অবুঝ প্রেমের রাতের আলাপন
বৃহস্পতিবার , ৯ এপ্রিল, ২০২৬ ৪:৫২ পূর্বাহ্ন
শেয়ার করুন:
আমার বাসার নিচের রাস্তাটাতে প্রায় দু মাস যাবৎ খোঁড়াখুঁড়ি আর নির্মাণ কাজ চলছে; কিন্তু গল্পটা রাস্তার নয়, প্রেমের। প্রেমিক ছেলেটা এই নির্মাণ কাজেরই কেউ একজন, ফোরম্যান বা গুডস সাপ্লায়ার জাতীয় কিছু হবে।
সারাদিন লেবারদের কাজে ভুল ধরে আর ধমকাধমকি করে; এরপর রাত হলে সে নিজে তার মহান প্রেমিকার কাছে উপর্যুপরি ধমক খায়! যদিও তার এই একান্ত ব্যক্তিগত এবং গোপনীয় ব্যাপারটা কোনোভাবেই আমার জানার কথা নয়, হয়তো জানতামও না কোনোদিন, যদি না সে আমার দোতালার জানালার ঠিক নিচে দাঁড়িয়ে তার প্রেমালাপটা না করত; আর যেহেতু ঠিক সেই জানালার পাশেই আমার নিত্য কাজ-অকাজের চেয়ার-টেবিলখানা এবং ওখানেই আমি বসি, তাই আমাকে বাধ্য হয়েই সে আলাপ শুনতে হয়; যাহোক, প্রতিদিন রাত সাড়ে এগারোটা থেকে বারোটার মধ্যেই তার প্রেমালাপ শুরু হয়; আলাপের প্রথম কয়েক মিনিট বেশ হাসিখুশি, উৎফুল্ল আমেজ বজায় থাকে— কেমন আছো? কী করছো? খেয়েছো? আর বলো না...
তারপর হঠাৎই পরিস্থিতির অবনতি ঘটতে থাকে; আক্রমণটা বরাবর ফোনের ওপাশ থেকেই আসে, সেটা টের পাওয়া যায় এপাশের রক্ষণাত্মক উত্তর শুনেই; এরপর যা হয়, পরিস্থিতি উত্তপ্ত হতেই ছেলেটা বসা থেকে উঠে দাঁড়ায়, এবং শুরু হয় তার অস্থির পায়চারি; গলিটা দৈর্ঘ্যে অত বড় নয়, সুতরাং অস্থির হয়েও সে খুব বেশি দূর যেতে পারে না; আবার ফিরে আসে; এমতাবস্থায় তার একান্ত প্রেমালাপ কর্ণগোচর হওয়ার অন্যায় আমি কিছুতেই এড়াতে পারি না; প্রেমালাপের এই ঝড়পর্বে ছেলেটির কোনো বাক্যই শেষ হয় না, ঘুরে ফিরে কয়েকটি শব্দেই তার কথাগুলো কেবল হোঁচট খেতে থাকে— “আরে মুশকিল... তুমি বুঝো না কেন?... আবার সেই কথা..... আচ্ছা শোনো... ব্যাপারটা বোঝার চেষ্টা কর....”
ফোনের ওপাশ তবুও বোঝে না, লাইনটা হয়তো কেটে দেয়; ছেলেটা রাগে-দুঃখে নিজের ওপর খেদ ঝাড়ে, “এমন বেবুঝ, ঘাড়ত্যাড়া মাইয়া মানুষরে খোদা, খাল কাইটা কুমির আনছি!”
আমি জানালার এপাশে দীর্ঘশ্বাস ফেলি; কারণ আমি জানি, কিছুক্ষণের মধ্যেই সেই বিশেষ কুমিরের খোঁজে সে আবার খালে নামবে, অর্থাৎ আবার ফোন দেবে; আমার সত্যিই ভালো লাগে; সেই না-দেখা, না-জানা মেয়েটিকে বলতে ইচ্ছে হয়— মেয়ে, তুমি চিরঅবুঝ হও; আর ছেলেটিকে ডেকে বলি— কখনও ক্লান্ত হয়ো না, চিরকাল এভাবেই বুঝিয়ে যাও; কারণ, মেয়েটির এই অবুঝপনা, আর ছেলেটির এই আপ্রাণ বোঝানোর তাড়না— এখানেই প্রেম সতেজ এবং সবুজ! ছেলেটি যা বোঝাতে চায়, সেটা যদি সত্যি সত্যি মেয়েটি কোনোদিন বুঝে যায়, প্রেম সেদিন অসাড় হয়ে যাবে; প্রেমের অকালমৃত্যু ঘটবে; কারণ, বোঝাবুঝির পূর্ণতায় নয়, বরং প্রেম বেঁচে থাকে এই পূর্ণতার অজড় আকাঙ্ক্ষায়; আর তাতে যে অপূর্ণতা, যেটুকু যাতনা, সে যাতনায় নিকষিত হেমের মতোই ক্রমশতর বিশোধিত হয়ে ওঠে প্রেম...
ততক্ষণে আমি শুনতে পাই ছেলেটি বলছে,
“আরে ফোনটা তো ধরবা.... কতবার ফোন দিছি ... আবার সেই কথা.... আচ্ছা একটা কথা শোনো....”
ছেলেটি তখন আমার জানালা ছেড়ে গলির মাথার দিকে হেঁটে যাচ্ছে; ওর গলার স্বরও ক্রমশ আমার কানে মিহি হয়ে আসে; আমি আর কিছু শুনতে পাই না...
লেখক: শিক্ষক ও কবি।
১৩১ বার পড়া হয়েছে