সর্বশেষ

সাহিত্য

প্রাণ-প্রকৃতির রাজ্যে : এক বিকাল থেকে সন্ধ্যা

হাবীব চৌহান
হাবীব চৌহান

বৃহস্পতিবার , ৯ এপ্রিল, ২০২৬ ৪:০৩ পূর্বাহ্ন

শেয়ার করুন:
এদিন ভ্রমণের প্রতিটি দৃশ্যে স্মৃতির উচ্ছ্বাস, অনুভূতি, আর মানুষ ও প্রাণ-প্রকৃতির মেলবন্ধন আরও জীবন্তভাবে ফুটে উঠেছে। অন্যান্য দিনের মতোই বিকালে আমরা দু’জনে বাড়ি থেকে বেরিয়ে পাকা রাস্তা ধরে সোজা যেতে শুরু করলাম। কিন্তু ঠিক কোথায় যাচ্ছি, তা আগে ঠিক করা হয়নি। তবে এটা নিশ্চিত যে—কোথাও যাওয়া হবে।

যেতে যেতে দু’জনের কথা হলো, তালের রস খেতে হবে। এজন্য আমরা রওনা দিলাম তারাপুরের দিকে, যেখানে প্রতিদিনই পাওয়া যায় মিষ্টি তালের রস। রস বিক্রেতার কাছে পৌঁছানোর আগেই যেন সেই স্মৃতি মনে পড়ে আমাদের আনন্দটা বেড়ে গেল। তালের রসের স্বাদ আর স্মৃতির উচ্ছ্বাসে যেন বিকেলটা আরও রঙিন হয়ে উঠল।

রসের স্বাদ নেওয়ার পরে আমরা তারাপুর মোড় থেকে এদ্রাকপুর হরিয়াগাছি এলাকায় ঢুকলাম। সেখান থেকে দয়ারামপুর গ্রামের ভেতর দিয়ে ঘোষপাড়ার রাস্তা ধরে আমরা চরের দিকে এগোচ্ছিলাম।
বিকেলের হালকা রোদ আর ধুলোমাখা পথ—মনে হচ্ছিল ধুলা, বালি আর সবুজ প্রাণ-প্রকৃতির রাজ্যে প্রবেশ করেছি আমরা।

দয়ারামপুরের গ্রামরক্ষা বাঁধে উঠলাম আমরা। তারপর নিচুতে নামতেই চোখে পড়ল পদ্মার চরের বিস্তীর্ণ চিত্র। চারিদিকের সবুজ মাঠ, ফসল আর পানি শুকিয়ে যাওয়া চর, খোলা আকাশ—মনে হলো প্রকৃতিই আমাদের সঙ্গে খেলছে। চমন ভাই গাড়ি চালাচ্ছিলেন, আর আমি পেছনে বসে চারপাশের সৌন্দর্য উপভোগ করছিলাম।

ধুলোমাখা পথ পেরিয়ে ওপারের উঁচুতে উঠলাম। সেখানে কিছু মানুষ ফসল তোলার কাজে ব্যস্ত ছিলেন।
আমরা সেখানে দাঁড়িয়ে চারপাশ ঘুরে দেখলাম। তারপর আরও কিছুদূর এগিয়ে চলার পর আমরা গাড়ি থামিয়ে হেঁটে আরও দূরে গেলাম। কিছুক্ষণের জন্য সবুজ ঘাসের ওপর বসে পড়লাম।
আশেপাশে কলার বাগান, ভুট্টার ক্ষেত, শাকসবজির চাষ—কোথাও নতুন বীজ বোনা হয়েছে, কোথাও ফসল দুলছে হাওয়ায়। মনে হচ্ছিল, এই মাঠ যেন নিঃশব্দে জীবনের গান গাইছে।

সূর্যাস্তের আগে মাঠের ফাঁকা জায়গায় ছেলে-মেয়েরা খেলাধুলায় মেতে উঠেছে। ফুটবল খেলা দেখেই মনে পড়ে গেল আমাদের ছোটবেলার দিনগুলো। তখনও আমরা ফসল তোলার পর মাঠে ফুটবল খেলতাম। সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসলেও খেলাধুলা থামেনি।

তৎক্ষণাৎ চোখে পড়ল গৃহপালিত পশুর দল—গরু, ছাগল, ভেড়া—প্রায় শতাধিক। তারা নদীর কোল ধরে ফিরছিল। মহিষের গাড়ি সরাসরি পানিতে নেমে গেল, সঙ্গে ছিল মহিষের বাচ্চাও। এপার থেকে ওপারে তারা হেঁটে চলে গেল।
হাঁটুর পানিতে মৎস্যশিকার, জাল ছড়িয়ে মাছ ধরার দৃশ্যও অবিস্মরণীয়।

দূরে বালির গাড়িগুলো ধুলা উড়িয়ে চলছিল। পানিতে সাদা বড় বড় বক, ছোট বক, ওপর থেকে মাছরাঙার নির্দিষ্ট নিশানায় নিক্ষেপ—প্রকৃতির এই চিত্র যেন জীবন্ত হয়ে উঠল।

নানা-প্রজাতির পাখিরা উড়ে বেড়াচ্ছিল, ডাকাডাকি করে ছোটাছুটি করছিল। হঠাৎ ফাঁকা মাঠে আমরা দেখতে পেলাম এক শেয়াল—দু’চোখে কষ্ট, ঠিকমতো দৌড়াতে পারছে না। ধীরে ধীরে সে কলার বাগানে চলে গেল।
তারপর চোখে পড়ল দূর থেকে একটি ঘোড়া ধুলো উড়িয়ে দৌড়ে আসছে, যার পিঠে বসে আছে এক শিশু। চর থেকে বাড়ির দিকে ফিরছে তারা। আমরা তাদের পিছু পিছু গেলাম, সেই দৃশ্য চোখে দেখলাম, ছবি তুললাম ও ভিডিও করলাম।

গ্রামীণ চিরায়ত পরিবেশ, ফসলের ক্ষেত, নদী, প্রাণী আর শিশুর ছুটে চলা—সব মিলিয়ে বিকেলের ভ্রমণ আমাদের মনে এক অনন্য আনন্দ সৃষ্টি করল।
প্রকৃতির সান্নিধ্য, গ্রামের শৈশবস্মৃতি এবং ফসলের সৌন্দর্য—সবই মিলিয়ে মনে হলো আমরা প্রকৃতির সঙ্গে একাকার হয়ে গিয়েছি।

সেই বিকেলে আমরা ঘুরে এলাম প্রাণ-প্রকৃতির রাজ্য থেকে, যেখানে নদীর চরে গড়ে ওঠা গ্রাম, ফসলের ক্ষেত আর প্রাণ-প্রকৃতির মাঝে কেটে গেল এক পরম আনন্দঘন মুহূর্ত।

লেখক: হাবীব চৌহান, সাংবাদিক।

১৫৪ বার পড়া হয়েছে

শেয়ার করুন:

মন্তব্য

(0)

বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০
বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন
এলাকার খবর

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন














সর্বশেষ সব খবর
সাহিত্য নিয়ে আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০
বিজ্ঞাপন