রাজনীতিতে বিদেশি গোপন আলাপ: জামায়াতের সাম্প্রতিক বৈঠক, জাপার আগের নজির
বৃহস্পতিবার , ১ জানুয়ারি, ২০২৬ ৬:৩৬ পূর্বাহ্ন
শেয়ার করুন:
বাংলাদেশের দুই ভিন্ন ধারার রাজনৈতিক দল—জামায়াতে ইসলামি ও জাতীয় পার্টি—ভারতের সঙ্গে এমনভাবে কূটনৈতিক/রাজনৈতিক আলাপ করেছে, যার সবিস্তার দেশের জনগণের সামনে তুলে ধরা হয়নি।
একটি ঘটনা একেবারেই সাম্প্রতিক, আরেকটি ঘটেছিল ২০২৩ সালের আগস্টে; দুই ক্ষেত্রেই “সব বলা যাবে না” ধরনের গোপনীয়তার কারণে বিদেশি প্রভাব ও দেশবিরোধী সমঝোতার আশঙ্কা সামনে এসেছে।
জামায়াতে ইসলামির আমির ডা. শফিকুর রহমান ২০২৫ সালের শেষ দিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জানান, এ বছরের শুরুর দিকে তিনি ভারতের একজন কূটনীতিকের সঙ্গে ‘গোপন’ বৈঠক করেছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, বৈঠকটি গোপন রাখার অনুরোধ এসেছে ভারতীয় কূটনীতিকের পক্ষ থেকেই, অর্থাৎ বৈঠকের অস্তিত্ব ও আলোচনার প্রকৃতি দুটোই জনসম্মুখ থেকে আড়াল করার চেষ্টা হয়েছে।
এই সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে প্রথমবারের মতো প্রকাশ পায় যে, বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ ও সম্ভাব্য ‘ইউনিটি গভর্নমেন্ট’ নিয়ে আলোচনার প্রেক্ষাপটে জামায়াতের সঙ্গে ভারতের এমন গোপন যোগাযোগ রয়েছে। বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, সাম্প্রতিক এই তথ্য জামায়াতের রাজনৈতিক অবস্থান, যুদ্ধাপরাধের দায় আর আঞ্চলিক কৌশলের প্রশ্ন—সবগুলোকে নতুন করে বিতর্কের মুখে দাঁড় করিয়েছে।
এর আগেই ২০২৩ সালের আগস্টে তিন দিনের সফরে ভারতের রাজধানী দিল্লি গিয়েছিলেন জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জি এম কাদের। দেশে ফিরে তিনি স্বীকার করেন, ভারতের “গুরুত্বপূর্ণ কয়েকজন” ব্যক্তির সঙ্গে তাঁর বৈঠক হয়েছে, কিন্তু কার সঙ্গে, কী বিষয়ে এবং কতদূর আলোচনা অগ্রসর হয়েছে—এসব প্রশ্নে তিনি প্রকাশ্যে “সব বলা যাবে না” ধরনের মন্তব্য করে সুনির্দিষ্ট তথ্য গোপন রাখেন।
তখনই দেশের গণমাধ্যম ও বিশ্লেষণে প্রশ্ন ওঠে—বাংলাদেশের আসন্ন নির্বাচনে জাতীয় পার্টির ভূমিকা, আসন– সমঝোতা কিংবা পরবর্তী ক্ষমতার সমীকরণ নিয়ে দিল্লিতে কী ধরনের বোঝাপড়া হয়েছে, যা জনগণকে জানানো হচ্ছে না। ফলে ২০২৩ সালের এই ঘটনাটি ছিল বিদেশি রাজধানীতে গোপন বা আংশিক–গোপন রাজনৈতিক আলাপের একটি পূর্ববর্তী নজির, যার ওপর ভিত্তি করে এখনকার অনেক সমালোচক ধারাবাহিকতা টেনে দেখছেন।
দুটি ঘটনাই সময়ের দিক থেকে আলাদা—জাতীয় পার্টির দিল্লি বৈঠক আগের, জামায়াত–ভারতীয় কূটনীতিকের বৈঠকের তথ্য প্রকাশ একেবারে সাম্প্রতিক—তবে উভয় ক্ষেত্রেই অভিন্ন একটি প্রশ্ন উঠে এসেছে: দেশের রাজনৈতিক দলগুলো কি জনগণের ম্যান্ডেটের বদলে বিদেশি সমর্থন ও গোপন সমঝোতায় বেশি ভর করছে? যখন কোনো রাজনৈতিক দল বিদেশি রাষ্ট্রের প্রতিনিধিদের সঙ্গে এমনভাবে আলোচনা করে, যার সম্পূর্ণ বিবরণ নিজেদের জনগণকে জানায় না, তখন সেটিকে বহু বিশ্লেষক সরাসরি দেশবিরোধী ষড়যন্ত্রের ঝুঁকি হিসেবে দেখছেন।
তাদের মতে, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সমীকরণ যদি দিল্লি প্রভৃতি বিদেশি টেবিলে গোপন আলোচনার মাধ্যমে নির্ধারণ হয় এবং দেশের নাগরিকদের কাছে তার জবাবদিহি না থাকে, তবে তা রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব, গণতান্ত্রিক স্বচ্ছতা এবং জনআস্থার জন্য এক গুরুতর হুমকি। এই প্রেক্ষাপটে সাম্প্রতিক জামায়াত–ভারতীয় বৈঠক এবং আগের জাতীয় পার্টি–দিল্লি যোগাযোগকে অনেকেই একই রাজনৈতিক ধারাবাহিকতার অংশ হিসেবে দেখছেন, যা ভবিষ্যতে বাংলাদেশের রাজনীতিতে বহির্ভূত হস্তক্ষেপ আরও জোরদার হওয়ার আশঙ্কা তৈরি করছে।
লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্ট।
১২২ বার পড়া হয়েছে