বাংলাদেশের বিশ্বকাপ না-যাওয়া: মুস্তাফিজ ইস্যু, আইসিসি ভোট ও ‘ক্রিকেট কূটনীতি’
বৃহস্পতিবার , ২২ জানুয়ারি, ২০২৬ ১:০৭ অপরাহ্ন
শেয়ার করুন:
ভারতে অনুষ্ঠিতব্য টি–টোয়েন্টি বিশ্বকাপ না খেলার সিদ্ধান্তের পর বাংলাদেশের ক্রিকেটে এখন সবচেয়ে বড় বিতর্ক দুটি প্রশ্নকে ঘিরে—মুস্তাফিজুর রহমানকে আইপিএল থেকে বিশেষভাবে বাদ দেওয়া হলেও কেন এখনো আনুষ্ঠানিক কারণ স্পষ্ট নয়, আর আইসিসি কি সচেতনভাবেই এমন ভোট–প্রক্রিয়া সাজিয়েছে, যাতে বাংলাদেশ আবেগ ও চাপে পড়ে বয়কটের পথে হাঁটে।
কলকাতা নাইট রাইডার্স ও বিসিসিআই জানায়, “সাম্প্রতিক ঘটনার” প্রেক্ষিতে বোর্ডের নির্দেশে মুস্তাফিজকে স্কোয়াড থেকে ছাড়তে হয়েছে, তবে প্রকাশ্যে কোনো লিখিত সুনির্দিষ্ট কারণ দেখানো হয়নি। ভারতীয় গণমাধ্যম ও বিশ্লেষকদের বড় অংশ এটাকে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অস্থিরতা, সংখ্যালঘু নির্যাতন ইস্যু ও সোশ্যাল মিডিয়ায় মুস্তাফিজকে ঘিরে বিতর্কের সঙ্গে যুক্ত করে দেখালেও, বোর্ডের আনুষ্ঠানিক ভাষ্যে এসবের কিছুই নেই; ফলে খেলোয়াড় বাদ পড়েছে, কিন্তু “অপরাধ” কী—এটা যাচাইযোগ্যভাবে আজও ধরা যায়নি।
এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিসিবি আইসিসি ও বিসিসিআই–এর কাছে ব্যাখ্যা চেয়ে চিঠি পাঠায় এবং অনানুষ্ঠানিকভাবে এটাকে রাজনৈতিক প্রভাবিত সিদ্ধান্ত বলে অভিহিত করে, তবে আইসিসি লিখিতভাবে জানিয়ে দেয়—আইপিএল একটি ঘরোয়া টুর্নামেন্ট, সেখানে কোনো খেলোয়াড়কে বাদ–রাখা আন্তর্জাতিক ভেন্যু–নিরাপত্তা আলোচনার সঙ্গে যুক্ত করা যাবে না। বাংলাদেশের ভেতরে এ অবস্থান নিয়ে তীব্র উদ্বেগ তৈরি হলেও বিসিবি এখনো আইনি বা কঠোর কূটনৈতিক পাল্টা–পদক্ষেপের আনুষ্ঠানিক পথে যায়নি; বরং সরকারের নিরাপত্তা মূল্যায়ন ও রাজনৈতিক অবস্থানের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বিশ্বকাপ না–খেলার সিদ্ধান্তকে সামনে এনেছে।
প্রশ্ন উঠেছে—এমনটি যদি কোনো ভারতীয় ক্রিকেটারের ক্ষেত্রে ঘটত, ভারত কী করত? অতীত অভিজ্ঞতা বলছে, ভারতীয় ক্রিকেটারকে রাজনৈতিক কারণে বাদ দিলে ভারত সাধারণত দ্রুত কড়া প্রতিক্রিয়া দেখাত—দ্বিপাক্ষিক সিরিজ বাতিল, ঐ দেশকে ভবিষ্যৎ টুর্নামেন্টে বয়কটের হুমকি, এমনকি কূটনৈতিক স্তরেও প্রতিবাদ—এসবের নজির রয়েছে। ভারতের বোর্ড ও বাজারশক্তির ওজন এতটাই বেশি যে, অন্য বোর্ড ও আইসিসি প্রায়ই আগেভাগেই সমঝোতার পথে যায়, যাতে এমন পরিস্থিতি তৈরি না হয়; তাই অনেক বিশ্লেষকের মতে, কোনো ভারতীয় ক্রিকেটারকে নিয়ে মুস্তাফিজ–ধরনের ‘অঘোষিত’ বাদ–সিদ্ধান্ত বাস্তবে টিকেই থাকত না।
আইসিসি যে ভোট–প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বাংলাদেশের ভেন্যু বদলের প্রস্তাব নাকচ করেছে, সেটিও এখন নতুন বিতর্কের কেন্দ্র। বিসিবি জানুয়ারির শুরুতে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রস্তাব দেয়, বাংলাদেশ দলের ম্যাচগুলো ভারত থেকে সরিয়ে শ্রীলঙ্কা বা নিরপেক্ষ ভেন্যুতে নেওয়া হোক; আইসিসি কিছুদিন আলোচনার পর ২১ জানুয়ারি বোর্ড মিটিং ডেকে ফুল–মেম্বারদের ভোটে পাঠায় বিষয়টি। সেখানে বাংলাদেশ ও পাকিস্তান বাদে সবাই ভেন্যু অপরিবর্তিত রাখার পক্ষে ভোট দেয়; একই সঙ্গে বাংলাদেশকে ২৪ ঘণ্টার আলটিমেটাম দেওয়া হয়—ভারতে গিয়ে খেলবে, না কি স্কটল্যান্ডকে তাদের জায়গায় নামিয়ে দেওয়া হবে। আগে প্রকাশ্যে কোথাও বলা হয়নি যে এমন স্পর্শকাতর বিষয়ে ভোট হবে এবং সঙ্গে সঙ্গে এত অল্প সময়ের মধ্যে সিদ্ধান্ত দিতে হবে—এ কারণে সমালোচকদের অভিযোগ, প্রক্রিয়াটাই এমনভাবে সাজানো হয়েছে, যাতে বাংলাদেশ প্রায় বাধ্য হয় আবেগ ও মর্যাদাবোধের জায়গা থেকে ‘না’ বলতে।
বাংলাদেশের ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ নজরুল আইসিসির শর্তকে সরাসরি “অগ্রহণযোগ্য” বলেছেন এবং দাবি করেছেন, মিটিংয়ে তিনি “শকিং” কিছু মন্তব্য শুনেছেন যা একটি নিরপেক্ষ আন্তর্জাতিক সংস্থার কাছ থেকে প্রত্যাশিত নয়। আইসিসি আবার যুক্তি দিয়েছে, একাধিক স্বতন্ত্র নিরাপত্তা–অ্যাসেসমেন্টে ভারতের ভেন্যুগুলো নিয়ে কোনো নির্দিষ্ট, বিশ্বস্ত হুমকি পাওয়া যায়নি; তাই এখন ভেন্যু বদল করলে তা ভবিষ্যতের জন্য “খারাপ দৃষ্টান্ত” হয়ে যাবে এবং অন্য দলও রাজনৈতিক চাপে পড়ে এভাবে পরিবর্তনের দাবি তুলবে। কিন্তু সমালোচকেরা মনে করছেন, আইসিসি নিজেই আরেক দৃষ্টান্ত তৈরি করল—কোনো দেশের নিরাপত্তা উদ্বেগ ও খেলোয়াড়–বাছাইয়ে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের অভিযোগকে উপেক্ষা করে বড় বোর্ডের অর্থনৈতিক স্বার্থ অক্ষুণ্ণ রাখার।
নিরাপত্তা–প্রশ্নের ভবিষ্যৎ নিয়েও এখন সংশয় তৈরি হয়েছে। যদি বাংলাদেশের এই কেসকে আইসিসি “প্রেসিডেন্ট না–বানানোর” অজুহাতে ভেন্যু বদল ঠেকানোর উদাহরণ হিসেবে ধরে রাখে, তাহলে পরেরবার কোনো ছোট বা মাঝারি বোর্ড নিরাপত্তা–ঝুঁকি তুলে ধরলেই তাদের সামনে একই যুক্তি তুলে ধরা হবে—“হুমকি প্রমাণ হয়নি, ভেন্যু বদল নয়, খেলতে হলে খেলো, না হলে বদলি দল আসবে।” ফলে ক্রিকেটের ২২ গজে যে নোংরা কূটনীতি ঢুকে পড়েছে, তা অবিলম্বে ‘ঠিক’ হয়ে যাবে—এমন আশা করা কঠিন; বরং বোর্ডগুলোর সম্মিলিত রাজনৈতিক–কূটনৈতিক চাপ ছাড়া ভবিষ্যতে আর কোনো দলই নিরাপত্তা নিয়ে সহজে প্রশ্ন তুলতে পারবে কি না—সেটাই এখন নতুন বড় প্রশ্ন।
লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্ট।
১২২ বার পড়া হয়েছে