সর্বশেষ

সাহিত্য

যুদ্ধ নয়; সহমর্মিতাই মানুষের শেষ গন্তব্য

লিটন আব্বাস
লিটন আব্বাস

বৃহস্পতিবার , ৯ এপ্রিল, ২০২৬ ৫:১৩ পূর্বাহ্ন

শেয়ার করুন:
৮৩০ কোটি মানুষের পৃথিবী ও আধিপত্যের মরীচিকায় গুটিকতেক দেশের আগ্রাসন, সম্প্রসারণ, দখল এবং যুদ্ধবাজ মনোভাবের জন্য পৃথিবী দিনদিন বিপন্ন ও শূন্য মহাকাব্যের এক অদ্ভুত বৈপরীত্যের ইতিহাস লিখে চলেছে।

মানুষের অস্তিত্ব এক অমোঘ গাণিতিক ধ্রুবক দ্বারা নিয়ন্ত্রিত—যা শুরু হয় ‘শূন্যে’ এবং শেষও হয় ‘শূন্যে’। আমরা যখন পৃথিবীর আলো দেখি, তখন আমাদের কোনো নাম, পরিচয়, সম্পদ বা অহংকার থাকে না; আমরা থাকি এক রিক্ত, পবিত্র সত্তা। আবার যখন মহাকালের অতল গহ্বরে হারিয়ে যাই, তখন সব অর্জন, পদবী আর জয়গান পেছনে ফেলে সেই একই নিঃস্ব হাতে বিদায় নিতে হয়। এই দুই চিরন্তন সত্যের মাঝে মানুষের যে কয়েক দশকের সংক্ষিপ্ত জীবনকাল, সেখানে কেন এই দখল, কেন এই আধিপত্যের উন্মাদনা? আজ বিশ্বের ২৫৭টি দেশ ও অঞ্চলের প্রায় ৮৩০ কোটি মানুষের ভাগ্য কেন গুটিকয়েক শাসকের মদমত্ততায় পিষ্ট হচ্ছে? এই গুটিকয়েক অধিপতির দম্ভে জিম্মি হয়ে আছে পুরো পৃথিবীর মানুষ।
কেন এই যুদ্ধ? কেন এই অহেতুক রক্তপাত? মনোবিজ্ঞানের ভাষায় এটি ‘মেগালোম্যানিয়া’ বা অতি-ক্ষমতার লোভ। মানুষ যখন নিজের মরণশীলতাকে অস্বীকার করতে চায়, তখনই সে আধিপত্যের মাধ্যমে নিজেকে অমর করার চেষ্টা করে। ‘টেরর ম্যানেজমেন্ট থিওরি’ (টি এম টি) অনুযায়ী, মানুষ তার অবধারিত মৃত্যুকে ভয় পায় বলেই বিশাল নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে একটি কৃত্রিম নিরাপত্তা বলয় তৈরি করতে চায়। তারা ভুলে যায় যে, ইতিহাসের কোনো রাজত্বই—সেটি রোমানদের দাপট হোক, অটোমানদের বিশালতা কিংবা ব্রিটিশদের সূর্যহীন সাম্রাজ্য—শেষ পর্যন্ত টেকেনি—সবই আজ কেবল পাঠ্যবইয়ের ধূসর পাতা। কোনো রাজত্ব বা আধিপত্যই চিরস্থায়ী হয়নি। যে হাতগুলো আজ মারণাস্ত্র নিয়ন্ত্রণ করছে, প্রকৃতির অমোঘ নিয়মে সেগুলোও একদিন ধুলোয় মিশে যাবে। অথচ এই ধ্রুব সত্যটি ক্ষমতার মদমত্ততায় শাসকরা বিস্মৃত হন। মানুষ মনে করে শক্তি দিয়ে সে নিজেকে অমর করবে, কিন্তু তারা ভুলে যায় যে, যে মাটির ওপর তারা রক্ত ঝরাচ্ছে, সেই মাটিতেই একদিন তারা মিশে যাবে।
বর্তমান প্রজন্ম প্রযুক্তিতে বিস্ময়কর উন্নতি করলেও মানসিকভাবে ক্রমশ যান্ত্রিক ও ক্ষমতা-কেন্দ্রিক হয়ে উঠছে। সহমর্মিতার বদলে আধিপত্য এবং সৃজনশীলতার বদলে ধ্বংসাত্মক প্রতিযোগিতাই এখন আধুনিকতার মাপকাঠি। এই যান্ত্রিকতা মানুষকে সহমর্মিতা থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে, যার ফলে যুদ্ধ আজ কেবল সীমান্তে নয়, মানুষের মনেও দানা বাঁধছে।
যুদ্ধ মানে কেবল প্রাণের বিনাশ নয়; এটি একটি জাতির কয়েক দশকের অর্থনৈতিক অর্জনকে ধুলোয় মিশিয়ে দেয় এবং পৃথিবীকে মানুষের বসবাসের অযোগ্য করে তোলে।
ক্ষমতার মোহে মানুষ পৃথিবীকে শ্মশান বানাচ্ছে, কিন্তু সেই শ্মশানে কারোরই জয়মাল্য টিকে থাকবে না। আমাদের টিকে থাকার একমাত্র পথ হলো 'আশা' জিইয়ে রাখা এবং মানুষের প্রতি মানুষের সহমর্মিতা জাগ্রত করা। পৃথিবীটা কোনো নির্দিষ্ট শাসকের নয়, বরং কোটি কোটি প্রাণের সাধারণ আশ্রয়স্থল। আধিপত্যের চেয়ে বড় জয় হলো মানুষের হৃদয়ে বেঁচে থাকা, যা কেবল শান্তির মাধ্যমেই সম্ভব।
বর্তমান তরুণ প্রজন্ম প্রযুক্তিতে বিস্ময়কর উন্নতি করলেও মানসিকভাবে ক্রমশ যান্ত্রিক ও ক্ষমতা-কেন্দ্রিক হয়ে উঠছে। সহমর্মিতার বদলে আধিপত্য এবং সৃজনশীলতার বদলে ধ্বংসাত্মক প্রতিযোগিতাই এখন আধুনিকতার অলিখিত মাপকাঠি। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আর স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থার এই যুগে মানুষের আবেগগুলোও যেন যান্ত্রিক হয়ে পড়ছে। এর ফলে যুদ্ধ এখন আর কেবল সীমান্তে সীমাবদ্ধ নেই; এটি মানুষের মনে, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে এবং অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় দানা বাঁধছে। এই যান্ত্রিকতা মানুষকে অন্য মানুষের কষ্ট অনুধাবন করার ক্ষমতা কেড়ে নিচ্ছে, যার ফলে যুদ্ধ আজ এক 'ভিডিও খেলা'-এর মতো অনুভূতিহীন বিষয়ে পরিণত হয়েছে। কোনো একজন শাসকের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের জন্য একজন সাধারণ মানুষের প্রাণ দেওয়া বা বাস্তুচ্যুত হওয়া কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়।
বর্তমান বিশ্বে সফলতা মানেই অন্যকে ছাপিয়ে যাওয়া বা নিয়ন্ত্রণ করা। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আর পর্দা-নির্ভর এই যুগে মানুষের আবেগগুলোও যেন যান্ত্রিক হয়ে পড়ছে। এর ফলে যুদ্ধ এখন আর কেবল সীমান্তে সীমাবদ্ধ নেই; এটি মানুষের মনে, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে এবং অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় দানা বাঁধছে। এই যান্ত্রিকতা আমাদের অন্য মানুষের আর্তনাদ শোনার ক্ষমতা কেড়ে নিচ্ছে। যখন আমরা অন্যের দুঃখকে কেবল একটি 'সংবাদ প্রবাহ' হিসেবে দেখি, তখন মানবিকতা তার প্রাণ হারায়।
যুদ্ধ মানে কেবল গোলাবারুদ আর মানচিত্রের পরিবর্তন নয়। যুদ্ধ মানে---মানবিক বিপর্যয়---বর্তমানে বিশ্বে যুদ্ধ ও সহিংসতার কারণে রেকর্ড সংখ্যক—প্রায় ১১.৭ কোটি মানুষ—নিজ ভূমি থেকে উচ্ছেদ হয়ে বাস্তুচ্যুত যাযাবর জীবনযাপন করছে। সুদান থেকে গাজা, ইউক্রেন থেকে কঙ্গো—প্রতিটি জনপদই আজ লাশের মিছিলে পরিণত হয়েছে।
একটি যুদ্ধ কেবল একটি দেশকেই ধ্বংস করে না, বরং পুরো বিশ্বের সরবরাহব্যবস্থা ভেঙে দেয়। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, জ্বালানি সংকট এবং মুদ্রাস্ফীতির কারণে বিশ্বের প্রতিটি সাধারণ জীবন আজ দুর্বিষহ। যুদ্ধ মূলত পৃথিবীকে মানুষের জন্য একটি বিষাক্ত ও বসবাসের অযোগ্য নরকে পরিণত করছে।
বর্তমানের যুদ্ধগুলোতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে শিশুরা। ইউনিসেফের (ইউনিসেফ) তথ্যমতে, সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে বসবাসরত কোটি কোটি শিশু অপুষ্টি, শিক্ষা ও মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত।
পৃথিবীব্যাপী মানুষের জীবন আজ মূল্যহীন হয়ে পড়েছে।
অহেতুক যুদ্ধের ফলে পরিবেশের যে ক্ষতি হচ্ছে, তা পৃথিবীকে দ্রুত বসবাসের অযোগ্য করে তুলছে। রাসায়নিক অস্ত্র ও বোমার ব্যবহার মাটিকে বিষাক্ত করছে, বায়ুকে দূষিত করছে এবং পরবর্তী প্রজন্মের জন্য কেবল একটি ধ্বংসস্তূপ রেখে যাচ্ছে!
শান্তির অনিবার্য পথ শান্ত না হলে পৃথিবীতে নামবে অশান্তির ঝড়। সেই ঝড়ে ঝরে পড়বে মানুষ, আধিপত্য, সাম্রাজ্য—সব। ক্ষমতার দম্ভে পৃথিবীটাকে শ্মশান বানিয়ে কারোরই জয়মাল্য টিকে থাকবে না। আধিপত্যের চেয়ে বড় জয় হলো মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নেওয়া। জীবনের শুরু এবং শেষ যেহেতু শূন্যে, তাই মাঝখানের সময়টুকুতে যুদ্ধের কলঙ্ক লেপন না করে মানবিকতাই হওয়া উচিত ছিল পরম লক্ষ্য। মানুষের টিকে থাকার একমাত্র পথ হলো পারস্পরিক সহমর্মিতা এবং এই সত্যটি অনুধাবন করা যে—এই পৃথিবীটা কোনো নির্দিষ্ট শাসক বা শক্তির ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়; এটি কোটি কোটি প্রাণের এক অভিন্ন ঘর।
পৃথিবীর এই পতনোন্মুখ পরিস্থিতি ফেরানো হয়তো কঠিন, কিন্তু অসম্ভব নয়। ২৫৭টি অঞ্চলের ৮৩০ কোটি প্রতিটি দেশের মানুষকে আজ উপলব্ধি করতে হবে যে, একজনের আধিপত্য মানেই অন্যজনের অস্তিত্ব বিপন্ন হওয়া। সেকারণে শান্তিপ্রিয় মানুষের সোচ্চার হতে হবে—অনলাইনে, অফলাইনে, রাজপথে এবং চিন্তার জগতে। প্রতিবাদ জারি রাখতে হবে ভিন্ন ভিন্ন উপায়ে। যুদ্ধবাজদের মনে করিয়ে দিতে হবে যে, তারা নিজেরাও সেই একই 'শূন্য' থেকে এসেছে এবং একই 'শূন্যে' ফিরে যাবে। ৮৩০ কোটি মানুষের সম্মিলিত কণ্ঠস্বর যদি একবার গর্জে ওঠে, তবে কোনো অস্ত্রই তাকে দমাতে পারবে না।
কোনো সীমানা বা আদর্শিক বিভাজন নয়, বরং "মানুষ ০ হয়ে আসে এবং ০ হয়ে ফিরে যায়"—এই একটিমাত্র চরম সত্যই পারে যুদ্ধের মদমত্ততা কমিয়ে আনতে।
 

১৭৫ বার পড়া হয়েছে

শেয়ার করুন:

মন্তব্য

(0)

বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০
বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন
এলাকার খবর

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন














সর্বশেষ সব খবর
সাহিত্য নিয়ে আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০
বিজ্ঞাপন