জলের গান ফিরুক প্রিয় বাংলাদেশে
সোমবার, ২৩ মার্চ, ২০২৬ ৬:১২ পূর্বাহ্ন
শেয়ার করুন:
নতুন প্রজন্মের কাছে খাল খনন একটি নতুন বিষয়। এরইমধ্যে আলোচনা শুরু হয়েছে এর সুফল ও ফলপ্রসূ বাস্তবায়ন নিয়ে। পাশাপাশি কৃষকের ভাগ্য ও পরিবেশ উন্নয়ন এবং রাজনৈতিক নানা সমীকরণের বিষয়টি সামনে আসছে।
কারণ, যা কিছু ভালো- তা শুরুর সময় নানামুখি সমালোচনা থাকবে, একটা পক্ষ বিরোধিতার চেষ্টা করবে-এটাই সবসময় ঘটে, এখনও ঘটছে। শুরুতেই তাই বলবো, সমালোচনা থেকে ভুলত্রুটি শুধরে আরো ভালো কিছু হোক। সবুজ বাংলাদেশে পানি প্রবাহ ফিরে আসুক। প্রাণ ফিরে আসুক কৃষকের মাঠে। পানিপথ ফিরে পাক প্রাণচাঞ্চল্য। গতিময় ও ব্যয়সাশ্রয়ী হোক মানুষের জীবন। জলের গানে জেগে উঠুক প্রিয় বাংলাদেশ।
জনগণের ব্যালটে বিএনপি নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জনের পর সরকার গঠনের পর নতুন পরিকল্পনার ঝোড়ো বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে। মাটি ও মানুষের দল বিএনপি ঘোষিত খাল খনন কর্মসূচি কৃষি, পানি ব্যবস্থাপনা ও পরিবেশ সুরক্ষায় সময়ে সাথে আরো বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠবে-তা বলার অপেক্ষা রাখে না। কারণ, এর মাধ্যমে বর্ষার পানি ধরে রেখে শুষ্ক মৌসুমে সেচ নিশ্চিত করা হবে। উল্লেখযোগ্যহারে কমবে জলাবদ্ধতা-যার সরাসরি সুফল পাবে কৃষকসহ আপামর জনগণ। নতুন সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, পাঁচ বছরে দেশজুড়ে বিস্তৃত প্রায় ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খনন করা হবে। গত ১৬ মার্চ দিনাজপুরের সাহাপাড়া খাল খননের মাধ্যমে কর্মসূচির উদ্বোধন করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। একইসঙ্গে ভার্চুয়ালি দেশের ৫৪টি জেলায় চলমান খনন ও পুনঃখনন কাজেরও উদ্বোধন করেন তিনি। এর মাধ্যমে খাল খননের এক মহাযজ্ঞ শুরু হয়েছে সারাদেশে। ১৮০ দিনের মধ্যে ১২০০ কিলোমিটার খাল খনন দৃশ্যমান হয়ে উঠবে। মনে রাখতে হবে এটা শুরু, শেষ নয়; সামনের দিনে এই কর্মসূচি আরো বেগবান হবে। বিপন্ন নদীগুলো জলের গান নিয়ে ফিরে আসবে একের পর এক! ভাবতেই সৃজনশীল ও বিনয়ী প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রতি কৃতজ্ঞতা ভর করছে। নতুন বাংলাদেশ এক নতুন প্রধানমন্ত্রীকে দেখছে! এটা তরুণ প্রজন্মের জন্য সৌভাগ্যের। কারণ তারুণ্যেই আগামীর বাংলাদেশ।
প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমানের পথচলাকে অনেকেই শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সাথে তুলনা করছেন, কারণ তাঁর বাবার সুদূরপ্রসারী কাজগুলোর একটি ছিল খাল খনন কর্মসূচি। ১৯৭৭ সালে বাংলাদেশের গ্রামীণ উন্নয়ন ও কৃষি পুনরুজ্জীবনের উদ্দেশ্য নিয়ে খাল খনন কর্মসূচি চালু করেছিলেন জিয়াউর রহমান। সেসময় দূরদর্শিতা ও বুদ্ধিমত্তায় খাল খনন কর্মসূচির মাধ্যমে একটি যুগান্তকারী মডেল স্থাপন করেছিলেন তিনি। এ কর্মসূচির মূল লক্ষ্য ছিল বর্ষাকালে অতিরিক্ত পানি ধরে রাখা এবং শুষ্ক মৌসুমে কৃষিকাজে সেচব্যবস্থা নিশ্চিত করে বাংলাদেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ একটি দেশে রূপান্তরিত করা। পাশাপাশি সহজ যোগাযোগ ও পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলাও ছিল খাল খননের অন্যতম উদ্দেশ্য। ‘কাজের বিনিময়ে খাদ্য’ মডেলে পরিচালিত এ কর্মসূচি ১৯৭৭ থেকে ১৯৮১ সালের মধ্যে বাংলাদেশের গ্রামীণ উন্নয়ন ও কৃষি সম্প্রসারণে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছে। এ সময়ে ২৭৯টি প্রকল্পের মাধ্যমে প্রায় দেড় হাজার খাল খনন করা হয়। এ খালের দৈর্ঘ্য ছিল প্রায় ৩ হাজার ৬৩৬ মাইল।
সঙ্গতকারণেই, দেশের মানুষ আজ বেশি উচ্ছ্বসিত, উল্লসিত তারেক রহমানের খাল খনন কর্মসূচি নিয়ে। ছেলের মধ্যে বাবা রাষ্ট্রপতি জিয়াকে খুঁজে পাচ্ছেন বয়স্করা। সাধারণ মানুষ বেশি কিছু চায় না। তারা চায় খাদ্যনিরাপত্তা, নিত্যপণ্যের ন্যায্যমূল্য, সহজ যোগাযোগ ব্যবস্থা, সার, বীজ ও সেচের পানি। কৃষিনির্ভর বাংলাদেশে এর কোন বিকল্প আছে-তা কেউ বলতে পারবে না। সহজভাবে বললে এর কোন বিকল্প নেই। তবে খাল খননে অনিয়ম, দুর্নীতি, অস্তিত্বহীন খাল খননের নামে বিল লোপাট, রাজনৈতিক প্রভাব, পেশীশক্তির ব্যবহার, স্বেচ্ছাচারিতা, দলীয়করণ- এর কোনটাই আর দেখতে চাই না আমরা। আমি মনে করি, এটাই এখন বিএনপি তথা নতুন সরকারের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ। জনআকাঙ্খা পূরণে ব্যর্থ হলে সব অর্জন বিফলে যাবে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের হিসাবমতে, দেশে ৩০ হাজারেরও বেশি খাল রয়েছে। কিন্তু বিএস বা আরএস খতিয়ানে অনেক খালের অস্তিত্ব থাকলেও বাস্তবে নেই। খালগুলো যেন ইতিহাসের পাতায় ঠাঁই নিয়েছে। অনেকগুলো খাল ভরাট করে গড়ে তোলা হয়েছে ভবন, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান ও অন্যান্য স্থাপনা। কেউ কেউ প্রভাব খাটিয়ে নিজেদের মতো দখল করে সবজিক্ষেত করছেন। বাপদাদার সম্পত্তির মতো ভোগদখল করছেন স্থানীয় প্রভাবশালীরা। এই খালগুলো পুনরুদ্ধার করা এখন সময়ের দাবি। এজন্য রেকর্ডের খালগুলো শনাক্ত করাটাও জরুরি। এটা সহজ কাজ হবে না। কারণ, নদ-নদীর একটি হালনাগাদ তথ্যভান্ডার থাকলেও খাল নিয়ে পূর্ণাঙ্গ ও একীভূত কোনো ডেটাবেজ নেই। ফলে খাল খনন, পুনঃখনন ও রক্ষণাবেক্ষণে বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতি ও দ্বৈততা বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
নগরীর সমন্বিত পানি ব্যবস্থাপনা বা ইন্টিগ্রেটেড আরবান ওয়াটার ম্যানেজমেন্ট (আইইউডাব্লুএম) দীর্ঘদিন পানি ব্যবস্থাপনা ও মানদণ্ড নিয়ে কাজ করছে। তাদের গবেষণা বলছে, খালের মাধ্যমে নগরীর জল সরবরাহ, বর্জ্য জল এবং ঝড়ের জলসহ জল ব্যবস্থার উপাদানগুলির সাবসিস্টেমগুলোর সুবিধাজনক একীকরণহয়। এর মাধ্যমে নাগরিক জীবনে স্বস্তি ফিরে আসবে। নিরাপদ পানি জনস্বাস্থ্যেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। তাইতো নগরীর মতো সারা দেশের খালগুলোর উৎপত্তিস্থল, আউটফল, প্রবাহপথ, বেসিন ও সাববেসিন চিহ্নিত করে একটি জিও-ইনফরমেশন সিস্টেমভিত্তিক খাল নেটওয়ার্ক তৈরি করা দরকার। যার মাধ্যমে জনজীবন, জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশের ওপর, খাদ্য নিরাপত্তার ওপর, অর্থনীতির ওপর উল্লেখযোগ্য ও টেকসই পরিবর্তন আসবে।
বাংলাদেশে ১ লাখ ৬১ হাজার কিলোমিটার খাল রয়েছে। এর মধ্যে বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যে ৫৪টি অভিন্ন নদী রয়েছে। যেগুলো এখন গলার কাটা। কারণ, খালের পানির মূল উৎস যেখানে নদী, সেখানে উজানে প্রতিবেশি দেশের একের পর এক বাঁধ, ব্যারেজ এবং পানি প্রত্যাহার প্রকল্প নদীগুলোকে হত্যা করেছে। শুষ্ক মৌসুমে নদীগুলো মৃতপ্রায় পড়ে থাকে, হতাশায় কাটে কৃষকের দিন। আর বর্ষাকালে অতিবর্ষণে নিচু এলাকায় দেখা দেয় বন্যা পরিস্থিতি। জমির ফসল হারিয়ে, পুকুরের মাছ হারিয়ে, ঘরবাড়ি হারিয়ে সর্বশান্ত হয়ে যায় হতভাগ্য লাখ লাখ মানুষ। সরকার আসে সরকার যায়, তবু ভাগ্যের পরিবর্তন হয় না তাদের। নদী নিয়ে আমরা আর সুবিধাবাদি রাজনীতি, জটিল ভূ-রাজনীতি আর নতজানু কূটনীতি দেখতে চাই না।
অন্তর্বর্তী সরকারকে আমরা দেখেছি। এর আগে প্রায় সতেরো বছরের একদলীয় শাসন দেখেছি। কিন্তু দেখিনি পানির ন্যায্য হিস্যা; নদী বা খালগুলোতে প্রাণসঞ্চারের কোন জোরালো পদক্ষেপ। খালে পানি আনা বা খালকে জীবন দেওয়ার যে চ্যালেঞ্জ বিএনপি সরকার নিয়েছে, তার ওপর আস্থা রাখতে চাই। আমরা প্রত্যাশা করি, বর্তমান সরকার আন্তর্জাতিক নদী আইন অনুযায়ী, অভিন্ন নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা আদায়ে আপোষহীন ভূমিকা পালন করবে। খালগুলোর নদীর পানি পাবে। মাছেরা বেড়ে উঠবে। জেলেরা ভরষা পাবে। জীবন পাবে প্রাণ ও প্রকৃতি। খাল-নদী খনন ও পুনঃখননের মাধ্যমে আমরা আবারো শুনতে পাবো জলের গান। আসুন, আমরা এখন সেই সময়ের জন্য অপেক্ষা করি।
লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক।
২০১ বার পড়া হয়েছে