মুকুলের হাসিতে রঙিন ‘আমের রাজধানী’, ফলনের স্বপ্নে ভাসছে কৃষক
সোমবার, ২৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ৩:৪৯ অপরাহ্ন
শেয়ার করুন:
বসন্তের হালকা রোদ, নরম হাওয়া আর শীতের বিদায়ের ঘণ্টা-সব মিলিয়ে দেশের ‘আমের রাজধানী’ হিসেবে খ্যাত চাঁপাইনবাবগঞ্জ যেন এখন হলুদ রঙের উৎসবে মেতেছে।
জেলার আমবাগানগুলো একে একে মুকুলে সেজে উঠছে। অনুকূল আবহাওয়ার সুবাদে ইতোমধ্যে প্রায় ৭০ শতাংশ আমগাছে দেখা দিয়েছে মুকুল। কৃষি বিভাগের আশা, মাসের শেষ পর্যন্ত আবহাওয়া এমন থাকলে প্রায় প্রতিটি গাছই মুকুলে ভরে উঠবে।
কৃষি কর্মকর্তারা বলছেন, তাপমাত্রার সঠিক ভারসাম্য আর আর্দ্রতার সুন্দর সমন্বয় এবার মুকুল আসার জন্য আদর্শ পরিবেশ তৈরি করেছে। মৌসুমের শুরুতেই এমন ‘হলুদ সংকেত’ বড় ফলনের পূর্বাভাস দিচ্ছে। তবে শেষ হাসি হাসতে হলে নজর রাখতে হবে রোগবালাই আর কালবৈশাখির দিকে—কারণ ঝড়-বৃষ্টি আর অনিয়ন্ত্রিত আবহাওয়াই পারে স্বপ্নে ভাটা ফেলতে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের প্রধান অর্থকরী ফসল আম। ফজলি, খিরসাপাত, গোপালভোগ, ল্যাংড়াসহ দেড় শতাধিক জাতের সুস্বাদু আম উৎপাদিত হয় এ জেলায়। স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরবরাহের পাশাপাশি বিদেশেও রপ্তানি হয় এখানকার আম। মৌসুমে রাজধানীসহ বড় শহরগুলোতে এ জেলার আমের চাহিদা থাকে তুঙ্গে। তাই জেলার অর্থনীতির বড় ভরসাই এই সোনালি ফল।
গত বছর ফলন ভালো হলেও পাকার মৌসুমে বৈরী আবহাওয়ার কারণে অনেক আম নষ্ট হয়ে যায়। টানা বৃষ্টিতে দাম পড়ে যায়, আর উৎপাদন খরচ তুলতে না পেরে লোকসান গুনতে হয় অনেক চাষিকে। সেই ক্ষতি পুষিয়ে নিতে এবার মৌসুমের শুরু থেকেই বাগানে চলছে বাড়তি যত্ন-আত্তি। নিয়মিত সেচ, আগাছা পরিষ্কার, সুষম সার প্রয়োগ আর রোগ-পোকার বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ওষুধ ব্যবহারে ব্যস্ত সময় কাটছে চাষিদের।
তবে পরিচর্যার খরচ এবার বেড়েছে। সার, কীটনাশক আর শ্রমিকের মজুরি—সবকিছুর দামই আগের তুলনায় বেশি। চাষিদের দাবি, প্রণোদনা, সহজ শর্তে কৃষিঋণ ও বাজার ব্যবস্থাপনায় সরকারি সহায়তা বাড়ালে তারা আরও উৎসাহ নিয়ে উৎপাদনে মন দিতে পারবেন।
জেলার টিকরামপুর এলাকার আমচাষি মিলোন আলী বলেন, “এ বছর মুকুল আসার জন্য আবহাওয়া মৌসুমের শুরু থেকেই ভালো। দিনের বেলায় যে তাপমাত্রা দরকার, রোদের মাধ্যমে সেটি পাওয়া যাচ্ছে। আরও ১০ দিন এমন থাকলে মুকুলের পরিমাণ আরও বাড়বে।”
আমচাষি সরিফুল ইসলাম জানান, “গত বছর টানা বৃষ্টিতে আম নষ্ট হয়ে অনেক চাষি ক্ষতির মুখে পড়েন। এ বছর ভালো মুকুল আর ভালো ফলনের আশাতেই সবাই বাগান পরিচর্যায় ব্যস্ত।”
অন্যদিকে আমচাষি মুকুল হোসেনের আক্ষেপ, “আম চাষে প্রচুর খরচ হয়। সার, কীটনাশক, পানি ও শ্রমিক—সবকিছুতেই ব্যয় বাড়ছে। অথচ ধান, গম বা পাটের মতো ফসলে কৃষকরা সরকারি প্রণোদনা পেলেও আমচাষিরা তা পান না। সরকার যদি প্রণোদনা দেয়, তাহলে আমরা আরও উৎসাহ পাব।”
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, চাঁপাইনবাবগঞ্জের উপপরিচালক ড. ইয়াছিন আলী জানান, অনুকূল আবহাওয়ায় ইতোমধ্যে ৭০ শতাংশ গাছে মুকুল এসেছে। মাসের শেষ পর্যন্ত মুকুল আসার সময় রয়েছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে ব্যাপক মুকুলের সম্ভাবনা রয়েছে। কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে নিয়মিত মাঠ পরিদর্শন ও চাষিদের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
জেলা কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, এ বছর জেলায় ৩৭ হাজার ৪৮৭ হেক্টর জমিতে আমবাগান রয়েছে। আবহাওয়া সহায়ক থাকলে লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী উৎপাদন সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে অনেক বাগানে মুকুল রক্ষায় ছত্রাকনাশক ও বালাইনাশক প্রয়োগ শুরু হয়েছে। পাশাপাশি মৌমাছির উপস্থিতি নিশ্চিত করতে পরিবেশবান্ধব ব্যবস্থাপনার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে, যাতে পরাগায়ন ভালো হয় এবং ফলের গুটি বেশি ধরে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মুকুল আসার পরবর্তী সময়টিই সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ। অতিরিক্ত কুয়াশা, অকালবৃষ্টি বা তাপমাত্রার হঠাৎ পরিবর্তনে মুকুল ঝরে পড়তে পারে। তাই নিয়মিত পর্যবেক্ষণ ও সময়মতো পরিচর্যা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সব মিলিয়ে মৌসুমের শুরুতেই মুকুলে ছেয়ে যাওয়া আমবাগান নতুন আশার বার্তা দিচ্ছে। গত বছরের ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে এবং ন্যায্য দাম পেতে চাষিরা এখন তাকিয়ে আছেন অনুকূল আবহাওয়া ও সহায়ক বাজার ব্যবস্থার দিকে। আবহাওয়া যদি সহায় হয়, তাহলে ‘আমের রাজধানী’ আবারও সোনালি ফলনে ভরে উঠবে-এমন প্রত্যাশাই সংশ্লিষ্ট সবার।
১০৮ বার পড়া হয়েছে