বীর কিশোরীর অদম্য সাহস: মুক্তিযোদ্ধা আয়শা পারভীনের যুদ্ধদিনের গল্প
বৃহস্পতিবার , ২৬ মার্চ, ২০২৬ ৭:২০ অপরাহ্ন
শেয়ার করুন:
পিরোজপুর শহরের কালীবাড়ি সড়কের এক সাধারণ পরিবারে জন্ম নেওয়া এক কিশোরী পরবর্তীতে হয়ে ওঠেন সাহসিকতার প্রতীক।
তিনি বীর মুক্তিযোদ্ধা মোসাম্মৎ আয়শা পারভীন—যিনি মাত্র ১৪ বছর বয়সে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন মহান মুক্তিযুদ্ধে।
১৯৫৬ সালের ৩ সেপ্টেম্বর জন্মগ্রহণ করেন আয়শা পারভীন। তার বাবা মোহাম্মদ ফজলুল হক ও মা জাহানারা বেগম। চার ভাইয়ের স্নেহের ছোট বোন হলেও ছোটবেলা থেকেই তিনি ছিলেন সাহসী ও দৃঢ়চেতা। অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী মনোভাব তাকে খুব অল্প বয়সেই আলাদা করে তোলে।
১৯৭১ সালের মার্চ মাসে শেখ মুজিবর রহমানের-এর স্বাধীনতার আহ্বানে জেগে ওঠে সমগ্র বাঙালি জাতি। সেই ডাকে সাড়া দিয়ে পিরোজপুরসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি। স্থানীয় নেতৃত্বের নির্দেশনায় অস্ত্র সংগ্রহ ও সংগঠিত হওয়ার নানা কার্যক্রমে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে যুক্ত হয়ে পড়ে আয়শার পরিবার।
তার চার ভাই যখন অস্ত্র হাতে যুদ্ধে যাওয়ার প্রস্তুতি নেন, তখন তাদের পরিবারও হানাদার বাহিনী ও রাজাকারদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়। নির্যাতন ও আতঙ্কের মধ্যে দিয়ে পরিবারটি এক স্থান থেকে অন্য স্থানে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়—পিরোজপুর থেকে বরিশাল, সেখান থেকে ঝালকাঠি এবং পরে মঠবাড়িয়ার রাজারহাট এলাকায়। কিন্তু এসব প্রতিকূলতা আয়শা পারভীনের মনে স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষাকে আরও দৃঢ় করে তোলে।
রাজারহাটে পৌঁছে তিনি শুধু দর্শক হয়ে থাকেননি। বুকাবুনিয়া মুক্তিবাহিনীর ক্যাম্পে তিনি ও তার পরিবার সক্রিয়ভাবে যুক্ত হন। গ্রাম থেকে চাল-ডাল সংগ্রহ, মুক্তিযোদ্ধাদের খাবারের ব্যবস্থা করা এবং আহত যোদ্ধাদের সেবাসহ বিভিন্ন কাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন তিনি।
১৯৭১ সালের জুন মাসে চার ভাইয়ের সঙ্গে তিনিও সরাসরি যোগ দেন মহান মুক্তিযুদ্ধে। ৯ নম্বর সেক্টরের অধীনে পটুয়াখালী-বরগুনা সাব-সেক্টরে শুরু হয় তার যুদ্ধজীবনের নতুন অধ্যায়। বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল মজিদের কাছে প্রশিক্ষণ নিয়ে দ্রুতই অস্ত্র পরিচালনায় দক্ষ হয়ে ওঠেন তিনি। পরে নারী গেরিলা কমান্ডার মাহফুজার অধীনে সহযোদ্ধা হিসেবে প্রায় তিন মাস দায়িত্ব পালন করেন।
এরপর শুরু হয় সম্মুখ যুদ্ধের দিনগুলো। ২৩ নভেম্বর বামনা, ২৮ নভেম্বর পাথরঘাটা, ১ ডিসেম্বর বেতাগী, ৩ ডিসেম্বর বরগুনা এবং ৮ ডিসেম্বর পটুয়াখালী—প্রতিটি যুদ্ধে তিনি অগ্রসারির সাহসী যোদ্ধা হিসেবে অংশ নেন।
বামনা ছিল পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর একটি শক্ত ঘাঁটি, যেখানে নির্যাতন ও হত্যার বিভীষিকা ছিল নিত্যদিনের ঘটনা। সেই ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্যেও সহযোদ্ধাদের সঙ্গে সম্মুখ যুদ্ধে অংশ নেন আয়শা পারভীন। বিষখালী নদীতে শত্রুপক্ষের গানবোটের টহল থাকা সত্ত্বেও প্রায় ৫০ থেকে ৬০ জন মুক্তিযোদ্ধা এবং ছয়জন নারী যোদ্ধা সাহস ও কৌশলের সঙ্গে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। তীব্র গোলাগুলির একপর্যায়ে শত্রুপক্ষ পিছু হটতে বাধ্য হয় এবং বামনা এলাকা হানাদারমুক্ত হয়।
এই বিজয় শুধু একটি যুদ্ধের জয় নয়, বরং ছিল এক কিশোরীর অদম্য সাহস, আত্মত্যাগ ও দেশপ্রেমের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
মুক্তিযুদ্ধের সময় তার সহযোদ্ধাদের মধ্যে ছিলেন রোকেয়া বেগম বেবী, রোজিনা আনসারী হেপী এবং এম এ রব্বানী ফিরোজসহ আরও অনেকে। তাদের সম্মিলিত সংগ্রাম ও ত্যাগের বিনিময়েই অর্জিত হয়েছে স্বাধীন বাংলাদেশ।
সময় অনেক দূরে সরে গেলেও ইতিহাসের পাতায় এবং স্বাধীন বাংলাদেশের প্রতিটি নিঃশ্বাসে বেঁচে আছেন সেই সাহসী কিশোরী—বীর মুক্তিযোদ্ধা আয়শা পারভীন। তার জীবনগাথা শুধু ব্যক্তিগত স্মৃতি নয়, বরং আমাদের জাতীয় ইতিহাসের এক গর্বিত অধ্যায়; যা প্রমাণ করে, দেশপ্রেমের কোনো বয়স হয় না।
লেখক: সাংবাদিক।
১২৫ বার পড়া হয়েছে