জ্বালানি নিরাপত্তা, বৈশ্বিক সংঘাত ও বাংলাদেশের বাস্তববাদী কূটনৈতিক পদক্ষেপ
বৃহস্পতিবার , ১২ মার্চ, ২০২৬ ৬:১৫ পূর্বাহ্ন
শেয়ার করুন:
বিশ্ব রাজনীতি বর্তমানে এক অনিশ্চিত ও অস্থির সময় অতিক্রম করছে। মধ্যপ্রাচ্যে ইরানকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে চলমান যুদ্ধ এবং পূর্ব ইউরোপে দীর্ঘস্থায়ী রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধ আন্তর্জাতিক অর্থনীতি ও জ্বালানি বাজারকে গভীরভাবে প্রভাবিত করছে।
এই দুই সংঘাত শুধু আঞ্চলিক নিরাপত্তা সংকট নয়, বরং বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ, মূল্য স্থিতিশীলতা এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর অর্থনৈতিক নিরাপত্তার ওপর সরাসরি চাপ সৃষ্টি করছে। এমন প্রেক্ষাপটে রাশিয়া থেকে জ্বালানি আমদানির ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে বিশেষ অনুমতি (waiver) চাওয়ার বাংলাদেশের উদ্যোগ নতুন করে আলোচনায় এসেছে। পত্রিকার প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত বুধবার (১১ মার্চ) রাজধানীর শেরে বাংলা নগরে পরিকল্পনা মন্ত্রীর কার্যালয়ে বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট টি. ক্রিসটেনসেনের সঙ্গে বৈঠক শেষে অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, "আন্তর্জাতিক অস্থিরতা—বিশেষত ইরান, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রকে ঘিরে চলমান উত্তেজনা—বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দামকে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে ঠেলে দিচ্ছে"। ফলে, এই পরিস্থিতিতে সাশ্রয়ী মূল্যে বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি সংগ্রহকে কেবলমাত্র অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখার সুযোগ নেই বরং এখন এটি জাতীয় স্থিতিশীলতার প্রশ্ন এবং বাংলাদেশের অবস্থান এখানে মূলত বাস্তববাদী। কেননা, দেশটি কোনো ভূরাজনৈতিক ব্লকের অংশ হিসেবে নয়, বরং একটি আমদানিনির্ভর অর্থনীতির বাধ্যবাধকতা থেকেই বিকল্প জ্বালানি উৎস খুঁজছে। বিশ্ববাজারে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি সরাসরি পরিবহন ব্যয়, বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্প খরচ এবং শেষ পর্যন্ত খাদ্যদ্রব্যের দামে প্রভাব ফেলে। ফলে জ্বালানি সংকট কেবল অর্থনীতির পরিসংখ্যান নয়, বরং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মানের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।
তবে প্রশ্ন উঠতে পারে—রাশিয়া থেকে তেল কিনতে কেন যুক্তরাষ্ট্রের অনুমতি প্রয়োজন? এর উত্তর নিহিত আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার কাঠামোয়। রাশিয়ার ওপর আরোপিত পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার কারণে আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং, ডলার লেনদেন ও বীমা ব্যবস্থার বড় অংশ নিয়ন্ত্রিত নিয়মের আওতায় পড়ে। ফলে অনুমতি ছাড়া এ ধরনের বাণিজ্য অর্থনৈতিক ঝুঁকি ও কূটনৈতিক জটিলতা তৈরি করতে পারে। সেই বাস্তবতায় বাংলাদেশ সরাসরি সংঘাতে না গিয়ে কূটনৈতিক স্বচ্ছতার পথ বেছে নিয়েছে।
অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী'র বক্তব্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক উঠে এসেছে—ভারতকে দেওয়া অস্থায়ী ছাড়ের নজির। কেননা, ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের জেরে রাশিয়ার তেলের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর নিষেধাজ্ঞা থাকলেও বৈশ্বিক বাজার স্থিতিশীল রাখতে নির্দিষ্ট কিছু দেশকে শর্তসাপেক্ষে তেল কেনার অনুমতি বা বিশেষ ওয়েভার দিয়ে আসছে যুক্তরাষ্ট্র। সম্প্রতি ভারতকে দেওয়া এমন একটি বিশেষ ছাড়ের পরেই বাংলাদেশও একই পথে হাঁটার সিদ্ধান্ত নিল। অর্থাৎ, আঞ্চলিক অর্থনৈতিক বাস্তবতায় ভারত যেমন নিজস্ব জ্বালানি নিরাপত্তার স্বার্থে বিশেষ সুবিধা পেয়েছে, বাংলাদেশও একই যুক্তিতে সমান সুযোগ প্রত্যাশা করছে। ফলে এই বিষয়টিকে বিশেষ কোনো রাজনৈতিক অবস্থান হিসেবে না দেখে বরং সমতা ও প্রয়োজনের ভিত্তিতে আন্তর্জাতিক নীতির প্রয়োগের দাবি হিসেবে দেখায় শ্রেয়। এছাড়া বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির ঐতিহ্যগত দর্শন—“সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়” এখানেও স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত। একদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখা, অন্যদিকে জাতীয় স্বার্থে সাশ্রয়ী জ্বালানি নিশ্চিত করা, এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করাই এখন প্রধান কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ। বাস্তবতা হলো, উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য জ্বালানি আজ কেবল বাণিজ্যিক পণ্য নয়; এটি সামাজিক স্থিতিশীলতা, শিল্প প্রবৃদ্ধি এবং দারিদ্র্য নিয়ন্ত্রণের অন্যতম ভিত্তি। তাই বৈশ্বিক রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের ভার যেন সাধারণ মানুষের ওপর না পড়ে—এই প্রত্যাশাই বাংলাদেশের উদ্যোগের মূল বার্তা। শেষ পর্যন্ত, এই উদ্যোগ সফল হোক বা না হোক, একটি বিষয় স্পষ্ট: বর্তমান বিশ্বে অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কূটনৈতিক নমনীয়তা ও বাস্তববাদী সিদ্ধান্ত গ্রহণই ছোট ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোর প্রধান শক্তি। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক পদক্ষেপ সেই বাস্তববাদী কূটনীতিরই একটি উদাহরণ।
লেখক: শিক্ষক, সমাজবিজ্ঞান ও নৃবিজ্ঞান বিভাগ, এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ।
১৬৬ বার পড়া হয়েছে