মুকুলের ঘ্রাণে মাতোয়ারা নওগাঁ: হলুদ-সবুজের বাগানে ভালো ফলনের স্বপ্ন
বুধবার, ২৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ১:৫৯ অপরাহ্ন
শেয়ার করুন:
নওগাঁজুড়ে এখন যেন এক অন্যরকম ঋতুর আগমনবার্তা। সারি সারি আমগাছ ভরে উঠেছে মুকুলে। চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছে মনকাড়া ঘ্রাণ-প্রকৃতি যেন নিজেই রাঙিয়েছে হলুদ আর সবুজের অপূর্ব মেলবন্ধনে।
অনুকূল আবহাওয়ার কারণে গতবারের তুলনায় এ বছর গাছে মুকুল এসেছে বেশি। সবুজ পাতার ফাঁকে ফাঁকে ফুটে ওঠা মুকুলে আশার আলো দেখছেন চাষিরা।
ধানের পরেই এ জেলার কৃষকদের প্রধান ভরসা আম। নওগাঁ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে জেলায় ৩০ হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে আম চাষ হয়েছে। গত বছর এ পরিমাণ ছিল ৩০ হাজার ৩০০ হেক্টর। গতবার আম উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৪ লাখ ৩১ হাজার টন। তবে দীর্ঘ শীত ও ঘন কুয়াশায় ফলন বিপর্যয়ের কারণে উৎপাদন নেমে আসে ৩ লাখ ৭৫ হাজার টনে। এবার কৃষি বিভাগ ৪ লাখ ৫০ হাজার টন আম উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে।
জেলার মধ্যে সবচেয়ে বেশি আম চাষ হয়েছে সাপাহার উপজেলা ও পোরশা উপজেলা এলাকায়। এই দুই উপজেলাতেই প্রায় ২০ হাজার হেক্টর জমির বাগানে আম চাষ হয়েছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, বড় ও মাঝারি আকারের গাছে এবার মুকুলের আধিক্য বেশি। শুধু বাগানেই নয়—বসতবাড়ি কিংবা রাস্তার পাশের গাছেও মুকুলের বাহার। গাছের ডালপালা যেন হলুদে মোড়ানো। ফলনের আশায় ব্যস্ত সময় পার করছেন বাগান মালিকরা।
চাষিদের অভিজ্ঞতা বলছে, গত বছর মুকুলের উপস্থিতি ছিল বেশ ভালো, কিন্তু দীর্ঘ শীত ও ঘন কুয়াশায় অধিকাংশ মুকুল ও গুটি ঝরে যায়। ফলে ফলন ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তবে এ বছর শীতের তীব্রতা কম এবং ঘন কুয়াশা না থাকায় এখন পর্যন্ত পরিস্থিতি অনুকূলে রয়েছে।
সাপাহারের তরুণ কৃষি উদ্যোক্তা সোহেল রানা জানান, গত বছর তার বাগানের ৫০-৬০ শতাংশ গাছে মুকুল এসেছিল। এবার এখন পর্যন্ত ৮০ শতাংশ গাছে মুকুল এসেছে। বাকি গাছগুলোতেও আগামী ১৫ থেকে ২০ দিনের মধ্যে মুকুল আসবে বলে তিনি আশাবাদী। ইতোমধ্যে কিছু মুকুলে গুটি ধরতে শুরু করেছে। রোদের তাপ ভালো থাকায় ছত্রাকের আক্রমণও কম।
একই উপজেলার চাষি ফিরোজ হোসেন বলেন, গত বছর ১৫ থেকে ২০ দিন দেরিতে মুকুল এসেছিল। মার্চের মাঝামাঝি সময়েও অনেক গাছে মুকুল ধরেছিল। তবে এবার অনেক আগেই মুকুল এসেছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে ভালো ফলনের সম্ভাবনা রয়েছে।
পোরশার চাষি মেহেদী হাসান জানান, মুকুল আসার পর থেকেই গাছের প্রাথমিক পরিচর্যা শুরু করেছেন। কৃষি বিভাগের পরামর্শ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় স্প্রে করা হচ্ছে। বর্তমানে আবহাওয়া আমের জন্য সহায়ক।
আমচাষি জাকারিয়া হোসেন বলেন, এবার সবার বাগানেই মুকুলের পরিমাণ বেশি। মুকুল ঝরে পড়া ঠেকাতে সার, কিটনাশক ও সেচ দেওয়া হচ্ছে। তবে বালাইনাশক ও শ্রমিকের মজুরি বৃদ্ধিতে উৎপাদন খরচ বেড়েছে বলে তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
নওগাঁ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক হুমায়রা মণ্ডল জানান, জানুয়ারির শেষ সপ্তাহ থেকে মুকুল আসা শুরু হয়েছে। মুকুল ধরার পর থেকেই তাপমাত্রা বেড়েছে এবং ঘন কুয়াশা হয়নি। ফলে এখন পর্যন্ত মুকুল ঝরে পড়ার ঘটনা নেই। ভালো ফলনের আশাবাদ ব্যক্ত করে তিনি বলেন, মুকুল ও গুটি রক্ষায় কৃষকদের কীটনাশক ও ছত্রাকনাশক ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, নওগাঁর আমবাগান এখন শুধু প্রকৃতির সৌন্দর্য নয়—কৃষকের স্বপ্নেরও প্রতীক। যদি আবহাওয়া অনুকূলে থাকে, তবে এবার আমে আমে ভরে উঠবে নওগাঁ, আর সেই সুবাস ছড়িয়ে পড়বে দেশজুড়ে।
১০৬ বার পড়া হয়েছে