প্রান্তিক প্রাণের কথাকার: অদ্বৈত মল্লবর্মণ ও তিতাস পুরাণ
বৃহস্পতিবার , ৯ এপ্রিল, ২০২৬ ২:৫১ পূর্বাহ্ন
শেয়ার করুন:
অদ্বৈত মল্লবর্মণ (১৯১৪-১৯৫১) বিংশ শতাব্দীর বাংলা সাহিত্যের এক আলোকচিত্রকর, যাঁর সংক্ষিপ্ত জীবনকালেই তিনি মহাকাব্যিক প্রতিভার স্বাক্ষর রেখে গেছেন। তাঁর লেখনীতে প্রথমবারের মতো প্রান্তিক মালো বা মৎস্যজীবী সম্প্রদায়ের জীবন, তাদের সুখ-দুঃখ, সংগ্রাম আর প্রকৃতির সাথে অবিচ্ছেদ্য একাত্মতা এমন এক গভীর মানবিক মর্যাদায় মূর্ত হয়ে উঠেছে, যা বাংলা সাহিত্যের মানচিত্রে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে।
অদ্বৈতের সাহিত্যিক সত্তা নিছক কল্পনার ফসল ছিল না, বরং তা ছিল তাঁর নিজের জীবন-অভিজ্ঞতারই এক শিল্পিত সম্প্রসারণ, নিজ সম্প্রদায়ের প্রতি এক নিবিড় আত্মিক অনুরাগের প্রাঞ্জল প্রকাশ। তাঁর লেখায় আমরা দেখি এক বঞ্চিত, অবহেলিত সমাজের আত্মানুসন্ধান, যা একইসাথে একটি ব্যক্তিগত সংগ্রাম এবং সমষ্টিগত অস্তিত্বের এক অমোঘ দলিল।
জীবিকার তাগিদে ১৯৩৪ সালে অদ্বৈত কলকাতায় পাড়ি জমান, যা তাঁর জীবনের এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে। মহানগরীর কোলাহলময় পরিবেশের মধ্যেও তিনি নিজ শেকড়ের টানে অটুট ছিলেন। কলকাতায় এসে তিনি সাংবাদিকতাকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করেন, যা তাঁকে সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষের সান্নিধ্যে আসার সুযোগ করে দেয় এবং তাঁর পর্যবেক্ষণ ক্ষমতাকে আরও শাণিত করে তোলে। তিনি ‘ত্রিপুরা’, ‘নবশক্তি’, ‘মাসিক মোহাম্মদী’, ‘দৈনিক আজাদ’ এবং ‘দেশ’ পত্রিকার মতো বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সংবাদপত্র ও সাহিত্য সাময়িকীতে কাজ করেছেন, যা তাঁর পেশাগত জীবনে বৈচিত্র্য এনেছিল। এই সময়কালে তাঁর সখ্য গড়ে ওঠে তৎকালীন সাহিত্যের প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তিত্বদের সাথে, যার মধ্যে কবি প্রেমেন্দ্র মিত্রের সাহচর্য বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। প্রেমেন্দ্র মিত্রের আধুনিক ও সংবেদনশীল সাহিত্যদৃষ্টি অদ্বৈতকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল, তাঁর লেখকসত্তাকে আরও পরিণত ও পরিশীলিত করে তুলতে এক বড় ভূমিকা রেখেছিল। সাংবাদিকতার কাঠিন্য আর ব্যস্ততার মধ্যেও অদ্বৈত তাঁর লেখার জন্য সময় বের করতেন, কারণ তাঁর ভেতরের শিল্পীসত্তা তাঁর নিজস্ব কাহিনী বলার জন্য ব্যাকুল ছিল। কলকাতা তাঁকে দিয়েছিল এক বৃহত্তর প্রজ্ঞা, কিন্তু তাঁর আত্মা পড়ে ছিল তিতাস নদীর তীরে, মালোপাড়ার অলিগলিতে।
অদ্বৈত মল্লবর্মণের সাহিত্যজীবনের শ্রেষ্ঠতম কীর্তি নিঃসন্দেহে তাঁর মরণোত্তর প্রকাশিত মহাকাব্যিক উপন্যাস ‘তিতাস একটি নদীর নাম’, যা ১৯৫৬ সালে প্রথম প্রকাশিত হয়। এই উপন্যাসের রচনার ইতিহাস অত্যন্ত ট্র্যাজিক এবং লেখকের দৃঢ় সংকল্পের এক অসামান্য দৃষ্টান্ত। একবার রচনার এক পর্যায়ে পাণ্ডুলিপিটি হারিয়ে যায়, যা ছিল লেখকের জন্য এক মর্মান্তিক অভিজ্ঞতা। কিন্তু অগণিত পাঠক এবং শুভানুধ্যায়ীদের অনুরোধ ও ভালোবাসায় অনুপ্রাণিত হয়ে অদ্বৈত তাঁর স্মৃতির ভাণ্ডার থেকে সেই হারানো আখ্যানকে পুনরায় রচনা করেন, যা তাঁর স্মৃতিশক্তির প্রখরতা এবং তাঁর রচনার বিষয়বস্তুর প্রতি তাঁর আত্মিক সংযুক্তিকে প্রমাণ করে। এই উপন্যাসে তিতাস নদী কেবল একটি ভৌগোলিক সত্তা নয়, বরং তা এক জীবন্ত চরিত্র হিসেবে, এক মহাজাগতিক শক্তির প্রতীক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। নদীতীরবর্তী মালো সমাজ এই উপন্যাসের প্রাণকেন্দ্র, যেখানে তাদের জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত সবকিছুর সাথে তিতাস অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। উপন্যাসের পাতায় পাতায় পরিস্ফুট হয়েছে মালোদের ঐতিহ্য, তাদের উৎসব-ব্যথা, ধর্মবিশ্বাস, সামাজিক রীতি-নীতি এবং প্রকৃতির সাথে তাদের অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক। কিশোর, বাসন্তী, অনন্ত, সুবল, রামপ্রসাদ, বনমালী ও তিলকের মতো রক্তমাংসের চরিত্রের মাধ্যমে লেখক মালোদের জীবনচক্রকে নিপুণভাবে তুলে ধরেছেন। তাদের দৈনন্দিন সংগ্রাম, মহাজনী শোষণ, প্রকৃতির রুদ্রতা, বিশেষত নদীর গতিপথ পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট অস্তিত্বের সংকট—সবকিছুই তিনি এক হৃদয়স্পর্শী ভাষায় চিত্রিত করেছেন। তিতাসের জলধারার মতো মালোদের জীবনও প্রবাহিত হয়, কখনো শান্ত, কখনো উত্তাল, আবার কখনো শুকিয়ে যাওয়া নদীর মতো রিক্ত ও শূন্য। লেখকের বর্ণনায় মালো সমাজের জীবন শুধু টিকে থাকার এক নিরন্তর লড়াই নয়, তা জীবনের প্রতি এক অদম্য ভালোবাসা, পারস্পরিক সহমর্মিতা এবং ভাগ্যের কাছে হার না মানার এক দৃঢ় প্রত্যয়। এই উপন্যাস মূলত এক সভ্যতার ধীরে ধীরে বিলীন হয়ে যাওয়ার আখ্যান, এক ব্রাত্য জনজীবনের আত্মপরিচয় রক্ষার নিরন্তর চেষ্টার দলিল। নদীর সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক এখানে আধ্যাত্মিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক সবকিছুকে ছাপিয়ে যাওয়া এক অস্তিত্বগত বন্ধন। তিতাস শুধু জলধারা নয়, সে মা, সে বন্ধু, সে ভাগ্যবিধাতা, সে সর্বস্ব। যখন তিতাস তার পথ পরিবর্তন করে, তখন মালোদের জীবনেও আসে চরম বিপর্যয়; তাদের অস্তিত্বই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে ওঠে। এই পরিবর্তন কেবল বাহ্যিক নয়, মালোদের অন্তঃস্থলেও এর গভীর ছাপ পড়ে, তাদের সংস্কৃতি, তাদের ঐতিহ্য ধীরে ধীরে মৃত্যুর মুখে পতিত হয়। অদ্বৈতের লেখনীতে এই ট্র্যাজেডি এমনভাবে ফুটে উঠেছে যে পাঠকও যেন মালোদের এই সম্মিলিত বেদনার অংশীদার হয়ে ওঠেন। তাঁর গদ্যশৈলী ছিল নিজস্ব, আঞ্চলিক ভাষার মাধুর্যে ভরপুর, যা মালো সমাজের প্রাণবন্ততাকে এক নতুন মাত্রা দিয়েছিল। তাঁর প্রতিটি শব্দ যেন তিতাসের জলধারার মতোই স্বচ্ছ ও গভীর। এই উপন্যাস শুধুমাত্র একটি জাতির বা নদীর গল্প নয়, এটি সামগ্রিকভাবে মানব অস্তিত্বের এক চিরন্তন অনুসন্ধানের গল্প।
‘তিতাস একটি নদীর নাম’ উপন্যাসের সাহিত্যিক বৈশিষ্ট্য আলোচনার ক্ষেত্রে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিখ্যাত ‘পদ্মা নদীর মাঝি’ উপন্যাসের সাথে এর তুলনা করা হয়। সমালোচকদের মতে, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় মালো বা জেলে সমাজকে দেখেছেন একজন বাইরের পর্যবেক্ষক বা ‘আউটসাইডার’ হিসেবে, যদিও তাঁর পর্যবেক্ষণ ছিল অত্যন্ত তীক্ষ্ণ ও সংবেদনশীল। তিনি মালোদের জীবনযাত্রাকে বস্তুনিষ্ঠভাবে বিশ্লেষণ করেছেন, তাদের অর্থনৈতিক ও সামাজিক বঞ্চনার চিত্র তুলে ধরেছেন। অন্যদিকে, অদ্বৈত মল্লবর্মণ ছিলেন সেই সমাজেরই ভেতরের মানুষ বা ‘ইনসাইডার’। তিনি নিজেও একজন ধীবর পরিবারের সন্তান ছিলেন, নদীর সাথে তাঁর নাড়ির সম্পর্ক ছিল, মালোদের দুঃখ-সুখ, আনন্দ-বেদনা তিনি আত্মস্থ করেছিলেন। ফলে তাঁর বর্ণনায় যে মরমী টান এবং খুঁটিনাটি বিষয়ের সাবলীল প্রকাশ পাওয়া যায়, তা মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখার থেকে এক ভিন্ন মাত্রা অর্জন করে। অদ্বৈতের লেখায় মালো সমাজের আত্মপরিচয়, তাদের নিজস্ব সংস্কৃতি ও বিশ্বাস, তাদের হাসি-কান্না, তাদের ভেতরের জগৎ এমন নিবিড়ভাবে উপস্থাপিত হয়েছে, যা কেবল একজন আত্মজই ফুটিয়ে তুলতে পারেন। তিনি মালোদের জীবনকে নিছক অর্থনৈতিক বা সামাজিক শোষণের প্রেক্ষাপটে সীমাবদ্ধ রাখেননি, বরং তাদের আত্মিক সংগ্রামের গভীরতাকে অনুভব করিয়েছেন। তাঁর লেখায় এক ধরনের ‘এথনিক ডিটেল’ (ethnic detail) ধরা পড়ে, যা শুধু তথ্যের বর্ণনা নয়, বরং অভিজ্ঞতার অনুভব। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখায় প্রলেতারীয় সংগ্রামের এক স্পষ্ট সুর থাকলেও, অদ্বৈতের লেখায় সেই সংগ্রাম ব্যক্তিক ও সমষ্টিগত অস্তিত্ব রক্ষার এক গভীরতর অনুসন্ধানে পরিণত হয়েছে, যেখানে প্রকৃতি একটি গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক। অদ্বৈতের উপন্যাস কেবল একটি বাস্তবতার চিত্রণ নয়, এটি একটি জীবন্ত সমাজের নৃতাত্ত্বিক ও সাংস্কৃতিক জীবনপ্রবাহের এক কাব্যিক উপস্থাপনা। এই অন্তরঙ্গতার কারণেই ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ বাংলা সাহিত্যে এক অনন্য স্থান দখল করে আছে। উপন্যাসের এই অসাধারণ মানবিক আবেদন এবং মহাকাব্যিক বিস্তারকে উপলব্ধি করে, ১৯৭৩ সালে প্রখ্যাত চলচ্চিত্রকার ঋত্বিক ঘটক এটিকে এক এপিক চলচ্চিত্রে রূপান্তর করেন। ঋত্বিকের চলচ্চিত্রিক রূপায়ণ উপন্যাসের মর্মবস্তু, তার গভীর বিষাদ এবং ব্রাত্য জীবনের মহাকাব্যিক সংগ্রামকে বিশ্বব্যাপী দর্শকের কাছে পৌঁছে দেয়, যা অদ্বৈতের প্রতিভার এক জ্বলন্ত প্রমাণ।
উপন্যাসের বাইরেও অদ্বৈত মল্লবর্মণ ছোটগল্প এবং অন্যান্য গদ্য সাহিত্যে তাঁর প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন। তাঁর চারটি উল্লেখযোগ্য ছোটগল্প হলো ‘সন্তানিকা’, ‘কান্না’, ‘বন্দী বিহঙ্গ’ এবং ‘স্পর্শদোষ’। এই গল্পগুলোতেও তাঁর প্রান্তিক মানুষের প্রতি মমত্ববোধ এবং সমাজের গভীরে লুকিয়ে থাকা বঞ্চনার চিত্র পরিস্ফুট হয়েছে। ‘সন্তানিকা’ গল্পে দেখা যায় এক অভাবী মায়ের সন্তান হারানোর মর্মস্পর্শী বেদনা, যা দারিদ্র্যের করাল গ্রাসে ঢাকা পড়ে। ‘কান্না’ গল্পে মানুষের অসহায়ত্ব ও নিয়তির নির্মম খেলাকে তুলে ধরা হয়েছে। ‘বন্দী বিহঙ্গ’ গল্পে তিনি দারিদ্র্যের খাঁচায় মানুষের অবদমিত সত্তার বন্দিত্বকে চিত্রিত করেছেন। এখানে বিহঙ্গ কেবল একটি পাখি নয়, তা মানুষেরই স্বাধীনচেতা চেতনার প্রতীক, যা অভাবের তাড়নায় মুক্তির স্বাদ পায় না। এই গল্পগুলিতে অদ্বৈত মানুষের ছোট ছোট সুখ, দুঃখ, আশা-আকাঙ্ক্ষা এবং সীমাবদ্ধতার মধ্যে তাদের টিকে থাকার লড়াইকে এক নিপুণ শিল্পীর দক্ষতায় ফুটিয়ে তুলেছেন। তাঁর ছোটগল্পগুলো আকারে ছোট হলেও ভাববস্তুতে গভীর ও তাৎপর্যপূর্ণ। তাঁর অন্যান্য উপন্যাসের মধ্যে ‘শাদা হাওয়া’ (১৯৪৮) এবং ‘রাঙামাটি’ বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। ‘শাদা হাওয়া’ উপন্যাসে তিনি শহুরে মধ্যবিত্ত জীবনের জটিলতা, প্রেম-বিরহ এবং মনস্তাত্ত্বিক টানাপোড়েনকে তুলে ধরেছেন, যা তাঁর ‘তিতাস’-এর জগৎ থেকে কিছুটা ভিন্ন হলেও তাঁর পর্যবেক্ষণ ক্ষমতার গভীরতা প্রকাশ করে। ‘রাঙামাটি’ উপন্যাসেও তিনি প্রান্তিক অঞ্চলের মানুষের জীবনযাত্রার এক অন্তরঙ্গ চিত্র অঙ্কন করেছেন। এছাড়া, মন্বন্তরের পটভূমিতে লেখা তাঁর ‘ভারতের চিঠি—পার্ল বাককে’ একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রচনা। এই চিঠির মাধ্যমে তিনি ১৯৪৩ সালের ভয়াবহ বাংলার মন্বন্তরের মর্মস্পর্শী চিত্র তুলে ধরেছেন এবং তৎকালীন ব্রিটিশ শাসকের ঔদাসীন্য ও দেশীয় সমাজের অমানবিক দিকগুলোকে কঠোর সমালোচনার মুখে এনেছেন। এটি কেবল একটি চিঠির সংকলন ছিল না, এটি ছিল এক মানবিক আবেদন এবং এক ঐতিহাসিক দলিল, যা মানুষের প্রতি মানুষের দায়িত্বকে স্মরণ করিয়ে দেয়। প্রাবন্ধিক হিসেবেও অদ্বৈত চিত্রকলা ও লোকসংস্কৃতি চর্চায় প্রাজ্ঞতার পরিচয় দিয়েছেন। তাঁর প্রবন্ধগুলোতে গ্রামীণ বাংলার লোকায়ত জীবন, শিল্পকলা এবং সংস্কৃতির প্রতি তাঁর গভীর অনুরাগ ও বিশ্লেষণাত্মক দৃষ্টিভঙ্গির প্রমাণ মেলে। তিনি কেবল কাহিনীকার ছিলেন না, ছিলেন তাঁর অঞ্চলের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও জীবনধারার একজন বিশ্বস্ত গবেষক ও সংগ্রাহক।
এই মহান সাহিত্যিকের জীবনাবসান ঘটে ১৯৫১ সালের ১৬ এপ্রিল মাত্র ৩৭ বছর বয়সে যক্ষ্মা রোগে আক্রান্ত হয়ে কলকাতায়। এক অস্থির অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এবং শারীরিক অসুস্থতার সঙ্গে নিরন্তর সংগ্রাম করে তিনি তাঁর জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত সাহিত্যচর্চা চালিয়ে গেছেন। তাঁর অকালপ্রয়াণ বাংলা সাহিত্যের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি ছিল, কারণ তাঁর মতো একজন অসামান্য প্রতিভার আরও অনেক কিছু দেওয়ার ছিল। কিন্তু স্বল্পায়ু জীবনেও তিনি যা রেখে গেছেন, তা তাঁকে বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে অমর করে রেখেছে।
অদ্বৈত মল্লবর্মণের সাহিত্য কেবল নদীকেন্দ্রিক জীবনগাথা নয়, বরং তা ব্রাত্য মানুষের অস্তিত্ব রক্ষার এক অবিনাশী দলিল হিসেবে বাংলা সাহিত্যে অম্লান থাকবে। তিনি দেখিয়েছেন কীভাবে দারিদ্র্য ও সামাজিক বঞ্চনার মধ্যেও মানুষ প্রকৃতির সাথে একাত্ম হয়ে বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখে, কীভাবে টিকে থাকার জন্য সংগ্রাম করে, এবং কীভাবে তাদের সাধারণ জীবনও মহৎ আখ্যানের জন্ম দিতে পারে। তাঁর লেখনী প্রান্তিকতাকে কেন্দ্রে এনেছে, নীরবে বয়ে চলা তিতাসের মতো অসংখ্য ব্রাত্য মানুষের কণ্ঠস্বরকে ভাষা দিয়েছে। অদ্বৈতের প্রভাব শুধুমাত্র সাহিত্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, তা সমাজ ও সংস্কৃতির প্রতি আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিতেও এক গুণগত পরিবর্তন এনেছে। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন যে, দেশের আসল প্রাণ লুকিয়ে আছে তার প্রান্তিক মানুষের জীবনে, তাদের আত্মিক শক্তিতে এবং তাদের লোকায়ত সংস্কৃতিতে। তাঁর সাহিত্য বিশ্বব্যাপী মানবতাবাদী চেতনার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত, যা চিরকাল পাঠকের হৃদয়ে গভীর আলোড়ন সৃষ্টি করবে।
লেখক: কবি ও প্রাবন্ধিক।
১২৮ বার পড়া হয়েছে