সেলিম আল দীন ও বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রমে নাট্যকলা
শুক্রবার, ১০ এপ্রিল, ২০২৬ ২:৫৯ অপরাহ্ন
শেয়ার করুন:
বাঙলা নাটকের বিবর্তনতাত্ত্বিক ইতিহাসে সেলিম আল দীন কেবল একজন নাট্যকার বা নির্দেশক হিসেবে নন, বরং তিনি আবির্ভূত হয়েছিলেন এক নবতর নন্দনতাত্ত্বিক দর্শনের রূপকার এবং প্রাতিষ্ঠানিক নাট্যশিক্ষার পথিকৃৎ হিসেবে।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা-উত্তর নাট্য আন্দোলন ও উচ্চশিক্ষার পরিসরে তাঁর ভূমিকা ছিল মৌলিক ও যুগান্তকারী, যেখানে তিনি প্রচলিত ইউরোপীয় প্রোসেনিয়াম থিয়েটারের কৃত্রিম কাঠামোকে অস্বীকার করে বাঙালির নিজস্ব নন্দনতাত্ত্বিক ঐতিহ্যের ওপর ভিত্তি করে এক নতুন নাট্যভাষা নির্মাণ করেছিলেন । সেলিম আল দীনের শিল্পভাবনার মূলে ছিল উত্তর-ঔপনিবেশিক চেতনা এবং ঐতিহ্যের সঙ্গে আধুনিকতার এক নিবিড় সংশ্লেষ, যা আজ বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার পাঠ্যক্রমে এক অপরিহার্য অধ্যায় হিসেবে স্বীকৃত।
সৃজনশীল জীবনের শুরুতে তিনি কবি হতে চেয়েছিলেন এবং বেশ কিছু কবিতাও প্রকাশ করেছিলেন। তবে তাঁর শিক্ষক ও প্রখ্যাত নাট্যকার মুনীর চৌধুরী তাঁকে নাট্যচর্চায় মনোনিবেশ করতে উৎসাহিত করেন। মুনীর চৌধুরীর সেই দূরদর্শী পরামর্শই বাঙলা নাটককে এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে দেয়। ছাত্রাবস্থাতেই ১৯৬৮ সালে তিনি তাঁর প্রথম নাটক রচনা করেন এবং ১৯৬৯ সালে তাঁর প্রথম রেডিও নাটক 'বিপরীত তমসায়' প্রচারিত হয় । ১৯৭০ সালে টেলিভিশনের জন্য তিনি লেখেন 'লিবিয়াম' যা পরবর্তীতে 'ঘুম নেই' নামে প্রচারিত হয়। ১৯৭২ সালে আমিরুল হক চৌধুরীর নির্দেশনায় তাঁর প্রথম মঞ্চ নাটক 'সর্প বিষয়ক গল্প' মঞ্চস্থ হওয়ার মাধ্যমেই তাঁর প্রকৃত নাট্যযাত্রার সূচনা ঘটে ।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর প্রাতিষ্ঠানিক অবদান বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার ইতিহাসে একটি মাইলফলক। ১৯৭৪ সালে তিনি এই বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে প্রভাষক হিসেবে যোগদান করেন। তবে তাঁর স্বপ্ন ছিল নাট্যচর্চাকে একটি পূর্ণাঙ্গ একাডেমিক শাস্ত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা। সেই স্বপ্নের বাস্তব রূপ ঘটে ১৯৮৬ সালে, যখন তাঁর একক প্রচেষ্টায় বাংলাদেশে প্রথম স্বতন্ত্র 'নাটক ও নাট্যতত্ত্ব' বিভাগ প্রতিষ্ঠিত হয়। তিনি ছিলেন এই বিভাগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি। বিশ্ববিদ্যালয়ের এই পাঠ্যক্রমটি তিনি এমনভাবে বিন্যাস করেছিলেন যেখানে প্রাচ্যের নাট্যতত্ত্বের সাথে পাশ্চাত্যের তুলনামূলক অধ্যয়ন সম্ভব হয় এবং শিক্ষার্থীরা কেবল অভিনয়ের কৌশল নয়, বরং নাটকের ইতিহাস ও তাত্ত্বিক ভিত্তি সম্পর্কেও গভীর জ্ঞান অর্জন করতে পারে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগের কারিকুলাম বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সেলিম আল দীন এখানে একটি গভীর দার্শনিক ও সৃজনশীল দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিফলিত করেছেন। বর্তমানে এই বিভাগে স্নাতক সম্মান ছাড়াও স্নাতকোত্তর পর্যায়ে পাঁচটি বিশেষায়িত শাখায় পাঠদান করা হয়, যার মধ্যে রয়েছে আর্ট অফ ড্রামাটার্জি, আর্ট অফ পারফরম্যান্স এবং আর্ট অফ প্লে ডিরেকশন। স্নাতক ও স্নাতকোত্তর উভয় পর্যায়েই তাত্ত্বিক আলোচনা, পদ্ধতিগত গবেষণা, ল্যাবরেটরি কোর্স এবং ফিল্ডওয়ার্ক বা মাঠকর্ম পাঠ্যসূচির অবিচ্ছেদ্য অংশ। এছাড়া তাঁর সম্পাদনায় প্রকাশিত 'থিয়েটার স্টাডিজ' (Theatre Studies) নামক গবেষণাধর্মী পত্রিকাটি নাট্যবিদ্যার তাত্ত্বিক ও প্রায়োগিক আলোচনায় এক অপরিহার্য দলিলে পরিণত হয়েছে। ১৯৯৫ সালে তিনি 'মধ্যযুগের বাঙলা নাট্য'র ওপর গবেষণা করে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন।
সেলিম আল দীনের শিল্পদর্শনের সবচেয়ে প্রভাবশালী দিকটি হলো তাঁর উদ্ভাবিত 'দ্বৈতাদ্বৈতবাদী শিল্পতত্ত্ব'। এই তত্ত্বের মাধ্যমে তিনি ইউরোপীয় রেনেসাঁ-পরবর্তী শিল্প-বিভাজনকে প্রত্যাখ্যান করে বাঙালির আদি ও মধ্যযুগীয় নন্দনতত্ত্বের আলোকে কবিতা, নাটক, সঙ্গীত ও নৃত্যকে এক অখণ্ড শিল্প হিসেবে দেখার প্রস্তাব করেন । তাঁর মতে, একটি সার্থক শিল্পকর্মের মধ্যে সাহিত্যের সকল শাখার উপস্থিতি থাকতে পারে। শিল্পের এই প্রাচীর ভেঙে ফেলার কৌশলের নাম দিয়েছিলেন তিনি 'আঙ্গিক-অবলুপ্তির কৌশল' । দ্বৈতাদ্বৈতবাদী শিল্পরীতিতে লেখা তাঁর নাটকগুলোতে নিচুতলার মানুষের সামাজিক ও নৃতাত্ত্বিক পটে তাদের বহুস্তরিক বাস্তবতাই উঠে আসে । এই তত্ত্বটি আজ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় এবং ভারতের যাদবপুর ও রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রমে সগৌরবে পঠিত হচ্ছে। বিশেষ করে তাঁর পিএইচডি অভিসন্দর্ভ 'মধ্যযুগের বাঙলা নাট্য' গ্রন্থটি বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের গবেষণায় একটি আকর গ্রন্থ হিসেবে বিবেচিত, যেখানে তিনি অকাট্য প্রমাণের মাধ্যমে দেখিয়েছেন যে বাঙলা নাটকের ইতিহাস ইউরোপীয় নাটকের চেয়েও প্রাচীন ও সমৃদ্ধ । এছাড়া তাঁর সংকলিত 'বাঙলা নাট্যকোষ' বাংলাদেশের একমাত্র পূর্ণাঙ্গ নাট্য-বিশ্বকোষ হিসেবে শিক্ষার্থীদের জন্য অপরিহার্য রেফারেন্স বুক । নাটক রচনার ক্ষেত্রে তিনি উত্তর-ঔপনিবেশিক চেতনাকে প্রাধান্য দিয়েছেন। তাঁর মতে, ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন বাঙালির সাহিত্যিক মননকে দাসত্বে অভ্যস্ত করে তুলেছে। এই মানসিক দাসত্ব থেকে মুক্তির জন্য তিনি বাঙালির হাজার বছরের নাট্য-ইতিহাসকে পুনর্নির্মাণ করেন।
'চাকা' ও 'কিত্তনখোলা' নাটকে তিনি যে বি-উপনিবেশায়ন বা ডিকলোনাইজেশন প্রক্রিয়ার প্রয়োগ ঘটিয়েছেন, তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ । বিশেষ করে 'চাকা' নাটকে তিনি পাশ্চাত্য রীতি অনুযায়ী ইংরেজি ব্যাকরণনির্ভর বিরামচিহ্ন বর্জন করে প্রাক-ঔপনিবেশিক বাঙলা যতিচিহ্ন ব্যবহারের পক্ষপাতী ছিলেন । তিনি প্রমাণ করেছেন যে, আধুনিকতা মানে ইউরোপীয় আঙ্গিকের অন্ধ অনুকরণ নয়, বরং ঐতিহ্যের পথ বেয়ে নতুনতর কল্পনা ও মানবিক প্রকাশ। তাঁর উদ্ভাবিত 'কথানাট্য' বা আখ্যানধর্মী নাট্যরীতি আজ উচ্চশিক্ষার পাঠ্যসূচিতে এক বিশেষ স্থান দখল করে আছে । এটি এমন এক ধরনের নাট্য আঙ্গিক যা বাঙালির আদি ও মধ্যযুগের পাঁচালি, কথকতা বা মঙ্গলকাব্যের বর্ণনাধর্মী রীতির আধুনিক সংস্করণ। তাঁর মতে, বাঙালির নাট্যচেতনা মূলত উপাখ্যানকেন্দ্রিক।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের থিয়েটার অ্যান্ড পারফরম্যান্স স্টাডিজ বিভাগের পাঠ্যক্রমেও সেলিম আল দীনের তাত্ত্বিক ও প্রায়োগিক প্রভাব অত্যন্ত নিবিড়। এখানে স্নাতক পর্যায়ের চার বছর মেয়াদী বিএ অনার্স প্রোগ্রামে প্রথম সেমিস্টার থেকেই শিক্ষার্থীদের নাটকের সংজ্ঞায়ন ও পরিবেশনার মৌলিক শব্দভাণ্ডারের সাথে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়। বিশেষ করে রিচার্ড শেকনারের পরিবেশনা তত্ত্বের পাশাপাশি সেলিম আল দীনের গবেষণালব্ধ তত্ত্বসমূহ এখানে পড়ানো হয়। দ্বিতীয় বর্ষের তৃতীয় সেমিস্টারে 'মার্গ-নাট্য' (Marga-natya Texts and Critical Tools) কোর্সে রূপক, ইতিবৃত্ত এবং রসের মতো ধ্রুপদী তত্ত্বসমূহ বিশ্লেষণে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি গৃহীত হয়। চতুর্থ সেমিস্টারে 'লোকধর্মী' (Lokadharmi Texts and Critical Tools) কোর্সে বাংলাদেশের লোকনাট্যের গঠনকাঠামো ও নৃ-তাত্ত্বিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণে শিক্ষার্থীরা সেলিম আল দীনের কাজসমূহকে প্রধান রেফারেন্স হিসেবে ব্যবহার করে। এই কোর্সে বিজয় গুপ্তের পদ্মপুরাণ বা কৃত্তিবাসের রামায়ণের মতো মধ্যযুগীয় আখ্যানের পরিবেশনাগত আঙ্গিক বোঝার ক্ষেত্রে তাঁর পিএইচডি থিসিস 'মধ্যযুগের বাঙলা নাট্য' অপরিহার্য। তৃতীয় বর্ষের ষষ্ঠ সেমিস্টারে 'বাঙলা থিয়েটার (পোস্ট-কলোনিয়াল)' কোর্সে মুনীর চৌধুরী, সাঈদ আহমেদ ও সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর সাথে সেলিম আল দীনের নাটকসমূহ বিস্তারিত পড়ানো হয়। স্নাতকোত্তর পর্যায়ে 'পারফরম্যান্স থিওরি' কোর্সে পোস্ট-কলোনিয়ালিজম ও সাবাল্টার্ন স্টাডিজ ফ্রেমওয়ার্কে তাঁর রচনাগুলো মূল্যায়ন করা হয়। শিক্ষার্থীরা তাঁর নাটক থেকে দৃশ্য অভিনয় করার মাধ্যমে কায়া-সাধনা ও আহার্য অভিনয়ের দেশজ রূপগুলো আয়ত্ত করে।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলা বিভাগে ২০০৩ সাল থেকে স্বতন্ত্রভাবে নাট্যচর্চা শুরু হয় এবং এখানে ফলিত নাট্যকলা বা অ্যাপ্লাইড থিয়েটারের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের কারিকুলামে তত্ত্ব ও ব্যবহারিক কোর্সের অনুপাত রাখা হয়েছে ৪০:৬০, যেখানে ব্যবহারিক প্রয়োগের ওপর অধিক জোর দেওয়া হয়। এখানে শিক্ষার্থীদের জন্য 'এথনিক থিয়েটার স্টাইল' এবং 'ন্যারেটিভ এথনিক স্টাইল' বা বর্ণনাত্মক রীতি হাতে-কলমে শেখানো হয়, যা সরাসরি সেলিম আল দীনের চিন্তার ফসল। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলা বিভাগের শিক্ষার্থীরা নিয়মিতভাবে তাঁর নাটক মঞ্চস্থ করে, যার মধ্যে সাম্প্রতিককালে 'নিমজ্জন' নাটকের সফল মঞ্চায়ন অন্যতম। এই নাটকটি বিশ্ব ইতিহাসের সকল গণহত্যাকে উপজীব্য করে নির্মিত হওয়ায় শিক্ষার্থীরা এর মাধ্যমে মানবিকতার জয়গান এবং ইতিহাসের এক গভীর রাজনৈতিক পাঠ গ্রহণ করতে সক্ষম হয়। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রমে আদি ও মধ্যযুগীয় বাংলা নাটক থেকে শুরু করে আধুনিক কাল পর্যন্ত নাটকের যে বিবর্তন পড়ানো হয়, তাতে সেলিম আল দীনের দ্বৈতাদ্বৈতবাদী শিল্পতত্ত্বকে একটি স্থায়ী তাত্ত্বিক কাঠামো হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এছাড়া জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়েও একইভাবে তাঁর নাট্যদর্শনকে কেন্দ্র করে অ্যাকাডেমিক প্রজেক্ট ও সেমিনার পরিচালিত হয়। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিল্ম ও টেলিভিশন বিভাগে শিল্পের বি-উপনিবেশায়ন আলোচনায় সেলিম আল দীনকে কেন্দ্রীয় গুরুত্ব প্রদান করা হয়। শিক্ষার্থীদের অ্যাকাডেমিক নির্দেশনায় তাঁর নাটক 'ধাবমান' বা 'নিমজ্জন' মঞ্চস্থ করার মাধ্যমে তাঁদের সংলাপ নির্মাণের নতুন কৌশল ও আখ্যানধর্মী অভিনয়ের ব্যাকরণ বুঝতে সাহায্য করা হয়। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলা ও পরিবেশ বিদ্যা বিভাগের পাঠ্যক্রমেও সেলিম আল দীনের প্রভাব প্রবল। এখানে শিক্ষার্থীদের একাডেমিক নির্দেশনায় তাঁর নাটক 'লাঠি' এবং অন্যান্য নিরীক্ষাধর্মী কাজ নিয়মিত প্রদর্শিত হয়। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের কারিকুলামে জাতীয়তাবাদ ও দেশজ নন্দনতত্ত্বের ওপর যে জোর দেওয়া হয়েছে, তা মূলত তাঁর শেকড়সন্ধানী নাট্যতত্ত্বের বাস্তব প্রয়োগ।
সেলিম আল দীনের রচনার একটি বড় অংশ জুড়ে রয়েছে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জীবনতত্ত্ব। তিনি উদ্ভাবন করেন 'নিও এথনিক থিয়েটার' বা নৃ-তাত্ত্বিক নাট্যচর্চা । তিনি কেবল শহরের শিক্ষিত মধ্যবিত্তের জন্য নাটক লেখেননি, বরং তাঁর নজর ছিল প্রান্তিক মানুষের দিকে। তাঁর 'বনপাংশুল' নাটকে মান্দি বা গারো সম্প্রদায়ের জীবন এবং প্রকৃতি ও মানুষের দ্বান্দ্বিক সম্পর্ক ফুটে উঠেছে । তেমনি 'একটি মারমা রূপকথা' নাটকে তিনি পাহাড়ের মানুষের জীবনের রূপক ও উপমা ব্যবহার করেছেন । এই নাটকগুলো পাঠ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার ফলে শিক্ষার্থীরা নৃতাত্ত্বিক বাস্তবতাকে নাট্য আঙ্গিকে রূপান্তরের কৌশল আয়ত্ত করতে সক্ষম হচ্ছে। তাঁর এই নৃতাত্ত্বিক পঠন-পাঠন প্রান্তিক মানুষের জীবনকে শিল্পের মূল কেন্দ্রে নিয়ে আসার এক রাজনৈতিক দায়বদ্ধতাও বটে। তিনি বিশ্বাস করতেন, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনাচরণের মধ্যেই বাঙালির প্রকৃত সংস্কৃতির আদিম ও অকৃত্রিম উপাদানসমূহ টিকে আছে। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ভারতের যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় এবং রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের ড্রামা ও বাংলা বিভাগের সিলেবাসে সেলিম আল দীনের কাজ বিশেষ গুরুত্ব পায় । যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে 'ভারতীয় সাহিত্যতত্ত্ব' ও 'নাট্যশাস্ত্র ও বি-উপনিবেশায়ন' সংক্রান্ত আলোচনায় তাঁর 'মধ্যযুগের বাঙলা নাট্য' গ্রন্থটি প্রধান রেফারেন্স হিসেবে ব্যবহৃত হয়। রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের ড্রামা বিভাগে 'হিস্ট্রি অফ বেঙ্গলি থিয়েটার' এবং 'লোকনাট্য' কোর্সে তাঁর প্রবর্তিত নিও এথনিক থিয়েটার ও কথানাট্য রীতি বিশদভাবে পড়ানো হয়।
সেলিম আল দীন আজ কেবল একটি নাম নন, বরং তিনি একটি পূর্ণাঙ্গ শিল্প-প্রতিষ্ঠানের নাম। বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রমে তাঁর অন্তর্ভুক্তি তরুণ প্রজন্মকে শেকড়ের সন্ধান দেয় এবং ঔপনিবেশিক দাসত্বমুক্ত হয়ে স্বাধীন শিল্প-সত্তা নির্মাণে পথ দেখায় । তাঁর সৃষ্ট শিল্পরীতি আমাদের ঐতিহ্যের ধারায় বিশ্বনন্দনে হাঁটার আত্মমর্যাদা দান করেছে এবং বাংলা নাট্যকলা চর্চাকে নিজস্ব ঐতিহ্যের আলোয় উদ্ভাসিত রেখেছে । তাঁর 'নাট্যাচার্য' উপাধি আজ কেবল একটি বিশেষণ নয়, বরং তা একটি অ্যাকাডেমিক সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তাঁর প্রয়াণের পর এক যুগেরও বেশি সময় অতিক্রান্ত হলেও বাংলাদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলা বিভাগের প্রতিটি কক্ষে ও মঞ্চে তাঁর চিন্তার প্রতিধ্বনি আজও সমানভাবে প্রবহমান।
লেখক: কবি ও প্রাবন্ধিক।
১৫৫ বার পড়া হয়েছে