জেনারেটর না সোলার: স্বাস্থ্যমন্ত্রীর নির্দেশে নীতি–বৈপরীত্য
শুক্রবার, ৩ এপ্রিল, ২০২৬ ৬:০৫ অপরাহ্ন
শেয়ার করুন:
বাংলাদেশের বিদ্যুৎ–জ্বালানি সংকট যখন চরমে, ঠিক সেই সময়ে হাসপাতালের বিদ্যুৎ নিরাপত্তা নিয়ে সরকারের অবস্থান প্রশ্নের মুখে পড়েছে। সাম্প্রতিক এক অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বিদ্যুৎ ঘাটতি মোকাবিলায় হাসপাতালগুলোতে জেনারেটরের সংখ্যা বাড়ানো, সবসময় স্ট্যান্ডবাই রাখা এবং এর জন্য অতিরিক্ত ডিজেল রিজার্ভ নিশ্চিত করার নির্দেশ দিয়েছেন।
তাঁর যুক্তি, বিদ্যুৎ সংকটে যেন আইসিইউ, সিসিইউ, এনআইসিইউ, অপারেশন থিয়েটারের মতো ক্রিটিক্যাল ইউনিটে চিকিৎসা ব্যাহত না হয়। কিন্তু এই সমাধান বাস্তবে আবার আমদানি–নির্ভর জ্বালানি তেলের ওপর নির্ভরতা বাড়াচ্ছে, যেখানে তেল সংকটই বর্তমান বিদ্যুৎ ঘাটতির অন্যতম মূল কারণ।
বিশ্ব যখন জলবায়ু সঙ্কট ও তেল–নির্ভরতা থেকে বেরিয়ে আসার পথ খুঁজছে, সেখানে জেনারেটর–নির্ভর সমাধানকে অনেকেই ‘উল্টো স্রোত’ হিসেবে দেখছেন। জ্বালানি বিশ্লেষকদের ভাষায়, ডিজেল জেনারেটর মানে ডলার দিয়ে তেল কিনে বিদ্যুৎ বানানো, আর রুফটপ সোলার মানে সূর্যের আলোকে স্থায়ী সম্পদে পরিণত করা—দু’য়ের মধ্যে পার্থক্যটা নীতিনির্ধারকদের আগে বুঝতে হবে। তাঁদের মতে, এটা খুবই স্বল্পদৃষ্টিসম্পন্ন পদক্ষেপ; কারণ ডিজেলের ওপর চাপ বাড়ালে বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভ, বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় এবং ট্যারিফ—সব দিকেই নতুন ঝুঁকি তৈরি হবে।
অথচ দেশের ভেতরেই নবায়নযোগ্য জ্বালানির, বিশেষ করে সোলার পাওয়ারের, শক্তিশালী একটি বাজার তৈরি হয়েছে। সোলার হোম সিস্টেম থেকে শুরু করে গ্রিড–সংযুক্ত রুফটপ সোলার পর্যন্ত একাধিক প্রতিষ্ঠান বহু বছর ধরে সফলভাবে কাজ করছে। বিশেষজ্ঞদের ভাষায়, সোলার সিস্টেম ইনস্টল করতে খুব বেশি সময়ও লাগে না; একটি মাঝারি মানের হাসপাতালের ছাদে উপযোগী রুফটপ সোলার প্ল্যান্ট চাইলে কয়েক দিনের মধ্যেই স্থাপন ও গ্রিডের সঙ্গে সংযোগ দেওয়া সম্ভব, যদি টেকনিক্যাল ও প্রশাসনিক অনুমোদন আগে থেকেই পরিষ্কার থাকে। তাঁদের দাবি, নীতিগত সিদ্ধান্ত আর নির্দেশনা থাকলে দুই–তিন দিনের মধ্যেই কোনো হাসপাতালকে আংশিকভাবে হলেও সোলার সিস্টেমের আওতায় আনা যায়; বহু বছর ধরে শুধু ডিজেল চালিয়ে যে অর্থ ব্যয় হয়েছে, সোলার থাকলে তার বড় অংশই বেঁচে যেত।
সোলার প্রযুক্তির বড় সুবিধা হলো—একবার ইনস্টলেশন খরচ দিলেই পরবর্তীতে জ্বালানির আলাদা খরচ থাকে না; দিনে উৎপাদিত বিদ্যুৎ লিথিয়াম ব্যাটারিতে সংরক্ষণ করে রাতেও ব্যবহার করা যায়। আবার গ্রিড–সংযুক্ত সিস্টেমে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ নেট–মিটারিংয়ের মাধ্যমে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করে বিল সমন্বয় করা যায়। বাংলাদেশ ইতোমধ্যে নেট–মিটারিং নীতিমালা হালনাগাদ করে সরকারি ভবন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও হাসপাতালসহ বিভিন্ন স্থাপনায় রুফটপ সোলার বসানোর একটি জাতীয় কর্মসূচি ঘোষণা করেছে, যার লক্ষ্য ডিসেম্বরের মধ্যে ৩,০০০ মেগাওয়াট সোলার সক্ষমতা যোগ করা। যদিও বিশেষজ্ঞরা এই টার্গেটকে সময়ের দিক থেকে অত্যন্ত টাইট ও বাস্তবায়ন–ঝুঁকিপূর্ণ বলে উল্লেখ করেছেন, তবু এটাকে ‘লো–হ্যাংগিং ফ্রুট’ হিসেবে কাজে লাগানোর পরামর্শ দিয়েছেন।
প্রতিবেশী ভারতের অভিজ্ঞতা এ প্রসঙ্গে অনেক শিক্ষণীয়। সেখানে কেন্দ্রীয় সরকার ঘরে ঘরে রুফটপ সোলার বসাতে নগদ সাবসিডি, কর রেয়াত ও সহজ ঋণ দিচ্ছে; ফলে দিনের বেলায় সোলার বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখছে, রাতের বেলায় ব্যাটারি ব্যাকআপ ব্যবহার হচ্ছে। বাংলাদেশও নতুন নবায়নযোগ্য নীতির মাধ্যমে ৩০ শতাংশ পুনর্নবীকরণযোগ্য জ্বালানির লক্ষ্য নিয়েছে, রুফটপ সোলারের জন্য ৩,০০০ মেগাওয়াট লক্ষ্যমাত্রা ঘোষণা করেছে, কিন্তু স্বাস্থ্যখাতের দৈনন্দিন সিদ্ধান্তে সেই ভিশন এখনো প্রতিফলিত হচ্ছে না—এটাই বড় বৈপরীত্য।
সিভিল সোসাইটি অ্যাক্টিভিস্টদের মন্তব্য, এনার্জি ক্রাইসিসের সময়ে আমাদের আসলে ‘জরুরি জেনারেটর প্ল্যান’ নয়, ‘জরুরি সোলার প্ল্যান’ দরকার ছিল। তাঁদের ভাষায়, জেনারেটর বাড়ানো মানে পুরোনো সমস্যার ভেতরেই হাঁটা, আর সোলারে যাওয়া মানে সংকটকে সুযোগে বদলে ফেলা—প্রশ্ন শুধু, সরকার কোন পথে হাঁটবে।
লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট, লেখক।
১৩৩ বার পড়া হয়েছে