কেবল একটি ঋতু নয়, বরং এটি বাঙালির জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য মহাকাব্য। রবীন্দ্রনাথের আধ্যাত্মিকতা, নজরুলের বিদ্রোহ, জীবনানন্দের নির্জনতা, ফররুখের গতি সবকিছু মিলেই তৈরি হয়েছে আমাদের এই বৈশাখী সত্তা।
হেগেলীয় দ্বন্দ্বমূলক দর্শনের কথা যদি ভাবি—পুরনো বছরের জরাজীর্ণতা যদি হয় ‘থিসিস’ আর বৈশাখী ঝড়ের প্রলয় যদি হয় ‘অ্যান্টি-থিসিস’, তবে এই দুয়ের মিলনে যে নতুন বছরের স্নিগ্ধ সকাল জন্মে, তা-ই হলো আমাদের ‘সিন্থেসিস’। কাল পাল্টাবে, মানুষের জীবনধারা পাল্টাবে, হয়তো কবিতার ছন্দও বদলে যাবে—কিন্তু বৈশাখের সেই মূল আবেদন কখনোই ফুরাবে না।
মহাকালের রুদ্রতন্ত্রীতে যখনই নতুন কোনো আলাপ শুরু হবে, তখনই আমরা কবিদের চরণে খুঁজে পাবো সেই চিরন্তন সত্য—ধ্বংসের মাঝেই সৃষ্টির বীজ নিহিত। জরাজীর্ণকে বিদায় দিয়ে নতুনের এই যে অভিষেক, এটিই আমাদের জীবনের পরম সার্থকতা। বৈশাখ আমাদের শিখিয়ে দিয়ে যায়, সূর্য একবার অস্ত গেলেও সে আবার উদিত হওয়ার অধিকার রাখে। বাংলা কবিতা যতদিন বেঁচে থাকবে, ততদিন বৈশাখী চৈতন্য আমাদের হৃদয়ে এক অন্তহীন প্রেরণা হয়ে বাজবে—কখনো রুদ্র রবে, কখনো বা শান্ত ভোরের শিশিরভেজা সুরে। এই তো জীবন, এই তো আমাদের শাশ্বত বৈশাখ।
লেখক: কবি ও প্রাবন্ধিক।
১৩৪ বার পড়া হয়েছে