কর্মজীবী নারী এবং ভারসাম্যপূর্ণ জীবনব্যবস্থা
বুধবার, ২৫ মার্চ, ২০২৬ ৬:১৯ পূর্বাহ্ন
শেয়ার করুন:
"সারাদিন অফিস সেরে বাসায় গিয়ে দেখি অনেক কাজ জমে আছে। বাইরের কাপড় না ছাড়েই কাজে লেগে পড়ি। রাতে বাচ্চাদের নিজে পড়াই। শাশুড়ির রান্না, বাচ্চাদের রান্না, নিজেদের রান্না সব শেষ করে ঘুমাতে যাই ১২ টারও অনেক পরে।
আবার সেই ভোরে উঠে বাচ্চাদের টিফিন, নিজের লাঞ্চ সব গুছিয়ে একবারে বের হই। অফিসেও দেখা যায় আমরা মেয়েরা কাজ গুছিয়ে করি বলে আমাদের উপরই কাজের চাপ বেশী আসে। এভাবেই কাটে প্রতিদিন। নিজের যত্ন বা নিজের দিকে খেয়াল করার সময় কোথায়? মাঝে মাঝে মনে হয় আমি বাঁচি অন্যদের জন্য। এতকিছুর পরও প্রায়ই হাজবেন্ডের মুখ ভার। অনেক কিছু হাতের কাছে পায় না বলে ওর মুখ ভারে আমার জীবনটা যেন আরও ভারী ভারী লাগে।"
একজন কর্মজীবী নারীর কথা এগুলো হলেও বাংলাদেশের বেশীর ভাগ কর্মজীবী নারীর জীবনের দৃশ্যপট এমনই।
আধুনিক সমাজে নারীর ভূমিকা দিন দিন বিস্তৃত হচ্ছে। তাদের ক্ষমতায়ন নিয়ে অনেক কথা হচ্ছে। কিন্তু নারীরা সত্যি বলতে এতো প্রতিকুলতার মাঝেও এখনো হিমশিম খাচ্ছেন। এক সময় নারীর প্রধান দায়িত্ব ছিল সংসার ও পরিবারকে ঘিরে, কিন্তু বর্তমান সময়ে শিক্ষা, দক্ষতা এবং আত্মনির্ভরতার মাধ্যমে নারীরা কর্মক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন। ফলে কর্মজীবী নারীদের জীবনে একই সঙ্গে অফিসের দায়িত্ব ও পারিবারিক দায়িত্ব পালন করার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। এই দ্বৈত দায়িত্বের মাঝেও একটি ভারসাম্যপূর্ণ জীবন গড়ে তোলা আজকের সময়ের যেন এক বড় চ্যালেঞ্জ।
তাদের প্রতিদিনের জীবন খুব সহজ নয়। অফিসের কাজ শেষ করে বাড়িতে ফিরেই তাদের সংসারের নানা দায়িত্ব পালন করতে হয়—রান্না, সন্তানের পড়াশোনা দেখাশোনা, পরিবারের সদস্যদের যত্ন নেওয়া ইত্যাদি। অনেক ক্ষেত্রে স্বামী-স্ত্রী উভয়েই কর্মজীবী হলেও বাসার অধিকাংশ দায়িত্ব নারীর ওপরই পড়ে। ফলে মানসিক ও শারীরিক চাপ অনেক সময় বেড়ে যায়।
এছাড়া সমাজের দৃষ্টিভঙ্গিও কর্মজীবী নারীদের জন্য বড় একটি প্রতিবন্ধকতা। সন্তানের ফলাফল খারাপ হলে কিংবা কোনো সমস্যা হলে বেশীর ভাগ সময় দায় চাপানো হয় মায়ের ওপর। অথচ একজন কর্মজীবী মা একই সঙ্গে পরিবার ও কর্মক্ষেত্রের দায়িত্ব সামলে চলার চেষ্টা করেন।
এই পরিস্থিতিতে ভারসাম্যপূর্ণ জীবন গড়ে তুলতে কিছু বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বসহকারে দেখা উচিত। প্রথমত, নিজের যত্ন নেওয়া অত্যন্ত জরুরি। পর্যাপ্ত ঘুম, পুষ্টিকর খাবার এবং নিয়মিত বিশ্রাম একজন নারীর শারীরিক ও মানসিক সুস্থতা বজায় রাখতে সাহায্য করে। পাশাপাশি সপ্তাহে কিছু সময় নিজের জন্য রাখা—যেমন গান শোনা, বই পড়া বা পছন্দের কোনো কাজ করা—তার মানসিক চাপ কমাতে সাহায্য করবে।
দ্বিতীয়ত, সময় ব্যবস্থাপনা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। একটি নির্দিষ্ট রুটিন বা পারিবারিক ক্যালেন্ডার তৈরি করলে পরিবারের সবার কাজের সময়সূচি জানা সহজ হয়। এতে সন্তানের পড়াশোনা, স্কুলের কার্যক্রম কিংবা চিকিৎসার সময় ঠিকভাবে সামলানো সম্ভব হয়।
তৃতীয়ত, পরিবারের সহযোগিতা কর্মজীবী নারীর জীবনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। স্বামী, সন্তান এবং পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা যদি বাসার কাজে কিছুটা সাহায্য করেন, তাহলে তাদের ওপর চাপ অনেকটাই কমে যায়। একই সঙ্গে কর্মক্ষেত্রেও সহানুভূতিশীল পরিবেশ, নারীবান্ধব নীতিমালা নারীদের কাজের স্বাচ্ছন্দ্য ও উদ্দীপনা আরও অনেকগুণ বাড়িয়ে দিতে পারে।
এই যে কর্মজীবী মায়েরা এতো কষ্ট করেন, তার অনেক সুফলও আছে। গবেষণায় দেখা গেছে, কর্মজীবী মায়েদের সন্তানরা অনেক ক্ষেত্রেই বেশি আত্মনির্ভরশীল ও সচেতন হয়ে ওঠে। তারা ছোটবেলা থেকেই দায়িত্ববোধ শেখে এবং পরিবারে সহযোগিতার মনোভাব গড়ে ওঠে। এমনকি অনেক পরিবারে দেখা যায়, ছেলে সন্তানরাও বাসার কাজে অংশ নিতে শেখে, যা লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্য কমাতে সাহায্য করে।
বাংলাদেশে কর্মজীবী নারীর সংখ্যা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। তারা দেশের অর্থনীতি, সমাজ এবং উন্নয়নের অগ্রযাত্রায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। তাই তাদের জন্য এমন একটি পরিবেশ তৈরি করা প্রয়োজন, যেখানে তারা কর্মজীবন ও পারিবারিক জীবনের মধ্যে সুন্দর ভারসাম্য বজায় রেখে একটি সুস্থ, সুখী এবং পরিপূর্ণ জীবন যাপন করতে পারেন।
কর্মজীবী নারীর সাফল্য শুধু ব্যক্তিগত অর্জন নয়; এটি পরিবার, সমাজ এবং দেশের অগ্রগতির সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পর্কিত। তাই একটি সমতা ও সহযোগিতামূলক সমাজ গড়ে তুলতে কর্মজীবী নারীদের প্রতি সম্মান, সহানুভূতি এবং সহযোগিতা অত্যন্ত জরুরি এবং সেই সঙ্গে কর্মজীবী নারীদের উচিত নিজের প্রয়োজনের জন্য একটি ভারসাম্যপূর্ণ জীবন ব্যবস্থা গড়ে তোলা।
লেখক:
সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান
ব্যবসায় প্রশাসন বিভাগ
এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ
১৪৮ বার পড়া হয়েছে