নানা প্রতিশ্রুতি, দ্বিমুখী বয়ান: জামায়াতের দ্বিচারিতার রাজনীতি কতটা উন্মোচিত
শুক্রবার, ৩০ জানুয়ারি, ২০২৬ ৫:৩১ অপরাহ্ন
শেয়ার করুন:
নির্বাচনের আগে গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার আর ‘সবার নিরাপত্তা’র আশ্বাস দিচ্ছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী।
একই সঙ্গে নারী নেতৃত্ব, শরীয়া আইন, ৭১-এর ভূমিকা ও ধর্মভিত্তিক প্রচারণায় দলটির পরস্পরবিরোধী বক্তব্য ও কৌশল জনগণের একাংশের কাছে স্পষ্ট দ্বিচারিতা হিসেবে ধরা পড়ছে।
জামায়াতের প্রতিশ্রুতি বনাম গোপন রাজনৈতিক চরিত্র
দলটির ঘোষণায় তারা নিজেদেরকে গণতন্ত্র, আইনের শাসন ও সংখ্যালঘু নিরাপত্তার রক্ষক বলে দাবি করলেও দীর্ঘদিন ধরে সংগঠন ও নেতৃত্ব কাঠামো জনসমক্ষে অস্বচ্ছই থেকেছে। স্থানীয় পর্যায়ে পূর্ণাঙ্গ কমিটি, কাউন্সিলের সময়, কার কোন পদ—এসব তথ্য গণমাধ্যম বা জনপরিসরে ধারাবাহিকভাবে পাওয়া যায় না বলে অভিযোগ রয়েছে, ফলে দলের ভেতরের জবাবদিহিতা কতটা কার্যকর তা যাচাই করার সুযোগও সীমিত।
এমন বাস্তবতায় নির্বাচন এলেই জামায়াতের নেতারা সাধারণ ভোটারের সামনে যে অঙ্গীকারপত্র তুলে ধরেন—দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ, সব নাগরিকের অধিকার, নারীর নিরাপত্তা, সংখ্যালঘুদের সুরক্ষা—তা দলটির সাংগঠনিক গোপনীয়তা ও অতীত রাজনৈতিক অবস্থানের সঙ্গে তীব্র অসামঞ্জস্য তৈরি করেছে।
নারী নেতৃত্ব: কথায় সম্মান, কাঠামোয় নিষেধাজ্ঞা
সাম্প্রতিক সময়ে আলজাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জামায়াতের আমীর ডা. শফিকুর রহমান স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, কোনো নারী কখনোই জামায়াতের প্রধান হতে পারবে না।
আলজাজিরা সাংবাদিক জানতে চাইলে, “একজন নারী কি কখনো জামায়াতের প্রধান হতে পারেন?” উত্তরে তিনি বলেন, “এটা সম্ভব না। আল্লাহ নারী-পুরুষকে আলাদা প্রকৃতিতে সৃষ্টি করেছেন; একজন পুরুষ যেমন সন্তান ধারণ ও বুকের দুধ খাওয়াতে পারে না, তেমনি নারীরও সীমাবদ্ধতা আছে।”
সেই সঙ্গে তিনি জানান, চলমান জাতীয় নির্বাচনে জামায়াত একটিও নারী প্রার্থী মনোনয়ন দেয়নি, শুধু ভবিষ্যতে “প্রস্তুতি” নেওয়ার কথা বলেছেন; যদিও স্থানীয় সরকার নির্বাচনে কিছু নারী প্রার্থী অংশ নিয়েছেন বলে উল্লেখ করেন।
কিন্তু রাজনৈতিক বাস্তবতায় ঠিক এই দলই অতীতে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট সরকারের অংশ ছিল, যেখানে প্রধানমন্ত্রী ছিলেন একজন নারী, খালেদা জিয়া।
একদিকে নারী নেতৃত্বাধীন সরকারের অংশীদার হওয়া, অন্যদিকে নিজেদের সংগঠনে নারীর সর্বোচ্চ নেতৃত্ব সম্পূর্ণভাবে অগ্রহণযোগ্য বলা—এই দ্বৈত অবস্থানই এখন সামাজিক মাধ্যমে ও বিশ্লেষকদের কাছে জামায়াতের “নীতিগত না, সুবিধাবাদী ধর্মব্যাখ্যা” হিসেবে সমালোচিত হচ্ছে।
শরীয়া আইন নিয়ে দুই মুখ: সংখ্যালঘুদের সামনে এক কথা, কোর ভোটারের সামনে আরেক
শরীয়া আইন প্রসঙ্গেও জামায়াতের বক্তব্যে দেখা যাচ্ছে দ্বৈততা। ঢাকায় খ্রিস্টান নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে জামায়াতের আমীর শফিকুর রহমান প্রতিশ্রুতি দেন, ক্ষমতায় গেলে বাংলাদেশকে তারা শরীয়া আইনে পরিচালনা করবেন না, বিদ্যমান সংবিধান ও আইন কাঠামোর ভেতরেই দেশ চলবে।
শরীয়া আইন, ব্লাসফেমি বা সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিয়ে খ্রিস্টান নেতাদের উদ্বেগের জবাবে তিনি আশ্বাস দেন, সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে কোনো বাড়তি আইন আনা হবে না এবং তারা এ প্রতিশ্রুতিকে রেকর্ডেও রাখবেন।
কিন্তু একই সময়ে মাঠে জামায়াতের কিছু প্রার্থী ও নেতারা নির্বাচনী সমাবেশে আল্লাহর আইন প্রতিষ্ঠা, শরীয়া ভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থা ও “ইসলামি শাসন” প্রতিষ্ঠার কথা বলছেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদন ও ভিডিওতে উঠে এসেছে।
এই দুই ধরনের ভাষা—একদিকে আন্তর্জাতিক ও সংখ্যালঘু মহলের সামনে ‘শরীয়া না আনার’ আশ্বাস, অন্যদিকে নিজস্ব কোর ক্যাডার ও সমর্থকদের সামনে শরীয়া প্রতিষ্ঠার ইশারা—জামায়াতের আসল অবস্থান নিয়ে ভোটারদের মনে বড় ধরনের সংশয় তৈরি করছে।
‘আল্লাহর দূত’ দাবি ও ধর্মভিত্তিক প্রচারণা
খুলনা-১ আসনে জামায়াতের প্রার্থী কৃষ্ণ নন্দী সাম্প্রতিক এক নির্বাচনী সমাবেশে নিজেকে “আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রেরিত বার্তাবাহক” হিসেবে আখ্যায়িত করায় নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছেন।
উইথড্র হওয়া ভিডিওতে দেখা যায়, তিনি সমাবেশে বলেন, “আমাদের নেতা ডা. শফিকুর রহমান আমাকে আপনাদের মাঝে পাঠিয়েছেন, কেন পাঠিয়েছেন জানেন? আমি আল্লাহর দূত হয়ে আপনাদের কাছে এসেছি, নইলে আমি এখানে কেন আসতাম?”—এই বক্তব্য ভাইরাল হওয়ার পর সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক সমালোচনা হয়।
সমালোচকরা বলছেন, একটি গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রে কোনো প্রার্থী নিজেকে “আল্লাহর দূত” দাবি করে ভোট চাইলে তা শুধু নির্বাচন আচরণবিধি নয়, ধর্মীয় অনুভূতিকেও রাজনৈতিক হাতিয়ার বানানোর সামিল।
স্থানীয় বিএনপি প্রার্থীও অভিযোগ করেছেন, কৃষ্ণ নন্দী একদিকে হিন্দু ভোটারের সামনে দাবি করছেন মৃত্যুর পর তাদের নাম জপতে হবে, অন্যদিকে মুসলমানদের বলছেন তিনি “আল্লাহর পক্ষ থেকে পাঠানো”—যা স্পষ্টভাবে ধর্মকে ভোটের টানে ব্যবহার করা।
এই বাস্তবতায়, একদিকে জামায়াত নেতারা আন্তর্জাতিক মহলের সামনে ধর্মনিরপেক্ষতার ভাষা, আরেকদিকে মাঠে বেহেস্ত, আল্লাহর দূত, শরীয়া—এমন ধর্মতাড়িত প্রতিশ্রুতি ব্যবহার করায় দলটির উপর নীতি-ভিত্তিক বিশ্বাসের বদলে “ধর্মীয় আবেগের সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা” দেখছেন অনেক ভোটার।
৭১’র ভূমিকা, ক্ষমা প্রার্থনা ও ‘ভুল ছিল কিছু লোকের’
বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় জামায়াতে ইসলামীর ভূমিকা নিয়ে দেশের ভেতরে ও বাইরে বহু গবেষণা ও বিচারপ্রক্রিয়ায় সহযোগিতার অভিযোগ উঠেছে; দলের শীর্ষস্থানীয় একাধিক নেতা যুদ্ধাপরাধের মামলায় দণ্ডিত হয়েছেন।
তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জামায়াতের নতুন নেতৃত্ব ১৯৭১ সালের প্রসঙ্গে “কিছু ভুল”, “কিছু ব্যক্তির অপরাধ” ইত্যাদি শব্দ ব্যবহার করে সামগ্রিক দলীয় দায়কে আড়াল করার চেষ্টা করছে বলে বিশ্লেষকদের মন্তব্য।
পাবলিক প্ল্যাটফর্মে কখনো তারা “ভুলের জন্য দুঃখ প্রকাশ” বা “ক্ষমা চাওয়ার” মতো সুরে কথা বলেন, আবার অন্য প্রসঙ্গে বিচারপ্রক্রিয়াকে ‘অন্যায়’ বা ‘রাজনৈতিক’ বলে উল্লেখ করেন—যাতে প্রকৃত অনুশোচনার বদলে তা রাজনৈতিক কৌশল হিসেবেই ধরা পড়ছে।
এই দ্বৈত ভাষা—একদিকে অতীত ভুলের আংশিক স্বীকারোক্তি, অন্যদিকে সেই ভুলকে ছোট করে দেখা—ভোটারের কাছে জামায়াতের আন্তরিকতা নিয়ে আরও প্রশ্ন তৈরি করছে।
ক্যাডার-কেন্দ্রিক সংগঠন, সদস্যপদ অস্বচ্ছতা ও দায় এড়ানোর সুযোগ
জামায়াত-বান্ধব বা বিরোধী বিভিন্ন বিশ্লেষণেই এসেছে, দলটি ও তাদের ছাত্রসংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবির স্থানীয় পর্যায়ে পরিচিতির চেয়ে ক্যাডারভিত্তিক, নেটওয়ার্ক-নির্ভর কাঠামোর উপর বেশি নির্ভর করে।
মিছিল-মিটিংয়ে দেখা যাওয়া বহু কর্মী এলাকার সাধারণ মানুষের কাছে অপরিচিত; আবার মহিলা সংগঠনের কর্মীরাও প্রায়ই নিজেদের বাসস্থান থেকে দূরে অন্য এলাকায় কাজ করেন—ফলে স্থানীয় জনগণের সঙ্গে স্বাভাবিক রাজনৈতিক যোগাযোগ তৈরি হয় না।
সদস্যপদ ও বহিষ্কার প্রক্রিয়াও বাইরে থেকে প্রায় অপ্রমাণযোগ্য। মাঠের অভিজ্ঞতা বলছে, কোনো পরিচিত জামায়াত-সমর্থক অনৈতিক কাজে ধরা পড়লে বা আলোচনায় আসলে স্থানীয় নেতৃত্ব অনেক সময় বলে থাকেন, “ও তো বহু আগেই জামায়াত থেকে বহিষ্কৃত/সঙ্গ ত্যাগ করেছে”—কিন্তু এর কোনো আনুষ্ঠানিক নথি বা গণমাধ্যমে প্রকাশ থাকে না।
একইভাবে কেউ যদি দল ছাড়ার ঘোষণা দিয়ে অন্য দলে যোগ দেন, তখন আবার বলা হয়, “ও কখনোই জামায়াতের কর্মী ছিল না”—যা প্রমাণের বেড়াজালে ফেলে সাধারণ মানুষকে।
এই অস্বচ্ছতার সুযোগেই দলটি একদিকে কর্মীদের কর্মতৎপরতা থেকে সাংগঠনিক সুবিধা নেয়, অন্যদিকে বিতর্কিত ঘটনা ঘটলে সহজেই ব্যক্তিকে অস্বীকার করে দায় এড়িয়ে যেতে পারে—এমন অভিযোগ ক্রমে জনমনে জমেছে।
ভোটের কৌশল নাকি নীতির রাজনীতি?
নির্বাচন সামনে রেখে জামায়াত একদিকে গণতন্ত্র, মানবাধিকার, সংখ্যালঘু নিরাপত্তা ও নারীর প্রতি সম্মান দেখানোর প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে; অন্যদিকে একই সময় নারী নেতৃত্ব অস্বীকার, শরীয়া আইন নিয়ে দ্বৈত ভাষা, ৭১-এর ইতিহাসের আংশিক স্বীকারোক্তি আর ধর্মীয় পুরস্কারের লোভ দেখিয়ে ভোট চাওয়ার ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এটি মূলত ‘ভোটের কৌশল-নির্ভর ইসলামি রাজনীতি’; যেখানে নীতি ও আদর্শের চেয়ে তাৎক্ষণিক লাভ, আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা ও ক্ষমতার সমীকরণকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
ফলে সচেতন ভোটারদের একাংশ এখন প্রশ্ন তুলছেন—
• যে দল নিজস্ব সংগঠনের ভেতর নারীর নেতৃত্ব অগ্রহণযোগ্য ঘোষণা করে,
• সংখ্যালঘুদের সামনে শরীয়া আইন না আনার কথা বলে, আবার মাঠে শরীয়া রাষ্ট্রের ডাক দেয়,
• ৭১-এর ইতিহাসে নিজের দায়কে ‘কিছু লোকের ভুল’ বলে ঘোলাটে রাখে,
• আর ধর্মের পুরস্কার দেখিয়ে ভোট চায়—
তাদের প্রতিশ্রুতিকে কি গণতন্ত্র, সমতা ও জবাবদিহির বাস্তব প্রতিশ্রুতি হিসেবে ধরা যায়?
এতসব দ্বিচারিতা, অস্বচ্ছতা ও দ্বিমুখী বয়ানের মাঝেই জামায়াত আজ ভোট চাইছে “ইসলামি কল্যাণরাষ্ট্র” গড়ার নামে। কিন্তু ক্রমশ বেশি সংখ্যক মানুষ এখন প্রশ্ন তুলছেন—এই কল্যাণ কি সবার জন্য, নাকি কেবল এক সংকীর্ণ ক্যাডার ও স্বার্থগোষ্ঠীর জন্য—এবং সেই প্রশ্নের স্পষ্ট, নীতিগত উত্তর এখনও দেয়নি দলটি নিজেই।
লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট।
১১৮ বার পড়া হয়েছে