ঢাকায় বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রায় দুর্গাপ্রতিমা বিসর্জন
বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর, ২০২৬ ১:১০ পূর্বাহ্ন
শেয়ার করুন:
শঙ্খধ্বনি, উলুধ্বনি, ঢাকের বাদ্য আর ভক্তদের জয়ধ্বনিতে আনন্দ-বিষাদের আবহে রাজধানী ঢাকায় শুরু হয়েছে দেবী দুর্গার প্রতিমা বিসর্জনের বিজয়া শোভাযাত্রা। বুধবার (২১ অক্টোবর) বিকেল চারটায় ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দির থেকে শোভাযাত্রাটি শুরু হয়। প্রতিমা বিসর্জন নির্বিঘ্ন করতে রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে ১৬ হাজারের বেশি পুলিশ সদস্য মোতায়েন করেছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)।
এ বছর রাজধানীর বিভিন্ন মণ্ডপের প্রতিমা বিসর্জনের জন্য বুড়িগঙ্গা ও তুরাগ নদে মোট ১১টি ঘাট নির্ধারণ করা হয়েছে। এ বছর ঢাকা মহানগরে ২৫৮টিসহ সারা দেশে ৩৩ হাজার ৮৫১টি মণ্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয়েছে।
প্রতিমা বিসর্জন নির্বিঘ্ন করতে রাজধানীতে সর্বোচ্চ নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণ করেছে ডিএমপি। এ উপলক্ষে নগরীর বিভিন্ন স্থানে ১৬ হাজারের বেশি পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। রাজধানীর ৩৩টি পয়েন্টে প্রতিমা বিসর্জনের আয়োজন করা হয়েছে। এসব স্থানের মধ্যে ওয়াইজঘাট এলাকায় সবচেয়ে বেশি প্রতিমা বিসর্জন হয়েছে।
ডিএমপির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা জানান, দুর্গাপূজা উপলক্ষে এখন পর্যন্ত কোথাও কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। প্রতিমা বিসর্জনসহ পূজার বাকি কার্যক্রমও শান্তিপূর্ণভাবে শেষ হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
আনন্দ, উৎসব আর বিদায়ের বিষাদমাখা অনুভূতির মধ্য দিয়ে রাজধানী ঢাকায় শুরু হয়েছে দেবী দুর্গার প্রতিমা বিসর্জনের বর্ণাঢ্য বিজয়া শোভাযাত্রা। বুধবার (২১ অক্টোবর) বিকেল চারটায় পলাশী মোড়ের ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দির থেকে শোভাযাত্রাটি শুরু হয়।
রাজধানীর বিভিন্ন পূজামণ্ডপ থেকে আনা প্রতিমা নিয়ে শোভাযাত্রাটি জগন্নাথ হল, দোয়েল চত্বর, গুলিস্তান মোড়, নবাবপুর সড়ক ও রায়সাহেব বাজার হয়ে পুরান ঢাকার ওয়াইজঘাটে পৌঁছানোর কথা। রাত ১০টার মধ্যে শোভাযাত্রা গন্তব্যে পৌঁছানোর কথা রয়েছে। ওয়াইজঘাটে বুড়িগঙ্গা নদীতে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে দুর্গোৎসবের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটবে।
হিন্দুধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, মহালয়ার মধ্য দিয়ে মর্ত্যে আগমন ঘটে দেবী দুর্গার। পাঁচ দিনের পূজা শেষে বিজয়া দশমীতে তিনি কৈলাসে স্বামীগৃহে ফিরে যান। অশুভ শক্তির বিনাশ ও শুভ শক্তির বিজয়ের বার্তা নিয়ে দিনটি উদ্যাপিত হলেও দেবীর বিদায়বেলায় ভক্তদের মধ্যে বিরাজ করে বিষাদের আবহ।
বুধবার সকালে ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরে সকাল সাতটায় বিজয়া দশমীর বিহিত পূজা শুরু হয়। সকাল নয়টায় দর্পণ বিসর্জনের মধ্য দিয়ে পূজার শাস্ত্রীয় আনুষ্ঠানিকতা শেষ হয়। এরপর সকাল ১১টা থেকে দুপুর একটা পর্যন্ত চলে সিঁদুর খেলা।
এ সময় সধবা নারীরা স্বামীর দীর্ঘায়ু ও পরিবারের কল্যাণ কামনায় দেবীর চরণে সিঁদুর নিবেদন করেন। পরে একে অপরের কপাল ও গালে সিঁদুর মাখিয়ে উৎসবে অংশ নেন তাঁরা।
বিজয়া দশমী উপলক্ষে সকাল ১১টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিদের শুভেচ্ছা বিনিময়ের আয়োজন করা হয়। এতে ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরের পূজা কমিটির প্রায় ১০০ সদস্য অংশ নেন।
দুর্গোৎসবকে কেন্দ্র করে ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতার পাশাপাশি বিভিন্ন সামাজিক কার্যক্রমও পরিচালিত হয়। মহানগর সর্বজনীন পূজা কমিটির উদ্যোগে ঢাকেশ্বরী মন্দির প্রাঙ্গণে বিনা মূল্যে চিকিৎসাসেবা দেওয়া হয়। বুধবার দুপুরে মন্দিরে প্রায় ৫০ বছর ধরে চলে আসা ঐতিহ্যবাহী রক্তদান কর্মসূচিও অনুষ্ঠিত হয়।
আয়োজকদের পক্ষ থেকে জানানো হয়, নবমীর রাতে প্রায় ৫০ হাজার মানুষের মধ্যে মহাপ্রসাদ বিতরণ করা হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে শুভাশিষ কুমার বিশ্বাস বলেন, “বিশ্বের মধ্যে এটি বিরল যে এক ধর্মের অনুষ্ঠান সুন্দর ও সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে অন্য ধর্মের মানুষ, বিশেষ করে সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম ভাইয়েরা ও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা সহযোগিতা করেন।”
প্রতিমা বিসর্জনকে ঘিরে মণ্ডপে আসা ভক্তদের পাশাপাশি প্রতিমা তৈরির কারিগরদের মধ্যেও ছিল আবেগঘন পরিবেশ। দীর্ঘদিনের প্রস্তুতি ও পূজার আনন্দ শেষে দেবীকে বিদায় জানানোর মুহূর্তে অনেকের চোখেমুখে দেখা যায় বিষাদের ছাপ।
পুরান ঢাকার ওয়ারীর বাসিন্দা প্রতিমাশিল্পী চন্দন চন্দ্র দাস বলেন, “মা দুর্গা আমাদের আরাধ্য দেবী। জগতের সব শক্তির উৎস তিনি। আজ আবার ধরাধাম থেকে তিনি মৃন্ময়ী থেকে চিন্ময়ীতে চলে যাবেন। জগতের অশুভ শক্তি বিনাশ হোক—এই প্রার্থনা নিয়েই মাকে বিদায় জানাচ্ছি।”
লালবাগের বাসিন্দা শ্রাবণী দাস বলেন, গত বছরের তুলনায় এবার তিনি বেশি আনন্দ করেছেন। তবে বিদায়ের মুহূর্তে তাঁর মন খারাপ হচ্ছে। তিনি বলেন, “আজ একটু কষ্ট হচ্ছে। আবার এক বছর পর মায়ের সঙ্গে দেখা হবে।”
ব্যক্তিগত সমস্যার কারণে এবার সিঁদুর খেলায় অংশ নিতে না পারার আক্ষেপও প্রকাশ করেন তিনি।
শিক্ষক সীমা রানী পাল এবারই প্রথম ট্রাকে করে প্রতিমা বিসর্জনের শোভাযাত্রায় অংশ নিচ্ছেন। শহর ও গ্রামের পূজার পরিবেশের পার্থক্য তুলে ধরে তিনি বলেন, “শহরে উৎসবটা সবার হয়ে যায়। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের পাশাপাশি মুসলিম সহকর্মী ও তাঁদের সন্তানদেরও রাতে পূজা দেখতে আসতে দেখা যায়। এ কারণে শহরে সম্প্রীতির মেলবন্ধনটা বেশি।”
দুর্গোৎসবের শেষ দিনে সাধারণত প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে পূজার আনুষ্ঠানিকতা শেষ হয়। তবে ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরের মূল প্রতিমা বিসর্জন না দিয়ে সংরক্ষণ করার ঐতিহ্য রয়েছে।
এ বিষয়ে শুভাশিষ কুমার বিশ্বাস সাধন বলেন, “ঢাকেশ্বরী মন্দিরে দেবী দুর্গা স্বয়ং অধিষ্ঠিত। মন্দির প্রতিষ্ঠার পর থেকেই ঐতিহ্য রয়েছে, এই প্রতিমা আমরা এক বছর সংরক্ষণ করি। পরবর্তী পূজার আগে বিসর্জন দেওয়া হয়। এবার প্রতীকী হিসেবে সপ্তমী পূজার দিন প্রতিষ্ঠা করা কলাবউ বা কলাগাছটি বিসর্জন দেওয়া হবে।”
১৭৩ বার পড়া হয়েছে