সুশৃঙ্খল যাকাত ব্যবস্থাপনা: দারিদ্র্য জয়ের সম্ভাবনাময় মডেল
বুধবার, ১৮ মার্চ, ২০২৬ ৫:১৩ অপরাহ্ন
শেয়ার করুন:
বাংলাদেশে দারিদ্র্য বিমোচন নিয়ে আলোচনা নতুন নয়। স্বাধীনতার পর থেকে এদেশের বিভিন্ন সরকার, আন্তর্জাতিক সংস্থাসমূহ এবং উন্নয়ন সহযোগীরা অসংখ্য প্রকল্প গ্রহণ করেছে দরিদ্র মানুষের ভাগ্যোন্নয়নের জন্য।
মাইক্রোক্রেডিট থেকে শুরু করে নানা প্রকৃতির সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি, কাবিখা, কাবিটা, ভিজিএফ কার্ড বিতরণ, টিসিবির স্বল্পমূল্যে জরুরি পণ্য বিক্রি পর্যন্ত বহু কিছু চেষ্টা করা হয়েছে। তবু বাস্তবতা হলো, উন্নয়নের পরিসংখ্যান যতই আশাব্যঞ্জক হোক না কেন, সমাজের একটি বড় অংশ এখনও অনিশ্চিত আয়ের দুষ্টচক্রে বন্দী। অভাব ও দারিদ্র্যের কালিতেই লেখা হয় তাদের নিত্যদিনের গল্প।
এই বাস্তবতায় দারিদ্র্য দূরীকরণে একটি বিকল্প ও টেকসই পথ হিসেবে সুশৃঙ্খল ও প্রাতিষ্ঠানিক যাকাত ব্যবস্থাপনার কথা বিভিন্ন সময় সামনে এলেও কার্যকর উদ্যোগ, পরিকল্পনা এবং সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার অভাবে ব্যাপক সম্ভাবনাময় যাকাতের বিপুল পরিমাণ অর্থ কার্যকর কোনো ভূমিকা রাখতে পারছে না। অথচ, বাংলাদেশের মতো একটি মুসলিম প্রধান দেশ চাইলে শুধু যাকাত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমেই দারিদ্র্যের চাকা ঘুরিয়ে দিতে পারে। কারণ, যাকাত হলো এমন এক ধরনের আর্থিক ব্যবস্থা, যেখানে দরিদ্র ও বিত্তহীন লোকদেরকে বিনা সুদে এককালীন অর্থ সহায়তা দেওয়া হয়। এই অর্থ ভেঙে না খেয়ে কর্মসংস্থানমূলক কাজে পুঁজি হিসেবে ব্যবহার করলে সহজেই একজন ব্যক্তি তথা একটি পরিবারের ভাগ্যের চাকা ঘুরে যেতে পারে।
সম্প্রতি আমাদের বর্তমান সরকারের প্রধান মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যাকাত ব্যবস্থাপনাকে একটি আধুনিক ও সংগঠিত কাঠামোর মধ্যে আনার যে ধারণা সামনে এনেছেন, তা কেবল ধর্মীয় দায়িত্ব পালনের বিষয় নয়; বরং এটা হতে পারে দারিদ্র্য বিমোচনের একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক মডেল। আমার ধারণা, অনেক ভেবেচিন্তেই তিনি এই কাজটিতে হাত দিয়েছেন। কারণ, যাকাত দারিদ্র্য বিমোচনের খুবই কার্যকর একটি হাতিয়ার। এটা ঠিকঠাক ব্যবহার করা গেলে সামাজিক নিরাপত্তার অনেক উদ্যোগই আর দরকার পড়বে না সামনে।
ইসলামী অর্থনীতিতে যাকাত কেবল একটি সাধারণ দান নয়। এটি একটি সামাজিক পুনর্বণ্টন ব্যবস্থা। সমাজের সম্পদশালী মানুষের সম্পদের একটি নির্দিষ্ট অংশ নিয়মিতভাবে দরিদ্র মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার মাধ্যমে অর্থনৈতিক ভারসাম্য সৃষ্টি করাই এর মূল লক্ষ্য।
কিন্তু বাংলাদেশে যাকাতের বিপুল সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও এটি এখনও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত ও বিচ্ছিন্নভাবে বিতরণ হয়। পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনার বদলে চরম অপরিকল্পিতভাবে যেমন-তেমন করে শাড়ি-লুঙ্গি বিতরণ করে দায় সারা হয়। ফলে এর অর্থনৈতিক প্রভাব সীমিত থেকে যায়। অধিকাংশ মানুষ বঞ্চিত হয় যাকাতের প্রকৃত সুফল থেকে।
যাকাত ব্যবস্থার সবচেয়ে শক্তিশালী দিক হলো, এটি একটি নির্দিষ্ট ও ন্যায্য অনুপাতের ভিত্তিতে সম্পদের পুনর্বণ্টন নিশ্চিত করে। ইসলামী বিধান অনুযায়ী কোনো ব্যক্তির সম্পদ নির্ধারিত নিসাব অতিক্রম করলে তাকে মোট সম্পদের ২.৫ শতাংশ যাকাত দিতে হয়। অর্থাৎ কারও কাছে যদি এক লাখ টাকা থাকে, তাকে দিতে হবে আড়াই হাজার টাকা। এক কোটি টাকা থাকলে দিতে হবে আড়াই লাখ টাকা। একইভাবে কারও সম্পদ যদি ১০০ কোটি বা ১০০০ কোটি টাকাও হয়, তাহলেও তাকে একই অনুপাতে ২.৫ শতাংশ যাকাত দিতে হবে।
ফলে সম্পদ যত বড় হবে, সমাজে দরিদ্র মানুষের জন্য তত বড় অঙ্কের অর্থ প্রবাহিত হবে। এই নীতির ফলে সমাজে সম্পদের একটি স্বাভাবিক ও ন্যায়ভিত্তিক পুনর্বণ্টন ঘটে, যা দারিদ্র্য হ্রাসে অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
বাংলাদেশে প্রান্তিক মানুষের দারিদ্র্য মোকাবিলায় এখন পর্যন্ত সবচেয়ে প্রচলিত পদ্ধতি হলো ক্ষুদ্রঋণ। দেশের লাখ লাখ অভাবী-দরিদ্র মানুষ জরুরি প্রয়োজনে ক্ষুদ্রঋণের দারস্থ হয়। কিন্তু ক্ষুদ্রঋণের একটি সীমাবদ্ধতা আছে। প্রায় সময়ই এসব ঋণ অত্যন্ত চড়া সুদের হয় সাধারণত। ঋণ গ্রহণকারীকে সুদ ও কিস্তি দুটোরই চাপ বহন করতে হয়। অনেক ক্ষেত্রে দরিদ্র মানুষ পুরোনো ঋণ শোধ করতে গিয়ে নতুন ঋণের ফাঁদে পড়ে। অনেকেই ঋণের টাকা শোধ করতে না পেরে ভিটেমাটি ছেড়ে পালিয়ে বাঁচে। ঋণ পরিশোধে অপরাগ হয়ে আত্মহননের পথও বেছে নেয় কেউ কেউ।
কিন্তু যাকাতের অর্থ ঋণ নয়; এটি একটি অধিকারভিত্তিক সহায়তা। যাকাতের টাকা কখনো ফেরত দিতে হয় না। ফলে যাকাতের অর্থ ব্যবহার করে যদি ক্ষুদ্র ব্যবসা, কৃষি উদ্যোগ কিংবা কারিগরি প্রশিক্ষণ দেওয়া যায়, তাহলে এটি ঋণের বিকল্প একটি টেকসই অর্থনৈতিক সহায়তা হয়ে উঠতে পারে খুব সহজেই।
বিশ্বের বিভিন্ন মুসলিম দেশে এই ধারণা ইতোমধ্যেই কার্যকরভাবে প্রয়োগ করা হয়েছে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশ মালয়েশিয়া তার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। সেখানে যাকাত ব্যবস্থাপনাকে সরকার ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মাধ্যমে সংগঠিত করা হয়েছে। রাজ্যভিত্তিক যাকাত বোর্ডগুলো যাকাত সংগ্রহ করে এবং তা দরিদ্র মানুষের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, আবাসন এবং উদ্যোক্তা উন্নয়নে বিনিয়োগ করে। অনেক ক্ষেত্রে যাকাত তহবিল থেকে দরিদ্র মানুষকে ব্যবসা শুরু করার পুঁজি দেওয়া হয়, যার মাধ্যমে তারা স্থায়ী আয়ের উৎস তৈরি করতে সক্ষম হয়।
বাংলাদেশেও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে যাকাত ব্যবস্থাপনার সফল উদাহরণ ইতোমধ্যে দেখা গেছে। জনপ্রিয় ইসলামি বক্তা মাওলানা আহমদুল্লাহ সাহেব তার আসসুন্নাহ ফাউন্ডেশনে যাকাতের অর্থকে কেবল দান হিসেবে বিতরণ না করে তা কর্মসংস্থানমুখী উদ্যোগে ব্যবহার করার একটি কার্যকর মডেল তৈরি করেছেন।
তাদের উদ্যোগে অসচ্ছল মানুষকে রিকশা, ভ্যান, সেলাই মেশিন, মুদি দোকান চালুর পুঁজি কিংবা ছোট কৃষি উদ্যোগের জন্য গবাদিপশু দেওয়া হয়েছে। ফলে একজন বেকার যুবক রিকশা পেয়ে আয় শুরু করেছে, কোনো বিধবা নারী সেলাই মেশিন পেয়ে নিজের সংসার চালাতে পারছে, আবার কেউ ছোট একটি দোকান খুলে পরিবারের জীবিকা নির্বাহ করছে। এই ধরনের উদ্যোগের মাধ্যমে শত শত পরিবার স্থায়ী আয়ের সুযোগ পেয়েছে এবং দানের অর্থ ধীরে ধীরে উৎপাদনশীল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে রূপ নিয়েছে।
এই বাস্তব অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে, নির্দিষ্ট পরিকল্পনামাফিক সুশৃঙ্খলভাবে পরিচালিত হলে যাকাত একটি শক্তিশালী সামাজিক নিরাপত্তা ও কর্মসংস্থানমুখী অর্থনৈতিক তহবিলে পরিণত হতে পারে। আসসুন্নাহ ফাউন্ডেশনের যাকাত ব্যবস্থাপনা তার বাস্তব উদাহরণ। বেসরকারি উদ্যোগে তাদের চেয়ে ভালোভাবে যাকাত ব্যবস্থাপনা মডেল এখন পর্যন্ত আর কেউ বাস্তবায়ন করে দেখাতে পারেনি দেশে।
তাদের এই মডেলকে সামনে রেখে বাংলাদেশে যদি জাতীয় পর্যায়ে একটি স্বচ্ছ ও প্রযুক্তিনির্ভর যাকাত ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা যায়, যেখানে দরিদ্র মানুষের সঠিক তালিকা, দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচি এবং উদ্যোক্তা তৈরির পরিকল্পনা থাকবে, তাহলে এটি দারিদ্র্য বিমোচনে নতুন দিগন্ত খুলে দিতে পারে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এ কারণেই সম্ভবত মাওলানা আহমদুল্লাহকে সরকারি যাকাত ব্যবস্থাপনার কাজে অংশীদার করতে চান, কাজে লাগাতে চান তার বাস্তব অভিজ্ঞতা। উদ্যোগ হিসেবে তারেক রহমানের এ পদক্ষেপ অসাধারণ। এটি ঠিকঠাক বাস্তবায়ন করা সম্ভব হলে এটি যে দারিদ্র্য বিমোচনের একটি রোল মডেল হবে, একথা নির্দ্বিধায় বলা যায়।
এই প্রেক্ষাপটে তারেক রহমানের গৃহীত সুশৃঙ্খল যাকাত ব্যবস্থাপনা উদ্যোগকে কেবল রাজনৈতিক পদক্ষেপ হিসেবে দেখলে ভুল হবে। রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে দলমত নির্বিশেষে এটিকে একটি সম্ভাবনাময় অর্থনৈতিক মডেল হিসেবে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। কারণ উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো দারিদ্র্য দূরীকরণে টেকসই অর্থনৈতিক কাঠামো তৈরি করা। ঠিক এই জায়গাটিতে অত্যন্ত দক্ষ ও কার্যকর একটি ব্যবস্থা হিসেবে কাজ করতে পারে যাকাত।
সারা দেশের যাকাত ব্যবস্থাকে আধুনিক প্রশাসনিক কাঠামো, প্রযুক্তি এবং দক্ষ ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত করা গেলে এটি একদিকে যেমন ধর্মীয় দায়িত্ব পালনের সুযোগ দেবে, অন্যদিকে সমাজে নিশ্চিত করবে সম্পদের ন্যায্য বণ্টন। দরিদ্র মানুষ ঋণের ফাঁদে না পড়ে কর্মসংস্থানের সুযোগ পাবে, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা তৈরি হবে এবং স্থানীয় অর্থনীতি শক্তিশালী হবে।
বাংলাদেশে দারিদ্র্য বিমোচনের যে লড়াই, তা এক অতিদীর্ঘ এবং বহুকালের এক অসীম লড়াই। এ লড়াইয়ের যেন কোনো সীমা-পরিসীমা নেই। কিন্তু সঠিক পরিকল্পনা, স্বচ্ছ ব্যবস্থাপনা এবং সামাজিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা গেলে সেই লড়াইয়ের মাঠে যাকাত হতে পারে সেই শক্তি, যা দানের সংস্কৃতিকে রূপ দেবে অর্থনৈতিক মুক্তির এক কার্যকর মডেলে। আর সেই পথ দেখানোর একটি সম্ভাব্য সূচনা হতে পারে তারেক রহমানের প্রস্তাবিত সুশৃঙ্খল যাকাত ব্যবস্থাপনা উদ্যোগ। তবে এর সফলতা নির্ভর করছে স্বচ্ছতার সাথে সুষ্ঠুভাবে এ উদ্যোগ যথাযথ বাস্তবায়নের ওপর।
লেখক: লেখক, অ্যাক্টিভিস্ট
১৪৭ বার পড়া হয়েছে