জ্বালানি সংকট প্রতিদিনের জীবন ও অর্থনীতিতে তীব্র প্রভাব
রবিবার, ২৯ মার্চ, ২০২৬ ৬:৪৭ অপরাহ্ন
শেয়ার করুন:
বাংলাদেশে সাম্প্রতিক জ্বালানি সংকট একটি গুরুতর সামাজিক ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে, যা মূলত মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত—বিশেষ করে ইরান-সংশ্লিষ্ট যুদ্ধ এবং হরমুজ প্রণালির অনিশ্চয়তার কারণে জ্বালানি তেলের আমদানি ব্যাহত হওয়ায় তীব্র আকার ধারণ করেছে।
২০২৬ সালের মার্চ মাসের শেষভাগে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)-এর সর্বশেষ তথ্য অনুসারে, ডিজেলের মজুত ১.৫৩ লাখ টন (প্রায় ১২ দিনের চাহিদা), পেট্রোল ১৬,৫০০ টন (১১ দিনের) এবং অকটেন ১০,৭০০ থেকে ১১,০০০ টন (৯ দিনের) রয়েছে। দেশের বার্ষিক জ্বালানি আমদানি ৬.৫ থেকে ৬.৮ মিলিয়ন টনের মধ্যে, যার মধ্যে অকটেনের বড় অংশ দেশীয় রিফাইনারি ও গ্যাস কনডেনসেট থেকে উৎপাদিত হলেও আমদানি-নির্ভরতা এবং আন্তর্জাতিক সরবরাহ চেইনের বিঘ্নের কারণে স্টক দ্রুত কমে যাচ্ছে। মার্চের মাঝামাঝি থেকে অনেক পাম্পে “পেট্রোল/অকটেন সোল্ড আউট” নোটিশ ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং কয়েকটি স্টেশন সীমিত সময়ের জন্য খোলা রাখা হয়েছে। বিপিসি এপ্রিল মাসের জন্য ১৪টি সমুদ্রপথের শিপমেন্টসহ পাইপলাইনের মাধ্যমে মোট ৪,২৮,০০০ টন জ্বালানি আমদানির পরিকল্পনা করেছে, যার মধ্যে ৩০৩,০০০ টন ডিজেল, ২৫,০০০ টন অকটেন রয়েছে।
রাজধানী ঢাকাসহ চট্টগ্রাম, বগুড়া, জামালপুর, সাতক্ষীরা এবং অন্যান্য জেলায় পেট্রোল পাম্পগুলোতে দীর্ঘ লাইন এখন নিত্যদিনের দৃশ্য। মোটরসাইকেল চালকরা মাত্র ২ লিটার, প্রাইভেট কারে ১০ লিটার এবং বড় যানবাহনে ২০–২৫ লিটারের সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে, যা প্যানিক বাইংকে আরও উস্কে দিয়েছে। গ্রামীণ এলাকায় লোকাল বাস, সিএনজি ও অটোরিকশার সংখ্যা কমে গেছে, ফলে কৃষকরা তাদের ফসল (বিশেষ করে বোরো মৌসুমের ধান) বাজারে নিয়ে যেতে পারছেন না সময়মতো। শিক্ষার্থীদের স্কুল-কলেজ যাতায়াত, দৈনিক শ্রমিকদের কর্মস্থলে পৌঁছানো এবং ছোট ব্যবসায়ীদের পণ্য পরিবহন ব্যাহত হচ্ছে। ঈদ-উল-ফিতরের পর চাহিদা হঠাৎ বেড়ে যাওয়ায় সংকট আরও তীব্র হয়েছে; দূরপাল্লার বাস সার্ভিস অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে এবং অনেক যাত্রী টিকিট কেটেও যেতে পারেননি। পেট্রোল পাম্প মালিকদের সংগঠন সতর্ক করেছে যে নিরাপত্তাহীনতা ও অপর্যাপ্ত সরবরাহের কারণে অনেক পাম্প যেকোনো সময় বন্ধ হয়ে যেতে পারে।
এই জ্বালানি সংকটের অর্থনৈতিক প্রভাব ব্যাপক ও বহুমুখী। পণ্য পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়ায় নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে, যা সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা আরও সংকুচিত করছে। কৃষি খাতে ডিজেল-নির্ভর সেচ পাম্প ও ফসল পরিবহনে ব্যাঘাত ঘটছে, ফলে উৎপাদিত ফসল পচে নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি বাড়ছে এবং বিক্রয়মূল্য কমে যাচ্ছে। গার্মেন্টস শিল্পসহ ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পকারখানায় ডিজেল জেনারেটর চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে, যা উৎপাদন কমিয়ে কর্মসংস্থানের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। বিপিসির তথ্য অনুসারে, মার্চ মাসের প্রথম সপ্তাহগুলোতে ডিজেল, পেট্রোল ও অকটেনের বিক্রি গত বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে, যা প্যানিক বাইংয়ের ফল। দীর্ঘমেয়াদে এই সংকট অব্যাহত থাকলে মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি পাবে, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়বে এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হবে। বিপিসি বর্তমানে ডিজেল আমদানিতে প্রতি লিটারে প্রায় ৬৮–৭৪ টাকা লোকসানের সম্মুখীন হচ্ছে।
সরকার এই সংকট মোকাবিলায় কয়েকটি তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ নিয়েছে। বিপিসি চীন (পেট্রোচায়না ও ইউনিপেক থেকে ৩০,০০০ টন করে তিনটি কার্গো), ভারত (নুমালিগড় রিফাইনারি থেকে পাইপলাইনে ৫,০০০ টন এবং আরও পরিকল্পিত) সহ অন্যান্য দেশ থেকে অতিরিক্ত ডিজেল আমদানির ব্যবস্থা করেছে। জ্বালানি তেলের দাম মার্চ মাসে অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে (ডিজেল ১০০ টাকা, পেট্রোল ১১৬ টাকা, অকটেন ১২০ টাকা, কেরোসিন ১১২ টাকা প্রতি লিটার), যাতে জনগণের ওপর অতিরিক্ত চাপ না পড়ে। বিপিসি বিভাগীয় শহরগুলোতে অকটেন ও পেট্রোল সরবরাহ ১০ শতাংশ বাড়িয়েছে। তবে কালোবাজারি ও অতিরিক্ত দামে বিক্রির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে—মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে ৬২ জেলায় একদিনে ২৯৩টি অভিযানে ৭৮টি মামলায় মোট ৩.১৫ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। জামালপুরের একটি পাম্পে ২,৫০০ লিটার মজুত পেট্রোল পাওয়ায় ম্যানেজারকে ৫০,০০০ টাকা জরিমানা করা হয়েছে (কনজিউমার রাইটস প্রোটেকশন অ্যাক্ট-২০০৯ অনুসারে)। বর্তমানে অতিরিক্ত দামে তেল বিক্রি বা মজুতের জন্য সাধারণত ২৫,০০০ টাকা জরিমানা করা হয়। কিন্তু এটি যথেষ্ট নয়—দেশের মানুষের নিস্তার জন্য কঠোর ব্যবস্থা প্রয়োজন: প্রথমবার সতর্কতা সহ ১ মাসের সম্পূর্ণ আয়ের সমান জরিমানা, দ্বিতীয়বার ৩ মাসের আয়ের সমান জরিমানা, এবং তৃতীয়বার পাম্প বাজেয়াপ্ত করে রাষ্ট্রীয় সম্পদ হিসেবে গ্রহণ করা। এরপর সরকারি নিয়োগের মাধ্যমে পাম্প পরিচালনা করা, দুষ্কৃতকারীর পরিবারের খাবারের টাকা সরকারি কোষাগার থেকে দেওয়া এবং সবাইকে ৩ মাসের নৈতিক শিক্ষার কোর্স করানো। এমন কঠোর পদক্ষেপ নিলে কালোবাজারি কমে দেশের মানুষ কিছুটা স্বস্তি পেত।
দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের জন্য বাংলাদেশকে নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎসের দিকে আরও জোরালোভাবে ঝুঁকতে হবে। সৌরশক্তি, বায়ু শক্তি এবং জৈব জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়ানো, রুফটপ সোলার প্রোগ্রামকে জাতীয় পর্যায়ে বিস্তার করা এবং ২০৩০ সালের মধ্যে বিদ্যুতের ২০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা (বর্তমানে মাত্র ৫.৩৮ শতাংশ) অর্জন করা জরুরি। গ্রামীণ ও শহুরে পরিবহন ব্যবস্থায় নিয়ন্ত্রিত তেল বরাদ্দ, কৌশলগত তেল মজুত ব্যবস্থা গড়ে তোলা (বর্তমানে মজুত ৯–১৪ দিনের মধ্যে সীমাবদ্ধ), জ্বালানি সাশ্রয়ী প্রযুক্তি (যেমন ইলেকট্রিক যানবাহন) প্রচার এবং স্থানীয় উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর মাধ্যমে আমদানি-নির্ভরতা কমানো সম্ভব। পাশাপাশি নাগরিকদের সচেতনতা বাড়ানো দরকার—অপ্রয়োজনীয় যানবাহন ব্যবহার কমানো, শেয়ারিং পরিবহন (কারপুলিং) চালু করা, এবং তেলের অপচয় রোধ করা। সমবায়ভিত্তিক পরিবহন ব্যবস্থা এবং জনসচেতনতা ক্যাম্পেইন এই সংকটের তীব্রতা কিছুটা কমাতে সাহায্য করতে পারে।
জ্বালানি সংকট শুধুমাত্র একটি বাজার বা সরবরাহের সমস্যা নয়; এটি দেশের প্রতিদিনের জীবনযাত্রা, খাদ্য নিরাপত্তা, শিল্প উৎপাদন এবং সামাজিক স্থিতিশীলতার সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। যদি এটি দীর্ঘায়িত হয়, তাহলে নাগরিক দুর্ভোগ বাড়বে, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি অব্যাহত থাকবে এবং অর্থনীতিতে অনিশ্চয়তা ছড়িয়ে পড়বে। তাই সরকার, ব্যবসায়ী সম্প্রদায়, শিল্প মালিক এবং সাধারণ নাগরিকদের সমন্বিত উদ্যোগ অপরিহার্য। স্বল্পমেয়াদে আমদানি ও বিতরণ ব্যবস্থা শক্তিশালী করা (চীন-ভারত থেকে অতিরিক্ত কার্গোসহ) এবং দীর্ঘমেয়াদে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও শক্তি দক্ষতার ওপর জোর দিয়ে এই সংকটকে স্থায়ীভাবে মোকাবিলা করতে হবে, যাতে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং জনজীবন স্বাভাবিক গতিতে ফিরে আসতে পারে।
লেখক: প্রভাষক - ব্রেভ জুবিলেন্ট স্কলার্স অব মনোহরদী মডেল কলেজ (বিজেএসএম মডেল কলেজ), মনোহরদী, নরসিংদী। প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা - ওয়েল্ফশন মানবকল্যাণ সংঘ, কাপাসিয়া, গাজীপুর।
১২৩ বার পড়া হয়েছে