প্রমাণহীন বয়ানের সূত্র ধরে চট্টগ্রামে জামায়াত আমীরের ‘মিথ্যা’ ভাষণ
মঙ্গলবার, ৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ৪:১৬ অপরাহ্ন
শেয়ার করুন:
কর্নেল (অব.) ড. অলি আহমদ বীর বিক্রমের একক দাবি–তিনি নাকি মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে “সর্বপ্রথম বিদ্রোহ” ঘোষণা করেন–এই প্রমাণহীন বয়ানকে ভিত্তি করে চট্টগ্রামে এক সমাবেশে বিতর্কিত বক্তব্য দিয়েছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর।
মুক্তিযুদ্ধের শুরুর পর্যায়ে বিদ্রোহের ঘটনাকে নতুনভাবে ব্যাখ্যা করে দেওয়া এ ভাষণকে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতির ঘৃণ্য চেষ্টা হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষক ও মুক্তিযোদ্ধারা।
চট্টগ্রাম নগরের ফউজদারহাট-অঞ্চল সংলগ্ন ময়দানে সোমবার আয়োজিত এক সমাবেশে জামায়াতের আমীর দাবি করেন, “মুক্তিযুদ্ধের সর্বপ্রথম বিদ্রোহ করেছিলেন কর্নেল অলি আহমদ; ইতিহাসকে বিকৃত করে তাঁর ভূমিকা গোপন রাখা হয়েছে।” তিনি আরও ইঙ্গিত দেন, স্বাধীনতার ঘোষণার ক্ষেত্রেও প্রচলিত বর্ণনা নাকি “একচোখা ও একপেশে”।
তবে মুক্তিযুদ্ধ গবেষণা, সমকালীন সামরিক নথি কিংবা নিরপেক্ষ ঐতিহাসিক গ্রন্থে কর্নেল অলি আহমদের এই দাবির পক্ষে সুস্পষ্ট কোনো প্রমাণ পাওয়া যায় না। বরং তাঁর “সর্বপ্রথম বিদ্রোহ” সংক্রান্ত বক্তব্যের প্রধান উৎস হচ্ছে তাঁর নিজস্ব স্মৃতিচারণ, সাম্প্রতিক কিছু সাক্ষাৎকার এবং সীমিত সংখ্যক সমর্থকধর্মী প্রতিবেদন। ইতিহাসবিদদের একটি অংশ দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছেন, ১৯৭১ সালে চট্টগ্রাম ও দেশের বিভিন্ন স্থানে একাধিক ইউনিট ও জোনে প্রায় একই সময়ে বিদ্রোহ ও প্রতিরোধ গড়ে ওঠে; কোনো এক ব্যক্তিকে এককভাবে “প্রথম বিদ্রোহী” ঘোষণা করা ইতিহাসকে অতি সরলীকরণের শামিল।
জামায়াত আমীরের সর্বশেষ বক্তব্যে তাই নতুন করে বিতর্কের জন্ম নিয়েছে। মুক্তিযোদ্ধা ও প্রগতিশীল নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা বলছেন, একটি রাজনৈতিক দল দীর্ঘদিন যুদ্ধাপরাধের দায় এড়ানোর চেষ্টা করেছে; এখন তারা নির্বাচনী সমীকরণে সুবিধা নেওয়ার জন্য মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে নিজেদের মতো করে সাজাতে চাইছে। তাঁদের ভাষায়, “প্রমাণহীন ব্যক্তিগত দাবি ধরে ‘প্রথম বিদ্রোহী’ বানিয়ে দেওয়া মুক্তিযুদ্ধকে দলীয় প্রচারের উপকরণে পরিণত করার সামিল।”
ইতিহাসবিদদের মতে, মুক্তিযুদ্ধের মতো স্পর্শকাতর অধ্যায়ে ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণ অবশ্যই মূল্যবান, তবে তা যাচাইযোগ্য দলিল, সমকালীন সাক্ষ্য ও বহুমাত্রিক গবেষণার সঙ্গে মিলিয়ে দেখা জরুরি। অন্যথায় প্রজন্মের কাছে বিভ্রান্তিকর বার্তা পৌঁছায়। তাদের মতে, সাম্প্রতিক এই বক্তব্য শুধু ইতিহাস বিকৃতিই নয়, মুক্তিযুদ্ধের সম্মিলিত চরিত্রকে খণ্ডিত করার অপচেষ্টা।
লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট, লেখক
১০৭ বার পড়া হয়েছে