সরকারি হাসপাতালের সত্যি গল্প: রোগীর আর্তনাদ এখানে মূল্যহীন!
বৃহস্পতিবার , ১২ মার্চ, ২০২৬ ৭:৪৫ পূর্বাহ্ন
শেয়ার করুন:
শুধু কুষ্টিয়ার কুমারখালী নয়, দেশের প্রতিটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স যেন আজ এক করুণ বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। সারা দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় শুধু সংকট আর সংকট। আর আমাদের স্থানীয় সরকারি হাসপাতালের বেহাল দশা তো আমাদের সকলেরই জানা।
ডাক্তার সংকট, জনবল সংকট, ওষুধ সংকট—সব মিলিয়ে হাসপাতাল যেন হাবুডুবু খাচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরও ভয়ংকর একটি বিষয়, তা হলো- ডাক্তারদের আন্তরিকতা ও মানবিকতার গভীর সংকট।
একদিকে ডাক্তার নেই, অন্যদিকে যারা আছেন তাদের বড় একটি অংশ নিয়মিত কর্মস্থলে থাকেন না, দেরিতে আসেন, কিংবা দায়িত্বহীন আচরণ করেন। রোগীর সঙ্গে এমন আচরণ দেখে অনেক সময় নাগরিক হিসেবে লজ্জায় আমাদের মাথা নিচু হয়ে যায়।
একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে সরকারের প্রতি নিবেদন--
স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়নকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েই কাজ শুরু করতে হবে (ইতোমধ্যেই শুরু হয়েছে)। কারণ তৃণমূল পর্যায়ের মানুষ জেলা কিংবা উপজেলা সরকারি হাসপাতালে গিয়ে ন্যূনতম চিকিৎসা সেবা থেকেও চরমভাবে বঞ্চিত হচ্ছেন।
আজ বাস্তবতা এমন দাঁড়িয়েছে—সরকারি হাসপাতালে সিজারের মতো জীবনরক্ষাকারী সেবাও পাওয়া যায় না।
অথচ প্রাইভেট হাসপাতালে গেলেই টাকার বিনিময়ে একই সেবা মিলছে। প্রশ্ন হলো- প্রাইভেট হাসপাতালের তো নিজস্ব ডাক্তার নেই। সরকারী হাসপাতালের ডাক্তাররাই তাদের চালিয়ে নিচ্ছেন। তাহলে রাষ্ট্রীয় স্বাস্থ্য ব্যবস্থা গোল্লায় যাচ্ছে কেন?
ডাক্তার সংকট একটি বাস্তব সমস্যা—এটা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কিন্তু যারা সরকারি হাসপাতালে কর্মরত, তাদের বড় একটি অংশকে দেখা যায় প্রাইভেট হাসপাতালে অনেক বেশি ফুরফুরে মেজাজে।
সেখানে তারা ঘণ্টার পর ঘণ্টা সেখানে রোগী দেখেন, রিপোর্ট খুঁটিয়ে দেখেন। চারপাশে ঘিরে থাকেন ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধিরা, প্রাইভেট হাসপাতালের মালিক ও কর্মচারীরা। সেখানে তাদের আন্তরিকতার কোনো ঘাটতি নেই। আর সরকারি হাসপাতালের রোগীরা যেন বোঝা।
প্রাইভেট হাসপাতালে টাকার বিনিময়ে আন্তরিকভাবে সেবা দিচ্ছে, অথচ সরকারি বেতনের বিনিময়ে হাসপাতালে কি সেবা দিচ্ছেন তারা ?
এই বাস্তবতার এক নির্মম অভিজ্ঞতা হয়েছে আমার জীবনে।
কিছুদিন আগের (সংসদ নির্বাচনের আগের) কথা। ফজরের আজান চলছিল। হঠাৎ আম্মা অসুস্থ হয়ে পড়লেন। বার বার চিৎকার করে বলছিলেন- আমি মারা গেলাম রে। ক্রমেই তাঁর পেট ফুলে যাচ্ছে, প্রস্রাব হচ্ছে না। আমরা দিশেহারা।
আমার স্ত্রী বললো—এখনই হাসপাতালে নিতে হবে আম্মাকে।
ভোর ছয়টার আগেই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পৌঁছালাম। চারদিকে নীরবতা। জরুরি বিভাগের ডাক্তারের কক্ষে তালা ঝুলছিল। উপসহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসারের কক্ষে বারবার নক করেও সাড়া নেই।
পরে ভিতর থেকে ক্ষিপ্ত স্বরে প্রশ্ন ভেসে এলো, এত সকালে কী হয়েছে? যেন রোগী হওয়াটাই অপরাধ!
আম্মাকে ভর্তি করানো হলো। কিন্তু সকাল ১০টা পর্যন্ত কোনো ডাক্তার পাওয়া গেল না। নার্সরা এলেন না আম্মার কাছেই। প্রাথমিক কাজগুলো করলেন হাসপাতালের ক্লিনাররা (টাকার বিনিময়ে)। আর ভোরে ফার্মেসি খুলিয়ে প্রয়োজনীয় জিনিস কিনতে হলো। তারপর শুরু হলো অপেক্ষা ---
সকাল- ৭টা, সকাল- ৮ টা, সকাল- ৯ টা কোনে ডাক্তার নেই! !
শেষ পর্যন্ত উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তাকে ফোন করতে হলো—যিনি কর্মস্থলের বদলে কুষ্টিয়া শহরে থাকেন।
তিনি সকাল ১০টার দিকে এসে রোগী দেখলেন। আর বললেন - আমার একটা প্রোগ্রাম আছে তো! সেখানে যেতেই হবে। এই হলো তৃণমূলের সরকারি স্বাস্থ্য সেবার বাস্তব চিত্র।
আর রোগী দেখা শেষে হাসপাতালের (প্রধান কর্তা) শত শত রোগীকে ফেলে রেখে তিনি ছুটলেন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের একজন বড় কর্মকর্তা কর্তৃক স্বাস্থ্যসেবা ক্যাম্পের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে। আমি সেদিন নিজেই নিশ্চুপ হয়ে হাসপাতালে উপস্থিত থেকে তাকিয়ে তাকিয়ে এমন দায়িত্বহীনতার চিত্র দেখেছিলাম। আর ভেবেছিলাম ওই সরকারি কর্মকর্তার কি দায়িত্ব ছিল না সবার আগে সরকারি হাসপাতাল পরিদর্শন করা? না কি উনি সরকারি সফরে আসেননি। আর তাই যদি হয় তবে- উনার অনুষ্ঠানে সরকারি হাসপাতালের কর্মকর্তা অফিস সময়ে গেলেন কেন? এই প্রশ্ন তাঁরই করা উচিত ছিল।
কিন্তু না! তিনি- এখানকার পূর্ব পরিচিতদের মান ও মন রক্ষা করেই চলে গিয়েছিলেন।
এ অভিজ্ঞতা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটি দেশের অধিকাংশ উপজেলা হাসপাতালের প্রতিদিনের গল্প। আর হাজারো সাধারণ মানুষ/রোগী এহেন পরিস্থিতির নিরব স্বাক্ষী।
এখন আমরা আশায় আছি—নতুন সরকারের ডাক্তার নিয়োগ ও স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়নের ঘোষণায়। তবে বাস্তব অভিজ্ঞতার আলোকে স্পষ্ট করে বলতে চাই—শুধু ডাক্তার নিয়োগ করলেই সমস্যার সমাধান হবে না।
ডাক্তারদের কর্মস্থলে উপস্থিতি, দায়িত্বশীল আচরণ ও মানবিক সেবাদান নিশ্চিত করতে কঠোর ও নিরবচ্ছিন্ন মনিটরিং ব্যবস্থা চালু করতে হবে। দায়িত্ব পালনে কোনো অজুহাত গ্রহণযোগ্য নয়, এই বার্তা পরিষ্কারভাবে দিতে হবে।
আর মনে রাখাতে হবে তৃণমূলের মানুষ হাসপাতালের বারান্দায় শুয়ে আর আশ্বাস নয়, চিকিৎসা চায়।
লেখক : সাংবাদিক।
(লেখাটি লেখকের ফেসবুক থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে)
১৩০ বার পড়া হয়েছে