জাতির উদ্দেশে ভাষণ
নতুন বাংলাদেশ গড়ার আহ্বান জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমানের
সোমবার, ৯ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ৪:৩৭ অপরাহ্ন
শেয়ার করুন:
আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে নতুন বাংলাদেশ গড়ার একটি ঐতিহাসিক সুযোগ হিসেবে উল্লেখ করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। তিনি দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, অতীতের রাজনৈতিক ধারা পরিহার করে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে একটি বৈষম্যহীন ও মানবিক বাংলাদেশ গড়ে তুলতে হবে।
সোমবার সন্ধ্যায় বাংলাদেশ টেলিভিশন ও বেতারে জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে তিনি এসব কথা বলেন। নির্বাচনের প্রাক্কালে ভাষণে তিনি দলের রাজনৈতিক দর্শন, সংস্কার পরিকল্পনা ও ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রব্যবস্থার রূপরেখা তুলে ধরেন।
ভাষণের শুরুতে তিনি জুলাই অভ্যুত্থানের শহীদদের রূহের মাগফিরাত কামনা এবং মহান মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানান। আহতদের দ্রুত আরোগ্য কামনা করে তিনি বলেন, বৈষম্য ও স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে ছাত্র–জনতা, নারী, শ্রমিক, পেশাজীবী এবং দেশপ্রেমিক সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের ঐক্যই ছিল জুলাইয়ের মূল শক্তি। তিনি বলেন, ভবিষ্যতে এমন বাংলাদেশ গড়তে হবে, যেখানে জনগণকে অধিকার আদায়ে আর রাস্তায় নামতে না হয়।
ডা. শফিকুর রহমান অভিযোগ করেন, ২০০৯ সালের পর থেকে ক্ষমতাসীন সরকার মানবাধিকার ও ভোটাধিকার ক্ষুণ্ন করেছে এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ধ্বংস করেছে। গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা ও তথাকথিত ‘আয়নাঘর’-এর কথা উল্লেখ করে তিনি ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ বলে মন্তব্য করেন। তাঁর ভাষায়, তরুণ প্রজন্ম এখন পরিবারতন্ত্র ও গোষ্ঠীতন্ত্রমুক্ত একটি “বাংলাদেশ ২.০” দেখতে চায়।
জুলাই-পরবর্তী সময়ে শুরু হওয়া সংস্কার প্রক্রিয়া এখনও অসম্পূর্ণ দাবি করে তিনি বলেন, রাষ্ট্রের কাঠামোগত সংস্কার নিশ্চিত করতে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি গণভোট আয়োজন করা হচ্ছে। এ গণভোটে সংস্কারের পক্ষে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেওয়ার আহ্বান জানান জামায়াত আমির।
নির্বাচনী ইশতেহারের মূলনীতি তুলে ধরে তিনি বলেন, সততা, ঐক্য, ইনসাফ, দক্ষতা ও কর্মসংস্থানের পক্ষে ‘হ্যাঁ’ বলতে হবে। একই সঙ্গে দুর্নীতি, ফ্যাসিবাদ, আধিপত্যবাদ, বেকারত্ব ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে ‘না’ বলার আহ্বান জানান।
জামায়াত আমির শিক্ষা, বিচার বিভাগ এবং অর্থনীতি ও ব্যাংকিং খাতে আমূল সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দেন। নৈতিকতা ও প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, বেকার ভাতা নয়, দক্ষতা উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানই হবে মূল লক্ষ্য। বিচার বিভাগে সৎ ও যোগ্য বিচারক নিয়োগের মাধ্যমে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার কথা বলেন তিনি। অর্থনীতি ও ব্যাংকিং খাতে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি এবং অনানুষ্ঠানিক খাত সংস্কারের ওপর গুরুত্ব দেন।
নারীর মর্যাদা ও সমান সুযোগ নিশ্চিত করার অঙ্গীকার করে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, জামায়াত ক্ষমতায় গেলে নারীরা রাজনীতি থেকে করপোরেট সব ক্ষেত্রে সমান অংশগ্রহণের সুযোগ পাবেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশ মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিষ্টান—সবার দেশ; এখানে কেউ ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে ভয়ের মধ্যে থাকবে না।
প্রবাসীদের অবদানের প্রশংসা করে তিনি জানান, তাদের জন্য ভলান্টিয়ার প্রতিনিধি ব্যবস্থা চালু করা হবে এবং ভবিষ্যতে সংসদে প্রবাসী প্রতিনিধিত্বের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
ভাষণে তাবলীগ জামাতের সদস্যদের ‘ভাই’ সম্বোধন করে তিনি বলেন, অতীতে তাদের মানবাধিকার লঙ্ঘিত হয়েছে, ভবিষ্যতে তা আর হতে দেওয়া হবে না। আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে সমমর্যাদা ও জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথাও পুনর্ব্যক্ত করেন তিনি। জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা এবং রোহিঙ্গাদের নিরাপদ প্রত্যাবর্তনে কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদারের প্রতিশ্রুতি দেন।
ভাষণের শেষাংশে রাষ্ট্রীয় দায়িত্বকে ‘আমানত’ হিসেবে উল্লেখ করে তিনি জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র গড়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন এবং আসন্ন নির্বাচনে দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানান।
১২০ বার পড়া হয়েছে