টি২০ বিশ্বকাপ থেকে বাদ পড়ার পর এখন কী করতে পারে বাংলাদেশ?
রবিবার, ২৫ জানুয়ারি, ২০২৬ ১:৫২ পূর্বাহ্ন
শেয়ার করুন:
টি২০ বিশ্বকাপ থেকে বাংলাদেশকে বাদ দেওয়ার পর এখন কী করতে পারে—এটা শুধু ক্রিকেট নয়, কূটনীতি ও আইনি কৌশলেরও প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। আইসিসির সিদ্ধান্তে বিশ্বকাপে না খেলতে পারা বাংলাদেশের জন্য বড়সড় প্রতিকূলতা হলেও এটি পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার শেষ সুযোগও বটে।
প্রথমত, রয়েছে আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক পথ। আইসিসির ভেতরে যে বিরোধ নিষ্পত্তি কমিটি আছে, সেখানে বিসিবি ইতোমধ্যে আবেদন করেছে—সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার অনুরোধ জানিয়ে। এই কমিটি সরাসরি আইসিসি বোর্ডের সিদ্ধান্ত উল্টে না দিতে পারলেও, বাংলাদেশের আপত্তি ও যুক্তি আনুষ্ঠানিকভাবে নথিবদ্ধ করার জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ। পরবর্তী ধাপে আন্তর্জাতিক স্পোর্টস আরবিট্রেশন কোর্টে যাওয়ার সুযোগও খোলা রাখে এই প্রক্রিয়া। লোজানভিত্তিক ওই আদালতে গেলে মূল লক্ষ্য হবে—প্রক্রিয়াগত ন্যায়বিচার চাওয়া, বৈষম্যের অভিযোগ তুলে ধরা এবং সম্ভব হলে ক্ষতিপূরণ বা প্রতীকী প্রতিকার আদায়, যদিও বাস্তবে বিশ্বকাপের দলবদল উল্টে দেওয়ার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ।
দ্বিতীয়ত, কূটনৈতিক ও বোর্ড–রাজনীতি এখন বড় ফ্যাক্টর। বাংলাদেশের ভেন্যু–বিতর্ক শুধু ভারত–বাংলাদেশ সম্পর্কেই প্রভাব ফেলেনি, আইসিসির অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার ভারসাম্য নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে। এই অবস্থায় বাংলাদেশকে কয়েকটি কাজ সমান্তরালে করতে হবে—আইসিসি বোর্ড মিটিংয়ে “নিরাপত্তা–ভিত্তিক ভেন্যু বিরোধ” নিয়ে আলাদা নীতি ও স্বাধীন রিভিউ প্যানেলের প্রস্তাব তোলা; এশীয় দেশসহ অন্য বোর্ডগুলোকে বোঝানো যে, নিরাপত্তা উদ্বেগ অগ্রাহ্য করার এই নজির ভবিষ্যতে তাদের বিরুদ্ধেও যেতে পারে; এবং ভবিষ্যৎ আয়োজন, কোয়ালিফিকেশন ও রাজস্ব বণ্টনের আলোচনায় নিজ অবস্থান শক্ত রাখা। এতে তাৎক্ষণিক ফল নাও আসতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশকে পুরোপুরি কোণঠাসা হওয়া থেকে রক্ষা করবে।
তৃতীয়ত, সবচেয়ে জরুরি অংশ হলো ক্রিকেট–সংক্রান্ত ‘ড্যামেজ কন্ট্রোল’। বিশ্বকাপে না খেলতে পারায় বাংলাদেশি খেলোয়াড়রা উচ্চমানের প্রতিদ্বন্দ্বিতা, বিশ্বমঞ্চের অভিজ্ঞতা ও আইসিসি অংশগ্রহণজনিত আর্থিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত হবে। এই ক্ষতি আংশিক পুষিয়ে নিতে দ্রুত বিকল্প ম্যাচ ক্যালেন্ডার বানানো দরকার—ঘরের মাঠে শক্তিশালী ত্রিদেশীয় বা চারদেশীয় টি২০ সিরিজ আয়োজন, বেশি সংখ্যক দ্বিপক্ষীয় সিরিজের চেষ্টা, এবং তরুণ ও অভিজ্ঞ ক্রিকেটারদের বিদেশি ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগে খেলতে সব ধরনের সহায়তা দেওয়া। এতে অন্তত ম্যাচ অনুশীলন ও প্রতিযোগিতামূলক মান কিছুটা ধরে রাখা সম্ভব হবে।
চতুর্থত, ভবিষ্যৎ বড় টুর্নামেন্টকে সামনে রেখে নীতি পরিষ্কার করা প্রয়োজন। সরকার ও ক্রিকেট বোর্ডের মধ্যে নিরাপত্তা–সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত ও ক্রিকেটীয় বাস্তবতার সমন্বয়ের জন্য একটি লিখিত প্রোটোকল করা যেতে পারে, যেখানে নির্ধারিত থাকবে—কোন পরিস্থিতিতে কোন ধরণের নিরাপত্তা আপত্তি ওঠানো হবে, এবং সে সিদ্ধান্ত কীভাবে আন্তর্জাতিক বোর্ডগুলোর সঙ্গে আগেভাগে শেয়ার করা হবে। এতে একই ধরনের সংকট আবার তৈরি হওয়ার ঝুঁকি কমবে।
শেষত, জনমত ও ক্রিকেটারদের মানসিক দিক সামাল দেওয়া এখন বড় কাজ। অনেক খেলোয়াড় ইতিমধ্যে প্রকাশ্যে হতাশা ব্যক্ত করেছেন, সমর্থকরাও বিভক্ত—কেউ নিরাপত্তা, কেউ ক্রিকেটীয় স্বার্থের পক্ষে। বোর্ডের উচিত স্পষ্টভাবে জানানো যে, ক্রিকেটারদের ওপর কোনো দায় চাপানো হচ্ছে না; বরং তারা দেশের প্রতিনিধি হিসেবে সম্মানিত, এবং ভবিষ্যৎ টুর্নামেন্টে অংশ নেওয়ার পথ খোলা রাখতে বোর্ড সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে।
অর্থাৎ, এখনই সব দরজা বন্ধ করে ‘অভিমানী বিচ্ছিন্নতা’ দেখালে তা বাংলাদেশের ক্রিকেটের জন্য দীর্ঘমেয়াদে আত্মঘাতী হবে। বরং আইনি আপিল, কূটনৈতিক তৎপরতা ও বাস্তবসম্মত ক্রিকেটীয় পরিকল্পনা—এই তিন দিকেই একসঙ্গে কাজ করা ছাড়া সামনে যাওয়ার যুক্তিসংগত পথ নেই।
লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট, লেখক
১৩৫ বার পড়া হয়েছে