ধামরাইয়ে ধর্ষণ অভিযোগ: ঘটনার বাস্তবতা ছিনতাইয়ের ঘটনা, তথ্য মিলছে না
বুধবার, ২১ জানুয়ারি, ২০২৬ ১২:৫১ অপরাহ্ন
শেয়ার করুন:
ঢাকার ধামরাইয়ে স্বামীর সঙ্গে বেড়াতে এসে এক নারী পালাক্রমে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন বলে খবর ছড়িয়েছে।
তবে তার স্বামী বলছেন, কোনো ধর্ষণের ঘটনা ঘটেনি। ঘটেছে ছিনতাইয়ের ঘটনা। এছাড়া ঘটনাস্থলে গিয়ে তাদের আতিথেয়তা দেওয়া পরিবার ও ঘটনাস্থলের আশপাশের লোকজনের সঙ্গে কথা বলেও ধর্ষণ সম্পর্কে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
ঘটনার পর প্রাথমিক অনুসন্ধানে দেখা যায়, স্বামী পরিচয় দেওয়া ব্যক্তির স্ত্রী নন ওই নারী। এছাড়া গা ঢাকা দিয়েছেন উভয়েই। গত ২০ জানুয়ারি ধামরাইয়ের বালিয়া ইউনিয়নের রামরাবন এলাকায় ঘটনাস্থলে যান এই প্রতিবেদক। কথা হয় স্থানীয়দের সঙ্গে। এছাড়া সকালের দিকে কথা হয় সেই নারীর স্বামীর সঙ্গেও।
কি ঘটেছিল সেদিন ওই নারীকে স্ত্রী পরিচয় দিয়ে রামরাবন এলাকায় নিয়ে আসেন আব্দুর রাজ্জাক। তিনি এনডিই নামে একটি ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের ট্রাক চালক। একই প্রতিষ্ঠানের দিনমজুর হিসেবে কাজ করা রামরাবন এলাকার কৃষ্ণ চন্দ্র মনি দাসের সঙ্গে সখ্যতার জেরে সেদিন বিকেলে স্ত্রীকে নিয়ে তার বাড়ি বেড়াতে আসবেন বলে জানান।
সন্ধ্যার দিকে এক নারীকে নিয়ে কৃষ্ণ চন্দ্র মনি দাসের বাড়ি এসে তাকে স্ত্রী হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেন। কৃষ্ণ চন্দ্র মনি দাসের বাড়িতে পর্যাপ্ত থাকার জায়গা না থাকায় তিনি তাদের থাকতে দেন একই এলাকায় প্রায় ২০০ মিটার দূরে তার বোনের বাড়িতে। আর বোনকে নিজের বাড়িতে নিয়ে যান।
একপর্যায়ে রাত দেড়টার দিকে আব্দুর রাজ্জাক এসে কৃষ্ণ চন্দ্র মনি দাসকে ডেকে তুলে তার স্ত্রীর গহনা, টাকা ও মুঠোফোন ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে বলে জানান। ঘটনা শুনে সেখানে ছুটে যান কৃষ্ণ চন্দ্র মনি দাস ও তার পরিবারের সদস্যরা। সেখানে গিয়ে ছিনতাইয়ের ঘটনা জানতে পারেন তারা।
আব্দুর রাজ্জাক ও তার স্ত্রীর বরাত দিয়ে কৃষ্ণ চন্দ্র মনি দাস জানান, তিনি খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে জানতে পারেন আব্দুর রাজ্জাকের স্ত্রীর কানের দুল, নাক ফুল, গলার চেইন, ১৭ হাজারের মতো টাকা ও মুঠোফোন ছিনিয়ে নেয় অজ্ঞাত পরিচয়ধারী ৫ জন ব্যক্তি। এরমধ্যে দুজন আব্দুর রাজ্জাককে মারধর করে।
আব্দুর রাজ্জাক এই বিষয়ে বলেন, “আমার স্ত্রী বালিয়াটি রাজবাড়ি বেড়াতে আসেন। বিকেলের দিকে আমিও যাই। এরপর আমি রাতে থাকা যাবে কিনা, সেজন্য যোগাযোগ করি কৃষ্ণ চন্দ্র মনি দাসের সঙ্গে। এরপর আমরা রামরাবন আসি। তার বাড়ি আসার পর রাতে তার বোনের বাড়িতে ঘুমাতে যাই। রাত সাড়ে ১০টার দিকে এক যুবক এসে দরজা খুলতে বলে। আমার স্ত্রী বলল, দরজা খুলে দিন, আমরা তো চোর নই। আমি দরজা খুলে দেই। এরপর তারা আমাদের পরিচয় ও সম্পর্ক জিজ্ঞেস করে। আমরা বলার পর সে চলে যায়। রাত দেড়টার দিকে পাঁচজন লোক আবারও এসে দরজা খুলতে বলে। দরজা খোলার পরই তারা বাইরের লাইট বন্ধ করে দেয়। এরপর চারজন ঘরে ঢুকে আমাদের পরিচয় জিজ্ঞেস করে ও আমার মানিব্যাগ থেকে ১৩০০ টাকা নেয়। আমার স্ত্রীর কাছ থেকে দুটি মোবাইল ফোন, তার কানের দুল, নাক ফুল, গলার স্বর্ণের চেইন ও ১৭ হাজারের মতো টাকা ছিনিয়ে নেয়। তারা আমাকে মারধর করে লাথি দেয়। এই ঘটনা আমাকে কাউকে জানাতে নিষেধ করে প্রায় পাঁচ মিনিট পর চলে যায়। পরে আমি পুরো ঘটনা কৃষ্ণ দা’কে জানাই। আর আমি কাউকে চিনতেও পারিনি।”
আব্দুর রাজ্জাক ও তার স্ত্রীর সঙ্গে ঘটে যাওয়া ছিনতাইয়ের ঘটনাটি আওয়াজে টের পান পাশের বাড়ির বাসিন্দা গৃহবধূ শিল্পী মনি দাস। তিনি বলেন, রাত ১টার দিকে হঠাৎ মারামারির শব্দ শুনি, এসে দেখি কেউ নাই, শুধু তারা দুইজন ঘরে দাঁড়িয়ে আছে। পরে ওই মহিলা বললো, তার কানের দুল, গহনা, টাকা, মোবাইল নিছে। আর কাউকে দেখিনি। প্রায় ৪-৫ মিনিট ধরে ঘটে এই ঘটনা।
রাতেই ঘটনাটি শুনে কৃষ্ণ চন্দ্র মনি দাসের সঙ্গে ঘটনাস্থলে এসেছিলেন তার চাচাতো ভাই বিকাশ চন্দ্র মনি দাস। তিনি বলেন, রাতের বেলা আমি আমার বাসায় শুয়ে ছিলাম। আনুমানিক রাত দেড়টার দিকে আমার কৃষ্ণ দাদা ডাক দিয়ে আমাকে ওঠান। তিনি জানান, পাশের একটি বাড়িতে চুরির ঘটনা ঘটেছে। খবর শুনে আমরা দ্রুত ওই বাড়িতে যাই। ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর পরে দেখি, সেখানে ওই মহিলা কান্নাকাটি করছিলেন। আমি তাকে জিজ্ঞেস করি, “ভাবি, কী হয়েছে? কেন কাঁদছেন?” তখন তিনি বলেন, তার কাছে মোট ২২ হাজার টাকা ছিল। এর মধ্যে আগে ৫ হাজার টাকা খরচ করা হয়েছিল। বাকি প্রায় ১৭-১৮ হাজার টাকা চোরেরা নিয়ে গেছে। পাশাপাশি তার দুইটি কানের দুল, একটি নাকফুল এবং আরেকজনের একটি চেইন চুরি হয়েছে বলে জানান। আমি আবারও তাকে জিজ্ঞেস করি, “আপু, কাঁদবেন না। আপনার স্বামী বা কোনো পরিচিত মানুষ কি এসব নিয়ে গেছে?” তিনি বলেন, “না ভাই, আমার পরিচিত কেউ কিছু নেয়নি। তারা অপরিচিত ছিল। আমার স্বামীকে দুজন মারধর করে চলে গেছে।”
পাঁচ দিন পর ভাইরাল হওয়া ঘটনাটি, অভিযোগ পালাক্রমে ধর্ষণের ১৫ জানুয়ারি ঘটনাটি ঘটার পরপরই সকালে পারিবারিক প্রয়োজনে ওই বাড়ি ত্যাগ করেন আব্দুর রাজ্জাক ও তার স্ত্রী পরিচয় দেওয়া সেই নারী। এর চার দিন পর দৈনিক যুগান্তর, দৈনিক আমার দেশ ও দেশ রুপান্তর পত্রিকায় এ নিয়ে খবর প্রকাশ করা হয়। এতে বলা হয়, ঢাকার ধামরাইয়ে বেড়াতে এসে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছেন এক গৃহবধূ। স্বামীকে জিম্মি করে ঘরের খুঁটির সঙ্গে বেঁধে রেখে ওই গৃহবধূকে রাতভর ধর্ষণ করা হয়। সেই সঙ্গে গৃহবধূর কানের দুল, গলার চেইন ও হাতের বালাসহ তিন ভরি স্বর্ণের গহনা ছিনিয়ে নেয় ধর্ষণকারীরা। পরে স্বামী-স্ত্রীকে হত্যার ভয় দেখিয়ে বাড়ি ও গ্রাম থেকে বের করে দেওয়া হয়।
এ ঘটনায় গত শুক্রবার সকালে ভুক্তভোগীরা স্থানীয় ইউপি সদস্য নন্টু চন্দ্র মনি দাসসহ area's গণ্যমান্য ব্যক্তিদের কাছে বিচার চান। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে সজীব চন্দ্র মনি দাসসহ উচ্ছৃঙ্খল কিছু যুবক ধর্ষণের শিকার নারী ও তার স্বামীকে লাঠিপেটা করে গ্রাম থেকে বের করে দেয়। এনিয়ে ফেসবুকের বিভিন্ন পেজ থেকে মুসলিম নারীকে হিন্দুদের পালাক্রমে ধর্ষণের ঘটনা হিসেবেও প্রচার করা হয়।
সরাসরি খোঁজ নিয়ে জানা যায়, স্থানীয় বাসিন্দা নেপাল চন্দ্র মনি দাস নামে এক ব্যক্তি ঘটনাটি স্থানীয় এক সাংবাদিককে বিষয়টি অবহিত করেন। সেই সাংবাদিকের মাধ্যমেই অপরাপর সাংবাদিকরা তথ্য পেয়ে খবরটি প্রকাশ করেন। প্রথম তথ্য দাতা সাংবাদিকের নাম আব্দুল মান্নান। তিনি সম্প্রতি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে চাঁদাবাজিকালে র্যাবের হাতে গ্রেপ্তার হন। তার বিরুদ্ধে ধামরাই ও আশুলিয়া থানায় হত্যাচেষ্টাসহ অন্তত চারটি মামলার তথ্য পাওয়া যায়। বিষয়টি ভাইরাল হওয়ার পর গা ঢাকা দিয়েছেন আব্দুল মান্নান।
একাধিকবার ফোন করলেও তিনি কল ধরেননি। যুগান্তর পত্রিকার স্থানীয় প্রতিনিধিকে ফোন করলে তিনি জানান, ঘটনাস্থলের পাশের বাড়ির নেপাল চন্দ্র মনি দাস আব্দুল মান্নানের কাছে ঘটনাটি জানান। তার কাছে ভয়েস রেকর্ড রয়েছে। তিনি বলেন, প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে যে নামটি বলা হচ্ছে, তার নাম নেপাল চন্দ্রমণি দাস। তার বাড়ি ঘটনাস্থলের কাছেই, রানী মনি দাসের বাড়ির পাশে। এছাড়া স্থানীয় সাংবাদিক আব্দুল মান্নানের কাছে কিছু ভয়েস রেকর্ড আছে, যেখানে ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের নাম বলা হয়েছে।
ধর্ষণের অভিযোগ সম্পর্কে কি বলছেন আব্দুর রাজ্জাক ও স্থানীয়রা? ভাইরাল হওয়া খবরের ভিত্তিতে এই বিষয়ে খোঁজ নিতে গিয়ে ওই নারীর কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। এই ঘটনার পর দিন থেকে কর্মস্থলেও অনুপস্থিত তিনি। আব্দুর রাজ্জাকের জাতীয় পরিচয়পত্রের ঠিকানা ধরে তার গ্রামের বাড়ি মানিকগঞ্জের তেওতা এলাকায় গিয়ে তার স্ত্রীকে পাওয়া যায়। তবে তিনি জানান, তিনি সেই নারী নন। তিনি কখনও রামরাবন এলাকায়ও যাননি।
এদিকে আব্দুর রাজ্জাকের কাছে ওই নারীর বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি কোনো জবাব দেননি। এমনকি এর পর থেকে তার মুঠোফোনও বন্ধ পাওয়া যায়। তবে সকালে কথোপকথনের সময় তার স্ত্রী পরিচয় দেওয়া নারীকে ধর্ষণের কিংবা যৌন নিপিড়নের কোনো ঘটনা ঘটেছে কিনা প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, এমন কোনো ঘটনা ঘটেনি।
প্রতিবেশী শিল্পী মনি দাস বলেন, “আমি পাঁচ মিনিটের মধ্যেই এই বাড়িতে আসি। তখন কাউকে দেখতে পাইনি। তাদের কাছে এমন কোনো ঘটনাও শুনিনি। বেঁধে রাখতেও দেখিনি। শুধু আব্দুর রাজ্জাককে চর থাপ্পড় মারা হয়েছে শুনেছি।”
একই রকম বক্তব্য ঘটনার পরপরই সেখানে আসা বিকাশ চন্দ্র মনি দাসেরও। তিনি বলেন, “ঘটনাস্থলে পৌঁছে আমি তাকে কাঁদতে দেখি। তাকে জিজ্ঞেস করি, তখন তিনি গহনা, টাকা, ফোন ছিনিয়ে নেওয়ার কথা বলেন। তাকে কোনো সম্মানহানি করেছে কিনা প্রশ্ন করলে তিনি এমন কিছু হয়নি বলে জানান। আমি তখনই তাকে বলি সকালে পুলিশ ফাঁড়িতে গিয়ে অভিযোগ করতে। এতে আব্দুর রাজ্জাক ও তার স্ত্রী পরিচয় দেওয়া সেই নারী কেউই রাজি হননি।”
এদিকে পরের দিন সকালে লোকমুখে এই বিষয়ে জানতে পারেন স্থানীয় বালিয়া ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য মন্টু চন্দ্র মনি দাস। তিনি বলেন, “আমি বৃহস্পতিবার সকালে জানতে পারি একটা লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে। এসে আমি কাউকেই পাইনি। আমার কাছে কেউই আসেনি। কোনো সহযোগিতাও চায়নি। যদি সহযোগিতা চাইতো, আমি অবশ্যই সহযোগিতা করতাম। তবে ওই সময় যারা উপস্থিত ছিল, বা পরে যারা এসেছে সবাই বলেছেন, মালামাল নিয়েছে। কিন্তু আর কোনো ঘটনা ঘটেনি।”
পুলিশ মঙ্গলবার দুপুরের দিকে ধামরাই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. নাজমুল হুদা খান ও পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) শহীদুল ইসলাম ঘটনাস্থল পরিদর্শনে যান। ওসি নাজমুল হুদা খান বলেন, “সংবাদমাধ্যম ও সূত্রে পাওয়া খবর থেকে আমরা ঘটনাস্থল পরিদর্শনে এসেছি। পরিদর্শনের সময় এলাকার লোকজনের সঙ্গে কথাবার্তা বলেছি ও জিজ্ঞাসাবাদ করেছি। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী বলা যায়, এখানে পালাক্রমে ধর্ষণ বা কোনো নারীর উপর যৌন নিপীড়নের কোনো সত্যতা পাওয়া যায়নি। যারা এই ঘটনা সংক্রান্ত অভিযোগ করতে চাইবেন, তারা আইনগত ব্যবস্থা নিতে পারেন। তবে স্থানীয় লোকজনের কাছ থেকে ধর্ষণ বিষয়ে কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ইউপি সদস্যের কাছেও বিচারপ্রার্থী হিসেবে কেউ কোনো অভিযোগ জানায়নি। কোনো লোককে বাধা দিয়ে বা অস্ত্রের মুখে ভয় দেখিয়ে ধর্ষণ করা হয়েছে এমন তথ্য পাওয়া যায়নি।”
এদিকে সংবাদমাধ্যমে উল্লেখিত এসআই হারাধন নামে কোনো এসআই নেই বলে জানান ওসি। খোঁজ নিয়ে ধামরাই থানায় আরাধন চন্দ্র সাহা নামে একজন এসআই রয়েছে বলে জানা যায়। তিনি সংবাদমাধ্যমে বক্তব্য দেওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করেন।
১০৬ বার পড়া হয়েছে